a child in hospital days and a cordial doctor | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

প্রতিবাদ জানিয়ে অনশন করছিলাম। ১৩ দিনের মাথায় জোর করে গলায় নল দিয়ে তরল কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করতে সেটা ঢুকে গিয়েছে শ্বাসনালিতে। দমটম আটকে মরার জোগাড়। তাতে পুলিশের আপত্তি ছিল না বোধহয়, কিন্তু জেল প্রশাসনের ঝামেলা তাদের কাস্টডিতে অনশনরত বন্দি মরে গেলে। কাজেই হাসপাতাল।

Published by: Robbar Digital

Posted:November 29, 2025 4:09 pm | Updated:November 29, 2025 6:27 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৫.

অনেকদিন আগেকার একজন ডাক্তারবাবুকে মনে পড়ল।

বহরমপুরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছি। ১৯৭৩ সাল। শীতকাল। এখনকার বহরমপুর নয়, সে একটা পুরনো বহরমপুর। এখনকার হাসপাতাল নয়, নদীর ধারে অন্য এক পুরনো হাসপাতাল। কোনও চার্জশিট ইত্যাদি ছাড়া, মানে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তিন বছর ধরে জেলে ভরে রাখা হয়েছে কেন– বিশেষত আমার বাড়ির থেকে বহু দূরের এক জেলে, তার প্রতিবাদ জানিয়ে অনশন করছিলাম। ১৩ দিনের মাথায় জোর করে গলায় নল দিয়ে তরল কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করতে সেটা ঢুকে গিয়েছে শ্বাসনালিতে। দমটম আটকে মরার জোগাড়। তাতে পুলিশের আপত্তি ছিল না বোধহয়, কিন্তু জেল প্রশাসনের ঝামেলা তাদের কাস্টডি-তে অনশনরত বন্দি মরে গেলে। কাজেই হাসপাতাল। পরদিন সকালে রাউন্ডে এসে সুপারিন্টেডেন্টের রাগারাগি, ওয়ার্ডের ভেতরে পুলিশ কেন? এখানে আমাদের অন্য রোগীরা আছেন। রক্ষীরা অবশ্য কাউকেই কিছু বিরক্ত করেননি, কেবল তাদের পাহারাধীন আসামীটির দুই পা দু’জনে চেপে ধরে বেডের দু’পাশে বসেছিলেন। তাতেও সুপারের রাগ– ‘এই রুগীর বিশ্রাম আর ঘুম দরকার। পা ধরে বসে থাকলে সেটা হবে না। আপনারা কী করে পাহারা দেবেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার, আমাকে হাসপাতালের ডিসিপ্লিন দেখতে হবে। পেশেন্ট নিয়ে চলে যান।’ দুই রক্ষী ওয়ার্ডের দরজার সামনে দুটো চেয়ারে স্থিত হলেন। তারপর ডাক্তার তালুকদার পড়লেন আমাকে নিয়ে–

‘শুনুন মশাই, আপনি কার সঙ্গে মারামারি করেছেন, কাকে মারবেন, সে সব আপনার ব্যাপার। অনশন করে অসুস্থ হয়েছেন বলে আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, আপনাকে সুস্থ করে তোলাটা আমার ডিউটি। আমার সঙ্গে, হাসপাতালের সঙ্গে তো আপনার কোনও লড়াই নেই? আমাদের চিকিৎসা করতে দিন। গায়ে একটু জোর করে নিয়ে, যান না, আবার যুদ্ধ করুন!’

সমস্ত বলাটা এমন কৌতুকছলে যে রাগ করা বা গাম্ভীর্য বজায় রাখা গেল না। আজ স্বীকার করা যায়, তিন বছর ধরে ক্রমাগত ৮ ফুট বাই ১০ ফুট সেলে একা বন্ধ থেকে থেকে এইটুকু বাইরের আলো-বাতাস, অন্য মানুষদের মুখ, কণ্ঠস্বর, যেন নতুন একটু প্রাণ দিচ্ছিল। ফিরে যাওয়াটাকে আরেকটুখানি বাড়িয়ে নেওয়ার লোভ হল। মেনে নিলাম ডাক্তারের কথা। লেবুর জল থেকে সেদ্ধ তরকারি। তারপর গলা ভাত। তারপরের দিন দেওয়া একটুকরো সেদ্ধ মাছ প্লেট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল খাটের তলা থেকে লাফ দিয়ে ওঠা বিড়াল! তার নখে লেগে কেটে যাওয়া আঙুলটা শাদা হয়ে খুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, একটুও রক্ত বেরল না।

সেদিন সন্ধেবেলা রাউন্ডে এসে ডাক্তার আমাকে শুধোলেন, ‘এই হাসপাতালে থাকার সময়ে যদি কিছু কিনে দিতে হয়, তার খরচা কি আপনার?’

–আমার কেন হবে? আমার কাছে তো কোনও টাকাই নেই। তা ছাড়া আমি কি কাউকে বলেছি আমাকে ধরে এনে জেলে ভরে রাখো? যারা রেখেছে, খরচা তাদেরই।

‘হুঁ!’ বলে সিস্টারকে জিগ্যেস করলেন,

–সিস্টার, এখন বাজারে সবচেয়ে দামি বিস্কুট কী?

দুই সিস্টার হেসে বলল,

–স্যর, ওই যে মোটা মোটা চিনি লাগানো বিস্কুট আছে, ওটা খুব দামি।

–বেশ। সেন্ট্রিদের হাতে স্লিপ করে দেবেন, রোজ ওই বিস্কুট এক প্যাকেট করে পাঠায় যেন। আর হেলথ ড্রিংক।

ওয়ার্ডে অন্য রোগীরা কৌতূহল নিয়ে আমাকে দেখেন, কিন্তু বুঝতে পারি, আমার কাছে আসা বা কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু ভেতরের হলঘরে থাকে ছোট্ট এক পুচ্চি, সে কারও কথার ধার ধারে না। তার বয়েস হয়তো বছর সাতেক। পিঠের বোতাম ছেঁড়া জামার ওপরে পুরনো রং ওঠা সোয়েটার, দিনের মধ্যে বারতিনেক ওয়ার্ডে হইচই বাঁধে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। প্রতিবারই পাওয়া যায়, সে পালিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালের পাশে রাস্তার ওপরে বসা বাজারে। কেউ না কেউ তাকে কিছু খেতে দিয়েছে আর সে গল্প করছে সেখানে বসে।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিনে রক্ষীদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে এসে আমার বিছানায় উঠে বসল একটা শালিকের মতো। কার্বাঙ্কল হয়েছে তার। অপারেশন করতে হবে। সেই তারিখ ঠিক হওয়ার অপেক্ষায় সে এখানে ভর্তি। বাজারে যাচ্ছে না বলে সিস্টাররা স্বস্তিতে আছেন। রোজ পুচ্চি নিজের ছোট্ট হাতটি মুঠো করে তাদের লোভ দেখায়,

–এই এত বড় বড় কুল আছে আমাদের বাড়িতে। একবারটি আমাকে ছেড়ে দাও না গো, তোমাদের এত্ত কুল এনে দেব, সত্যি। সেই নিতান্ত তরুণী সিস্টাররা প্রতিদিন কথা দেয় কালকেই অপারেশনের ব্যবস্থা হবে, কিন্তু হয় না। সবকিছু যে সবার হাতে নয়, সে কথা পুচ্চি বিশ্বাস করে না। বড়দের সকলেরই তো অসীম ক্ষমতা, এই তো, সে যদি একবার বড় হত…।

বিকেল ঠিক পাঁচটায় তার কাছে আসেন তার ম্লান তরুণী মা। সাড়ে চারটে থেকে সে আমার বেডে বসে ওয়ার্ডের বাইরের দরজার দিকে চেয়ে থাকে, আর পাঁচটা বেজে এক মিনিট হলেই ঠোঁট বেঁকে যায়, চোখ দিয়ে ধারা গড়িয়ে পড়ে…

–আমার মা আজ এল না! দুই কি তিন মিনিট তাকে শোনাতে হয় কীভাবে ঘরের দরজার তালাটা লাগাতে একটু দেরি হল মায়ের, ব্রিজ পার হওয়ার সময়ে চটি ছিঁড়ে গিয়েছে বলে সিঁড়ির নিচে বসা মুচির কাছে দাঁড়িয়ে কেমন চটি সেলাই করাতে হচ্ছে। তারপরই মুখখানা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে,

–ওই তো এসে গেছে আমার মা। কিছুক্ষণ সে আর কাউকে চেনে না।

শেষে একদিন ঠিক হল তার অপারেশনের তারিখ। বন্দিত্বের আর আমি কী জানি! আমার কাছে তো সিদ্ধান্ত আমার নিজের হাতে। কিন্তু ওই যে এত বড় বড় কুল আর মায়ের কোলের ঘর থেকে এসে হাসপাতালে আটকে থাকা, যেখান থেকে নাকি বাজারের এক-দুটো চেনা-অচেনা মাসি কিংবা কাকুর সঙ্গে একটু দুটো কথা বলারও স্বাধীনতা নেই– পিঠে কী একটা হয়েছে বলে, ওই ছোট্ট বুকের ভিতর বন্দিত্বের দুঃখের যে আর সীমা-পরিসীমা থাকে না। সেই আটকে থাকা শেষ হওয়ার কূল দেখা যাচ্ছে বলে, ছুরিকাঁচির ভয়ও আর ভয় নয়। কিন্তু সে-ও কী নির্বাধ? সন্ধেবেলা আবার চোখে জল নিয়ে উপস্থিত,

–মাসি গো, আমার কালও হবে নে।
–সে কী, কেন রে?
–কী করে হবে? ডাক্তারবাবুরা কাল ‘টাইট’ করেছে যে।
–কী করেছে?
–টাইট গো টাইট। জানো না, কেউ কোনও কাজ করবে নে…

বুঝবার পর টাইট ভাঙার পক্ষেই যেতে হল মাসিকে। রাউন্ডে আসা ডাক্তার তালুকদারকে জিজ্ঞেস করলাম,

–কাল না কি ‘টাইট’ করছেন আপনারা?

–কী করেছি?

প্রথমে তিনিও থতমত। বুঝিয়ে বলতে হল, পুচ্চির অপারেশন নাকি হবে না কাল?

ধরতে পেরে হা হা করে হেসে উঠলেন ডাক্তার। জোরে ডাকলেন সিস্টারকে,

–দেখুন হাইকোর্টে নালিশ হয়েছে কাল কাজ হবে না বলে। সকাল ছ’টা থেকে শুরু তো? ছ’টার আগে ও-টি রেডি করে দেবেন। অপারেশন কাল হতেই হবে। তারপর স্ট্রাইক।

বিছানায় উঠে বসতে পারছি, কথা বলতে পারছি অন্যদের সঙ্গে। সুতরাং, পরদিন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল জেলে। পুচ্চির সঙ্গে দেখা হয়নি আর। ডাক্তার তালুকদারের সঙ্গেও না। নানা কর্ম-অকর্মের খবরের নিচ থেকে সেই চিকিৎসককে মনে পড়ে মাঝে মাঝে। ওই বিস্কুটের প্যাকেটটা দেখলেও।

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম

Doctor Hospital Jail medical system Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on