
সম্ভাব্য সমস্ত বহুলতা সরিয়ে রেখে, শব্দের ‘ঐশ্বর্য’ ঝরিয়ে নিয়ে, এই যে আঁটোসাটো, নির্মেদ, প্রখর একটি গড়ন তাঁর ছোট কবিতায়, এর মধ্যে ইমেজিস্ট কবিতার ছায়া। এজরা পাউন্ডের দু’ লাইনের কবিতা ‘ইন এ স্টেশন অফ দ্য মেট্রো’ মনে পড়তে পারে, জাপানের হাইকু এমনকী। তবে শঙ্খ ঘোষ যেভাবে খণ্ডমুহূর্তের ভিতর সমগ্র কাল লগ্ন করে নেন, তার ভিত্তি তাঁর ব্যক্তিগত গূঢ় সময়চেতনা।
শব্দের আড়ম্বর, যা তার অন্তর্গত সত্যকে ঢেকে দিতে পারে অকারণ আবরণে, অথবা অতিরিক্ত কোনও আবেগের সঞ্চালন সন্তর্পণে এড়িয়ে চলছেন কবি, আর পরিমিতিই হয়ে উঠছে শিল্প, এইটা ক্রমাগত বুঝতে বুঝতে শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়ি। নীরবতা আর নিয়ন্ত্রণকে তাঁর কবিতায় চারিয়ে দিচ্ছেন তিনি; প্রচার নয় প্রকাশ, জোর নয় বিশ্বাস প্রবল হয়ে উঠছে। একদিকে কবিতার শব্দে, আঙ্গিকে এই আশ্চর্য সংযম– যাকে তাঁর ব্যক্তিগত নৈতিক চেতনার সঙ্গে যোগ করে নিয়ে আমরা এগই; অন্যদিকে এই মুহূর্ত থেকে আসন্ন অনাগত কাল পর্যন্ত ভাবনার বিস্তার। শঙ্খ ঘোষের কিছু ছোট কবিতা নতুন করে পড়তে গিয়ে তাঁর কবিতা-ভাষায় পরিমিতির ওই অতুল বৈভব নিয়ে ভাবছিলাম।
এই কবির স্বর অনুচ্চ, তির্যক আর অব্যর্থ; ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি– সমগ্রভাবে সময়ের মধ্যে দৃঢ়প্রোথিত দাঁড়িয়ে, চারিদিকের অসঙ্গতির প্রতি ক্ষোভ আর প্রতিরোধের ব্যর্থতাকে মিলিয়ে নিচ্ছে তাঁর কবিতা। ‘ভূমধ্যসাগর’, ‘জাবাল সত্যকাম’, অথবা ‘আরুণি উদ্দালক’-এর মতো দীর্ঘ কবিতার পাশাপাশি ছোট কবিতা লিখেছেন তিনি বিপুল সংখ্যায়, যেন স্বল্পকথনেই তাঁর আগ্রহ; ‘কথা’ কবিতায় তাঁর মগ্ন উচ্চারণ ‘আমার অল্পই যাওয়া আর অল্পই কথা বলা’ মনে পড়ছে। তাঁর চার-পাঁচ লাইনের কবিতা রয়েছে অনেক, দু’ লাইনের কবিতাও; ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ কাব্যগ্রন্থে উৎসর্গপত্রের কবিতাটি বাদ দিলে ৬৪টি চার লাইনের কবিতা, যদিও সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা হিসেবেও পড়া সম্ভব। ওই প্রখর শব্দ-শাসনের জন্যই এখানে পাঠক পেয়ে যাচ্ছে ভাবনার অনেকটা অবসরও, দু’টি শব্দ অথবা দু’ লাইনের ফাঁকেও তাকে পড়ে নিতে হচ্ছে ইতিহাস-ভ্রষ্ট এই সময়, মিডিয়া আর চিৎকার-সর্বস্ব রাজনীতির দাপট নিয়ে তাঁর কোনও ইঙ্গিত; আর এই সবটা প্রক্রিয়া পাঠককে জড়িয়ে নিচ্ছে একরকম অংশগ্রহণে।

পঙ্ক্তি-বিন্যাস, শব্দের ধ্বনিগত ছাঁদ, কখনও একটি বিরতি, একটি অসমাপ্ত বাক্য, একটি শব্দ বা লাইন ধুয়োর মতো ঘুরে আসা, বিস্ময়-চিহ্ন, অথবা দুই লাইনের মধ্যে স্পেস– এই সবই তাঁর ছোট কবিতাকে করে তুলছে তীব্রতর, ঘনতাময়। জীবনানন্দ-সুলভ একটি সান্দ্র রহস্যময়তাও ঘিরে থাকছে। চার লাইনের কবিতা ‘রাঙামামিমার গৃহত্যাগ’ (‘নিহিত পাতালছায়া’) শুরু হচ্ছে মার্জিন ছেড়ে ডান দিকে, দ্বিতীয়, তৃতীয় লাইন ক্রমশ মার্জিনের দিকে সরে আসে, তার পরেই স্পেস দিয়ে শেষ লাইন:
ঘর, বাড়ি, আঙিনা
সমস্ত সন্তর্পণে ছেড়ে দিয়ে মামিমা
ভেজা পায়ে চলে গেল খালের ওপারে সাঁকো পেরিয়ে–
ছড়ানো পালক, কেউ জানে না!

শঙ্খ ঘোষের ‘সুপুরিবনের সারি’-তে গোপনে কবিতা-লেখা, সঙ্গ-বর্জিত ফুলমামির আত্মহত্যা মনে পড়ছে। তবে কাহিনিতে অবদমনের যে ইঙ্গিত ছিল, তার সঙ্গে কবিতায় যোগ হল একটি স্পষ্ট প্রতিস্পর্ধাও। অবিশ্বাসে, অপ্রেমে নিজেরই ‘ঘর’ যখন পরভূমি, তখন বিপন্নতা থেকেই জেগে উঠছে প্রত্যাখ্যান। প্রথম তিনটি লাইনের ক্রমশ আয়তনে বেড়ে যাওয়া যেন রাঙামামিমার দূর থেকে আরও দূরে হারিয়ে যাওয়ার আভাস, শেষে ‘ছড়ানো পালক’ আর ‘কেউ জানে না’ মিলিয়ে নিয়ে নিহিত আরও ভয়ংকর কোনও ইঙ্গিতে আমরা কেঁপে উঠি প্রায়! বুঝেও যাই শঙ্খ ঘোষের কবিতায় প্রস্তুত আবেগের জায়গা নেই, আর শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি প্রবল।
বাধ্যতার বিরুদ্ধে সম্ভব হয়ে উঠছে একটি অমোঘ প্রতিরোধ, এই ইমেজ– এর ঠিক আগেই ‘মুনিয়া’ কবিতাতেও। পাঁচ লাইনে দু’বার স্পেসের ব্যবহার যেন আপাত-শান্তির ভিতর সর্বনাশের প্রস্তুতি:
মুনিয়া সমস্ত দিন বাঁধা ছিল।
খুব বারোটায় উঠে চুপি চুপি খাঁচা খুলে
‘উড়ে যা’ ‘উড়ে যা’ বলে প্ররোচনা দিতে
আমার বুকের দিকে তুলে দিল ঠ্যাঙ–
জ্যোৎস্নায় মনে হলো বাঘিনীর থাবা।

একটি (নির্মম) ‘প্ররোচনা’ আর ক্রোধ, ঘৃণায় মেশানো তার প্রত্যুত্তর, এই দুই স্বরের সংঘাতের একটি রাজনৈতিক পাঠ সম্ভব। ক্রমাগত ‘ক্ষমতা’-র অনুশাসনে আর ‘দলগত’ হয়ে থাকবার বাধ্যতায় আমাদের নির্বিরোধ ক্লান্ত সত্তার ভিতরে অলক্ষে জমছে প্রতিরোধ! একটা সময়ে কবি তাঁর চারিদিকে খুঁজছিলেন ‘সাময়িকের মধ্য দিয়েই অতিসাময়িক হয়ে উঠবে যে কবিতা, বোধ আর বুদ্ধির সামগ্রিকতায় গড়ে উঠবে যে কবিতা, ইতিহাসকে সত্তার মধ্যে ধারণ করবার অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে উঠবে যে কবিতা।’ (‘কবিতার মুহূর্ত’) সেই ‘যোগ্য ভাষা’ ব্যবহারে তাঁর সিদ্ধি, আত্মচিন্তা থেকে সমগ্র-চিন্তার দিকে তা এগয়।
সম্ভাব্য সমস্ত বহুলতা সরিয়ে রেখে, শব্দের ‘ঐশ্বর্য’ ঝরিয়ে নিয়ে, এই যে আঁটোসাটো, নির্মেদ, প্রখর একটি গড়ন তাঁর ছোট কবিতায়, এর মধ্যে ইমেজিস্ট কবিতার ছায়া। এজরা পাউন্ডের দু’ লাইনের কবিতা ‘ইন এ স্টেশন অফ দ্য মেট্রো’ মনে পড়তে পারে, জাপানের হাইকু এমনকী। তবে শঙ্খ ঘোষ যেভাবে খণ্ডমুহূর্তের ভিতর সমগ্র কাল লগ্ন করে নেন, তার ভিত্তি তাঁর ব্যক্তিগত গূঢ় সময়চেতনা।

‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’ কাব্যগ্রন্থের চার লাইনের ‘তুমি’ কবিতাটির প্রথম লাইনে ছ’টি শব্দ, পরের দু’টি লাইন ক্রমশ দীর্ঘতর, তিন শব্দের শেষ লাইন যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ করছে:
আমি উড়ে বেড়াই আমি ঘুরে বেড়াই
আমি সমস্ত দিনমান পথে পথে পুড়ে বেড়াই
কিন্তু আমার ভালো লাগে না যদি ঘরে ফিরে না দেখতে পাই
তুমি আছো তুমি।

আপাতভাবে প্রেমের কবিতাই, তবে প্রথম লাইনের ‘উড়ে বেড়াই’, ‘ঘুরে বেড়াই’-এর পেলবতা দ্বিতীয় লাইনের ‘পুড়ে বেড়াই’-তে অদৃশ্য! কবিতার এই ‘তুমি’ নিয়েও শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, “অনেক ক্ষেত্রে ‘তুমি’ কোনো নিকটনারী বা প্রেমিকাকে বোঝালেও এর সর্বনাম-সুযোগ অনেক সময়েই চলে যায় তাকে অতিক্রম করে… অনেক সময়েই কবি কথা বলেন নিজেরই সঙ্গে নিজে। তাঁর একটা অস্তিত্ব অপর অস্তিত্বকে প্রশ্ন করে, বিদ্রূপ করে, আঘাত করে, প্রীতি করে।”(‘নিঃশব্দের তর্জনী’) যেন দুই ‘আমি’ অথবা ‘আমি’ আর ‘তুমি’-র মধ্যে একটা দ্বিরালাপ সম্ভব হচ্ছে, যাকে তিনি নিজেই বলছেন ‘আমি-তুমির অন্তর্নাটকের খেলা’।
প্রগাঢ় একটি বিমূর্ততাও তাঁর কোনও কোনও ছোট কবিতা জুড়ে, যেমন ‘আদিম লতাগুল্মময়’ কাব্যগ্রন্থের পাঁচ লাইনের কবিতা ‘বিবেক’:
নীল জল।
হঠাৎ ঝাপট মারে মাঝে মাঝে খয়েরি শুশুক
ওই ওই রব ওঠে ওই ওই
তার পর সব শান্ত নিরুদ্বেগ সবুজ পৃথিবী
ধোয়া তুলসিপাতা!

