
থোকা থোকা পলাশ পাড়ছি আর ঝুমুরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছি। ঝুমুর ওর কালো কোঁকড়ানো চুলে গুঁজে নিচ্ছে একের পর এক পলাশ। আমি ফুল ছুড়ছি আর বলছি– “এটা অ্যাসিড আক্রান্ত সেই মেয়েটাকে, এটা ‘প্রেমিকের’ হাতে খুন হওয়া মেয়েটাকে, এটা উত্তর ভারতের দলিত মেয়েটাকে– যে ধর্ষিত হয়েছে উঁচু জাতের রাক্ষসের হাতে, এটা পণের জন্য খুন হওয়া তরুণীকে, এটা গরিব বাবার কালো মেয়েকে, এটা আফগানিস্তান, ইরানের মেয়েদের জন্য– যারা ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে, এটা সন্তানের একমাত্র ভগবান পৃথিবীর সব মায়েদের জন্যে…।
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
বন্দনা মাসির টাইম-ট্রাভেল
প্রেমের তিন সিঁড়ি– বসন্ত, পলাশ আর কোকিল। উঠেই অলৌকিক চিলেকোঠা। দেখি ৪০ বছর আগের অষ্টাদশী বন্দনা মাসি বসে আছে! ছিপছিপে গড়ন। পরনে সাদা-লাল ছাপার শাড়ি, কাঁধে ঝোলা, চোখে হরলিক্স (হাই পাওয়ার) চশমা। নাকের ডগায় ঝুলছে। মেজেতে আঁচল ছড়িয়ে। সামনে খোলা হারমোনিয়াম, খোলা রবীন্দ্রনাথ, মানে গীতবিতান আর মুখোমুখি খোলা জানলা। ওদিকে পাড়ার একমাত্র পলাশগাছ, লালে লাল! একটা ডাল মুখ বাড়িয়ে মাসিকে মাপছে যেন। সুযোগ বুঝে প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু মাসি আমাকে দেখেই বলল, ‘অ্যাই ছেলে, কোথায় ছিলি রে! এবার বসন্তবরণে তুই ভলেন্টিয়ার। কোরাসে গাইবি। প্রেম মানেই কোরাস, কমিউনিটি।’
তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আমার তো হবে না।’
আমার কথায় কান না দিয়ে মাসি বলল, ‘চুপ কর। এবার কোন গান গাইব বল। বল বল।’
দুম করে বললাম, ‘ওরে গৃহবাসী।’
খোপা থেকে চুলের কাঁটা খুলে, সরস্বতী ঠাকুরের মতো একঢাল মৃদু কোঁকরানো চুলকে সাপের ফনার মতো খানিক দুলিয়ে, কাঁচের চুড়িতে শব্দ তুলে বুকের কাপড় ঠিক করে মাসি বলল, ‘ওই এক! বসন্ত নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর কোনও গান লেখেনি না কি?’
মাথা চুলকে বললাম, ‘তাহলে?’
মাসি বলল, ‘ওই পাতাতেই। গীতবিতানের ৫০৫-এই আছে।’
‘কোন গান?’
বন্দনা মাসি হারমোনিয়ামের হাঁপড় টেনে মাঝখান থেকে দু’কলি শোনাল, ‘পলাশের কুঙ্কুম/ চাঁদিনির চন্দন/ পারুলের হিল্লোল,/ শিরীষের হিন্দোল,/ মঞ্জুল বল্লীর বঙ্কিম কঙ্গণ।’
আমি বললাম, ‘কঠিন।’
বন্দনা মাসি খেপে গিয়ে বলল, ‘এটাই হবে। বুঝলি।’
আমি বললাম, ‘কোনও মতে হবে না। আমার তো এসআইআর।’
সেটা কী?
‘কঠিন জিনিস। রবীন্দ্রনাথের গানের চাইতে সাড়ে তেইশ গুণ কঠিন। তুমি তো ১৯৮৬ সালে পড়ে আছো, বুঝবে কী করে! পুরো কবি অরুণ চক্রবর্তীর বয়ান। বুঝলে। কাগজ দেখাতে না পারলেই বলবে– লাল পাহাড়ির দেশে (পড়ুন বাংলাদেশে) যা। ইত্থাক তুকে মানাইছে না গো…।’

আমার কথা কেটে আচমকা কোকিল ডাকল। চোখ তুলে জানলায় চাইলাম। লাল গাছে কালো পাখি কোথায় বসে! কোথায়? ঘরের ভেতর চোখ ফেরাতেই বন্দনা মাসি ভ্যানিস! জাস্ট ভ্যানিস! মনে মনে বললাম, পলাশের জোরে ৪০ বছর টাইম ট্রাভেল করে বন্দনা মাসি এসেছিল বটে, কিন্তু এসআইআর-এর এক ঝটকায় হাওয়া!
পুরুষ ফুল পলাশ
হেঁটে বেড়াচ্ছি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের অনন্ত ল্যান্ডস্কেপে। উত্তরা কিংবা মন্দ মেয়ের উপাখ্যানের আউটডোরে। ‘লাল দরজা’ মানেও তো পলাশই। হুড়া, পুঞ্চা, বান্দোয়ান, বলরামপুর, বাঘমুন্ডি, রঘুনাথপুর… অযোধ্যা পাহাড়ের লাল শাসনে ঘুরতে ঘুরতে খেয়াল হল– এ জগতে পলাশই একমাত্র পুরুষ ফুল! বাকিরা ‘পুষ্প’ বা ‘পুষ্পা’, মানে নারী। গোলাপ থেকে শিউলি, চাঁপা থেকে টগর। নাম, চেহারা, গন্ধেই পরিচয়। অতএব, মেয়েদের চুল সাজাতে পুরুষ পলাশ ইজ দ্য বেস্ট। এই কারণে প্রতিবার দোলে রাজ্য জুড়ে, বিশেষত শান্তিনিকেতনে পলাশের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। আদতে পুরুষের জন্য নারীর হাহাকার! অপ্রেম থেকে মুক্তির হাহাকার! এইসব ভাবছি আর দিকশূন্য পথে ঘুরছি বারেডি ঝর্না পেরিয়ে নির্জন কুহুবুরুর গ্রামে, যেখানে দাউদাউ বসন্তে বনপলাশের পদাবলি। অনুচ্চ পাহাড় ঘেরা জজহাতু। অনতি দূরে চেমটাবুরু শৃঙ্গ। সেখানেও পলাশের দাবানল দেখতে, প্রেমের টানে পর্যটনে যাওয়াই যায়। ফুটিয়ারি ড্যামের কাছেও। আহা, পলাশকে সঙ্গী করে বোটিংয়ের সুযোগ। জলেও দুলছে লাল ‘বিপ্লবের’ আয়না। ঘৃণার পৃথিবীতে প্রেমের চেয়ে বড় বিপ্লব কে কবে দেখেছে! মাঠা থেকে হাতিপাথার অবধি ছড়ানো এই কিংশুক উপত্যকা যেন ভারত-পাকিস্তান, ইউক্রেন-রাশিয়া, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্বের নামে লাশের রাজনীতির প্রতিবাদ, ওরফে পলাশ! কীভাবে?
লাশের পালটা পলাশ
লাশের পালটা পলাশ, ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টি। প্রকৃতির এই ‘অ্যাডাল্ট কাব্য’ কবির নজরে আসবে না তা কি হয়! ফলে কালিদাসের আদিরসাত্মক রচনা ‘ঋতুসংহার’-এর ষষ্ঠ সর্গে বসন্তের বর্ণনায় পলাশ অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় কথা, মহাকবির বর্ণনায় পলাশ যেমন বনভূমির জ্বলন্ত আগুন, তেমনই কামোদ্দীপক যৌন চিহ্নও। ‘ঘোমটার নিচে খ্যামটা’ আদর্শে জন্মাননি মেঘদূতের কবি। ফলে পলাশ ফুলকে প্রেয়সীর শরীরে সঙ্গমকালীন নখের চিহ্নের (নখ-ক্ষত) সঙ্গে তুলনা করেছেন কালিদাস। লক্ষ করুন, ‘ঋতুসংহার’-এর স্রষ্টার কাছেও পুরুষ ফুল হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছিল রক্তপলাশ। আমির খসরুর রচনায়, জয়দেবের গীতগোবিন্দে, সতেরো শতকের অন্যতম কবি আলাওলের ‘ঋতু বর্ণনা’ কবিতাতেও যৌবন, প্রেম তথা বিরহ-মিলনের তীব্রতার প্রতীক পলাশ। একটি জীবন্ত মানুষকে ধারালো অস্ত্রে কোপালে ফিনকি দিয়ে বের হয় যে রক্ত, তার রং আর নারীর ঋতুকালীন রক্তস্রোতে যে অমিল নেই, কেবল একটি মৃত্যুর, অন্যটি জন্মের প্রস্তুতি এটুকুই তো তফাত। আসলে পলাশ ম্যাজিক করতে পারে। করুক না জাদু– ইজরায়েলি বোমার আঘাতে গাজায় মৃত এক লক্ষ শিশুর আত্মা পলাশ হয়ে ফুটে আছে সমগ্র বাঁকুড়া-বীরভূম-পুরুলিয়ায়! আশ্চর্য কান্না। লাল মাটিতে ঝরে পড়ছে লাল অশ্রুর পাপড়ি! কিন্তু প্রেমে ফেরার পথ কোথায়?

লাল চরাচর
যেদিন সরকার প্রেমে পড়ার জন্যও সরকারি কাগজ দেখাতে বলবে, চুম্বন কিংবা আলিঙ্গনের আগে স্থানীয় থানার অনুমতি লাগবে, তার আগে অবধি প্রেমে ফেরার পথ খোলাই আছে। শুধু প্রেমে পড়ার মতো পিছল হৃদয় লাগবে। কারণ এক মহাদেশ জুড়ে পলাশের বিস্তৃত চরাচর। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসেও দেখা মেলে টিয়ার ঠোঁটের মতো লাল টুকটুকে এই ফুলের। ভারতেই কত ডাকনাম! সংস্কৃতে কিংশুক, হিন্দিতে টেসু, ধাক, সাঁওতালিতে মুরুপ, তামিলে পুরাসু, মনিপুরীতে পাঙ গোঙ, কোল ভাষায় সুরুৎ, নেপালিতে পলাশী। এছাড়াও পূতদ্রু, যাজ্ঞিক, বাতপোথ, পর্ণ… পলাশেরই নাম। নেটিভ হোক কিংবা সাহেবি ভাষা, পলাশের ব্যাঞ্জনায় বদল নেই। তাই ইংরেজিতে তার এক নাম– Flame of the Forest। যে হৃদয়বনে লেলিহান আগুন ধরায় তার অন্য নাম হওয়ার কথাই নয়। তাই ঋগ্বেদে বিবাহের স্তোত্রে এই গাছের কথা, রামায়ণে পঞ্চবটী বনের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে পলাশ। বৌদ্ধদের কাছেও পবিত্র পলাশ। কথিত আছে, রানি মহামায়া পুত্র বুদ্ধের জন্মের পরমুহূর্তে পলাশ গাছের একটি ডাল ধরেছিলেন। ভবিষ্যতে সেই কমলা-লাল রঙেই রাঙানো হয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আলখাল্লা। মিথ হোক বা মিথ্যে, ভাবতে খারাপ লাগে না! কারণ প্রেমের ঔষধী পলাশ।
ঔষধী পলাশ
সত্যি-ওষুধ পলাশের কথা অনেকেরই জানা। ফুলের নির্যাস ছাড়াও পলাশ পাতা, গাছের ছাল বা বাকলের রসও উপকারী। সাধারণ পেটের অসুখে পলাশ পাতার চা কাজে আসে। প্রস্রাবের সমস্যা দূর করে পলাশ পাতার রস। এর পাতা বা ফুল দিয়ে তৈরি চা খেলে ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে থাকে, দাবি পুষ্টিবিদদের। পলাশ ফুলের চা ত্বকের জন্যও উপকারী। দ্রুত বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না। এটা অবশ্যি জানাই ছিল। হতই। যেহেতু যৌবনের ফুল পলাশ। কিন্তু ঋষি জীবনানন্দ কথিত ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ’ ঠিক কোথায়? কতটা দেহে? কতটা কুসুমের মতো মন না থাকার যন্ত্রণা? তারও সমাধান রয়েছে পলাশেই। প্রচলিত একটি বিশ্বাস– যখন অশ্বিনী নক্ষত্র এবং শারদ ঋতু (সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি), তখন যদি একটি পলাশ গাছের শিকড় একজন পুরুষের বাহুতে বেঁধে দেওয়া হয়, তবে ওই পুরুষ যে নারীকে স্পর্শ করবে, সেই প্রেমে পড়ে যাবে! পলাশের এই অলৌকিক শক্তির কথা জানা ছিল না বিমল করের ‘পলাশ’ ছোটগল্পের নায়িকা উমার। ফলে জামাইবাবু রতিকান্তর সঙ্গে পলাশগাছ দেখতে গিয়ে বিপদে পড়েছিল সে। ‘উমা আঁচল জড়ো করা পলাশ ফুল মাঝে মাঝে তুলছিল আর রাখছিল। কখনও ফুলের নরম পাপড়ি গালে গলায় ধীরে ধীরে বুলিয়ে কোমল অথচ অন্য রকম এক স্পর্শ নিচ্ছিল।’ পাঠ টের পায়– রতিকান্তই ওই অবৈধ স্পর্শ! একবেলার ‘প্রেম পর্যটন’ শেষে ফেরার পথে উমার আঁচলে মিউয়ে যাওয়া ‘পাংশু’ পলাশ দেখে রতিকান্ত বলে, ‘ওদের অবস্থা এখন আমারই মতন।’ অর্থাৎ, ফের প্রমাণিত– পুরুষ ফুল পলাশ। নারী তাকে ধারণ করে মাত্র। একথা ভাবা মাত্রা ঝুমুরকে ফোন করলাম আমি। পলাশতলায় ডাকলাম।
মধ্যমগ্রাম পলাশতলা
মধ্যমগ্রামে ‘পলাশতলা’ বলে আদৌ কোনও জায়গা নেই। শহরতলির একমাত্র পলাশগাছটি যে নির্জন কোণে একাকী দাঁড়িয়ে, আমি সেই জায়গার নাম রেখেছি ‘পলাশতলা’। ‘পলাশতলা’ আমার মনের নামও হত পারে, আবার নাও হতে পারে। আসল কথা, মনোফোনে আমার প্রাইমারি (স্কুলের) প্রেমিকা ঝুমুরকে ফোন করেছিলাম। এড়াতে পারেনি, আপ বসন্ত লোকাল ধরে পলাশতলায় এসেও পড়েছে ঝুমুর। সমস্যা হল আমি বড় হয়ে গেলেও ঝুমুর ক্লাস ফোরেই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু আগের মতোই স্মার্ট। ঝকঝকে। লাজুক হেসে বলল, ‘ডাকলি কেন?’
আমি বললাম, ‘একটা জরুরি কাজ আছে। আমি পলাশ-প্রতিবাদ করব। তুই আমার সঙ্গী হবি।’
ঝুমুর হেসে বলল, ‘কাজটা খুব কঠিন হবে মনে হচ্ছে।’ আমি কথা না বাড়িয়ে গাছে উঠে পড়লাম। থোকা থোকা পলাশ পাড়ছি আর ঝুমুরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছি। ঝুমুর ওর কালো কোঁকড়ানো চুলে গুঁজে নিচ্ছে একের পর এক পলাশ। আমি ফুল ছুড়ছি আর বলছি– “এটা অ্যাসিড আক্রান্ত সেই মেয়েটাকে, এটা ‘প্রেমিকের’ হাতে খুন হওয়া মেয়েটাকে, এটা উত্তর ভারতের দলিত মেয়েটাকে– যে ধর্ষিত হয়েছে উঁচু জাতের রাক্ষসের হাতে, এটা পণের জন্য খুন হওয়া তরুণীকে, এটা গরিব বাবার কালো মেয়েকে, এটা আফগানিস্তান, ইরানের মেয়েদের জন্য– যারা ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে, এটা সন্তানের একমাত্র ভগবান পৃথিবীর সব মায়েদের জন্যে…।

শেষে
শেষে এক লাফে পলাশগাছ থেকে নেমে হাফাতে হাফাতে পকেট থেকে আর দুটো আরও ফুল বের করলাম আমি। নিজে হাতে পরিয়ে দিলাম ঝুমুরের চুলে। মুখে বললাম, ‘একটা তোর অন্যটা বন্দনা মাসির।’ মাথায় পলাশের মুকুট পরা ঝুমুর ট্রেড মার্ক লাজুক হাসল। অমনি একটা কোকিল ডাকল। আমার চোখ চলে গেল লালে লাল পলাশ গাছের দিকে। কোথায় লুকিয়ে ডাকছে বসন্তের কালো পাখি! চোখ ফেরাতেই দেখি– বন্দনা মাসির মতোই ঝুমুরও ভ্যানিস! আমার পলাশতলায়, আমার বসন্তে আমি একাই দাঁড়িয়ে আছি। আমি কি পাগল হয়ে গেছি! কাজী নজরুল বিড়বিড় করছি– ‘পলাশ ফুলের মউ পিয়ে ওই/ বউ-কথা-কও উঠল ডেকে…’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved