
মন ডুবে গেলে রিমির চলে না। হাত-পা-মাথা-মুখ-চোখ একে অপরের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। এবং এই সমস্ত কিছুর সংযোগটাই যেহেতু সে– রিমি বিশ্বাস, রিমি বিশ্বাস নামের অস্তিত্বটাই তার কাছে ধোঁয়াটে হয়ে যেতে থাকে। তার চোখের সামনে যেন অভিনীত হয়ে চলেছে কোনও নাটক, সে-ও যেন সেই নাটকের এক চরিত্র। খিদে, ঘুম, যৌনক্রিয়া, কোনওটাই তার নিজের মনে হয় না তখন। ছুরিতে হাত কেটে গেল, সে দেখল রক্ত। কার রক্ত?
বিম্বিসার মজুমদার হাই তুললেন। বাঁদরশিশুটি ওয়াশিং মেশিনের ডালা খুলল, জামাকাপড় ঢোকাল, ডালা বন্ধ করল। তারপর সুইচ টিপল। মেশিন চলার আওয়াজ শুরু হল। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা নার্সারি রাইম বাজছে। ‘গুসি গুসি গ্যান্ডার হোয়্যার শ্যাল আই ওয়ান্ডার/ আপস্টেয়ার্স অ্যান্ড ডাউনস্টেয়ার্স অ্যান্ড ইন মাই লেডিজ চেম্বার…।’ বাঁদরটার গায়ে চকচকে গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট। হাফপ্যান্টে বোধ হয় মাপ করে ফুটো করা হয়েছে, সেই ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আছে একটা ল্যাজ। অভ্যাসবশত ভিডিওর নিচে কমেন্ট–বাটনের ওপরে আঙুল চলে গেল বিম্বিসারের। সবচেয়ে ওপরে এক মেমসাহেবের কমেন্ট– ‘সো ফাকিং কিউট’। সত্যিকারের মেমসাহেব, না দিশি মেম– দেখতে গিয়ে বিম্বিসার তার ডিপি-র ওপরে ক্লিক করলেন। নাহ! স্যান্ড্রা স্যান্ড্রা নামের রংবাহারি চুলের মেম তার প্রোফাইল লক করে রেখেছে। ছবি বড় করা যাচ্ছে না। বিম্বিসার মজুমদার অগত্যা ব্যাক করে ফিরে আসেন বাঁদরের ভিডিওতে। স্যান্ড্রা স্যান্ড্রার নীচের কমেন্ট প্রবাল দত্তগুপ্ত নামের এক মধ্য-চল্লিশের বঙ্গতনয়ের। বাক্যগঠন এবং বানানে বিস্তর ভুল। সে লিখেছে ‘ফিলিং নস্টালজিক’। বাঁদর অতি চালাক প্রাণী। তার ছোটবেলাতেও এমন অনেক চালাক বাঁদর নিয়ে পাড়ায় খেলা দেখাতে আসত লোকেরা। বিম্বিসার মজুমদারের পাড়াতেও অমন খেলা হত। সকলে ভিড় করে দেখত। কিন্তু তিনি এখন বাঁদর সম্পর্কে কোনও নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছেন না। কথায় কথায় যাদের নস্টালজিয়া হয় তাদের তিনি একরকম অপছন্দই করেন। অতীতে ডুবে থেকে বর্তমান সম্পর্কে তারা যথেষ্ট মনোযোগী হয় না। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে না। সেরকম একজনের সঙ্গে এতগুলো বছর কাটিয়েই হয়তো এমন উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন বিম্বিসার! সমস্ত জমানো টাকা খরচ করে হানিমুনে আন্দামানের টিকিট কেটেছিলেন বত্রিশের বিম্বিসার। রিমি সেখানে গিয়ে চুপ করে ছিল। শুধু একবার বলেছিল ক্লাস ফোরে দিঘায় প্রথম সমুদ্র দেখার কথা। বাবার হাত ধরে চান করা, সমুদ্রের জলে নাকানিচোবানি খাওয়া, বালি দিয়ে পুতুল বানানো… সব স্মৃতি, শুধু স্মৃতি… বিম্বিসারের অসহ্য লাগছিল।
বাঁদরের ভিডিও থেকে বেরিয়ে বিম্বিসারের হাতের আঙুল চলে গিয়েছে ঠিক তার নিচের ভিডিওতে। দু’জন মানুষ, সম্ভবত স্বামী-স্ত্রী। তাঁরা পাশাপাশি বসে নিবিষ্ট মনে খাচ্ছেন। ভদ্রমহিলার পরনে নাইটি, বাহুতে আঁট করে বসা মাদুলি। ভদ্রলোক পরে আছেন লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি। রোমশ হাত, তাতেও মাদুলি। ভদ্রলোক কেজো মুখে বললেন, ‘শুক্তো দিয়ে শুরু করি।’ ভদ্রমহিলা ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন৷ তারপর দু’জনে মিলে বড় বড় ভাতের গরাস তুলতে লাগলেন মুখে। ডাঁটা চিবোচ্ছেন, ছিবড়ে ফেলছেন। শুক্তো ফুরতে ভাজা মুগের ডাল, আলুভাজা। তারপরে তিনরকম মাছ, মাছের ডিমের বড়া, মাংস, ডিম। সব শেষে চাটনি, পাঁপড়, মিষ্টি দই, রাজভোগ। এডিট করা হলেও প্রায় মিনিট ১৫ চলল এই ভিডিও। বিপুল খাওয়াদাওয়া শেষ করে স্বামী-স্ত্রী তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন আওয়াজ করে। বিম্বিসার দেখলেন– ভিডিওর তলায় বাঁদিকের কোণে দেখাচ্ছে মিঠি মজুমদার, চৈতালি চই প্লাস ২০.৪ কে রিয়্যাকশনস। অর্থাৎ ২,০০,৪০২ মানুষ এই ভিডিও দেখে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জনকে তিনি চেনেন– মিঠি মজুমদার আর চৈতালি চই। মিঠি তাঁর খুড়তুতো বোন আর চৈতালি বা চই হল রিমির প্রথম জীবনের ছাত্রী। তাঁদের যাদবপুরের ভাড়াবাড়িতে পড়তে আসত। এখন এক সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করে মার্কিন দেশ-প্রবাসিনী। বিম্বিসার দেখলেন চৈতালি ওরফে চই কমেন্টও করেছে ভিডিওর নিচে, ‘খাচ্ছিস খা, লোককে দেখাচ্ছিস কেন?’ অন্য যারা কমেন্ট করেছে, তাদের ভাষা আরও খারাপ। হ্যাংলা, হাঘরে, এবার মরে যাবি, দু’ অক্ষর, চার অক্ষর, দুই-চারের নানাবিধ পার্মুটেশন-কম্বিনেশন, ইত্যাদি, ইত্যাদি…।

এখান থেকে চইয়ের প্রোফাইলে ঢুকে পড়েন বিম্বিসার। দেখেন পরপর পোস্ট সিরিয়ালের এক অভিনেত্রীর আত্মহত্যা নিয়ে। মেয়েটির নাম রোশনি, বেশ চটকদার চেহারা। কাগজে বেরিয়েছে, গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দাবি, সে আত্মহত্যা করেনি, তাকে খুন করেছে তার বয়ফ্রেন্ড বিজন, যার বাবা কি না এক প্রভাবশালী নেতা। একটা ফোন আসে বিম্বিসারের, স্ক্রিনে ভেসে আসে তাঁর মেজদির ছেলে বুকাইয়ের নম্বর। বিম্বিসার কেটে দেন। তাঁর এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মনে হয় এই সিরিয়াল-মানবীর রহস্যমৃত্যুর বৃত্তান্তটা পুরো জানা দরকার আগে।
‘জাস্টিসফররোশনি’, হ্যাশট্যাগ দিয়ে একের পর এক পোস্ট শেয়ার করেছে চৈতালি চই। আত্মহত্যা বিষয়টি বিম্বিসারকে ভাবায় খুব। রিমি কি আত্মহত্যার কথা ভাবে? বেশিরভাগ রাতে রিমি ঘুমোয় না৷ সকালে উঠে বিম্বিসার দেখেন তার দু’চোখে অস্থিরতা। হাতে ফোন। চঞ্চল আঙুল কী যেন খুঁজে চলেছে, মুঠোয় ধরা স্ক্রিনের ভিতর থেকে যেন তাকে টেনে নিয়েছে এক অত্যাশ্চর্য নার্নিয়া। বিম্বিসার কখনও চেষ্টা করেন গলাটাকে নরম করতে। বলেন, ‘ঘুমোওনি?’ রিমি শুনতে পায় না, পেলেও অন্যমনস্কভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’য়ে জবাব দেয়। একদিন সকালে তাঁকে ফোন করে মেজদি। উদ্বিগ্ন গলায় বলে, ‘হ্যাঁ রে, রিমি ঠিক আছে?’ রিমি তখন সামনেই বসে। বিম্বিসার তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বলেন, ‘হ্যাঁ, কেন? কী হবে?’
–না, মানে বুকাই বলছিল, কী সব লিখেছে ফেসবুকে, অসুখবিসুখের কথা।
বিম্বিসার বারান্দায় যান। বলেন, ‘কার অসুখ?’
–কী সব না কি লিখেছে, পৃথিবীর অসুখ। বুকাই বলল আসলে মামির নিজের অসুখ। মনের অসুখ। তোর জামাইবাবু বলল তোকে জানিয়ে রাখতে। কতরকম ঘটনা ঘটে আজকাল, যদি কিছু করে বসে হঠাৎ… কিছু লুকোস না ভাই, তোরা ভালো আছিস তো?
–ভালো আছি। ভাবিস না। সাহিত্যের ছাত্রী। ওর ইনসমনিয়ার সমস্যা জানিসই তো। রাতে ঘুম আসেনি তাই কবিতার লাইন লিখেছে। পৃথিবীর অসুখ, ওর নয়। জীবনানন্দের লাইন।
বিম্বিসার কবিতা বোঝেন না, ভালোবাসেন না। তবে তিনি তুখড় ছাত্র ছিলেন। এই কবিতাটা পাঠ্যে ছিল। এখনও ভোলেননি। স্কুলপাঠ্যের পাট চোকার পরেও কবিতা মাঝেমাঝে অনাহূতভাবেই ঢুকে পড়ে তাঁর জীবনে। রিমির কবিতা–প্রেমের কারণেই একসময় কবিতার বই কিনতে হত ওর জন্মদিনে, বিয়ের তারিখে। একসময় রিমিকে খুশি করার একটা তাগিদ ছিল। বিম্বিসারের পরিবারে কেউ কবিতা পড়ে না, বোঝে না। বন্ধুবান্ধবেরাও কেঠো। শুধু সুপ্রকাশ ছাড়া। সুপ্রকাশের থেকে জেনেই রিমির জন্য কবিতার বই কিনতে হত তাঁকে। সেসব নাম এখনও মনে আছে। ‘ভাত আছে পাথর নেই’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’…।

কবিতা এখনও ঢুকে পড়ে জীবনে, বাঁদরশিশুকে ঠেলে, মাছের ডিমের বড়ার পাত্র সরিয়ে ফাঁকতাল বুঝে, ধূর্ত, লোভী বেড়ালের মতো। বিম্বিসার অবশ্য তাকে পত্রপাঠ বিদায় করেন। আত্মহত্যা-বিষয়ে চৈতালি চইয়ের একটি শেয়ার করা পোস্টে একজন আবৃত্তি করছে, ‘পথ নয়, ব্রিজ। তলায় অপার শূন্য। রেলিং বা কার্নিশ কিছু নেই/ কখন কার ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে হবে সে কথা পাশের লোক জানে?’। যে মেয়েটি আবৃত্তি করছে, তার মুখ লম্বাটে, চুলে লেয়ার কাট, কপালে বড় টিপ। কথাগুলো এমন টেনে উচ্চারণ করছে যে মুখটা যেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হাঁ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি শুরু করে, ‘ব্রিজের ওপরে। কবি জয় গোস্বামী।’ অমনি কবিতাকে পত্রপাঠ বিদায় জানাতেই বিম্বিসার ভিডিওর বোতাম টেনে এগিয়ে দেন একদম শেষ মাথায়। এটি শেষাংশ।
২
মন ডুবে গেলে রিমির চলে না। হাত-পা-মাথা-মুখ-চোখ একে অপরের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। এবং এই সমস্ত কিছুর সংযোগটাই যেহেতু সে– রিমি বিশ্বাস, রিমি বিশ্বাস নামের অস্তিত্বটাই তার কাছে ধোঁয়াটে হয়ে যেতে থাকে। তার চোখের সামনে যেন অভিনীত হয়ে চলেছে কোনও নাটক, সে-ও যেন সেই নাটকের এক চরিত্র। খিদে, ঘুম, যৌনক্রিয়া, কোনওটাই তার নিজের মনে হয় না তখন। ছুরিতে হাত কেটে গেল, সে দেখল রক্ত। কার রক্ত? রিমি বিশ্বাসের। জিভ ঠেকাল, স্বাদ পেল নোনতা। কাটার জায়গাটায় জ্বালা একটু কমল। সে দেখল, রিমি বিশ্বাস তার কাটা জায়গায় শুষে জ্বালাটা একটু কমিয়ে ফেলল। তখনই সে তীব্র ঝটকা মেরে উঠে পড়ে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘রিমি বিশ্বাস, ইউ নিড থেরাপি। মে বি সাম মেডিকেশন।’ কে যেন কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল অনেক অনেক বছর আগে, ‘গুড লর্ড! ইউ আর ইন ডায়ার নিড অফ থেরাপি, রিমি!’ তার কাঁধে মাথা রেখে রিমি বিশ্বাস এক দিন খুব কেঁদেছিল। বলেছিল, ‘কান্না পায় খুব। বড্ড অসুখ।’ সে হাত ধরেছিল, কিন্তু রিমি বুঝতে পেরেছিল, হাতটা ঠান্ডা। সরে যাওয়ার সময় আর মরে যাওয়ার সময় এমন ঠান্ডা হয়ে যায় মানুষের হাত।
রিমি বিশ্বাসের হাত ঠান্ডা হয়ে গেলেও কি ফ্ল্যাশলাইটের আলো এসে পড়বে তার মুখে, চোখে? খাকি পোষাক, লাঠি কী লন্ডভন্ড করবে তার সব জিনিস? জেনে নেবে তার নিজস্ব নার্নিয়ার পাসওয়ার্ড?… ক্রাইম থ্রিলারে যেমন দেখায়? চোখের সামনে ভেসে ওঠে হ্যাশট্যাগ, ‘জাস্টিসফররিমি’, হ্যাং বিম্বিসার, অ্যারেস্ট যশোময়…! না না যশোময়ের কথা তারা জানবে কী করে? সে কবেকার কথা! রিমি বিশ্বাসেরই মনে নেই তাকে পুরোটা। শুধু মনে আছে তার হাতের মানচিত্র। প্রতিটি রেখা, প্রতিটি বাঁক আর সমস্ত কাটাকুটি মুখস্থ রিমির। যশোময়ের ডান হাতের আয়ুরেখা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে আছে ইংরেজি বর্ণমালার তেইশতম সদস্য, ডব্লিউ। রিমি যদি কখনও অন্ধ হয়ে যায়, শুধুমাত্র তর্জনীর স্পর্শেই সে চিনে নিতে পারবে যশোময়কে। লক্ষ লোকের ভিড়েও।
গোটা গোটা করে পরিষ্কার হাতের লেখায় ছ’টি শব্দ লেখে সাদা পাতায়। বাংলায়। পরের লাইনে ইংরেজিতে। ফের ছ’টি শব্দ। কারণ সে বিপদে ফেলতে চায় না বিম্বিসারকে,… যশোময়কে,… তার পরিচিত কাউকে। বিম্বিসার কাজের মানুষ, কেঠো স্বভাবের। রিমির হাত সেরকম ঠান্ডা হয়ে গেলে সে হয়তো একরকম মুক্তি পাবে। দু’-এক দিন খারাপও লাগবে একটু, তারপর কাজকর্মে ডুবে যাবে। হয়তো আর সঙ্গিনী চাইবেও না। রিমি জানে সে দিব্যি একা জীবন কাটাতে পারবে। তিন-চার মাসে হঠাৎ এক দিন শরীর জেগে উঠলেও সে রিমির উদাসীনতা টের পেয়ে নিজেকে সামলে নেয়। হাত পা নাক চোখ কান মাথার সংযোগ যেদিন পুরো নষ্ট হয় না, সেদিন হয়তো রিমিই ডাকে তাকে। কথা বলতে হয় না। এত বছরের অভ্যাসে বিম্বিসার জানে আজ রিমি অ্যালাও করবে তাকে। রিমির ঈশ্বর নেই। তবু সে মনে মনে যেন হাত জোড় করে। বিড়বিড় করে বলে, সংযোগটুকু থাক,… শুধু সংযোগটুকু….

একা রাতে মানুষ দেখতে রিমি ফোন তুলে নেয়। ভিডিওর লিঙ্ক আসে, দেখুন ধনীর মেয়ে আজ রাস্তার পাগল। এলোঝেলো চুল, বিবর্ণ নাইটি, দাঁত-ভাঙা এক মহিলা হাসি মুখে বলছেন, ‘ছিল তো, বাড়ি ছিল, বাগান ছিল, বাড়ি ছিল, দালান ছিল, চক ছিল, চক… চক…’
–কী বলছেন? চকমেলানো দালান? পরিষ্কার করে বলুন…
–…
–দেখুন, উনি বলছেন, ওঁর বাড়ি ছিল। সম্ভবত চকমেলানো দালানও ছিল। কী বলতে চাইছেন উনি? নাম বলছেন দেবশ্রী মুখার্জি। জন্মসাল বলতে পারছেন না। দিদি…, মাসিমা…, আপনার ঠিকানাটা বলতে পারবেন?
–…
–দেখতেই পাচ্ছেন, উনি চুপ করে আছেন। বিড়বিড় করছেন। অন্য কথা বলছেন। ঠিকানা বলতে পারছেন না।
–সাইলেন্স! আই সে সাইলেন্স!
–দেখুন স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণ এক রাস্তার পাগলিনীর। আমরা বুঝতে পেরেছি, উনি বড়ঘরের মহিলা। কেউ যদি ওঁর ঠিকানা জানেন তবে আমাদের স্ক্রিনের ওপরে যে নম্বরটি স্ক্রল করে যাচ্ছে, সেখানে ফোন করবেন।
বড় ঘরের পাগলিনীর গল্প শেষ হয়ে শুরু হয় অন্য গল্প। দেখুন, প্রেমিকার দেহ আগলে প্রেমিক। রিমি বিশ্বাসের মুঠোর ভেতরেই আছে এমন আশ্চর্য নার্নিয়া। সে ঢেউয়ের মতো ভেসে ভেসে চলে, এক আবেগ থেকে অন্য আবেগে। মানুষের দুঃখ, মানুষের আনন্দ, মানুষের কান্না তাকে জেগে থাকতে, বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
৩
ব্রেকফাস্টের টেবিলে বিম্বিসার। মুখোমুখি রিমি। নরম গলায় বিম্বিসার জানতে চায়, ঘুমোওনি রাতে? রিমি মুঠোজগতের দিকে নিবিষ্ট মনে চেয়ে দেখে, একজন পুরুষ আর একজন মহিলা৷ পাশাপাশি বসে একে অপরের দিকে তাকায়। পুরুষটি বলে, শুরু করছি। প্রথমে মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাক।… খাওয়া চলতে থাকে। বিম্বিসারের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে গিয়ে রিমি দেখে টোস্টে কামড় দিতে দিতে বিম্বিসারের কানে ইয়ারফোন, চোখ নিজের ফোনের দিকে। রিমি কী মনে করে উঠে গিয়ে তার পিছনে দাঁড়ায়। কী আশ্চর্য! দেখে তার ফোনেও সেই খাইয়ে জুড়ি। পুঁইশাক শেষ। হাত বাড়িয়েছে ইলিশ মাছের দিকে। বিম্বিসারের ডান হাতের আয়ুরেখার শেষে ইংরেজির এন অক্ষরের অবয়ব। এত দিন, এত বছর, সে লক্ষই করেনি। বিম্বিসার পিছন ফিরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। এক কানের ইয়ারফোন খুলে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “দেখবে? এরা দু’জনে মিলে খাওয়াদাওয়া করে প্রচুর।”
অতঃপর দু’জন একত্রে প্রবিষ্ট হয় বিজ্ঞাপিত আবেগের সেই নার্নিয়ায়। একসঙ্গে ভাসতে থাকে দু’জন, কখনও আবার ডুবে যেতে থাকে অসম্পৃক্ত অবান্তর অপ্রয়োজনীয় তথ্যের সমুদ্রে। সে সমুদ্র ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, পাওয়া, না–পাওয়া। চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বিম্বিসারের পাশে। সে অবাক হয়ে দেখে বহুযুগের ওপার থেকে বিম্বিসারের কাঁধে মাথা রাখল রিমি বিশ্বাস। খুব ঘুম পায় তার। চোখদুটো বুজে আসে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved