Ashoke Sen Beyond Science: The Man Behind the Genius | Robbar
Robbar
  • ১০ কার্তিক ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ঘরোয়া অশোক সেন

‘অস্কার ক্লেইন মেডেল’ পাওয়ার পর রাতারাতি ‘ভাইরাল’ পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন। নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসেন, খেতেও ভালোবাসেন কাছের মানুষদের ‘মণিদাদা’। কলকাতার বাড়িতে এলে মেঝেতে ঘুমিয়ে নেন দু’দণ্ড। আবার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ডান্ডিয়া কিংবা ঠায় দাঁড়িয়ে বারবিকিউ বানাতেও তিলমাত্র আলস্য় নেই তাঁর। খ্য়াতির শীর্ষে চড়েও, নেহাতই মাটির মানুষ। সেই ঘরের লোক অশোক সেনের গল্প বললেন মৌসুমী ভট্টাচার্য।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ১৭:৫০   
Facebook WhatsApp Messenger

পদার্থবিজ্ঞানের জটিল অঙ্কে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষটি এতকাল বিজ্ঞানীমহলে সুপরিচিত থাকলেও, সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো অতটা পরিচিত ছিলেন না। না-থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রচারবিমুখ অশোক সেন সাধারণত বিজ্ঞানের বাইরে অন্য় কোনও ক্ষেত্রে মাথা ঘামান না। তবে দেশের কিংবা পৃথিবীর সার্বিক মঙ্গলের পরিপন্থী কোনও ঘটনার প্রতিবাদে তাঁর বলিষ্ঠ মতামত জানাতে দ্বিধা করেন না কখনওই। এহেন অশোক সেন সুইডেন থেকে ‘অস্কার ক্লেইন মেডেল’ পাওয়ার পর রাতারাতি ‘ভাইরাল’ হয়ে গিয়েছেন। দেশের মানুষ ভালোবাসায় আর প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন সমাজমাধ্যমের দেওয়াল। এত চর্চার আলো মুখে এসে পড়লে বড় লজ্জা করে, অস্বস্তি হয় এই আড়ালপ্রিয় মানুষটির। এবারও বোধহয় তাই হয়েছে।

যে মানুষকে নিয়ে আমায় লিখতে হবে, আমি তাঁর পরিবারের একজন। তিনি আমার ভাসুর। আমার স্বামীর একমাত্র দাদা। দাদার নিজের বোন নেই। তাই হয়তো আমার সঙ্গে নিবিড় দাদা-বোনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ-বাড়িতে আসার পর থেকে আমার শাশুড়ি-মা– গৌরী সেন, আমার বন্ধু। বয়সের দীর্ঘ ব্য়বধান সে বন্ধুত্বে বাধা হয়নি। এখন ৯৮ বছর বয়সেও অসম্ভব প্রখর স্মৃতি ও সজীব মন নিয়ে ছেলের কৃতিত্বের আনন্দ উপভোগ করছেন মা। বাবা ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের ফিজিক্সের অধ্যাপক। পরে প্রিন্সিপাল হিসেবে অবসর নেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাবাকে ‘এমিনেন্ট টিচার’ সম্মানে সম্মানিত করে। বাবা চলে গিয়েছেন ৯৬ বছর বয়সে। কিন্তু মাঝ-নব্বুইতেও আশ্চর্যরকম তীক্ষ্ণ ছিল তাঁর স্মৃতি। আমি ছিলাম এই দুই বৃদ্ধজনের গল্পের শ্রোতা। উৎসাহ নিয়ে শুনি, তাঁরাও উজাড় করে দেন গল্পের ঝাঁপি।

zoom
অশোক সেন

অশোকদার ডাক নাম ‘মণি’, আর তার ভাই, আমার স্বামী অরূপের নাম ‘ছোট’। দুই ভাইয়ের মধ্যে বয়সের ফারাক মাত্র বছর দেড়েক। তাই অনেকটা একসঙ্গেই ওদের বড় হওয়া, যমজের মতো। দু’জনের কণ্ঠস্বরও প্রায় একরকম। মা নিজেই অনেক সময় ভুল করে বসে, কে ডাকল, মণি না ছোট? জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দুই ভাই হরিহর আত্মা। মণি যেখানে যাবে, ছোটকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গেলেও সে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। দু’জনের জন্য একইরকম জামা-প্যান্ট কিনে দিতে হবে। আলাদা হলে কেউই পরবে না। জন্মদিনে দু’জনেই একইরকম নতুন জামা পরে বাড়ির সকলকে প্রণাম করে। বোঝা মুশকিল, জন্মদিন কার। শুধু মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ওদের আলাদা করে দিত। দাদা মোহনবাগান, আর ভাই ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক। সবুজ-মেরুনের সঙ্গে লাল-হলুদের খেলা থাকলে দুই ভাই ডিপ্লোম্যাটিক হয়ে যেত। দাদার জিত মানে ভাইয়ের হার। অথবা উল্টোটা। পাছে ভাই বা দাদা দুঃখ পায়, খেলা শেষে আর হারজিত নিয়ে কোনও কথাই বলত না দুই ভাই!

zoom
পারিবারিক ছবিতে অশোক সেন

বাগবাজারের গোপীমোহন দত্ত লেনের বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছের স্কুল পার্ক ইনস্টিটিউশন। কিন্তু সেখানে ভর্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি মণি। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে তার নাম ওঠে। তাই সেখানেই ভর্তি হতে হল ক্লাস টু-তে। স্কুলের প্রথম পরীক্ষায় যথেষ্ট খারাপ ফল করে মণি। এসবই মায়ের মুখে শোনা। মণিদাদাকে কিছুদিন আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমার মনে আছে, তুমি স্কুলের প্রথম পরীক্ষায় খুব খারাপ রেজাল্ট করেছিলে? কেন, কী হয়েছিল, লিখতে পারোনি?’ দাদার উত্তরটা শুনে খুব মজা পেয়েছিলাম। দাদা বলেছিল, ‘‘প্রথম দিন পরীক্ষা দিয়ে বেরনোর পর সব গার্জেন তাদের ছেলেদের জিজ্ঞেস করছিল: ক’টা প্রশ্ন ছেড়েছিস? সেটা শুনে আমার মনে হয়েছিল প্রশ্ন ছেড়ে আসাটাই তাহলে নিয়ম। আমিও তাই পরদিন থেকে প্রশ্ন ছেড়ে আসতে শুরু করলাম!’’ আহা রে! এর নাম শৈশব! তখন মেধার মান অনুযায়ী তিন রঙের কাগজের রিপোর্ট কার্ড হত। রেজাল্ট বেরনোর পর বেচারা মণি বুঝতে পারে, তার রিপোর্ট কার্ডের রং সাদা, সবচেয়ে খারাপ রেজাল্টের রং। রং পাল্টাতে থাকে সময়ের সঙ্গে। আজ যে রঙে দাদা মজে আছে, তা হল কল্পনার রং। বিজ্ঞান তার কাছে ‘বিউটি অফ ইমাজিনেশন’!

zoom

আসলে ২৭ বছর এক পরিবারে থাকার অভিজ্ঞতা তো বহু রকমের। এখন বুঝতে পারছি, পরের কথা লেখা যায়, কিন্তু ‘ঘরের কথা’ লিখতে বাধো বাধো লাগে। এক টেবিলে খেতে বসে কত খুনসুটি, এক সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কত গল্প…। কী রান্না করলাম ভিডিও কলে তার ছবি দেখানো, রেসিপি আদান-প্রদান, পারিবারিক সিদ্ধান্তের আলাপ আলোচনা, আনন্দ-উদ্বেগ, দায়দায়িত্ব– সবই তো পরিবারের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। এর তো কোনও শেষ নেই। মস্ত বড় বিজ্ঞানী হলেও আমার কাছে তো নেহাতই দাদা। আমার ছেলে চিকুর কাছে একান্তই আহ্লাদ-দেওয়া জেঠু। কী যে লিখি, কোনটা ব্যক্তিগত, আর কোনটা সার্বজনীন– সে বিভাজন বড় গোলমেলে! কিছু এলোমেলো টুকরো স্মৃতি না-হয় বলি।

আমি এ-বাড়িতে আসার পর মায়ের মুখে মা’র ছোটবেলা থেকে সমকাল অবধি অজস্র গল্প শুনতাম। মায়ের এসব গল্প শোনার লোক বাড়িতে বিশেষ নেই। আমাকে শ্রোতা পেয়ে মা কথায় কথায় ফিরে যায় শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোয়। মায়ের গান্ধীবাদী বড়মামা কিংবা যুগান্তর দলের বিপ্লবী ছোটমামার গল্প নাড়া দেয়। অবাক করে মায়ের দেশভাগ আর দুর্ভিক্ষের স্মৃতি। এমন আরও কত কী! একবার কী খেয়াল হল, ডায়েরিতে লিখতে শুরু করলাম একেকটা খাপছাড়া পর্ব। লিখেই মাকে পড়ে শোনাতাম, মা শুনে খুব খুশি।

দাদা কলকাতার বাড়িতে এলেই, ব্যাগ-ট্যাগ রেখে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসত, একটু পরে আধশোয়া, আর তার খানিক পরে চিৎ হয়ে সটান সরলরেখায় ঘুম। মা বলত, ‘মণি, মেঝেতে শুস না, খাটে শো, ঠান্ডা লেগে যাবে।’ মণিদাদা প্রতিবারই একই উত্তর দিত, ‘না গো মা, এক্ষুনি উঠে পড়ব।’ বলেই ঘুমিয়ে পড়ত। যখন দাদা জানতে পারল আমি ডায়েরি লিখছি, মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেই বলত, ‘ডায়েরি দেখি, নতুন কী লেখা হল।’ আমি দিতাম, দাদা পড়ত। পড়তে পড়তে আধশোয়া, পড়া শেষ হলে ১৮০ ডিগ্রিতে টানটান হয়ে ঘুম। আমিও যে খুব নিয়মিত লিখতাম, তা নয়। হয়তো তিন-চার মাস কিছুই লিখলাম না। তার মধ্যে দাদা বাড়ি এল। এসেই ডায়েরির খোঁজ। একটু পাতা উল্টেই বলত, ‘এ তো আগেরবার পড়েছি। নতুন লেখা কই?’

zoom

আমি বলতাম, ‘তুমি এত ঘন ঘন এলে আমি কী করব, আমার কী আর কাজ নেই!’ বলত, ‘আমি আসছি জানলে লিখে ফেলবে, তবেই তোমার লেখা এগবে।’

মায়ের ৯০ বছরের জন্মদিনে যখন সেই এলোমেলো ডায়েরিকে হুটোপাটি করে একটা বইয়ের আকার দেওয়ার কথা ভাবি, দাদা খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিলাম, সেবার পুজোর ছুটিতে আর এলাহাবাদ যাব না। বইটার কাজ শেষ করব বাড়িতে বসে। দাদা জোর করে, ‘চলে এসো, এখানে বসে কাজ করবে।’ চলে গেলাম সবাই। ওখানে বসে আমি ছুটিটা জুড়ে বইটার কাজ করেছিলাম, তা কিন্তু না, দুই ভাই বইয়ের বেশ কিছু প্রুফ দেখে দিয়েছিল। আর দাদা দু’-একটা লজিক্যাল কন্ট্রাডিকশনও আবিষ্কার করেছিল, যেগুলো লেখক হিসেবে আমার বা পাঠকদের কারও চোখে পড়েনি। কতটা মন দিয়ে পড়লে দুটো আলাদা প্রেক্ষিতে লেখা, আলাদা অধ্যায়ে, দুটো আলাদা বাক্যের মধ্যে বোধগত অসংগতি ধরা পড়ে, আমি ভেবে অবাক হই।

তবে এলাহাবাদে দাদার সঙ্গে বসে বইয়ের ফাইনাল এডিটিং করার ফলে একটা বিপত্তি হল। বইতে প্রসঙ্গক্রমে অশোক সেনের সাফল্যের কিছু কিছু কথা ছিল। সেগুলো নির্মমভাবে কেটে দিয়েছিল দাদা। এই নিয়ে আমার সঙ্গে খানিক ঝগড়াও হয়ে গেল। আমি চ্যাঁচালাম, ‘প্রুফ রিডারের অধিকার নেই লেখকের ওপর কলম চালানোর!’

zoom

দাদা মিটিমিটি হাসে আর বলে, ‘পাঠক হিসেবে ওগুলো আমার অবান্তর লাগছে, তাই কেটে দিলাম। মায়ের বায়োগ্রাফি, সেখানে আমার কথা লিখে কী হবে?’

‘কী হবে মানে? তোমার সাফল্যকে ঘিরে মায়ের ভালোলাগার অনুভূতি, তা অবান্তর?’ দাদা এমন একটা মানুষ, যেটা ঠিক মনে করবে ঘুরে ফিরে সেটা করেই ছাড়বে। বড্ড জেদ। আমি কোনও দিনই জেদ করতে পারি না। অগত্যা গজগজ করতে করতে মেনে নিলাম। মায়ের বই ‘যখন যেমন মনে পড়ে’ থেকে বাদ পড়ল অশোক সেন, থাকল শুধু ঘরের ছেলে মণির কথা। বিশ্বজনের আশোক রইল আমাদের পারিবারিক উপাখ্যানের দুই মলাটের বাইরে।

পুজোর পর এলাহাবাদে যাওয়া আমাদের ফি’বছরের অভ্যেস। খুব মজা হত। ‘হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতে দারুণ লাগত। দাদা অনেকরকম রান্না করত। রোজই কিছু না কিছু প্ল্যান ভাঁজা হত। সহকর্মীরা বাড়িতে আসতেন, অফুরন্ত আড্ডা! হাঁটতে বেরলে অনেকেই আবার অরূপকে অশোক ভেবে ভুল করত– বিশেষত ছুটিতে ছেলেমেয়েকে দেখতে আসা অভিভাবকরা। বুধবার বিকেলে স্থানীয় হাটে সবজি কিনতে যেতাম আমি আর দাদা। কোনও দিন গঙ্গার ধারে বাওবাব গাছ দেখতে যাওয়া হত। দিওয়ালিতে খুব আনন্দ-অনুষ্ঠান হত দাদাদের ইনস্টিটিউটে। ছাত্রছাত্রীরা আলপনা বা রঙ্গোলি দেয়। দেখার মতো তার সূক্ষ্ম কারুকাজ। প্রদীপ দিয়ে গোটা ক্যাম্পাস সাজানো হয়। আতসবাজি পোড়ানো হয়, তারপর ডিনার। অনেক সময় তা খোলা আকাশের নিচে, ‘প্রতিষ্ঠানপুরে’র ঢেউ খেলানো ঘাসের ঢালু মাঠে। তারপর শুরু হত ডান্ডিয়া নাচ। ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক ও তাঁদের পরিবারের অনেকেই তাতে যোগ দিতেন। অবধারিতভাবে দুটো ডান্ডিয়া হাতে নিয়ে মণিদাদা নাচ শুরু করত। গানের তালে তালে পা মিলিয়ে, লাঠিতে লাঠি মিলিয়ে। নাচের পার্টনার বদলাতে থাকে। ছাত্রছাত্রীরা সবাই একবার করে অশোক স্যরের ডান্ডিয়ার পার্টনার হয়। এক-আধবার আমিও। কখনও-বা সুমতিদি কিংবা অন্যান্য সহকর্মী। সবাই ক্লান্ত হয়ে যায়। মণিদাদা ক্লান্ত হয় না। যতক্ষণ ডান্ডিয়া চলে, মণিদাদা নাচতেই থাকে। হয়তো ভাবে, বড়রা নাচ থামিয়ে দিলে ছোটরা উৎসাহ হারাবে।

হরিশ্চন্দ্রতে বছরে একবার বারবিকিউ পার্টি হয়। অনেকগুলো বড় আকারের উনুন বানানো হয়। গনগনে কাঠের আগুনের ওপর চিকেন রোস্ট হতে থাকে। ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক বা স্টাফরা অনেকেই অল্প সময়ের জন্য পালা করে আসেন বারবিকিউ চিকেন বানাতে। প্রচণ্ড তাপে কেউই বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তারপর তাঁরা লাইন করে দাঁড়িয়ে যান প্লেট হাতে। একসেট চিকেন বারবিকিউ রেডি হয়, সঙ্গে সঙ্গে লাইনে দাঁড়ানো প্লেটে সেগুলো পড়তে থাকে। সেটা খেতে খেতেই তাঁরা আবার লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে যান পরের দান আসার জন্য। প্রায় মধ্যরাত অবধি জেগে থাকে লাইন। মণিদাদা শুরু থেকে শেষ অবধি একটানা উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে বারবিকিউ বানাতে থাকে। একবার তো সারা সন্ধে এই আগুনের তাপে বারবিকিউ করতে গিয়ে চশমার কাচ ফেটে চৌচির! দাদাকে কালো মোটা ফ্রেমের, মোটা গ্লাসের যে-চশমাতে আগেকার ছবিতে দেখা যেত, সেটি বারবিকিউয়ের তাপেই গিয়েছে। সে কী বিপত্তি! দাদা এলাহাবাদের এক দোকান থেকে একটি চশমা বানায়। গোল ফ্রেমের গান্ধী-চশমা। তার পরপরই দাদা কলকাতায় আসে। দেখলাম ফাটা কাচের পুরনো চশমাটাই পরে আছে। ‘এ কী! এভাবে ফাটা কাচের ফাঁক দিয়ে কেউ দেখতে পায় না কি! নতুন চশমার কী হল?’

বলল, ‘নতুন চশমাটা পরলে সব কিছু দুটো দুটো দেখছি!’

আমি জোর করে উল্টোডাঙার এক চশমার দোকানে নিয়ে গেলাম। দোকানে পাওয়ার টেস্ট করিয়ে নতুন চশমাটা দেখাতে, তারা মাপজোক করে জানাল বেশ কত মিলিমিটার যেন ফোকাসের গন্ডগোল আছে ওই চশমায়, তাই এমন দুটো-দুটো দেখাচ্ছে। আবার নতুন চশমা বানাতে দেওয়া হল। চশমা রেডি হলে, আমি সেটা কুরিয়ার করে এলাহাবাদ পাঠালাম। চশমা পাওয়ার পর দাদা সন্ধেবেলা ফোন করল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন দেখছ?’ বলল, ‘আরে, এটা পরেও তো আমি ডবল দেখছিলাম! চশমা পরে তাকিয়েই দেখলাম লিভিং রুমের দেওয়ালে দুটো টিউবলাইট জ্বলছে। তারপর চশমা খুলে দেখলাম সত্যিই দেওয়ালে দুটো টিউবলাইট আছে। এতদিন খেয়াল করিনি। তাহলে চশমা ঠিকই আছে, না হলে তো চারটে দেখতাম!’

zoom
স্ত্রী সুমতি রাওয়ের সঙ্গে।

রান্না করতে দাদা খুব ভালোবাসে। সুমতিদি নিরামিষাশী আর দাদা চূড়ান্ত রকম আমিষাশী। দু’জনের খাদ্যাভ্যাস একদম আলাদা। দাদা তাই দু’রকম রান্নাই করতে পারে। রান্নাটা দাদার কাছে মাথাকে বিশ্রাম দেওয়ার পন্থা। কিন্তু সেখানেও এত মনোযোগ দেয় যে, দেখে মনে হবে কোনও ল্যাবে জটিল এক্সপেরিমেন্ট চলছে। বাড়িতে ছাত্রছাত্রীরা এলে বেশিরভাগ সময়ই পিৎজা বানিয়ে দেয়। বড় দল এলে ৩০-৪০টা পিৎজা বানানো দাদার কাছে কোনও বড় ব্যাপার না! খাওয়াতে যে ভালোবাসে, সে যে খেতেও ভালোবাসে, বলাই বাহুল্য। কলকাতার বাড়িতে এলে হরেকরকম মাছের পদ সাজিয়ে দেওয়া হয় তার থালায়। সাগ্রহে তা সাবাড় করে মেছোদাদা। কোভিড অনেকের মতো মণিদাদাকেও অনেক কাজ শিখিয়েছে। দাদা বলেছিল, ‘আমি ঝাঁট দেওয়া আর ঘরমোছার মধ্যে একটা ফান্ডামেন্টাল ডিফারেন্স বের করেছি। ঝাঁট দিতে দিতে দূরে যেতে হয়, ঘর মুছতে মুছতে কাছে আসতে হয়!’ সত্যি খুব বড় এক তত্ত্ব বটে! স্ট্রিং থিওরিকেও হার মানাবে!

কোভিডের মধ্যেই মণিদাদা আর সুমতিদি এলাহাবাদ ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে আইসিটিএস-এ যোগ দেয়। সুমতিদি আগেই চলে যায়, মণিদাদা কয়েক মাস পরে। ওরা চাইছিল শেষবার আমরা এলাহাবাদে ঘুরে আসি। এইচআরআই-এর অপূর্ব সুন্দর ক্যাম্পাস ছেড়ে বেঙ্গালুরু যেতে ওদেরও হয়তো কষ্ট হচ্ছিল। চারপাশে গাছপালা, একদিকে ঘন জঙ্গল, কালিদাস পয়েন্ট থেকে গঙ্গা-যমুনার বিস্তীর্ণ সঙ্গমস্থলের মুগ্ধ করা দৃশ্য, উঠোনে নির্ভয় ময়ূরের ঘোরাঘুরি, রাতে শেয়ালের ডাক। শীতের সকালে ছাদে বসলে কোনও কোনও দিন টিয়া পাখি কোলে এসে বসে! বসন্তে আগুন-রঙা বিগোনিয়া ভেনাস্তার ফুলে ঢাকা পড়ে যেত ওদের বারান্দা আর ছাদ। প্রকৃতির এই নিবিড় সান্নিধ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে কষ্ট তো হবেই। তাই বেঙ্গালুরুতে গিয়েও মাঝে মাঝেই বলত: এলাহাবাদে যাব।

zoom
বিজ্ঞানীর জগৎ

ধীরে ধীরে দাদা থিতু হয়ে গেল দক্ষিণের জীবনে। ওরা বেঙ্গালুরুতে যাওয়ার পরেই আমরা একবার দিন ১৫ কাটিয়ে এসেছি ওদের সঙ্গে। কিন্তু এলাহাবাদের যে-টান, তা বেঙ্গালুরুর শহুরে জীবনে পাই না। এখন আমি পাহাড়ের টানে মজে থাকি। হিমালয়ের নেশা আমায় দক্ষিণমুখী হতে দেয় না। আমিই বাড়ির টুর প্ল্যানার। বেশ ক’বার যাব যাব বলেও না যাওয়ায় দাদার অভিমান। সেবার কলকাতা এয়ারপোর্টে দাদাকে ছাড়তে গিয়েছি। গাড়ি থেকে নেমে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘তোমার জন্য বেঙ্গালুরুতে একটা পাহাড় বানাব!’ বুঝলাম, এবার একবার যেতেই হবে বেঙ্গালুরুতে বাড়িতে। এক ডিসেম্বরের ছুটিতে দিনদশেক কাটিয়ে এলাম সবাই মিলে হইহই করে।

আমার জন্য একদিন পাহাড় বানাবে বলে, নিজেই এখন পাহাড়ে চড়ে বসেছে মণিদাদা। খ্যাতির পাহাড়। ভালোবাসা আর শুভেচ্ছার পাহাড়। পাহাড়ের শানুদেশে দাঁড়িয়ে অনুভব করি, এই লাজুক বিজ্ঞানসাধকের পা দুটো বরাবরের মতো মাটিতেই আছে। প্রচারের আলো একটু সরে গেলেই হয়তো মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়বে।

……………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন মৌসুমী ভট্টাচার্য-র অন্যান্য লেখা

……………….

ashoke sen Harish-Chandra Research Institute Indian Scientist International Centre for Theoretical Sciences Oskar Klein Medal Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Science Scientist

Share this article on