
একজন সাধারণ খালেদা খানম পুতুল থেকে একজন অনন্য আপসহীন নেত্রী হয়ে উঠেছেন খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ নারী থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন অসামান্য নেত্রী, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক। বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ও সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। জনগণের অধিকার ও বাংলাদেশ প্রশ্নে তিনি কখনও আপস করেননি। যার জন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে জীবন জুড়ে।
দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনযাপনের পর অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছ’টায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। দীর্ঘ ন’ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশ স্বাধীন-পরবর্তী বাংলাদেশে অনেকগুলো রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে।

নানা রাজনৈতিক পালাবদলের পর ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখান বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস তৈরি করেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। এরপর বিশ্বজুড়ে রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৬৬ সালে ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরেক মাইলফলক তৈরি করেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। এ পথ ধরে ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন বেনজির ভুট্টো। আর বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন বেগম খালেদা জিয়া। এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নারীসমাজের প্রেরণার প্রতীক।
বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর মধ্যে কখনও প্রতিশোধপরায়ণতা ছিল না; তিনি কখনও প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি, যা উপমহাদেশের রাজনীতিতে লক্ষণীয়। দেশের বাইরে আরামে থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশত্যাগ করেননি। জীবিত অবস্থায় তিনি বলেছেন, দেশের বাইরে তার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই, তিনি দেশেই থাকবেন। শেষমেশ তিনি দেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এটা বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে অনেক বড় অর্জন। ক’জন রাজনীতিবিদের নিজ দেশের মাটিতে এত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে মৃত্যুর সৌভাগ্য হয়!

বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও জীবনযাপনে বেগম রোকেয়ার প্রভাব লক্ষণীয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারে তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি সবসময়ই নারীদের কুসংস্কার ঠেলে নিজেদের আলোকিত করার, নিজেদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলতেন। তাই নারীশিক্ষা বিস্তার ও প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রক্ষণশীল এ সমাজব্যবস্থায় বেগম জিয়াকে কখনও হাত-মুখ ঢেকে চলাফেরা করতে দেখা যায়নি। তিনি সবসময়ই একজন বাঙালি নারীর মতোই শাড়ি পরে চলাফেরা করতেন। তার চালচলনে ছিল প্রগতিশীলতা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই মাসের মাথায় মে মাসে তৎকালীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজাকার আল-বদররা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান জানিয়ে দেয়। এতে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দুই পুত্র তারেক রহমান পিনো (তারেক রহমানের ডাকনাম ‘পিনো’) ও আরাফাত রহমান কোকো-কে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৭১ দোসরা জুলাই বেগম জিয়া, দুই পুত্র তারেক ও কোকো-সহ রাজাকার আল-বদরদের দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক বন্দি হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, তাঁর স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান এ ঘটনা শুনে ১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট মেজর জেনারেল জামশেদকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি লিখেন: ‘Dear, General Jamshed, My wife Khaleda is under your coustody. If you do not treat her with respect, I would kill you someday. –Major Zia.’ মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বেগম খালেদা জিয়া বন্দি অবস্থায় ছিলেন। এরপর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করে আত্মসমর্পণ করলে দুই পুত্র-সহ তিনি মুক্তি পান।

একজন সাধারণ খালেদা খানম পুতুল থেকে অনন্য আপসহীন নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ নারী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন অসামান্য নেত্রী, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক। বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ও সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। জনগণের অধিকার ও বাংলাদেশ প্রশ্নে তিনি কখনও আপস করেননি। যার জন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে জীবন-জুড়ে।
রাজনৈতিক আদর্শে মতবিরোধ থাকলেও বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীনতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর অবদানের প্রশ্নে এদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একমত। তার মৃত্যুতে দল-মত নির্বিশেষে শোক, সমবেদনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে সেটা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াও ইতিহাসের পাতায় কীর্তিমান হয়ে থাকবেন প্রাসঙ্গিক।
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন ইমরান ইমন-এর অন্যান্য লেখা
……………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved