

বাড়িটার খোলা বারান্দার পর একটা মাঠ। মাঠের ওপারে একটা পুজোর মণ্ডপ। সেখানে সপ্তাহে কোনও এক দিন বিকেলবেলায় একটা আনন্দমেলা গোছের হত। বিকিকিনি সব মেয়েদের। আর মণ্ডপে পুজো হত। সে-পুজো দেখতে পাওয়া যেত বারান্দায় বসে তো বটেই, এমনকী, মাঠের দিকের দুটো ঘরের জানলা দিয়েও। এরকমই এক পুজোর দিনে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো যখন চলছে, সেই মণ্ডপে আমার এক ভাইয়ের জন্ম হয়। খুব অদ্ভুতভাবে আমি আর আমার তিন ভাইয়ের জন্ম কোনও না কোনওভাবে পুজোর দিনগুলোয় জড়িত।
আমার ছেলেবেলাটা বেশ কয়েকটা জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে কেটেছে। তাই স্মৃতিগুলোও খানিক ছাড়া-ছাড়া। যা মনে পড়ে, যতটুকু মনে পড়ে, হতে পারে সে মনে-পড়ার মধ্যে কিছুটা বড়দের মুখে গল্প শোনা, আবার কিছুটা হয়তো আমার বড়-বয়সের কল্পনা মিশে গিয়েছে।
আমার জন্ম হয়েছিল ওপার বাংলায়। রংপুর শহরে, তাজহাটে। তাজহাটে আমার পিতৃবংশের জমিদারি ছিল। পরে জেনেছি, তখন জমিদারির অবস্থা একেবারেই পড়তির দিকে। তবু একটা মস্ত বাড়ি ছিল। তার অনেকগুলো সিঁড়ি দিয়ে নেমে বেশ খানিক গিয়ে বাঁ-দিকে চণ্ডীমণ্ডপ। তার স্থাপত্যে তখনই ফাটল ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু পুজো হত। ঘটস্থাপন থেকে প্রতিমা বিসর্জন অবধি। সে প্রতিমার মুখ আমার মনে পড়ে না। আবছা মনে পড়ে সিঁড়ি পেরিয়ে চণ্ডীমণ্ডপে যাওয়া পুজো দেখতে। আমি তো তখন খুব ছোট। শোনা কথা, বলি হত। সেই প্রসাদের মাংস আসত বাড়ির মধ্যে। তাই মহাষ্টমীর দিন যে প্রায় বাঙালির ঘরে ঘরে নিরামিষ ভোজনের চল, এখানে তা ছিল না। তবে দশমীর দিন তো আর বলি নয়, ফলে সেদিন নিরামিষ। দশমীর দিন বাজনাবাদ্যি বাজিয়ে প্রতিমার বিসর্জন হত। শুনেছি, এমনই এক বিসর্জনের রাতে আমি প্রথম দেখেছিলাম পৃথিবীর আলো। তাই আমার নামে ‘বিজয়া’ শব্দটা লগ্ন হয়ে আছে।

আমার বছর ছয় বয়সে আমাদের পূর্ব-পাকিস্তান ছাড়তে হল। পরিচিত পরিবেশ, রোজ-দেখা মানুষজনকে ছেড়ে চলে আসতে যে কী কষ্ট হয়েছিল! সীমান্তের স্টেশনে বসে গাড়ি-বদল করার আগে সেই চার-পাঁচ ঘণ্টা সমানে কেঁদেছিলাম। এ স্মৃতিটা ভুলিনি।
এসে পড়লাম এপার বাংলায়। একটা ছোট্ট শহরের পুরনো এক এলাকায়। খুব মনখারাপ করা পরিবেশ। দমচাপা অন্ধকার বাড়ি একটা। তখন পুজো ইত্যাদি কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বার দুই ওইরকমই বাড়ি বদলের পর একটু পরিচ্ছন্ন আলোহাওয়ার একটা বাড়িতে এসে ওঠা গেল। যেটা খুব পছন্দ হল, সেটা হল– বাড়িটার খোলা বারান্দার পর একটা মাঠ। মাঠের ওপারে একটা পুজোর মণ্ডপ। সেখানে সপ্তাহে কোনও এক দিন বিকেলবেলায় একটা আনন্দমেলা গোছের হত। বিকিকিনি সব মেয়েদের। আর মণ্ডপে পুজো হত। সে-পুজো দেখতে পাওয়া যেত বারান্দায় বসে তো বটেই, এমনকী, মাঠের দিকের দুটো ঘরের জানলা দিয়েও। এরকমই এক পুজোর দিনে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো যখন চলছে, সেই মণ্ডপে আমার এক ভাইয়ের জন্ম হয়। খুব অদ্ভুতভাবে আমি আর আমার তিন ভাইয়ের জন্ম কোনও না কোনওভাবে পুজোর দিনগুলোয় জড়িত।
রংপুর ছেড়ে আসার পর রায়গঞ্জে সেই বাড়িতে থেকেই বোধহয় আমার প্রথম দুর্গাপুজো দেখা। মফস্সল শহরের পুজো। সেখানে জাঁকজমক বিশেষ নেই। কিন্তু আনন্দের কোনও অভাব ছিল না। অল্পদিন পরে রায়গঞ্জে আমাদের একটা নতুন বাড়ি হল। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে। বাগান-পুকুর সমেত ভারি উর্বর ছিল সে জমি। ফুলের বাগান আর সবজির বাগানে চমৎকার ফলন। আমার বাবা ঠিক করলেন, নিজেদের বাড়ি যখন হয়েছে, তখন আবার দুর্গাপুজো শুরু হোক। হলও তাই। আমি একেবারে চোখ ভরে দেখলাম প্রতিপদ থেকে একটু একটু করে পুজোর প্রস্তুতি। রোজ বাবা এবং মায়ের পুজো করা। ষষ্ঠীর দিন বোধন হল, প্রতিমার চক্ষুদান হল। তারপর প্রতিমার সামনে শুরু হল পুজো। না, ছাগবলি আর হয়নি অবশ্যি। লাউকুমড়ো বলিই হল। কী যে ভালো লেগেছিল সেই নিজেদের বাড়ির মস্ত উঠোনে দুগ্গা ঠাকুরের পুজো! পুজোয় আরতি করার সময়ে প্রতিমার মুুখ যেন জ্বলজ্বল করত। মাঝারি মাপের ঠাকুর। কিন্তু আমার শৈশবদৃষ্টিতে মনে হত মস্ত বড়। কী মনখারাপ সেই প্রতিমা বিসর্জনে চলে যাওয়ার পর!
কিন্তু এইসব সুখ যে দীর্ঘস্থায়ী নয়, তখন বুঝিনি। বোঝা গেল অনতিকাল পরেই। অসুস্থ ঠাকুমার মৃত্যু হল। বাবাও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রায়গঞ্জের পাট উঠিয়ে আমাদের চলে আসতে হল কলকাতায়। আবার ঘুপচি ভাড়াবাড়ি, রোদহীন উঠোন, স্যাঁতসেঁতে ঘর। ইশকুলে ভর্তি হলাম। যদিও এই টালমাটালে ইশকুল-জীবনের একটা বছর খোওয়া গেল। কলকাতায় অনেক বারোয়ারি পুজো। পাড়ার পুজো। আমার কখনও আগ্রহ হয়নি প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঠাকুর দেখার। বড়জোর পাড়ার পুজোয় এক-আধবার যাওয়া ওই অবস্থাতেও। প্রথম প্রথম বাবা এবং মা আমাকে মামার বাড়িতে রেখে ফিরে গিয়েছেন রায়গঞ্জে, যত ছোট করেই হোক পুজোর আয়োজন করেছেন। কাউকে পাঠিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছেন রায়গঞ্জের বাড়িতে, পুজোর সময়টা থাকতে। ইশকুল তো তখন ছুটিই। উত্তরবাংলায় যাওয়ার জন্য তখনও পর্যন্ত গঙ্গা পেরতে হত স্টিমারে। ফরাক্কার ব্রিজ তখনও হয়নি। সদ্য বর্ষা-পেরনো গঙ্গা তখন প্রায় দুকূল ছাপিয়ে বইছে। মনিহারি ঘাট থেকে তো স্টিমারে উঠেছি। ওপারে সর্বত্র গলিতে নামা যাচ্ছে না। অন্য কোথায় একটা নামাল, সেখান থেকে ট্রেনে একবার বদল করে যখন রায়গঞ্জ স্টেশনে নামলাম, ততক্ষণে রাত হয়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে দেখি মা-বাবা ভীষণ উৎকণ্ঠিত।

পরদিন থেকে পুজোর আনন্দে সব কেটে গেল। দুর্গাপুজো পার করে কালীপুজোও করা হত। বলিও হত। অন্তত সে-বছরটা যে হয়েছিল, তা মনে পড়ে। সেটাই ছিল সবচেয়ে খারাপ দিক ওই পুজোর দিনগুলোর।
উত্তরবাংলায় তখন কালীপুজো নাগাদ বেশ ঠান্ডা পড়ে যেত। মা গরম জামা পরিয়ে দিতেন। কী বিরক্তিকর! গরম জামা পরলে বুঝি নতুন জামা দেখা যায় আর! কলকাতা থেকে ইশকুলের বন্ধুরা জানাত চিঠিতে কত কত ঠাকুর দেখেছে! আমার একটুও দুঃখ হত না। আমার বাড়ির উঠোনের দুর্গাপুজোই ছিল আমার পুজো দেখা। এই পুজোর ছুটির চিঠি চালাচালির সূত্রে আমার একটা বড় বেদনার স্মৃতি আছে। আমি তখন ক্লাস সেভেন। আমাদের ক্লাসে ছিল একটি মেয়ে, নাম নীলা। মাত্রই কয়েক মাসের পরিচয়। কিন্তু তাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তারও বোধহয় আমাকে পছন্দ ছিল। সে-বছর পুজোর ছুটিতে নীলার কাছ থেকে প্রথম একটা পোস্টকার্ড এল। হ্যাঁ, তখন আমরা পোস্টকার্ডেই লিখতাম চিঠি। নীলার গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠিটা পেয়ে আমার যে কী আনন্দ হয়েছিল! ছুটির পর রায়গঞ্জ থেকে ফিরে স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম নীলা মারা গিয়েছে। মেনিনজাইটিস হয়েছিল। সামান্য ভুগেই চলে গিয়েছে। এই নীলার কথা, ওর চেহারাটা, ওর গোটা গোটা হাতের লেখা, আমার দুর্গাপুজোর স্মৃতির সঙ্গে চিরকালের মতো জড়িয়ে গিয়েছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved