
গত আট বছর ধরে নাগাড়ে দেশের সবথেকে পরিচ্ছন্ন শহরের তকমা পাওয়া ইন্দোরের পানীয় জলের এমন শোচনীয় অবস্থা দেখে গোটা দেশবাসীই আজ স্তম্ভিত! ইন্দোরের এই পরিচ্ছন্নতা যে, একপ্রকার ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ মাত্র, প্রকৃত পরিচ্ছন্নতা নয়, তা ক্রমশই স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। আর প্রশ্ন উঠছে যে, দেশের পরিচ্ছন্নতম শহরের পানীয় জলের লাইনেই যদি নিকাশি জল মিশে যায়, পাইপ লাইনেই লিকেজ থাকে, শহরের জলের মূল পাইপলাইনের ওপরে নির্মিত হয় শৌচাগার; তাহলে দেশের বাদবাকি অপেক্ষাকৃত অপরিচ্ছন্ন রাজ্যগুলির দুরবস্থা সামনে আসা কি শুধু সময়ের অপেক্ষা?
আমেরিকার মিশিগান রাজ্যের ছোট্ট শহর ফ্লিন্ট; পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে দীর্ঘ ফ্লিন্ট নদী।
বছর ১০-১১ আগের কথা। ফ্লিন্টের আর্থিক অবস্থা তখন জুতের নয় মোটে। ব্যাংকগুলি দেউলিয়া হওয়ার পথে, বেশিরভাগ মানুষ বাস করছে দারিদ্রসীমার নিচে। ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট টিম নিয়োগ করে, ফ্লিন্ট প্রশাসন তখন ব্যয় সংকোচনের যাবতীয় পথ হাতড়াচ্ছে। তবু উপায় বের হচ্ছে না কিছুতেই।
শেষমেষ একটা মরিয়া সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। প্রশাসনিক বৈঠকে ঠিক হল যে, শহরের পানীয় জলের জন্য ডেট্রয়েট অঞ্চল থেকে জল আমদানি বন্ধ করে কিছুদিনের জন্য যদি ফ্লিন্ট নদীর জলই ব্যবহার করা হয়, তাহলে খরচ কমবে বেশ খানিকটা। ‘দুঃসাহসী’ আইডিয়া সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশাসন ভাবল– কয়েক মাসের তো মাত্র ব্যাপার; কী আর এমন হবে? কিছুদিনের মধ্যে এই চরম আর্থিক সংকট কেটে গেলেই আবার ফিরে যাওয়া হবে পুরনো ব্যবস্থায়। কাকপক্ষীতেও টের পাবে না!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ লোকচক্ষুর আড়ালে ফ্লিন্ট শহরের পানীয় জলের উৎস বদলে ফেলা হল। ডেট্রয়েট থেকে আমদানীকৃত জলের বদলে ফ্লিন্ট শহর জুড়ে এখন সরাসরি স্থানীয় ফ্লিন্ট নদীর জল। হ্যাঁ, সরাসরিই বটে। কারণ, পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে গেলে খরচ বেড়ে হরেগড়ে একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াত।
কিন্তু এর ফল হল শোচনীয়। মিশিগানের ফ্লিন্ট শহরের বাসিন্দারা হঠাৎই একদিন তাদের পানীয় জলে হালকা দুর্গন্ধ পেলেন। জলের রংটাও; বিশেষ লক্ষ না-করলে বোঝা যায় না, কিন্তু ঠিক যেন আগের মতো নেই।
‘হোয়াট দ্য আইজ ডোন্ট সি’, ‘খালি চোখে যা দেখা যায় না’– বইটির রচয়িতা ফ্লিন্ট শহরেরই এক অভিবাসী ডাক্তার মোনা হান্না আত্তিশা। ফ্লিন্ট শহরের এই জলসংকটের বিষয়টি নিয়ে সেই সময় দিনরাত এক করে কাজ করেছিলেন তিনি। দেখিয়েছিলেন যে, এই দূষিত জল কীভাবে দীর্ঘকালে শহরের মানুষজনের শারীরিক অবস্থার ভয়ংকর অবনতি ঘটাবে, বিশেষ করে শিশুদের ব্রেন ডেভলেপমেন্ট নষ্ট করে দেবে।

বস্তুত ডাক্তার মোনা হান্না আত্তিশাকেই ‘ফ্লিন্ট ওয়াটার ক্রাইসিস’ ঘটনার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ বলা হয়। তার প্রজ্ঞা এবং নিরলস পরিশ্রমই সেদিন ফ্লিন্টের জনসাধারণের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। ওই চূড়ান্ত অনিরাপদ পানীয় জল; যা কিনা এতটাই দূষিত, এতটাই লেড সম্পৃক্ত, যে ওই জল ব্যবহারকারী জেনারেল মোটরস কোম্পানির কারখানার মেশিনগুলো পর্যন্ত তাতে ক্ষয়ে যাচ্ছিল; তা যে ফ্লিন্ট শহরের গণমৃত্যুর কারণ হয়নি, তা কেবলমাত্র ডাক্তার মোনা হান্না আত্তিশার জন্যই। তাঁর এই জীবনদায়ী কর্মোদ্যোগকে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ সম্মান জানিয়ে লিখেছে– ‘এই নশ্বর পৃথিবীতে ভরসার কথা এটুকুই যে, আজীবন তা অন্যায়ের প্রতিস্পর্ধায় লড়ে যাওয়ার মতো মানুষের জন্ম দেয়।’
কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান তো সর্বত্র একইরকম অভ্যর্থিত নয়; স্থানভেদে তা অতি বন্ধুর। যেমন, সম্প্রতি ইন্দোরের পানীয় জলসংকট ঘটিত গণমৃত্যু প্রসঙ্গে সেখানকার রাজ্য আবাসন ও নগরোন্নোয়ন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন এক সর্বভারতীয় টিভি সাংবাদিক। সেই প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসনের লজ্জা বা ক্ষমাপ্রার্থনা উঠে আসেনি; এসেছে পাল্টা চ্যালেঞ্জ, ‘এসব হাবিজাবি প্রশ্ন করেন কেন আপনারা?’
নিরাপদ পানীয় জলের প্রশ্ন হাবিজাবিই বটে। তাই তো এই প্রশ্নোত্তরের ভিডিও ক্লিপিংটি গণমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়া মাত্রই সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলটি নিজেদের এক্স হ্যান্ডেল থেকে তা মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আর এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হেরে গিয়েছে আমেরিকার অভিবাসী একক ডাক্তার মোনা হান্না আত্তিশার কাছে। প্রশাসকের চোখে চোখ রেখে লড়াইতে এদেশের সংবাদমাধ্যম বলতে পারেনি, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

রাজা নগ্ন হলে প্রজাদের যে দুর্গতির সীমা থাকে না, সে-কথা আমরা জানি। ইন্দোরের ভাগীরথপুরা অঞ্চলের স্থানীয় মানুষজনের অবস্থাও ঠিক তাই। এখানকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা সঞ্জয় যাদব ছোটখাটো একটা সেলাইয়ের দোকান চালান। আয় অতি সামান্য; দোকান বন্ধ রাখলে ভাতের হাঁড়ি শিকেয় ওঠে। তবুও গত ২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে মা-র শরীরটা বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হওয়ায় দোকানের ঝাঁপ ফেলে দ্রুত বাড়ি ফেরেন সঞ্জয়। মা-কে হাসপাতালে ভর্তি করেন তড়িঘড়ি। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটার আগেই মৃত্যুর কাছে হেরে যান ৬৯ বছরের বৃদ্ধা।
সঞ্জয় যাদবদের পাশের বাড়ির সুধা পালের বাবা নন্দ পালও মারা যান সেদিন। মারা যান ওই এলাকারই আরেক বাসিন্দা লিখারের ভাই-সহ মোট ১৫ জন। অসুস্থ প্রায় দুই শতাধিক। কারণ? কারণ ওই এলাকার দূষিত পানীয় জল। গত বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রদেশের মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজের ল্যাব রিপোর্টে ওই এলাকার দূষিত পানীয় জলকেই এই গণমৃত্যুর কারণ হিসেবে শিলমোহর দেওয়া হয়েছে। ইন্দোরের চিফ মেডিক্যাল অ্যান্ড হেলথ অফিসার ডা. মাধব হাসানি বিষয়টি নিশ্চিতও করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল যে, একটা গোটা এলাকার পানীয় জল এরকম প্রাণঘাতী পর্যায়ের দূষিত হয়ে উঠল, অথচ সেখানকার সাধারণ মানুষ কিছুই টের পেলেন না?

ভাগীরথপুরা এলাকার সাধারণ মানুষের বক্তব্য যে, টের তাঁরা পেয়েছিলেন। ঘটনার বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই জলে একটা পচা গন্ধ তাঁরা পাচ্ছিলেন। তবে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো সত্ত্বেও কোনও লাভ হয়নি। আর এই দুর্গন্ধযুক্ত জল যে, এত দ্রুত এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে, এমনটাও তাঁরা আশা করেননি।
আশা তো আপামর ভারতবাসীই করেনি। গত আট বছর ধরে নাগাড়ে দেশের সবথেকে পরিচ্ছন্ন শহরের তকমা পাওয়া ইন্দোরের পানীয় জলের এমন শোচনীয় অবস্থা দেখে গোটা দেশবাসীই আজ স্তম্ভিত! ইন্দোরের এই পরিচ্ছন্নতা যে, একপ্রকার ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ মাত্র, প্রকৃত পরিচ্ছন্নতা নয়, তা ক্রমশই স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। আর প্রশ্ন উঠছে যে, দেশের পরিচ্ছন্নতম শহরের পানীয় জলের লাইনেই যদি নিকাশি জল মিশে যায়, পাইপ লাইনেই লিকেজ থাকে, শহরের জলের মূল পাইপলাইনের ওপরে নির্মিত হয় শৌচাগার; তাহলে দেশের বাদবাকি অপেক্ষাকৃত অপরিচ্ছন্ন রাজ্যগুলির দুরবস্থা সামনে আসা কি শুধু সময়ের অপেক্ষা?
অবশ্য অপেক্ষাই বা বলি কী করে? নীতি আয়োগের ২০১৮ সালের রিপোর্ট বলছে অনিরাপদ পানীয় জলের কারণে এ দেশে প্রতি বছর গড়ে দুই লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো জলবাহিত রোগই এর প্রধান কারণ। প্রতিবেদনটির কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স-এ বলা হয়েছে যে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জলের উৎসই কোনও না কোনওভাবে দূষিত, ৭৫ শতাংশ পরিবারেই নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই এবং প্রায় ৬০ কোটি মানুষ তীব্র জল সংকটে ভুগছেন।

২০১৮ সালের এই রিপোর্টটিতে আরও দেখা যায় যে, পানীয় জলের নিরাপত্তার সূচকে বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১২০তম। এই পরিসংখ্যান ও তথ্যাদির ভিত্তিতে দেশের পানীয় জলের সংকটকে একটি ‘জাতীয় সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করে ২০১৯ সালে ‘জল জীবন মিশন’ কর্মসূচির সূচনাও করা হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার শপথও নেওয়া হয়। কথা দেওয়া হয় যে, ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের এই ভয়াবহ জলসংকট ঘোচানো হবে।
কেন জানি না, আমার একেক সময় মনে হয় যে, অন্তর্যামী বলে অদৃষ্টে কেউ একজন সত্যিই আছেন। অন্তরালে থেকে যিনি প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিটি দেওয়া কথা, প্রতিটি গৃহীত শপথ বাক্যের হিসেব রাখেন। তিনি ঈশ্বর না শয়তান জানি না; কিন্তু এই পৃথিবীর প্রতিটি সত্যি-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, কথা দেওয়া-কথা ভাঙার হিসেব তিনি রাখেন।
নইলে নিরাপদ পানীয় জলের প্রতিশ্রুতির সময়সীমা স্খলনের মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ইন্দোরে দূষিত পানীয় জলজনিত এই মহামারি দেখা দেবে কেন? কেন ইন্দোর জীবন দিয়ে প্রমাণ করবে, যে জলের আরেক নাম জীবন নয় কেবল; মরণ-ও।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন প্রহেলী ধর চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved