Memoir of saraswati puja by Joya Mitra। Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

বাংলা অধ্যাপকদের মধ্যে একজন, হয়তো সুমতিদি, তীক্ষ্ণমেধা ও প্রচুর পাঠে সমৃদ্ধিময়ী, আমাকে একেবারে পছন্দ করতেন না। তাঁকে অল্পবিস্তর সকলেই ভয় করত। তিনি ছিলেন কিছুটা, যাকে বলা যায়, মুডি। ঠিক কখন যে কার ওপর রেগে যাবেন, বলা অসম্ভব ছিল। ফলে তাঁর ক্লাস থাকলে সর্বদাই কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতাম এবং বকুনিও খেতাম। আমার ‘প্রেসেন্ট প্লিজ’টা উনি প্রায়ই শুনতে পেতেন না। অন্যদের কাছে পরে শুনেছিলাম উনি নাকি ভাবেন, ইংরেজির ছাত্রী বলে বাংলাকে আমি কিছুটা অবহেলা করি।

প্রচ্ছদ: শান্তনু দে

Published by: Robbar Digital

Posted:January 27, 2026 12:13 pm | Updated:January 27, 2026 8:02 pm  
Facebook WhatsApp Messenger
Memoir of saraswati puja by Joya Mitra। Robbar

কলেজে ইংরেজি অনার্সের পাশাপাশি আমার সহযোগী বিষয় ছিল স্পেশাল বাংলা। বন্ধুরা অনেক সময় ঠাট্টা করে বলত, ‘দেড়খানা অনার্স’! কারণ, ওই দুই বিষয়ের জেরে আমাকে আর পাসের বিষয় হিসাবে আলাদা করে কিছু পড়তে হত না। সে-কথা আলাদা যে, নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে সংস্কৃতে উত্তররামচরিতের ক্লাস করেছি কিংবা মালতীদির শঙ্খের মতো মন্দ্রস্বরের পাঠন শোনার লোভে দরজার বাইরে দারোয়ানের টুলে বসে থাকতাম। ওই ক্লাসটাতে ভেতরে ঢোকার সাহস ছিল না।

একটা বড় সমস্যা ছিল অবশ্য সেই সুখের দিনকালেও।

বাংলা অধ্যাপকদের মধ্যে একজন, হয়তো সুমতিদি, তীক্ষ্ণমেধা ও প্রচুর পাঠে সমৃদ্ধিময়ী, আমাকে একেবারে পছন্দ করতেন না। তাঁকে অল্পবিস্তর সকলেই ভয় করত। তিনি ছিলেন কিছুটা, যাকে বলা যায়, মুডি। ঠিক কখন যে কার ওপর রেগে যাবেন, বলা অসম্ভব ছিল। ফলে তাঁর ক্লাস থাকলে সর্বদাই কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতাম এবং বকুনিও খেতাম। আমার ‘প্রেসেন্ট প্লিজ’টা উনি প্রায়ই শুনতে পেতেন না। অন্যদের কাছে পরে শুনেছিলাম উনি নাকি ভাবেন, ইংরেজির ছাত্রী বলে বাংলাকে আমি কিছুটা অবহেলা করি। বলা বাহুল্য, অন্যরা কেউ এরকম ভাবতেন না, যদিও তাঁদের প্রশ্ন করে, তর্ক করে, জ্বালাতন করতাম সত্যিকারেই বেশি।

যা হোক, স্কুলে সরস্বতী পুজো পাইনি বলে কলেজে, তার ওপর হস্টেলে থাকার সুযোগে সেই অভাব উসুল করার সুযোগ ঘটত। গেটের ভেতরে বাগানের সামনে গাড়ি ঢোকার রাস্তার ওপর রাত্রি দুটো পর্যন্ত দল বেঁধে আলপনা দেওয়াও বারণ ছিল না। দেবীকে সাজানো শেষ করে ভোর চারটেয় ঘুমতে যাওয়া, সকালে উঠে অঞ্জলি না দেওয়া, ভগবান বলে কিছু নেই। অঞ্জলি দেব কাকে?

–তাহলে সাজালি কেন রাত জেগে?

সে তো একটা অত সুন্দর মূর্তি। ওয়ার্ক অব আর্ট। সাজাব না?– এইসব আস্পর্ধাও মঞ্জুর হত ক্লাসের/হস্টেলের বন্ধুদের কাছে। থার্ড ইয়ারের সরস্বতী পুজোয় হোস্টেলের বন্ধুরা একটু আতঙ্কিত, ‘এবারে ওসব করিস না। এটা কিন্তু ফাইনাল ইয়ার।’ তাও ঘুমোলাম রাত জাগার ক্ষতিপূরণে। বেলার দিকে একবার কখন যেন সুমতিদির চোখে পড়েছে অনুপস্থিতি। সকালে একপত্তন আলপনার প্রভূত প্রশংসা হয়ে গেছে তার আগে। উনি থাকতেন কলেজের কাছেই স্টাফ হস্টেলে। এখনকার কথা ঠিক জানি না, আমাদের কালে টিচারদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের কৌতূহল ছিল প্রচুর। বিশেষত ডে-স্কলাররা যেখানে, যা খবর সংগ্রহ করতে পারত, সেগুলো নিয়ে প্রায় আমরা অমরাবতী তোলপাড়ের রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। কাজেই একটুও সাজসজ্জা করা বা লাজুক ‘মেয়েলি স্বভাব’ মেয়েদের যে কোনও উপলক্ষে তুলোধোনা করা, সেই তীক্ষ্ণমেধা সুমতিদি যে পুরী বেড়াতে গিয়ে সেখানকার কোনও হোটেল মালিক কিংবা ম্যানেজারকে বিয়ে করে ফেলেছেন, সেই খবর ততদিনে চাপা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু খোলাখুলি কোনও কথা নেই কোথাও। কেবল দিন পনেরো ছুটির পর রঙিন শাড়ি পরা সুমতিদি ক্লাস নিচ্ছেন। থার্ড ইয়ারের উত্তেজনা প্রায় জ্বরের মতো, কিন্তু প্রকাশ্যে মুখ সকলেরই প্রস্তরবৎ নিরাসক্ত। তো, সেই সরস্বতী পুজোর দিন অঞ্জলি দেবার সময়ে আমার অনুপস্থিতি খেয়াল করে খোঁজ করায় আমার বন্ধুরা ডেকে এনেছে হোস্টেলের ঘর থেকে।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

অঞ্জলি দিইনি কারণ ভগবান মানি না, এহেন স্বীকৃতির পর বন্ধুরা কেন, আমি নিজেও একটু সিঁটিয়ে আছি। ঠিক কীসের ভয়ে, জানি না, কিন্তু পায়ের দিকটা শিরশির করছে। আমাকে এক মুহূর্ত চুপ করে দেখে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে বলে গেলেন, ‘আমি তোমার সুপারকে বলে যাচ্ছি আমার রুমে চা খেতে যাবে বিকেলে।’ একা পেয়ে কী ঘরে বন্ধ করে রাখতে পারেন? ইত্যাকার ভাবনায় সাথীদের ফেলে আর নিজে বয়ে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে গেলাম। পাঁচটার সময়ে অশোকগাছে ঘেরা দোতলায় ঘরের ভেতর প্রায় ঝাপসা। বইখাতা কাগজের স্তূপ একপাশে গুটিয়ে রাখা টেবিলের পাশে বিছানা। ডাইনিং স্পেস থেকে একটা চেয়ার টেনে আনার চেষ্টা করতে এক ভদ্রলোক, সুমতিদির থেকে স্পষ্টতই তরুণতর, হাত থেকে চেয়ার নিয়ে সেটা খাটের পাশে রাখলেন। তিনি পাশের ঘরে ছিলেন। সুমতিদি বললেন, ‘বোসো, বোসো। এনার কথা তো শুনেছ নিশ্চয়ই?’ আমি নিরুত্তর এবং যথাসাধ্য অপ্রস্তুত। উনি খুব সাবলীলভাবে বললেন, ‘এঁকে বিয়ে করেছি আমি। ছুটি শেষ হতে নিয়ে এলাম যে, আমার কলেজ ঘরবাড়ি দেখে যাক একটু।’ ১৭ বছর বয়সিনী ভীত ছাত্রীর মাথায় কী-ই বা প্রতিক্রিয়া হতে পারে এইসব কথার। সুমতিদি চা করতে যাচ্ছিলেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘তোমরা বসে গল্প করো, আমি চা করে দিচ্ছি! চা আমি তোমার চেয়ে ভালো করি।’ গল্প করব, সুমতিদির সঙ্গে! সকলেই খুব ভালোভাবে প্রথম থেকে জানি ওঁর প্রখর কালীভক্তির কথা। কিন্তু সেসব কথা উঠল না কিছুই। দিদি বলতে লাগলেন, ওঁরা পুরীতে সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে কীভাবে ডুবে যাচ্ছিলেন সেই সব কথা। অমাবস্যার সমুদ্রের কথা। এবং হঠাৎ চমকে ওঠা, ‘এ কী! মা কালীকে আর সরস্বতীকে ভোগ দেবার কথা বলে গেছিলাম, এটা কী করেছ?’ ট্রে-তে বসিয়ে তিনটে কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ভদ্রলোক। সেটা টেবিলে রেখে একটু অপ্রস্তুত হেসে বললেন, “কী করব, দু’জনকে ভোগ দিতে বললে, এদিকে আমি দেখি তোমার ওই সাজানো বাটি মোটে একটা। তাই কমলালেবুর খোসাটাকে বাটির মতো করে কেটে নিলাম। তারপর ভাবলাম মা কালী তো রোজকারের দেবী আর সরস্বতী মোটে একদিনের গেস্ট। তাই ওঁকেই বাটিটা দিলাম আর মা কালীকে ওই কমলালেবুর খোসার বাটি। তা ছাড়া সরস্বতী এত সুন্দরী, ওর ওপর মা কালী নিশ্চয়ই রাগ করবেন না।” তারপর যে আর কী কথাবার্তা হয়েছিল, মনে নেই।

আমরাও ছিলাম ফাঁকি দিয়ে দিন কাটানোর শেষে আসন্ন পরীক্ষার উৎকণ্ঠায়। তখন পড়াশুনোর জন্য হস্টেল ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসার কাল। সরস্বতী পুজোর সেই বিকেল তার দুর্জ্ঞেয়তা নিয়েই হঠাৎ ফিরে এল আজ।

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম

Hostel Culture Robbar Digital Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Saraswati Puja School Teacher

Share this article on