মুহূর্তের ওই উত্তেজনাই আমাদের সময়কে গ্রস্ত করে রাখে, আবার পরক্ষণেই সব স্তিমিত; শেষ লাইনের দ্ব্যর্থকতায় কটাক্ষ স্পষ্ট, তবে ন্যায়-নীতি নিয়ে কোনও পাঠ নয়, বরং এই কবি ব্যক্তিগত সংশয়, প্রশ্ন পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে গড়ে তোলেন যেন একটি সংলাপ। ইয়র্গে গ্যিয়েন-এর কবিতার অভিপ্রায়ের আলোচনায় শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন শব্দকে অতিক্রম করে ‘শব্দাতীত তাৎপর্যের দিকে’ এগনোর কথা। (‘কবিতার মুহূর্ত’) চার লাইনের কবিতা ‘বোধ’ (‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’) যেন কবিতার ওই ‘শব্দাতীতে’ পৌঁছনোর সম্ভাবনাই জাগিয়ে দিচ্ছে:
যে লেখে সে কিছুই বোঝে না
যে বোঝে সে কিছুই লেখে না
দু-জনের দেখা হয় মাঝে মাঝে ছাদের কিনারে
ঝাঁপ দেবে কি না ভাবে অর্থহীনতার পরপারে!
‘আমাদের চারপাশে উদ্যত হয়ে উঠছে অনেক নিরর্থক প্রকাশ্যতা, অনেক বিজ্ঞাপন আর প্রচার’, বলেছিলেন কবি সখেদে একই প্রবন্ধে। ব্যক্তির অস্তিত্বের যা কিছু গোপন সঞ্চয়, এই অতি-প্রকাশ্যতার যুগে তা বিপন্ন, আর এই আক্ষেপ, বেদনা তাঁর কবিতায় বারবার রণিত, যেমন চার লাইনের এই কবিতা (‘ইঁট’/ ‘নিহিত পাতালছায়া’):
নষ্ট হয়ে যায় প্রভু, নষ্ট হয়ে যায়!
ছিল, নেই– মাত্র এই; ইঁটের পাঁজায়
আগুন জ্বালায় রাত্রে দারুণ জ্বালায়
আর সব ধ্যান ধান নষ্ট হয়ে যায়।

অবারণ কথা-স্রোত চারিদিকে, বিশ্বাস নয় চিৎকার প্রবল, আর বিভ্রান্ত জীবন-চিহ্ন নিয়ে চলাচল করা মানুষের ভীড়ে একটি প্রকৃত ‘শান্তি-কল্যাণের’ আশ্রয় খুঁজে নিতে চান কবি। ‘সুপুরিবনের সারি’ অথবা ‘সকালবেলার আলো’ জুড়ে থাকা অতীত-চারণায় যেভাবে ‘বাড়ি’ আর ‘দেশ’ সমার্থক হয়ে ওঠে, অনেকটা সেইভাবে একই কাব্যগ্রন্থের সাত লাইনের ‘বাড়ি’ কবিতায়:
আমি একটি বাড়ি খুঁজছি বহুদিন–
মনে-মনে।
আলোর তরল জলে ভেসে যাব কবে!
বাড়ি কি পেয়েছ তুমি?
বাড়ি তো পেয়েছি আমি বহুদিন–
মনে-মনে,
বাড়ি চাই বাহির-ভুবনে।
ব্যক্তিগত আর ‘বাহির-ভুবন’ মিলিয়ে নিয়ে একটি সামগ্রিকতার দর্শন তাঁর কবিতায় ঘুরে ঘুরে আসে; ‘আমি’ ও ‘তুমি’-র এই মগ্ন দ্বিরালাপেও তার ছায়া। একই কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘যৌবন’ দু’ লাইনের মধ্যেই ছুঁয়ে যায়, যাকে কবি বলেন ‘মহাসময়ের জট’:
দিন আর রাত্রির মাঝখানে পাখিওড়া ছায়া
মাঝে মাঝে মনে পড়ে আমাদের শেষ দেখাশোনা।
‘কখনো তুচ্ছ সাময়িকতা কখনো কেবল শব্দঝোঁক’ কবিতাকে করে তোলে দিশাহীন, লিখেছিলেন তিনি (‘কবিতার মুহূর্ত’)। তাঁর নিজের কবিতা-ভাষা নীরবতার ভিতর থেকে, নেপথ্য থেকে সময়ের আশ্চর্য পরিক্রমা।
…………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন উমা চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved