
৫৫৬ নম্বর স্টলের দেওয়ালে আশ্চর্য রঙিন ছবি এঁকেছেন বহুদিনের ‘সন্দেশী’ রাহুল মজুমদার। রেখার টানে, বোল্ড-কালারে অদ্ভুত সজীব জন্তু জানোয়ার এবং সন্দেশের খুদে পাঠকেরা। মেলার আনাচেকানাচে লাইভ ছবি আঁকার ব্যাপারটা ২০২৬-এর বইমেলায় এক প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। জানুয়ারির ২৩ তারিখ জার্মানির স্টলে সাদা দেওয়ালে কালো রঙে অসংখ্য চরিত্রকে আঁকা শুরু করে ২৬ তারিখ শেষ করলেন শিল্পী দেবাশীষ দেব। চিরাচরিত ভঙ্গিতে আঁকা সরসচিত্রটি দেখতে জার্মানির স্টলে একলাফে বেড়ে গিয়েছে ভিড়। গোটা মেলা জুড়ে দেবাশীষ দেবের কার্টুন এবং ইলাস্ট্রেশন রয়েছে স্বমহিমায়।
প্রচ্ছদের ছবি: দেবাশিস সেন
ছবির টানে কড়চা লিখি
নেইকো এতে ফাঁকি
মেলার মাঠে যেমন দেখি
হুবহু তাই আঁকি!
বাজনদারের পয়লা পিড়িং মহামতি সুকুমার রায়ের লাইনগুলোর সামনে দু’ হাত পেতে হাজির। এ ছাড়া আর উপায় নেইকো। হেতু? মূলত দুটো– এক, এবারের কিস্তির মহৎ উদ্দেশ্য পাঠকদের সংক্ষেপে ব্যক্ত করে সরাসরি মূল বিষয়ে ঢুকে পড়া; আর দুই, বইমেলা যে ঘনিয়ে এল– ফলে মেলা বইয়ের, অনেকানেক ছবির কথা সবিস্তার বলা চাই (নইলে ক্ষমা নাই)! হয় নীরব সংগীত নচেৎ গড়ের বাদ্যি। মধ্যিখানে যে পিলপিল করছে বইপড়ুয়ার দল! ওরে চল রে চল!

জন-অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ বলে– ‘প্রচ্ছদ দেখে কোনও বইয়ের গুণাগুণ মাপতে যেও না হে!’ এদিকে দুষ্টু লোকেরা চিরকালই দলে ভারী। তারা এর পালটা দিতে বলেছিল, ‘না হে, মলাটই হচ্ছে বইয়ের ললাট!’ সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকেরা না কি এরপর একগাল হেসে ভোটটা দ্বিতীয় মতের পক্ষে না দিয়ে পারেনি। বইমেলার মাঠেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে।
নতুন, পুরনো বা ‘পুরনোতুন’– বইয়ের জগতে ছবির দৌরাত্ম্য কেমন, বা কতটা, তা বুঝতে গিয়ে মেলায় সেঁধোতেই ভরদুপুর। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন তখন বইয়ের গন্ধে ম ম। বাইরের সারির একটি টেবিলে চোখ পড়তেই ম্যাজিক! ঝপ করে হস্তগত হল ছোটদের পত্রিকা ‘ফুলঝুরি’-র দু’টি পুরনো সংখ্যা! মলাট এঁকেছেন দেবাশীষ দেব। ১৯৯৮ সালের পুজো এবং ১৯৯৯-এর বইমেলায় প্রকাশিত বইদু’টির কয়েকটি কপিই আর অবশিষ্ট ছিল। ২৮ বছর বয়সী সংখ্যা দু’টি ঝলমলে ছবির জোরেই চিরনবীন।

আগের দিনের উল্টোবাগে হাঁটা শুরু করে মেলার মাঠ ঘুরে নেব এমনটাই ঠিক ছিল। অথচ দু’ হাত অন্তর অন্তর থমকে যেতে হচ্ছে। পসরা হরেকরকম! ভিড়ভর্তি মেলার মাঠে দু’ হাত অন্তর ছবি! হাতছানি দিয়ে ডাকছে, কতকটা আদ্যিকালের ছাপানো বিজ্ঞাপনের অদৃশ্য সুরে– ‘না কিনেন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’ বিস্তর শিল্পী, লেখক, সম্পাদক, ছাপাখানার কর্মীদের সমবেত সম্মেলনে এক মহা ধুমধাম। বইয়ের ছবি? ছবির বই? নাকি ছবিতে গল্প? কোনটা? বোধহয় সবগুলোই সত্যি।

ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির ‘সন্দেশ’-এর স্টলে। কেতাবি খবরে আবারও ছবির জয়জয়কার। ‘লেখায় উপেন্দ্রকিশোর রেখায় সত্যজিৎ’ আর সন্দীপ রায় অনূদিত ‘কমিক্স সমগ্র’। প্রথমটি ‘গল্পের ছবি’, দ্বিতীয়টি ‘ছবিতে গল্প’। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা বহু অদেখা বা অল্পচেনা ইলাস্ট্রেশন ও হেডপিসে সাজানো প্রথম বইটি পাঠকের মনে ধরবেই! অন্যদিকে সন্দীপ রায়ের অনুবাদে এবং তাঁরই হাতের লেখায় শোভিত স্পিচ-বাবলে সজ্জিত বহু বিদেশি কমিক্সের সংকলনটিও বেশ চিত্তাকর্ষক। যদিও মূল রচয়িতা ও প্রথম প্রকাশের সনতারিখের উল্লেখ থাকলে বইটি সর্বাঙ্গসুন্দর হত। বিচিত্রপত্র গ্রন্থন বিভাগ প্রকাশিত এই বইদু’টি মেলাতেই প্রায় নিঃশেষিত।

৫৫৬ নম্বর স্টলের দেওয়ালে আশ্চর্য রঙিন ছবি এঁকেছেন বহুদিনের ‘সন্দেশী’ রাহুল মজুমদার। রেখার টানে, বোল্ড-কালারে অদ্ভুত সজীব জন্তু জানোয়ার এবং সন্দেশের খুদে পাঠকেরা। মেলার আনাচেকানাচে লাইভ ছবি আঁকার ব্যাপারটা ২০২৬-এর বইমেলায় এক প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। জানুয়ারির ২৩ তারিখ জার্মানির স্টলে সাদা দেওয়ালে কালো রঙে অসংখ্য চরিত্রকে আঁকা শুরু করে ২৬ তারিখ শেষ করলেন শিল্পী দেবাশীষ দেব। চিরাচরিত ভঙ্গিতে আঁকা সরসচিত্রটি দেখতে জার্মানির স্টলে একলাফে বেড়ে গিয়েছে ভিড়। গোটা মেলা জুড়ে দেবাশীষ দেবের কার্টুন এবং ইলাস্ট্রেশন রয়েছে স্বমহিমায়। সে ‘থিমা’-র স্টলে শিবানী রায়চৌধুরীর রম্যগদ্যের নতুন বই ‘লণ্ডনের আনাচেকানাচে’-র প্রচ্ছদ হোক, বা ২৭৫ নম্বর স্টলের গায়ে ‘বেড়ালের বোনপো’-র মলাট; সবেতেই আদি অকৃত্রিম সম্মোহন– ‘না কিনুন, একবার দেখুন!’

ছোটদের প্যাভিলিয়নের অদূরেই একটি মঞ্চ, তাতে ‘আমরা আনিব নূতন প্রাণ’ শীর্ষক সুবিশাল ব্যানার ছবিতেও যে দেবাশীষ দেব, সেই তিনিই স্বর্ণাক্ষরের স্টলে অন্য আমেজ এনে দেন ‘হরিণের সঙ্গে খেলা’ বইয়ের প্রচ্ছদে। অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর লেখা এই বইটি বহুদিন পরে হুবহু এক অবয়বে ফিরে এসেই ফুরিয়েও গেল!

কমিক্স ও গ্রাফিক্স-৫ ‘ময়ূখ চৌধুরী ১০০’ সংখ্যা করেছে, তা কড়চার আগের একটি পর্বেই উল্লিখিত। পাশাপাশি গত ২৬ জানুয়ারি, বুক ফার্মের তরফে ‘কমিক্স ও গ্রাফিক্স’ সম্মাননাও মেলার মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল, আক্ষরিক অর্থেই ছবির জগতে ‘চাঁদের হাট’। বর্ষীয়ান শিল্পী গৌতম কর্মকার ও দিলীপ দাসের হাত থেকে ‘নারায়ণ দেবনাথ’, ‘ময়ূখ চৌধুরী’ এবং ‘কমিক্স ও গ্রাফিক্স’ পুরস্কার পেলেন যথাক্রমে রঞ্জন দত্ত, চার্বাক দীপ্ত, সপ্তদীপ দে সরকার, অর্ক চক্রবর্তী এবং সুমন্ত গুহ। এ-ও তো ছবিরই গল্প!

সেই কোনকালে শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর ছবির জুড়িদার শৈল চক্রবর্তীকে বলেছিলেন, ‘আমার লেখা যদি ছিপ হয়, আপনার ছবি হল টোপ।’ দুইয়ের মিলিত রূপেই বাজিমাত। প্রকাশক থেকে পাঠক, সব্বাই আটক! উদ্বোধনের স্টলে তাইই বোধহয়, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় অঙ্কিত ‘ছবিতে রামকৃষ্ণ কথামৃত’ বইটি নিয়ে বেশ আগ্রহ লক্ষ করা গেল। যেমনটি দেখা গেল কাফী খাঁ ও হরেন ঘটকের ছবি-ছড়ার যুগলবন্দি– ‘শেয়াল পণ্ডিত’কে ঘিরে। লালমাটি এই বইখানি প্রকাশ করে সত্যিই একটা বড় কাজ করলেন।

বহু প্রকাশনা এবার কমিক্সের নতুন সম্ভার নিয়ে মেলায় এসেছেন। পত্র ভারতী তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে ডা. সায়ন পালের লেখা ‘বঙ্কুডাক্তারের বুড়োক্রেসি’ এবং স্বাগত দত্ত বর্মণ সম্পাদিত ‘দুষ্প্রাপ্য কমিক্স সমগ্র’-র দ্বিতীয় খণ্ড। তাতে শৈল চক্রবর্তী, অহিভূষণ মালিক, ধীরেন বল, নারায়ণ দেবনাথ, সুফি প্রমুখ তাবড় তাবড় শিল্পীদের দুর্লভ কাজ দু’ মলাটে ধরা রয়েছে। আটের দশকে আনন্দমেলার অতি পরিচিত খেলোয়াড় রোভার্সের রয়, বহুদিন পর তিনি ফিরেছেন কলকাতায়। বইমেলার মাঠে তার দেখা মিলেছে কল্পবিশ্বের স্টলে।

আটের দশকের কৈশোর-স্মৃতি উসকে দিয়ে এ ফেরা রীতিমতো চিত্তাকর্ষক। অন্তরীপ কমিক্স নিয়ে এসেছে ‘মৃত্যুভূমি’ (মহাপ্রলয়), অন্যদিকে “লুবলু’র পৃথিবী” খ্যাত চার্বাক দীপ্ত-র হাত ধরে প্রকাশ পেয়েছে সুকুমার রায়ের ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ ও উইল আইসনারের ‘আ কন্ট্রাক্ট উইথ গড’। প্রকাশক বুক ফার্ম। এবারত প্রকাশনী ছেপেছেন ‘এনসেলাডাস’ ও ‘রোমাঞ্চ চতুষ্টয়’। ‘মায়াকানন’ বাজারে এনেছেন অরিজিৎ দত্ত চৌধুরীর ভৌতিক কমিক্সের নতুন সংকলন ‘আরও তিন’। আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি বাংলা কমিক্সের কাজও যে পৌঁছে যেতে পারে, তা প্রমাণ করেছেন শিল্পী সুমন্ত গুহ। তাঁর আঁকা ‘অন্ধকারের বন্ধু’ ২০২৫-এর পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলাতেই পাঠকদের মন জয় করে নিয়েছিল, মেলার মাঠে তাই-ই হাজির বই হয়ে। প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স।

‘কালি কলম ও ইজেল’-এর তরফ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ট্রিগার’ নামের একটি গ্রাফিক নভেল। সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘বনি’ পেয়েছে গ্রাফিক নভেলের চেহারা। এ ছাড়াও খুঁজলে মিলবে আরও নানান সব ছবিতে গল্পের আয়োজন। সব মিলিয়ে বলাই যায় ২০২৬-এর বইমেলায় ছবির মেলা। ‘লিমেরিক লাভার্স’-এর স্টলের দেওয়ালে গ্রাফিতি ও জয়ঢাক প্রকাশনের অন্দরসজ্জায় কমিক্সের ব্যবহার নজর কাড়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে যেমন চমক পাহারায় হাজির ভোঁদড় বাহাদুর।

আর্ট অলিন্দ প্রকাশনী হিসেবে নবীন, কিন্তু অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতায় অনন্য। উত্তমকুমারের পাশাপাশি ‘মিস্ ইন্দুবালা’-কে নিয়ে প্রকাশিত ‘My Prayers’ বইখানিও ছবি ও তথ্যে ভরপুর এক মহাফেজখানা। চমকে দিয়েছেন একলব্য প্রকাশন। ‘খোদাইচিত্রকোষ’ নামক আকর বইখানি পরিবর্ধিত সংস্করণে এঁরা ফিরিয়ে এনেছেন। বইয়ের ছবি, দেশের ছবি, দশের ছবি, গেটের ছবি, স্টলের ছবি– ছবিময় মেলা। যদিও শুক্রবার সন্ধ্যায় সেন্ট্রাল পার্ক মেলা প্রাঙ্গণে ‘হপ্তার হালুম’ বা হট টপিক ছিল দু’টি:
১. নেতাজী কি সত্যিই ফিরেছিলেন?
২. উত্তমকুমার কি বইমেলায় এসেছিলেন?
প্রথম প্রশ্নটি বিতর্কিত হলেও, দ্বিতীয়টির উত্তর নিশ্চিতভাবেই দেওয়া যায়। হ্যাঁ, উত্তমকুমার মেলায় এসেছিলেন বইকি! ১৯৮০ সালের কলকাতা বইমেলার মাঠে শুটিং অবধি করে গিয়েছেন। সাক্ষী আবারও সেই ছবি! অধ্যাপক গগন সেন (উত্তমকুমার) তাঁর সহযোগী অবলকান্ত দত্ত-র (সন্তোষ দত্ত) সঙ্গে বইমেলায় এসেছিলেন কয়েকটি জরুরি বই কিনতে।

‘ওগো বধূ সুন্দরী’ (১৯৮১) ছবির সেই দৃশ্য বাঙালি দর্শকদের স্মৃতিতে আজও সজীব। কী আশ্চর্য, তথ্য বলছে ছবিটিও রিলিজ করেছিল এমনই এক ফেব্রুয়ারি মাসে! ভাবলে অবাক লাগে– এক শতবর্ষী (সন্তোষ দত্ত) আরেক শতবর্ষ ছুঁইছুঁই সতীর্থকে (উত্তমকুমার) নিয়ে যদি সত্যিই ভরসন্ধ্যায় সেন্ট্রাল পার্ক মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বেরতেন দ্রুতপায়ে, কেমন হত তবে? এ-ও তো এক ছবিতে গল্প, গ্রাফিক নভেল! এমনতর আইকন বাঙালির সত্যিই কম পড়িতেছে বর্তমানে। তাই বারংবার মনে মনে এত জিজ্ঞাসা– ‘অমুক ফিরেছিলেন? তমুক কি এসেছিলেন?’ চিত্রবিচিত্র ভাবনায় ভেসে যাওয়ার আগেই স্থিতিজাড্য পেড়ে ফেলে বাঙালিকে, ‘এহ্হে, ভালো ভালো বইগুলো সব হাতছাড়া হয়ে গেল রে! চ শিগগির!’
জান কবুল, মান কবুল। বইমেলা হাউসফুল।
………………………………….
আপনারা বইমেলার কড়চা নিয়মিত পড়ছেন তো? তা, কেমন লাগছে? আপনাদের মতামতের আমরা প্রত্যাশী। আমাদেরকে মেলও করতে পারেন যে কোনও দিন, যখন খুশি– ভালোবাসায়, জিজ্ঞাসায়, বন্ধুত্বে, শত্রুতায়, আবদারে– [email protected]– এই মেল আইডিতে।
………. পড়ুন বইমেলার কড়চা-র অন্যান্য পর্ব ……….
৮. বইমেলার লিটল ম্যাগ টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী
৫. দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভিড়ে পাঠকও কি দুষ্প্রাপ্য?
৪. ছাব্বিশের বইমেলা বাণীপ্রধান!
৩. বই পোড়ানোর চেয়ে গুরুতর অপরাধ বই না পড়া
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved