
ডিজেনেরেট আর্ট-এর ক্ষেত্রে সত্য উদ্ঘাটনের ভাষাই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল নাৎসি শাসনকালকে। জাতীয়তাবাদ ভয় পায় সত্যের উদ্ঘাটন। সুতরাং এই প্রায় ২০,০০০ শিল্পকর্ম একত্রিত করে পৃথকীকরণ হল। ১৯৩৮-এ আটক করা শিল্পকর্মকে বেচে দেওয়াকে আইনসিদ্ধ করা হল। পরের বছর জুন মাসে, সুইৎজারল্যান্ডে বিরাট আন্তর্জাতিক নিলামে চড়ল সেসব। মাতিস, পিকাসো, ভ্যান গঘ বিক্রি করে প্রভূত মুনাফা লুটল জার্মানি।
সে-ও ছিল বসন্তকাল। ১৯৩৩ সাল। ওয়াইমার রিপাবলিক-এর সময় ফুরল। নাৎসিরা এল ক্ষমতায়। আর বছর কয়েক পরেই শুরু হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। নাৎসি আদর্শকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গ্লাইশশাল্টুং (Gleichschaltung), অর্থাৎ, জার্মান রাজনীতি, সমাজ আর সংস্কৃতিকে সম্মিলিত করে প্রচার শুরু হল। ‘নাৎসিয়ায়ন’ সুপরিকল্পিত এবং বিস্তৃত এক প্রকল্প। পুরনো সব সংগঠন ভেঙে দিয়ে নতুন করে ছাত্রলিগ, খেলাধুলো, মিউজিক ক্লাব আর নাৎসি পেশাদার সংস্থা গঠিত হতে থাকল নাগাড়ে। এই সংস্থার সদস্য হতে হলে ব্যক্তিবিশেষকে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য নাগরিক। এবং প্রামাণ্যভাবে আর্য। এর ব্যতিরেকে সদস্যপদের জন্য আবেদন গ্রাহ্য হবে না। (এই ঘটনা অনিবার্যভাবেই পাঠকের মনে এই বসন্তে ভারতীয় নির্বাচনের ভুক্তিকরণের ঘটনার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করবে।)
জার্মানিতে স্থানীয় আধিকারিকরা একে একে খুলতে লাগলেন ‘চেম্বারস অব হরর’ আর ‘এগজিবিশনস অব শেম’। কৌতূহলের নিরসন ঘটাতে গিয়ে চেম্বারের ভেতর চোখ রাখলে বিস্মিত হতে হয়।
আধুনিক শিল্পকর্ম যে ‘ন্যক্কারজনক’– একথা প্রমাণ করার জন্যই এ হেন আয়োজন। ‘চেম্বারস অব হরর’ ইত্যাদির সম্ভারে ছিল একাধিক অস্কার কোকোশ্কা, আর্ন্সট লুডভিগ কিরখনার, ম্যাক্স বেকম্যান, ফ্রানজ মার্ক, ক্যাথে কোলউইৎজ, জর্জ গ্রস আর ওটো ডিক্স। বাদ গেল না বিশ্ববরেণ্য অ-জার্মান শিল্পীদের কাজও– পিকাসো, কান্দিনস্কি, এমিল নোলদে, শাগাল, পিয়েট মন্ড্রিয়ান, ভ্যান গঘও। ডাডা, সাররিয়ালিজম, কিউবিজম, এক্সপ্রেশনিজম– কিছুই বাদ পড়েনি নাৎসিদের তৈরি করা ‘পঙ্কিল’ তালিকা থেকে।

এই পরিমাণ শিল্পকর্ম একত্র করে দেগে দেওয়ার জন্যই কি এমন আয়োজন? চেম্বারের অভ্যন্তরে লজ্জাজনক আর ভয়ংকর এমন কী ছিল, যা দেখে ভয়ে তাদের চিরদিনের জন্য মুছে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল হিটলারের নাৎসিবাহিনী?
জার্মান মডার্ন আর্টের আত্মপ্রকাশ ১৮৮০-র দশক থেকে। তবু, ১৯০৫ সাল জার্মান আধুনিক শিল্পের বেঞ্চমার্ক ইয়ার। রক্ষণশীল প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পের গণ্ডি অতিক্রম করে সে বছরই জার্মান এক্সপ্রেশনিজম ড্রেসডেন আর মিউনিখে তার আত্মপ্রকাশ ঘটায় ডি ব্রুক (Die Brücke) আর ডার ব্লু রাইটার (Der Blaue Reiter)-এর মাধ্যমে। ভারতবর্ষে সে বছর বঙ্গভঙ্গ। ওয়াইমার রিপাবলিকের সময়ই নিউ অবজেক্টিভিটি (Neue Sachlichkeit) আর বাউহাউস (১৯১৯)-এর মতো মৌলিক শিল্প আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল জার্মানিতে।

ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাউহাউস আন্দোলন শিল্প-কারিগরিবিদ্যা-প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বাহুল্যবর্জিত নকশায় এবং আকারে, কার্যকরি বস্তু নির্মাণ করতে শুরু করে। বলা বাহুল্য, সে বছর কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে খোলা হয় কলাভবন। ব্রিটিশের শেখানো industrial art-এর বুলিতে নয়; নিজস্ব সংস্কৃতি আর আত্ম-অন্বেষণের মধ্য দিয়ে একটি আত্মবিস্মৃত জাতি খুঁজে নেবে নিজের কন্ঠস্বর।– এই উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল কলাভবন। উপনিবেশের শিক্ষার খোলনলচে ছেড়ে, ঐতিহ্য-আধুনিকতা-কারিগরির মিশেলে, কল্পনাশক্তিকে প্রকাশ করার জন্য সুগ্রাহী (receptive) এক সমসাময়িক শিল্প-ভাষা প্রস্তুত করার সেই মুহূর্তই ছিল প্রতিরোধের এক জ্বলন্ত উদাহরণ (বা আর এক যুদ্ধ)।
বাউহাউস-এর পর, জার্মান এক্সপ্রেশনিজম-এর মাত্রাতিরিক্ততা, বাড়তি আবেগ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়ে Neue Sachlichkeit-এর যাত্রা শুরু (১৯২৫-এ Gustav Friedrich Hartlaub তার নামকরণ করেন)। নির্ভীক, তির্যক, ব্যাঙ্গাত্মক এই শিল্প-আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ওয়াইমার-যুগের সমাজের বাস্তবিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক চেহারাটা ধরা। তীর্যক সমালোচনা, ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক সমাজ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ক্লান্ত মন দুটো পৃথক শাখায় নিজেকে ব্যক্ত করল— ডিক্স, এবং গ্রস-এর মতন কড়া সমালোচক, রাজনৈতিক, তিক্ত, Verist শিল্পীরা; আর কিছু ক্ষেত্রে স্থবির, মসৃণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, স্বপ্নময় শ্ক্রিম্পফ, কানোল্ট-এর মতো আরও রক্ষণশীল Classicist-রা।– অর্থাৎ, প্রাচীন গর্বকে টিকিয়ে রাখার দায়ভার থেকে মুক্তিকামী জার্মান আধুনিক শিল্প কোন আঙ্গিকের ভাষা বেছে নিল, তা লক্ষ্যণীয়। সামাজিক অসমতা; যুদ্ধকে উপজীব্য করে অনৈতিক মুনাফা লোটা; বেশ্যা; ‘নব্য নারী’; নাগরিক জীবন– এই তাঁদের মূল বিষয়বস্তু। চিত্র, আলোকচিত্র, স্থাপত্যকর্মে ব্যক্ত হয়েছিল এই প্রকাশভঙ্গিমা।

সৌন্দর্যই শিল্পের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা নয়। যে শিল্পভাষা কেবলই সুন্দর আর পবিত্র; যার উদ্দেশ্য কেবল চাক্ষিক বিনোদন; যার প্রতিক্রিয়ায় দর্শকের শুধুমাত্র ‘অপূর্ব’ বলা ছাড়া আর কিছুই থাকে না– সমসাময়িক সমাজ, রূঢ় বাস্তবকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সে চূড়ান্তভাবে বিফল।
(বলা বাহুল্য, ইদানিং কলকাতা শহরে ছাঁচে ঢালা কারিগরি শিল্পকে নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা এবং প্রচারের রমরমায় বোধহয় শিল্পচর্চার আসল উদ্দেশ্যটা আমরাও ভুলতে বসেছি।) শিল্প এবং সংস্কৃতির আসল উদ্দেশ্য তাহলে কি নিছক বিনোদন? না কি সমসাময়িক কন্ঠস্বর হয়ে নিজেদের সংকট এবং সামাজিক ফাটলগুলো সম্পর্কে সোচ্চার হওয়া? যুদ্ধের আবহে এসব কথা ভাবতে গিয়ে আমাদের ইদানিংকালের জনপ্রিয় শিল্পচর্চার মানদণ্ড আর শিল্পে নিজেদের অবস্থান নিয়ে দ্যোতনা বাড়ে। আমাদের স্থানীয় শিল্পবোধ কি গভীর হওয়ার চাইতে এক আশ্চর্য বালখিল্যতার স্তরে নেমে এল?
এর পাশাপাশি, যুদ্ধ আর শিল্পের সম্পর্ক অপরিহার্যভাবে এ-ও ভাবায়– রাষ্ট্র শিল্পের ওপর কাঁচি চালায় কখন? সমাজে শিল্পীর স্বাধীনতা কেন প্রয়োজনীয়? যে দেশে শিল্পচর্চা নেই, কল্পনা নেই যে সমাজে, সেখানে কি রাষ্ট্র ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগ কায়েম করে অনায়াসে? হার্বার্ট মারকিউস কেন বারবার বলেছেন চিন্তাভাবনা আর সৃজনের ক্ষেত্রটা আগলে রাখার কথা?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে ওয়াইমার রিপাব্লিকের গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনকালে (১৯১৮-১৯৩৩) সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অনেক বেশি উদার। এক্সপ্রেশনিজম-এর মতো আঙ্গিক তাই সাদরে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু নাৎসি নেতাদের হজম হল না আভাঁ-গার্দ শিল্প। আধুনিক শিল্প না কি জার্মান গণতন্ত্রের বিশৃঙ্খলা, নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানির যুদ্ধবিরোধী (বা শান্তিবাদী) গণতান্ত্রিক প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। এই ভয়ে সর্বক্ষণ ত্রস্ত নাৎসি জার্মানি।
এতএব, শিল্পীদের প্রথা ভেঙে বাইরে বেরতে চাওয়া রাষ্ট্রের চোখে অপরাধমূলক হয়ে দাঁড়াল। চোখের আরাম হয় এমন সুন্দর শিল্পকর্মের চাইতে সত্যের শিল্পকর্ম চূড়ান্ত অস্বস্তির কারণ হল জাতীয়তাবাদী সরকারের চোখে। সত্যের আগুনে আত্মাহুতি দিতে ভয় তার। নইলে, যাঁরা দেশজ সংস্কৃতিকেই উপজীব্য করে ভাবনাচিন্তা ব্যক্ত করতে চাইলেন, তাঁরা কেন রাষ্ট্রের রোষের মুখে পড়লেন?

নাৎসিদের এ-ও মনে হয়েছিল– আধুনিক শিল্পের দ্ব্যর্থবোধক চরিত্রের মধ্যে কোথাও না কি লুকিয়ে আছে ইহুদি আর কমিউনিস্ট প্রভাব। এর ফলে নাগরিক সুরক্ষা আর শাসন ভেঙে পড়তে পারে। সাংস্কৃতিক বলশেভিজম দিয়ে না কি জার্মান সমাজকে ফোঁপরা করে দেবে আধুনিক শিল্প। ফ্যাসিজ়ম-এর ভীতির মনস্তত্ত্বের একটা আঁচ এই সুবাদে আবিষ্কার করা গেল। প্রতিষ্ঠা করা হল যে, একমাত্র অপরাধ-মনস্করাই পারে এমন ক্ষতিকারক শিল্পবস্তু বানাতে, যাদের মানসিক, শারীরিক, নৈতিক ক্ষমতা পচনশীল। এতএব, তাদের নির্মিত শিল্পের নামকরণ হল ‘ডিজেনারেট আর্ট’। এই নামকরণ অবাধে ব্যবহার হতে লাগল অপরাধ, অনৈতিকতা, শারীরিক আর মানসিক অক্ষমতাকে বর্ণনা করার জন্য।

জার্মানির বিভিন্ন শহরে তা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হল। কিউরেটরদের ওপর দায়িত্ব বর্তাল আধুনিক শিল্পীদের করা কাজের পৃথকীকরণের। সংগ্রহশালা থেকে সেগুলো বেছে বেছে সরিয়ে নিয়ে সটান স্টোররুমে ঢুকিয়ে দরজায় খিল এঁটে দেওয়া হল। ইহুদি-নিধন যজ্ঞের আগে ঠিক এই কাজটাই নাৎসি জার্মানি করেছে। পৃথকীকরণ। কখনও ইহুদীদের আলাদা করা হয়েছে সন্ধের পর বাড়ি থেকে বেরনো নিষিদ্ধ করে; কখনও হাতে নীল তারা বসানো পট্টি বেঁধে দিয়ে; কখনও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তাদের হাতে উলকি করে নম্বর দেগে দিয়ে। ফ্যাসিস্ট রাজত্বকালে পৃথকীকরণের মধ্যে দিয়ে ‘জাতীয় গোষ্ঠী’ নির্মাণের ঘটনা সহজাত। নীচু জাত বা ভিনদেশি সম্প্রদায় মনে হলেই তাকে ছেঁটে ফেলার প্রাক্কালে এই পদ্ধতিতেই তাদের প্রান্তিক করা হয়।
ভয় যে তীব্র হল তা বোঝা গেল ১৯৩৩-এর সেপ্টেম্বরে। ড্রেসডেন-এ আটক করা শিল্পকর্মের স্থানীয় প্রদর্শনী দেখা গেল। তারপর জার্মানি-অস্ট্রিয়ার বহু শহরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হতে থাকল অধঃপতিত শিল্প কাকে বলে। শেষমেশ ১৯৩৭-এর ১৯ জুলাই, মিউনিখের হফগার্টেন-এর ইন্সটিটিউট অব আর্কিওলজি-তে প্রদর্শিত হল নানান জার্মান সংগ্রহশালা থেকে আটক করা প্রায় ৬৫০টি শিল্পবস্তুর সম্ভার। ‘ডিজেনারেট আর্ট’ (Entartete Kunst)। হিটলারের নির্দেশে সম্প্রচার মন্ত্রী গোয়েবলস গ্রেট জার্মান এগজিবিশন থেকে পৃথক করে, সোল্লাসে যা ‘অধঃপতিত’ হিসেবে দেখাবেন। উৎকর্ষ বোঝানোর জন্য নয়। উপহাস করার জন্য; নিন্দায় ধূলিসাৎ করার জন্য। তারপর বিদেশি ডিলারদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে।

ইচ্ছাকৃতভাবে দমবন্ধ হওয়ার মতো ছোট্ট ঘুপচি ঘরে, ফ্রেমছাড়া, উল্টো, ভুল শীর্ষনাম সমেত বহু শিল্পকর্ম এভাবেই দেখানো হল। কুৎসিত ভাষায় দেওয়াল লিখন সমেত।
এ তো গেল যুদ্ধের আবহাওয়ায় শিল্পের প্রভাব। এখন দেখা যাক শিল্পের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের দিকটার কথা। যুদ্ধের আবহাওয়ায় শিল্প আর যুদ্ধের আন্তঃসম্পর্কের দিকটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে একথা মনে আসা অনিবার্য। এই প্রসঙ্গে শিল্প-ইতিহাসের নিরিখে একটু বিচ্ছিন্নভাবে হলেও বিভিন্ন সময়ে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বহু আলোচিত খানকয়েক শিল্পকর্ম একবার ফিরে দেখা যেতে পারে।
মধ্য যুগের শেষের দিকে ইউরোপের শিল্প-ইতিহাসে ‘দ্য ডান্স অফ ডেথ’ (বা Danse Macabre) বিষয়ক ছবি ছিল অতি জনপ্রিয় রূপক। লাতিনে বলা হয় memento mori। ‘যত বড় হও তুমি মৃত্যুর চেয়ে বড় নও’, একথা হামেশাই মনে করিয়ে দেওয়া বা চেতাবনিই memento mori-র কাজ। প্রথা অনুসারে memento mori-র কম্পোজিশন হত ধর্মীয়, নীতিমূলক বা আশা জাগানোর উদ্দেশ্যে। সমতল আর হরাইজন্টাল কম্পোজিশন। ইউরোপীয় রেনেসাঁস-এও এই চল বজায় ছিল।

কিন্তু ১৪৯৪ থেকে ১৫৫৯ অবধি চলতে থাকা ইতালির যুদ্ধের আবহাওয়ায় আর ফ্রান্সের ধর্মযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে উত্তর ইউরোপীয় (ডাচ-ফ্লেমিশ) রেনেসাঁসের ফ্লেমিশ চিত্রশিল্পী পিটার ব্রুয়েগেল দি এল্ডার-এর আঁকা ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব ডেথ’ (আনুমানিক ১৫৬২), শিল্পের ইতিহাসে ছক ভাঙার নিরিখে নিজেই এক যুদ্ধজয়। পুড়ছে নগর; চতুর্দিকে হত্যালীলায় মত্ত কঙ্কালবাহিনী; আতঙ্কিত মানবসভ্যতা– এই প্রলয়ের ছবি গড়ে উঠেছে একাধিক সাহিত্য-ধর্মীয়-ঐতিহাসিক-দৃশ্যকলার ধারাকে ভিত্তি করে। এই ছবির জটিলতার নিরিখে এই হল গোড়ার কথা।
তার পাশাপাশি ওটোমান আর হাবসবুর্গের যুদ্ধের ফলে লাগাতার অশান্তি জিইয়েই ছিল পশ্চিম ইউরোপ আর ভূমধ্যসাগরে। উপরন্তু ১৫৬০ সালে জারবার যুদ্ধ (Battle of Djerba) শুরু হতেই আসন্ন মহাপ্রলয়ের সূচনা হয়।

ব্রুয়েগেল-এর পূর্ববর্তী ‘ডান্স অফ ডেথ’ বিষয়ক ছবিতে সাধারণত দেখা যেত কঙ্কালরূপী মৃত্যু পথপ্রদর্শক হয়ে ভবিতব্যের দিকে এক সারিতে নিয়ে চলেছে পুরোহিত, চাষি, রাজা– সমাজের সব স্তরের মানুষকে। অর্থাৎ, মৃত্যু সর্বব্যাপী। ব্রুয়েগেল ছবির এই বিন্যাসকে আমূল পালটে ফেললেন। মৃত্যুর একনায়কতান্ত্রিকতাকে ভেঙে দিয়ে ছবিতে জুড়ে দিলেন অগুনতি কঙ্কালরূপী সৈন্যদল। বেলাগাম মানব-নিধন যজ্ঞে মত্ত তারা। শ্রেণি-ধন-ভক্তি ভুলে নির্বিচারে চলছে সে নিধন। নিছক নীতিকথার প্রচারের ধারা বদলে দিয়ে ব্রুয়েগেল যেন সার্বিকভাবে সভ্যতার অবসানের ভয়ঙ্কর এক ছবি আঁকলেন। সে ছবির দৃশ্যের বিস্তার অনুপম।
এই ভয়াবহতার আবহ নির্মাণের জন্য কম্পোজিশন-এও আনা হয়েছিল জটিল নকশার (arrangement) ব্যবহার। ছবির মাঝ বরাবর একটি আনুভূমিক রেখা টেনে দিলে বোঝা সহজ হবে বিষয়টা। নিচের অংশে দেখা যাবে একাধিক তির্যক রেখা মিলে তৈরি করেছে একাধিক অসম্পূর্ণ ত্রিভুজ। যেন একে অপরের গর্ভে বিরাজ করছে। ওপরের অংশে, একেবারে মাঝখানে আরেক উল্টো ত্রিভুজ। ধারের দিকে কোথাও অর্ধচন্দ্রাকার রেখা; কোথাও ইতিউতি অদৃশ্য উল্লম্ব রেখা। এই রেখা বা directional lines ধরেই উপাদান বসানো হয়েছে। ফলে, ছবির বিষয় আর তার উপস্থাপনার সঙ্গে জটিলতার অসামান্য মেলবন্ধন ঘটেছে।

যুদ্ধের বিধ্বংসী রূপ তুলে ধরতে ব্রুয়েগেল তাঁর রসদ সংগ্রহ করেছেন একাধিক ঐতিহাসিক সূত্র ধরে। মধ্যযুগের Danse Macabre ছাড়াও তাঁর পূর্বসুরি হিয়েরোনিমাস বশ-এর ‘দ্য গার্ডেন অব আর্থলি ডিলাইটস’ বা ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’-এর মতো দৈত্যাকার নিসর্গদৃশ্য, নীতিধর্মী রূপক এবং অগুনতি নাতিদীর্ঘ কাহিনির সমাহারে প্রতীকী, জটিল, মহাপ্রলয়ের মতো ছবি থেকে তাঁর নিজের আঁকার ধারাটা ব্রুয়েগেল নির্মাণ করেছেন। যদিও, বশের ছবিতে দৈত্যের বদলে কঙ্কালবাহিনী ব্যবহার করেছেন তিনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৮০ বছরব্যাপী যুদ্ধ। তাঁর সময়ে ধর্মীয় সংঘর্ষ, সামরিক দখল, পাশবিক নিপীড়নই সম্ভবত মৃত্যুদণ্ড, গণমৃত্যু, বা সামাজিক পতনের মতো বিষয়ের প্রতি ব্রুয়েগেল-এর আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। একটু খেয়াল করলে আরেকটা বিষয় চোখে ধরা পড়বে– ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ ডেথ’-এর প্রতি আনাচকানাচে বশ-এর নাতিদীর্ঘ কাহিনিমালার অনুসরণে এক-একটি অণু-গল্প রচনা করেছেন ব্রুয়েগেল– নিচে, বাঁ-দিকে রাজা ও তাঁর ধন; ডানদিকে গান শুনতে ব্যস্ত প্রেমিক-প্রেমিকা; জুয়াখেলার মাঝপথে আক্রান্ত জুয়ারির দল; কঙ্কালদের ভয়ে পালাতে থাকা চাষির দল ইত্যাদি। প্রথম কাহিনিতে ধন মৃত্যুর চেয়ে বড় নয় এবং সময় ফুরবে– একথা মনে করিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়টিতে ইন্দ্রিয়ের সুখ মৃত্যুঞ্জয় নয় এবং তৃতীয়টিতে মৃত্যু যে জুয়ায় জেতার বিহ্বলতা, দাম্ভিকতাকে চুরমার করে দেয়– একথা চেতাবনির মতো বারবার ফিরে আসে। এছাড়াও রয়েছে পুড়তে থাকা নিসর্গদৃশ্য; মাঝখানে দৈত্যাকার কফিনের মতো ফাঁদ, যাতে মানুষকে গবাদি পশুবৎ বোঝানো যায়; তীর্থযাত্রীর কাঁধে ক্রুশ থাকা সত্ত্বেও কঙ্কালদের দল ঘিরে রাখে তাকে।– মৃত্যুর কবল থেকে মুক্তি নেই তারও। এমন একাধিক অণুগল্পে মোড়া সেই ছবি। চোখ এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার পথে স্বভাবতই এক ট্রাজেডি থেকে অন্য ট্র্যাজেডি আবিষ্কার করতে থাকে।

এছাড়া পরিপ্রেক্ষিতকে সঙ্কুচিত করে দেখিয়েও নাটকীয় উপস্থাপনায় সাবেক প্রথাকে ভেঙে বিপ্লব ঘটান ব্রুয়েগেল। তাঁর ছবিতে রঙের ব্যবহার নিয়ে চিন্তাভাবনাও বিস্ময়কর। আগুনে লাল-পোড়া খয়েরি-ছাই-কালো কঙ্কালবাহিনীতে ভরা চতুর্দিক। মৃত্যুর ছায়া বোঝাতে সবুজের অনুপস্থিতি শিল্পীর বুদ্ধিমত্তাকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
শিল্পে যুদ্ধের প্রভাবের প্রসঙ্গে স্পেন-কেও একটু ছুঁয়ে দেখা যাক (পিকাসোর ‘গ্যের্নিকা’ বহুচর্চিত বলে উহ্য রাখা হল)।
১৮০৮ সাল। নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী দখল নিয়েছে স্পেন-এর রাজধানী মাদ্রিদ-এর। রাজা হয়ে বসার পর থেকেই নেপোলিয়নের নজর ছিল স্পেন-এর দখলে থাকা ভূমধ্যসাগরের দিকে। এদিকে স্পেন-এর রাজা চতুর্থ চার্লস তখন রাজ্য চালাতে অক্ষম। প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল দি গোদোই-কে প্রলুব্ধ করলেন নেপোলিয়ন। বললেন, পর্তুগালকে আক্রমণ করে স্পেন আর ফ্রান্সের মধ্য তিনভাগে ভাগ করা হোক। এক তৃতীয়াংশ পাবেন গোদোই একা। লোভ সামলাতে না পেরে নেপোলিয়নের ফাঁদে পা দিলেন গোদোই।

এদিকে রাজার পুত্র, সপ্তম ফার্দিনান্দ তখন সুযোগ খুঁজে চলেছেন গোদোই-কে হত্যা করার। এই পরিস্থিতিতে পর্তুগাল আক্রমণের আগে স্পেন-এর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার ফিকিরে ফার্দিনান্দ-এর সাহায্যে ২৩,০০০ ফরাসি সেনা ঢুকে পড়ল স্পেনে। সেটা ১৮০৭-এর নভেম্বর মাস।
তিন মাস পর বোঝা গেল আসল কারণ। নেপোলিয়ন ফাঁদে ফেলেছেন স্পেনকেই। গোড়ায় কোনও বাধা দেয়নি স্প্যানিশরা। কিন্তু, নেপোলিয়নের প্রধান কম্যান্ডার মার্শাল ইয়োহাকিম মুরাট যখন মনে করলেন– নেপোলিয়নের ভাই জোসেফ বোনাপার্ট-ই হবেন স্পেনের সুযোগ্য রাজা, তখন ফার্দিনান্দ-কে সরতেই হল।
যদিও স্প্যানিশ জনগণ বিদেশি শাসককে মেনে নিয়েছে আগেও একাধিকবার, এই নতুন ফরাসি শাসকের প্রতি তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করল। ‘বিজিত জাতি’– এই পরিচয়ের যন্ত্রণাই নম্র-ভদ্র স্প্যানিশদের ভয়ংকর বিপ্লবের ডাক দেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৮০৮ সালের ২ মে, স্প্যানিশ রাজ পরিবারের শেষ সদস্যটিকে ফ্রান্সে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ামাত্র মাদ্রিদের নাগরিক সমাজ ফুঁসে উঠল দস দি মেয়ো-র অভ্যুত্থানে।
মার্শাল মুরাট ক্ষেপে গেলেন। ফরাসি রক্ত বয়েছে; প্রতিশোধ নিতেই হবে। গ্রেফতার হওয়া সশস্ত্র বিপ্লবীদের প্রত্যেককে মারা হবে গুলি করে। গোয়্যার ছবি সেই প্রতিশোধের প্রতিফলন। ৩ মে, সূর্যোদয়ের আগেই মাদ্রিদ শহরের নানা জায়গায় শ’য়ে শ’য়ে স্প্যানিশ বিপ্লবীদের ঘিরে ধরে তাদের ওপর নির্বিচারে চলল গুলি। কিন্তু স্প্যানিশ প্রতিরোধ বন্ধ হল না; উল্টে পাঁচ বছরের পেনিনসুলার (উপদ্বীপ) যুদ্ধে পরিণত হল। ইতিহাসের নিরিখে সেই প্রথম গেরিলা যুদ্ধ।
এই হল ১৮১৪ সালে গোয়্যার আঁকা ‘দ্য থার্ড অফ মে, ১৮০৮’-র অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট।

কেনেথ ক্লার্ক-এর ‘সিভিলাইজ়েশন: আ পার্সোনাল ভিউ’-এ পাওয়া যায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে গোয়্যা প্রেরিত এক অনুরোধ, যাতে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়– ‘[to] perpetuate by means of his brush the most notable and heroic actions of our glorious insurrection against the Tyrant of Europe’– এই কাজ করার। এর আগে এই ধরনের জয়ের প্রথাগত ছবিতে ‘হিস্ট্রি পেইন্টিং’-এর ধারা অনুসারে জয়ের উপস্থাপন সবক্ষেত্রে ছিল নায়কোচিত। যেমন, থিওডোর জেরিকো-র ‘রাফট অফ দ্য মেডুসা’ (১৮১৮-১৮১৯) বা ইউজিন দেল্যাক্রোয়া-র ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’ (১৮৩০)। গোয়্যার ছবি কিন্ত অ-নায়কোচিত। আত্মসমর্পণের। তাঁর সময়ে ক্যানভাসে এই আয়োজন, ছকভাঙা এক ভিন্ন পদক্ষেপ। পাহাড়ের গায়ে দাঁড় করানো স্প্যানিশ বিপ্লবীর দল। পাহাড় যেন ফায়ারিং স্কোয়াডের কঠিন প্রাচীর। পালাবার পথ নেই। দলের ডানদিকে রক্তাক্ত লাশের গাদা। দু’ ধারে আসন্ন মৃত্যুর শঙ্কায় দু’ হাতে মুখ ঢাকা সমাজের সব স্তরের মুহ্যমান বিপ্লবীরা। একেবারে মাঝখানে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো হাত তুলে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, আলো নাটকীয়ভাবে তাঁর মুখের ওপর। উন্মুক্ত দুই হাতের তালুতে যিশুর মতোই ক্রুশের ক্ষত। মুহ্যমান-আধবসা-সোজা দাঁড়ানো-শায়িত শহিদদের দলের কম্পোজিশনের এই ইচ্ছাকৃত অসামঞ্জস্যপূর্ণতা আশ্চর্য বৈপরীত্য তৈরি করেছে উল্টোদিকে থাকা ফরাসি সেনাবাহিনীর শ্রেণিবদ্ধ, ঠান্ডা, যান্ত্রিক উপস্থাপনে। সারিবদ্ধ সেনাবাহিনী সীমাহীন হয়ে মিশে গেছে দূর অন্ধকারে। যেন অন্ত নেই এই নির্বিচার হত্যালীলার।


শিল্পী নির্বাক নন। তিনি প্রশ্ন তুলবেন। গোয়্যার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘দ্য থার্ড অফ মে’-র দু’ বছর আগেই যে অ্যাকোয়াটিন্ট এচিং সিরিজ করেছিলেন তিনি, তাতে হত্যালীলার নানা ছবি ধরা পড়েছিল প্রেস ফটোগ্রাফির মতো। প্রতিটি এচিং-এর ক্যাপশনে লুকিয়ে আছে গোয়্যার প্রতিক্রিয়া, যা ইংরিজি করলে দাঁড়ায়– ‘আই স ইট’; ‘অ্যান্ড দেয়ার ইজ নো রেমেডি’; ‘ওয়ান ক্যানট লুক অ্যাট দিস’।

যদিও খ্রিস্টীয় শহিদদের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই চিত্র– গেথসেমানি-র বাগান থেকে রাতের অন্ধকারে যিশুকে গ্রেফতারের সময় রোমান সৈন্যদের হাতে থাকা লন্ঠনের আলোয় যিশুর পীড়িত মুখ। তবুও প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছেন গোয়্যা পরতে-পরতে। তির্যক ডিরেকশনাল লাইন; পারিপাট্যের বদলে প্রায় বল্গাহীন উপস্থাপনা আর অসম্পূর্ণতাই প্রচলিত ধারার ইতিহাসকে আমূল বদলে দিয়েছে ‘দ্য থার্ড অফ মে, ১৮০৮’-তে।

১৯১৯-এর আরও একটি ল্যান্ডমার্ক ছবির কথা না বললেই নয়। জন সিঙ্গার সার্জেন্ট-এর ‘গ্যাসড’। দৈর্ঘ্যে ৬.১ মিটার; প্রস্থে ২.৩ মিটার এই সুবিশাল তৈলচিত্রটি আঁকা হয়েছিল ব্রিটেন-এর হল অব রিমেম্ব্র্যান্স-এর অনুরোধে। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট-এ গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অন্ধ ইংরেজ সৈন্যদের সারিবদ্ধ করে শুশ্রূষার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে– এই ঘটনা সার্জেন্ট প্রত্যক্ষ করেছিলেন ফ্রান্সে, আরাসের কাছে, ১৯১৮ সালের আগস্টে।

শিল্প-ইতিহাসে ধ্রুপদী শিল্পের ইতিহাসে স্তম্ভের ওপর ত্রিভুজাকৃতির ফ্রিজ-স্কাল্পচার সুপরিচিত। একেবারে কেন্দ্রের মূর্তিটি সাধারণত সবচেয়ে উঁচু বা দণ্ডায়মান হয়। তার দু’পাশে মুহ্যমান বা অর্ধশায়িত মূর্তি; একেবারে কোণের দিকে শায়িত, মৃত, পরাজিতরা– এইভাবে সাজানো হয়, ফ্রিজ ভরাটের জন্য।
সার্জেন্ট এই ইতিহাসকে বর্জন করেননি। কিন্তু তাকে তার পুনর্নির্মাণ করেছেন পরম্পরা থেকে সরে এসে। চোখে পট্টি-বাঁধা সৈন্যরা হেঁটে চলেছে পোড়ার যন্ত্রণা সম্বল করে। বাকিরা মাটিতে পড়ে আছেন। কাতরাচ্ছেন কেউ। কেউ মৃত। গোটা অঞ্চল জুড়ে মৃত্যু যেন হলুদ পাখা মেলেছে। নায়কের জয়ের উল্লাসের উদ্যাপন নয়; যুদ্ধের ছবিতে দক্ষ সার্জেন্টকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপরিসীম ক্ষতি; যান্ত্রিক যুদ্ধের ভয়াবহতা; অকারণ মৃত্যুর মধ্যেই এক অন্ধ অপর অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া। ছবিতে তা-ই সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির অন্যতম এই ছবিটি এখন রয়েছে লন্ডনের ইম্পিরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম-এর সংগ্রহে।
যাঁরা যুদ্ধের অনর্থক, নিষ্ফল, বিধ্বংসী দিকটা দেখেছিলেন, তাঁরা ভারি সুন্দর, নিটোল, প্রশান্ত, স্বপ্নালু এক ভাষায় নিখুঁত করে সাজিয়ে, বিচিত্র কাঠামোয়, লক্ষ লক্ষ দর্শক টেনে এনে অভিভূত করে দেওয়ার মতো এক ভাষায় নিজেদের ব্যক্ত করেননি। তাঁরা রূঢ় বাস্তবের কথাটা তুলে এনেছিলেন; প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁদের ভাষা কর্কশ, তির্যক, তীব্র, বহুস্তরীয় এবং সত্য। আমাদের এই মোদ্দা কথাটা বুঝতে হবে– সুন্দরের শিল্প-ভাষাই চূড়ান্ত শিল্পের ভাষা নয়। সুন্দর সর্বার্থে সত্যে নয়।

শিল্প-ভাষার এক অনন্য রূপ দেখা যায় ওয়শিংটন ডি.সি.-র ন্যাশনাল মল-এ। ১৯৮২-তে শিল্পী মায়া লিন-এর করা “ভিয়েতনাম ভেটেরান’স মেমোরিয়াল”-এ। বিংশ শতকের স্মৃতিসৌধের সর্বোচ্চ প্রভাবশালী বিন্যাসের অন্যতম এই ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার।
পালিশ করা দু’টি লম্বা কালো গ্র্যানাইটের পাঁচিল। একে অপরের সঙ্গে মিশে তারা ইংরিজি ‘ভি’ অক্ষরের এক কোণ তৈরি করে। সৌধের একদিক নির্দেশ করে লিংকন মেমোরিয়ালের দিকে; অন্যটি ওয়াশিংটন মনুমেন্ট-এর দিকে। গ্রানাইটের দেওয়ালে খোদিত ৫৮,০০০ নাম। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মৃত আর নিখোঁজ মার্কিন সেনাদের নামের তালিকা। অনুপস্থিতের প্রতি এক আশ্চর্য কাব্যময় উৎসর্গ।
সৌধের মধ্যভাগ উঁচু। দুই প্রান্ত ধীরে ধীরে নেমেছে নিচের দিকে। যেন মাটির বুকে নিঃশব্দ এক অবতরণ।

লিন তাঁর ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার সম্পর্কে বলছেন: ‘…cutting into the earth … a wound that would heal with time.’– এই ভাবনা ভাস্কর্যটিকে বিজয়ের উদ্যাপনের চাইতে অনেক বেশি করে গোষ্ঠীগত সম্মিলিত শোকের রূপক করে তোলে।
প্রথাগত বিজয়-তোরণ মূর্তি আর অ্যালেগোরিতে মোড়া থাকে। লিন সেই প্রথা ভেঙেছেন শুধুমাত্র ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতির দিকটুকু তুলে ধরে। সমালোচনার অন্ত ছিল না এই মিনিম্যালিস্ট কাজ নিয়ে। শেষে, ‘থ্রি সোলজার্স’ নামক একটি ভাস্কর্য একটু দূরে বসানো হয়, আপসের কথা ভেবে। কিন্তু, লিনের পাঁচিলই থাকে কেন্দ্রবিন্দুতে।
খোলা আকাশ আর সবুজ ঘাসের কোলে কালো পালিশ করা পাঁচিলের সামনে দাঁড়ালে হারিয়ে যাওয়া নামের ওপর জীবিতদের ছায়া পড়ে। নীরবে এক আশ্চর্য কবিতার নির্মাণ হয়।
ডিজেনেরেট আর্ট-এর ক্ষেত্রে সত্য উদ্ঘাটনের ভাষাই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল নাৎসি শাসনকালকে। জাতীয়তাবাদ ভয় পায় সত্যের উদ্ঘাটন। সুতরাং এই প্রায় ২০,০০০ শিল্পকর্ম একত্রিত করে পৃথকীকরণ হল। ১৯৩৮-এ আটক করা শিল্পকর্মকে বেচে দেওয়াকে আইনসিদ্ধ করা হল। পরের বছর জুন মাসে, সুইৎজারল্যান্ডে বিরাট আন্তর্জাতিক নিলামে চড়ল সেসব। মাতিস, পিকাসো, ভ্যান গঘ বিক্রি করে প্রভূত মুনাফা লুটল জার্মানি।

যদিও সন্দেহের নিরসন ঘটানোর জন্য গোড়ায় বলা হয়েছিল এই টাকা যুদ্ধে নয়; জার্মান শিল্প-সংস্কৃতির উন্নতির কাজে লাগানো হবে। নিলামের টাকা জার্মান শিল্প-সংগ্রহালয়ে যাবে বলে কথা দিয়েছিল যে দেশ, কথার খেলাপ করতে তার সময় লাগেনি। নিলামের টাকায় যুদ্ধের অস্ত্র কেনা হয়েছিল। বানানো হয়েছিল অস্ত্র। জার্মানির যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতিপর্বে আধুনিক শিল্পের প্রতি এক আশ্চর্য ভীতিও গভীরভাবে জুড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে যাওয়ার আগে আধুনিক শিল্পের ভাষার বিন্যাসই নির্ঘুম করেছিল তাকে। যে হাজার পাঁচেক শিল্পকর্ম শেষ অবধি বিক্রি হয়নি, তা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।
যুদ্ধের প্রভাব থেকে জাত শিল্পের ভাষা প্রতিমার মুখের মতো নির্মল নয়। তা বক্র; তির্যক; জটিল। কারণ সত্য প্রকাশের ভাষা নিটোল হয় না। আর নিছক নিটোল এক ভাষায় মনোমুগ্ধকর ছবি আঁকলে বা মূর্তি গড়লেই শিল্পের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা তৈরি হয় না। লক্ষ লক্ষ নির্বাক দর্শক এলেও তা নয়, যদি না সত্যের দিকটা সে ভাষায় উদ্ঘাটন হয়।
এই truth of art-এর কথাটা মনে রাখাটা আমাদের আশু কর্তব্য। না হলে সত্যনিষ্ঠ শিল্প প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তার জায়গা নেয় falsity of art।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved