Robbar

মেলার মাঠ খেলার মাঠ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 29, 2026 2:53 pm
  • Updated:January 29, 2026 3:16 pm  

ব‌ইমেলার এক এবং দুই নম্বর গেট, বাকি প্রবেশ-ফটকের তুলনায় একটু বেশিই শান্ত, জনহীন। প্রথমত, মাসের শেষ, দ্বিতীয়ত, সপ্তাহের কেজো-দিনের মাঝামাঝি। ফলে ভরদুপুরে ব‌ইমেলার ‘এক’ ও ‘দুই’ ভাতঘুমের মতো আয়েশি, ঝিমধরা। সেই ঝিমুনিকে অট্টহাসিতে আত্মারাম খাঁচা করে দিলেন দুই সত্তরোর্ধ্ব। একজনের প্রবেশ ঘটছিল, অন্যজনের প্রস্থান। সেই আসা-যাওয়ার মাঝেই দুই বন্ধুর দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ। ‘অনেকদিন পর আবার চেনা মুখ, বন্ধু কী খবর মুহূর্ত বলুক!’  সুখ-দুখের নানা কথায় ব‌ইমেলা তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘মিলনমেলা’।

প্রচ্ছদের চিত্র-ঋণ: সুখময় সেন

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

মাঘের শীত আজকাল বাঘের গায়ে লাগে না। বুধবাসরীয় ব‌ইমেলায় তাই শৈত্য নেই, উষ্ণতা আছে। সেই উত্তাপ ব‌ইপ্রেমী মানুষের উপস্থিতির, কলতানের। আর আছে বুক-ঝিমঝিম নস্টালজিয়া। অমাইক বা মাইক– শব্দের ছটা! অক্ষরের এমন ভিড়ে খানিক শব্দ তো হবেই। শব্দবাজি অন্তত বইমেলায় কোনওভাবেই নিষিদ্ধ নয়।

জন অরণ্যে বইমেলা

ব‌ইমেলার এক এবং দুই নম্বর গেট, বাকি প্রবেশ-ফটকের তুলনায় একটু বেশিই শান্ত, জনহীন। প্রথমত, মাসের শেষ, দ্বিতীয়ত, সপ্তাহের কেজো-দিনের মাঝামাঝি। ফলে ভরদুপুরে ব‌ইমেলার ‘এক’ ও ‘দুই’ ভাতঘুমের মতো আয়েশি, ঝিমধরা। সেই ঝিমুনিকে অট্টহাসিতে আত্মারাম খাঁচা করে দিলেন দুই সত্তরোর্ধ্ব। একজনের প্রবেশ ঘটছিল, অন্যজনের প্রস্থান। সেই আসা-যাওয়ার মাঝেই দুই বন্ধুর দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ। ‘অনেকদিন পর আবার চেনা মুখ, বন্ধু কী খবর মুহূর্ত বলুক!’  সুখ-দুখের নানা কথায় ব‌ইমেলা তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘মিলনমেলা’।

পাঠক, আপনারা‌ও তো ছিলেন তখন। মেলা চত্বরের কোথা‌ও-না-কোথাও দাঁড়িয়ে ওল্টাচ্ছিলেন ব‌ইয়ের পাতা। আপনাদের মন হয়তো নতুন ব‌ইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা ছিল, কান নিশ্চয়ই শুনেছে, মাইকে ভেসে আসা গানের কলি, ‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না/ আমি রবো না রবো না ঘরে…’। অথবা, আপনারা ছিলেন না, এবারে আসতে পারেননি কোনও কারণে। হয়তো কলকাতা থেকে অনেকানেক দূরে। কিন্তু তবুও এই যে রোজ আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি, এসপার-ওসপার করছি বইমেলায়, তা কিন্তু আপনাদের জন্যই। হে বন্ধু, হে পাঠক, যেটুকু স্বাদ, বই ও মেলার, আক্ষরিকভাবেই আমরা পৌঁছে দিতে চেয়েছি।

শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

বন্ধুত্বের কথায় ছুটে যেতে হয় অলোক মুখোপাধ্যায়ের কাছে। ভারতীয় ফুটবলে অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ সাইড ব্যাক। এবারের ব‌ইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনী ‘লাল কার্ডের বাইরে’। ‘দীপ প্রকাশন’-এর স্টলে সেই ব‌ইয়ের পাতায় স্মৃতি রোমন্থনের আবছায়া স্পর্শ। অধ্যায়ের অলিতে-গলিতে পাঠক, আপনি খুঁজে পাবেন ময়দান কাঁপানো চিমা ওকেরিকে। কেন মজিদ বিসকারের থেকে এগিয়ে চিমা? কেন প্রিয় বাবলুদা– সুব্রত ভট্টাচার্যর থেকে মনাদা ওরফে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে এগিয়ে রাখলেন একদা সতীর্থ অলোক। উত্তর আছে ‘লাল কার্ডের বাইরে’-তে।

আর আছে, অলোকের প্রিয় রন্টুর কথা। রন্টু মানে, ময়দান যাঁকে চিনত ‘কৃশানু দে’ নামে। ভারতীয় ফুটবলের ‘মারাদোনা’। কৃশানু-র মৃত্যুতে শোকাহত অলোক জাতীয় ক্যাম্পে প্র্যাকটিস বন্ধ রেখেছিলেন। রুষ্ট হয়েছিলেন তৎকালীন বিদেশি কোচ। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানে দাপিয়ে খেলা অলোক মুখার্জি অকপট, খেলার মাঠের মতো, ব‌ইমেলার মাঠেও।

বইপথিকদের চোখে কি পড়েছে ‘মান্দাস’-এর অভিনব পোস্টার? দেওয়ালে সাঁটানো পোস্টারে আমাদের প্রিয় অরণ্যদেবের জিজ্ঞাসা, ‘এই দুষ্টু, মান্দাসে কবে আসবি?’ ‘মান্দাস’ অবশ্য অরণ্যদেবের গুহা নয়, তাদের থিম এবার ফুটবল। ভিতরে ঢাউস ফুটবল আর সাদা-কালো ছবির কোলাজে জ্বলজ্বল করছেন ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলে। আর, অবশ্যই গৌতম সরকার, ভারতীয় ফুটবলের ‘মিডফিল্ড জেনারেল’। মেলায় প্রকাশ পেয়েছে গৌতম সরকারের আত্মকথা ‘মিডফিল্ড’। ’৭৭-এ ইডেনে প্রায় একার দায়িত্বে আটকেছিলেন কসমসের পেলেকে। সেই ‌অতিমানবিক পারফরম্যান্সের নিরিখে যদিও পেতে হয়েছিল ‘দেশদ্রোহী’ তকমা! বরাবরের আপসহীন গৌতম কর্মকারের কেরিয়ারটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল তিন বিশিষ্টের ষড়যন্ত্রে। তার মধ্যে অন্যতম পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়! হ্যাঁ, এমন‌ই বিস্ফোরকে ঠাসা ‘মিডফিল্ড’-এর আনাচকানাচ।

সুধীর কর্মকার। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো তাঁর নাম জানেই না। অথচ ময়দানের ঘাস চেনেন যাঁরা, তাঁরা জানেন, কত মিথ জড়িয়ে রয়েছে নম্র, বিনয়ী এই প্রাক্তন তারকার নামের সঙ্গে। সুধীর কর্মকারের ‘রক্ষণরেখা’ ব‌ইটিতে ছড়িয়ে আছে পুরনো সেই ময়দানের চেনা গন্ধ। পাতায় পাতায় সোনালি ইতিহাসের ঝলক। সুধীর কর্মকার, গৌতম সরকার, অলোক মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বর আর‌ও সম্মান প্রাপ্য। কিন্তু আত্মবিস্মৃত বাঙালি কবেই বা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝল!

স্মৃতি রোমন্থনে মন ভারাক্রান্ত হয়ে পারে, তবে ব‌ইমেলায় মনখারাপের জায়গা নেই। নেই একাকিত্বের ঠাঁই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামলেই মেলা চত্বরে জনপ্লাবন। সেই ভিড়ের মাঝেই খুঁজে পাওয়া গেল অভিনব দৃশ্য। সরস্বতী পুজো কেটে গিয়েছে দিনকতক। তবু মেলার প্রাণকেন্দ্রে সরস্বতী বিরাজমান, বেশ ‘কার্নিভাল’ আমেজে‌ই। উৎসাহী জনতা সেলফিতে সেই মুহূর্ত বন্দি করতে ভুলছেন না। ব‌ইমেলায় ‘সুভাষ ফিরেছিলেন’, লেখক কুনাল বোস-এর হাত ধরে। তবে এই দিন জানানো হল কপি আর নেই। পাঠকের সাগ্রহে প্রথম সংস্করণ কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। অনেকেই বুধবার ব‌ইটি কিনতে এসে‌ও খালি হাতে ফিরলেন। প্রকাশক অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, ‘সুভাষ ফিরবেন’। ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়েছিলেন ‘নীরেন ভাদুড়ি’‌ও। মানে, ‘নীরেন ভাদুড়ি’র স্রষ্টা সৌভিক চক্রবর্তী। বাংলা ওয়েবে ভালো-মন্দ মিশিয়ে সাড়া ফেলেছে ‘নিকষছায়া’ সিরিজ। নতুন ব‌ই কবে আসবে? গুণমুগ্ধদের সেই প্রশ্নে জেরবার দেখাল চক্কোত্তি মশাইকে।

ভিড় নয়, বেশ ফাঁকায় পাওয়া গেল আরেক ‘ভাদুড়ী’কে। তিনি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী। ‘মহাভারতের প্রতিনায়ক’-এর লেখক, দিব্য সুখটান দিচ্ছিলেন, নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই। কিন্তু অত্যুৎসাহীদের ভিড়ে তাঁকেও পা চালাতে হল দ্রুত।

মেলাজুড়ে প্রকাশক, ব‌ইকর্মীদের শশব্যস্ততা। ম্যাপ হাতে মার্কোপোলোর মতো ব‌ইয়ের অনুসন্ধানে ছুটে চলা পাঠক, মুহূর্তরা মুহূর্তের কাছে ঋণী এই ব‌ইমেলায়। তবে তাল কাটল সুমিতা চক্রবর্তীর টিপ্পনিতে। বর্ষীয়ান অধ্যাপিকা, লেখিকা, গ্রন্থ-সমালোচকের কথায়, ‘ব‌ই কেনা তো এখন শৌখিনতা!’

পাঠক, এই উক্তি ঠিক না ভুল, প্রমাণের দায়িত্ব কিন্তু আপনাদেরই।

………………………………….
আপনারা ব‌ইমেলার কড়চা নিয়মিত পড়ছেন তো? তা, কেমন লাগছে? আপনাদের মতামতের আমরা প্রত্যাশী। আমাদেরকে মেলও করতে পারেন যে কোনও দিন, যখন খুশি– ভালোবাসায়, জিজ্ঞাসায়, বন্ধুত্বে, শত্রুতায়, আবদারে– [email protected]– এই মেল আইডিতে।