Robbar

অ্যাঞ্জেল চাকমার হত্যা আসলে বৈচিত্রময় ভারতেরই রক্তক্ষরণ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 6, 2026 5:09 pm
  • Updated:January 6, 2026 5:09 pm  

ইতিহাসে দশ নম্বরের প্রশ্ন আসত: বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য কাকে বলে লেখো। খুব উদাসীনভাবেই, কোনও রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতাম তার উত্তর, ভালো নম্বরের আশায়। কখনও মনে হয়নি এই বিষয়টিতে আঘাত লাগলে প্রান্তে থাকা মানুষজন খুব সহজে আক্রান্ত হতে পারে অ্যাঞ্জেল চাকমার মতো। ভাবতে পারিনি বৈচিত্র নিয়ে লেখা এই ১০ নম্বরের নগণ্য উত্তরের সঙ্গে আমারই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকের বাংলায় কথা বলার জন্য হত্যা জড়িয়ে যাবে, কিংবা আমারই পাশের রাজ্যের কলেজের ছেলেটি নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে করতে শেষ হয়ে যাবে ২৫ ডিসেম্বর।

সম্প্রীতি চক্রবর্তী

২৪ বছরের অ্যাঞ্জেল চাকমা, ত্রিপুরার অধিবাসী, দেরাদুনের একটি কলেজে পড়তে এসেছিল তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে । গত ৯ ডিসেম্বর কিছু মত্ত যুবক তাকে হত্যা করে ছুরি, রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে। ‘যুবক’ বললে ভুল হবে, কারণ আততায়ীর দলে ছিল দুই স্কুল পড়ুয়াও। প্রায় ১৭ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর মৃত বলে ঘোষণা করা হয় অ্যাঞ্জেলকে; বাবা তরুণ চাকমার বক্তব্য তার ছেলে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বলে গিয়েছে– সেও ভারতীয়, চাইনিজ নয়। তরুণ চাকমা পেশায় বিএসএফ জওয়ান (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স), অর্থাৎ যে দেশ আমরা কল্পনা করি ম্যাপ, সীমান্ত আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, সেই ভারতের এক প্রহরীর পুত্রকে মরে যাওয়ার আগে অবধি বলে যেতে হয়েছে সে ‘ভারতীয়’। তার মুখের পেশি, চোখ বা ঠোঁট পড়শি দেশের মানুষের সঙ্গে খানিকটা মিলে যেতে পারে (যাকে আমরা ‘রেসিয়াল’ সাদৃশ্য বলি) কিন্তু তার পরিচয়, ভাষা বা আইডেন্টিটি ইন্ডিয়ান; এমন জবাবদিহি অনিবার্য হয়ে পড়েছিল ২৪ বছরের চাকমার জন্য, মারমুখী যুবাদের সামনেও সে এই কথাই পুনরাবৃত্তি করেছে। এখন প্রশ্ন হল, ভারতীয়ত্বের প্রমাণের জন্য গত কয়েক মাস ধরে সারা দেশে হুলুস্থুল কাণ্ড চলছে, কিন্তু এই চারটে শব্দ: ‘আমি ভারতীয়, চিনা নই’, সীমান্তবর্তী এলাকার এক মৃতপ্রায় যুককের মুখ থেকে শুনে কী ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির আঁচ আমরা পাই?

অ্যাঞ্জেল চাকমা

এই প্রশ্নের উত্তরের আগে এটি স্পষ্ট হওয়া দরকার যে চাকমা হত্যা একেবারেই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট এডভোকেট অনুপ প্রকাশ অবস্তি একটি পিটিশনে লেখেন (চাকমার মর্মান্তিক ঘটনার পরে) যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় রেশিয়াল হেট্রেড বা বর্ণবিদ্বেষবাদকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রেস বা বর্ণবিদ্বেষ প্রসঙ্গ আসলেই আমরা ভাবি– কালো আর সাদা মানুষের লড়াই‌, আমেরিকা বা ইউরোপে যা প্রভূত পরিমাণে দেখা যায়, ভারতে এর কোনও অস্তিত্ব নেই। আইনজীবী অনুপ কিন্ত দেখাচ্ছেন যে, ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বিভিন্ন জনজাতি, দীর্ঘদিন ধরে বর্ণবিদ্বেষের শিকার; তারা পড়াশোনা করতে বা পেশার কারণে যখনই নিজেদের এলাকা ছেড়ে কোনও বড় শহরে আসে, তাদের ওপর আক্রমণ, ভার্বাল ভায়োলেন্স, কটূক্তি (slur) একেবারে নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা (ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের আশেপাশে গোর্খা, মণিপুরী বা নাগাদের ‘চিঙ্কি’, ‘চাইনিজ’ বলা অভ্যেসে পরিণত হয়েছে)। এগুলি প্রতিরোধে আলাদা কোনও আইন নেই, সাধারণ আর পাঁচটা ক্রাইমের সঙ্গে এদের একই সরলরেখায় রাখা মানে এই দেশে বর্ণবিদ্বেষেবাদের উপস্থিতিকে একরকম অস্বীকার করে যাওয়া। অনুপবাবু দেখিয়েছেন যে, ২০১৪ সালে অরুণাচল প্রদেশের নিদো তানিয়ামের হত্যা (দিল্লিতে) আজকের চাকমা হত্যার পূর্বসূরি। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এসে হিংসার শিকার, কখনও সরাসরি শারীরিক নিগ্রহ, উত্তর-পূর্বের জনজাতিকে নির্দিষ্ট উপায় গালমন্দ করা আর ভিক্টিমের নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার এক আপ্রাণ চেষ্টা দেখা গিয়েছে।

এই সুনির্দিষ্ট অপরাধের ধরনগুলি দেখে প্রশ্ন জাগে যে, সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় হতে গেলে ঠিক কী কী করতে হয়? সাংবিধানিক বা আইনি সংজ্ঞার কথা হচ্ছে না, বরং জানতে ইচ্ছে করে পপুলার ইম্যাজিনেশন বা সাধারণ জনচেতনায় ভারত বলতে ঠিক কোন জনজাতির কথা আমাদের মনে আসে? এই দেশের প্রতিভূ কারা? বেনেডিক্ট এন্ডারসন (যাকে রাষ্টবিদ্যার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম ধরা হয়) বলছেন দেশ আসলে প্রকল্পিত এক সম্প্রদায়, যাকে আমরা কল্পনা করে নিই মনে মনে, তারপর তার হাজারো সিম্বল খুঁজতে থাকি, নির্মাণ করতে থাকি আমাদের আশপাশে (ফ্ল্যাগ, জাতীয় সংগীত, এম্বলেম্ব ইত্যাদি)। একটি ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল মানুষ কোনওদিনই একে অপরকে দেখতে পাবে না, কয়েকশো কোটির ভারতে তা হওয়া সম্ভবও না। কিন্তু এন্ডারসন বলছেন, এই এত মানুষ, তাদের মধ্যে হাজারো প্রভেদ থাকা সত্ত্বেও যেন পরস্পরের প্রতি এক সৌভ্রাতৃত্ব বোধ করে; এই যোগসূত্র হল ‘a deep horizontal comradeship’। কিন্তু তাঁর এই ক্লাসিক তত্ত্ব ইউরোপীয় দেশগুলির উত্থানকে যথাযথ বর্ণনা করলেও, উত্তর-পূর্ব এশিয়া বা বলা ভালো ‘ডিকলোনাইজড নেশন’-এর পক্ষে যুক্তিযুক্ত নয়। এই প্রসঙ্গ প্রায় ১০ বছর আগে পার্থ চ্যাটার্জির ধ্রুপদী বই ‘নেশনস অ্যান্ড ইটস ফ্রাগমেনস্ট’-এ পাওয়া যায়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই কল্পনার দেশ বা ইমাজিন্ড কমিউনিটিস, আসলে কার কল্পনা? কার ইমাজিনেশন? এমন প্রশ্নই কিছুক্ষণ আগে করলাম যে ভারতের প্রতিভূ কাদের ভাবা হয়? ‘ভারত’ নামটা শুনলেই বিদেশের মাটিতে কোন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা জনজাতির মানুষকে মুখ্য করে দেখানো হয়? তাদের কল্পনার দেশই কি ভারত? এখানে দেশের কল্পনায় বারেবারেই একটি সেল্ফ (আত্মপরিচিতি) এবং আদার (অপর)-এর বিষয় আসছে। আমি কে? আমার দেশের মানুষ আমার মতোই খাদ্যাভাস, ধর্মপালন বা ভাষার অনুসারী হবে নচেৎ সে আমার দেশের অংশ নয়, সুতরাং এই অপর বা আদারকে বাদ রাখাই নেশনের কল্পনার ভিত্তি। সেলফ অ্যান্ড আদারকে ভাগ করেই দেশ নির্মিত হচ্ছে আমাদের কল্পনায় (হোমি ভাবা এবং ফ্র্যান্টজ ফেননের বিখ্যাত থিওরি)। একটি এক্সক্লুসিভ জাতীয়তাবাদের ধারণা, যার উগ্র রূপ হল ‘সংখ্যাগুরু রাজনীতি’ বা ‘মেজারিটেরিয়ান পলিটিক্স’। এখানে আমিকে প্রাধান্য দেওয়া আর অপরকে কোণঠাসা করাই লক্ষ্য। সংখ্যালঘুকে ব্যঙ্গ করা, তাকে ব্রাত্য রাখা থেকে শুরু করে ক্রমশ হিংসার পথে পা বাড়ানো, যেখানে গালাগালি, কটূক্তি বা শারীরিক প্রহার ন্যায্যতা পায়। মজার বিষয় হল ভারত কিন্তু কখনওই এই এক্সক্লুসিভিটির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি।

এই দেশে বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে সংখ্যাগুরু রাজনীতির উত্থান, আরও সহজ করে বললে: ভারতকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান বলার প্রবণতা যত বাড়বে ততই মাইনরিটির ধর্ম, ভাষা, খাদ্যাভাস আর জনজাতির ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি পাবে। এই হিসেব অত্যন্ত সহজ, ‘সমানুপাতিক সম্পর্ক’ যাকে বলে। একটা কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করে নির্দিষ্ট করে দেওয়া কোনটা কেন্দ্র আর কোনটা প্রান্ত; আর প্রান্তের মানুষের ভাষা, খাওয়াদাওয়া, পোশাক বা রেশিয়াল ফিচার সবটাই মশকরার যোগ্য, সেগুলো ভারতীয় সংস্কৃতি নয় বলে মন্তব্য, বিগত কয়েক বছরে আরও স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। এই ধরনের ভারতীয় সংস্কৃতির নিদান দেওয়ার লোকেরাই কি আজ চাকমা হত্যার জন্য কিছুটা হলেও দায়ী নয়? এখনও বিভিন্ন পাঁচতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তর-পূর্ব থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পছন্দ করে, সেখানে খোপে খোপে বন্ধুত্ব হয়। নিজের কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতা বলে কেউ যেন এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখে, ব্যঙ্গ বা টিটকিরি হয়ে যায় অতি পরিচিত ঘটনা। ব্রাত্য করে রাখার এই মনোবৃত্তি যখন একধাপ এগিয়ে হিংসার পথ বেছে নেয় তখনই অরুণাচলের নিদো বা ত্রিপুরার চাকমার মতো মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসে। প্রশ্ন থেকে যায় যে, ভারতীয়ত্বের বয়ান কতটা সরলরৈখিক আর একতরফা হলে এমন ঘৃণ্য অপরাধ বারবার এই দেশে হতে পারে।

আলটপকা কথায় যারা ভারতীয় সংস্কৃতি বা ভারতের মানুষের ভাষা, আচার নিয়ে নিদান দেয়, তারা অবশ্যই ইতিহাসবিস্মৃত। ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার বা তাকে নতুনভাবে বিকৃত করার চেষ্টা চলছে বেশ অনেক দিন ধরেই। এই নতুন কিম্ভুতকিমাকার গালগল্পে বলা হয় যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানেই হিন্দি, হিন্দু, নিরামিষ ভক্ষণ বা গেরুয়া পোশাক। এখানে বৈচিত্র বা ডাইভারসিটির কোনও গুরুত্ব নেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে বহুত্ববাদকে তুলে ধরার জন্য জন-গণ-মন সংগীতে প্রত্যেক জনজাতি বা ভূখণ্ডের উল্লেখ আছে, তার সঙ্গে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান কতটা জুতসই? খুব ছোটবেলা থেকে গানটি গাওয়ার সময় (নার্সারিতে পড়াকালীন শব্দগুলি বোঝার ক্ষমতাও থাকে না), তার মর্মার্থ না বুঝেও, যে দর্শন আমাদের মনে গেঁথে যেত, সেই সমন্বয়ের বাণী আজ একটু শিশুকে শেখানো হয়? যদি হয় তাহলে অ্যাঞ্জেল চাকমাকে খুন করেছে যে ১০ আর ১২ ক্লাসের ছাত্র, কী ধরনের মনোভাবে তারা লালিত? আজ একটি সংখ্যালঘু মানুষকে (সে মুসলিম হোক, বাংলা ভাষায় কথা বলা পরিযায়ী শ্রমিক বা চাকমার মতো এথনিক মাইনরিটি) প্রহার বা ব্যঙ্গ করা সমাজমাধ্যমে যখন হাজারো লাইক পায়, ছোট ছেলেরা যখন সেই গণপ্রহার প্রকাশ্যে ভিডিও করে হাসতে হাসতে ফেসবুকে আপলোড করে, তখন বুঝে নেওয়া দরকার তাদের মননে ভারত বলতে এক ভাষা-এক ধর্মের বিকৃত ইতিহাসের বীজ বপন করা হচ্ছে।

অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার প্রতিবাদে ত্রিপুরার ছাত্রদের জমায়েত

১৯৪৭-এর পর যে বহুত্ববাদ ভারতকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল, নেহেরুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কল্যাণে, সেই ধারার আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। নেহরু তাঁর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়াতে’ লিখছেন যে ভারতীয় সভ্যতার এক অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘palimpsest’, অর্থাৎ একটা পুঁথি যেমন বারে বারে লেখা হয়, বিবিধ পণ্ডিত দ্বারা, তেমন ভারতের ইতিহাসও আর্য, দ্রাবিড়, গ্রিক, হুন, ইসলাম দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে, একে নেহরু ‘সিনথেসিস’ বলছেন। এই আসা-যাওয়া, একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে সহাবস্থান যেন কখনও অতিরিক্ত হিংসার হতে পারে না, সেই আদর্শেই ভারতে স্বাধীনোত্তর যুগে সংসদীয় গণতন্ত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। আমাদের দেশ ইতালি, ফ্রান্স বা চায়নার মতো ইউনিটারি গভর্মেন্ট পরিচালিত দেশ নয়। এখানে কেন্দ্র আর প্রান্তের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করার জন্যই ফেডারেল কাঠামো উপস্থিত, যাতে দেশকে কল্পনা করার সময় কোনও একটি ভাষা, ধর্ম বা জনজাতি অতিরিক্ত গুরুত্ব না পায়।

দুর্ভাগ্যবশত, এই সম্পূর্ণ ডাইভারসিটি বিষয়টি আজ এক প্রহসনের মতো শোনায়। ইতিহাসে দশ নম্বরের প্রশ্ন আসত: বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য কাকে বলে লেখো। খুব উদাসীনভাবেই, কোনও রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতাম তার উত্তর, ভালো নম্বরের আশায়। কখনও মনে হয়নি এই বিষয়টিতে আঘাত লাগলে প্রান্তে থাকা মানুষজন খুব সহজে আক্রান্ত হতে পারে অ্যাঞ্জেল চাকমার মতো। ভাবতে পারিনি বৈচিত্র নিয়ে লেখা এই ১০ নম্বরের নগণ্য উত্তরের সঙ্গে আমারই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকের বাংলায় কথা বলার জন্য হত্যা জড়িয়ে যাবে, কিংবা আমারই পাশের রাজ্যের কলেজের ছেলেটি নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে করতে শেষ হয়ে যাবে ২৫ ডিসেম্বর। শেষে আবারও স্পষ্ট করা দরকার যে, যতখানি উত্তর-ভারতীয় আদর্শে নিরামিষ ভক্ষণ, রামকেন্দ্রিক হিন্দুত্বের জিগির আর হিন্দিভাষাকে ভারতীয় বলে দেগে দেওয়া ন্যায্যতা পাবে, ততই বাকি জনগোষ্ঠীদের (জাতির ক্ষেত্রে দলিত, আদিবাসী, ধর্মের নিরিখে মুসলিম/খ্রিস্টান, ভাষার নিরিখে বাংলা, তামিল, তেলেগু এবং রেস/জনজাতির ক্ষেত্রে লেপচা, ভুটিয়া, চাকমা) অধিকার খর্ব হবে, ভারতীয় না হওয়ার তকমা জুটবে; আর কখনও কখনও এই ঘৃণা চরমে পৌঁছে গণপিটুনি, অত্যাচার বা হত্যার রূপ নেবে। অ্যাঞ্জেল চাকমা দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার সময় পুলিশের পক্ষ থেকে এটিকে প্রথমে জাতিগত বিদ্বেষ বলে মেনে নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ এই হিংসার নেপথ্য কোনও রেসিস্ট কটূক্তি বা মনোভাব থাকতে পারে সেটা সরকারের প্রতিনিধি  মেনে নিতে আপত্তি করেছিল। এরপর অ্যাঞ্জেলের বাবা তরুণ চাকমা, রেশিয়াল এবিউজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিষয়টি ক্রমশ গুরুত্ব পায়। এই আপত্তি প্রমাণ করে, যে সরকার বর্তমান ভারতে অধিষ্ঠিত, তারা চায় প্রত্যেকটি সংখ্যালঘু হত্যাকে তাৎক্ষণিক বা ‘র‌্যান্ডম অপরাধ’ বলে খাটো করতে। এতে রেস, ধর্ম বা মাইনরিটি নিধনকে অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট বা নথি থেকে সুকৌশলে বাদ রাখা যায়। তবু আজ সারা ভারতে চাকমার মৃত্যুতে প্রতিবাদ হচ্ছে, প্রতিবাদকারীরা জানে যে, এই হত্যার সুরাহা চাইতে হলে একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, যেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতীয়রা আগামিদিনে সমস্ত রকম বর্ণবিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে পারে। আশা করি, রেশিয়াল হত্যার মতোই ধর্মের জিগিরে হত্যা বা বাংলায় কথা বলার জন্য হত্যার বিরুদ্ধেও সমানভাবে বিরুদ্ধতার স্বর উঠবে। আশা রাখি এর নেপথ্যে থাকা বিকৃত ইতিহাস বা ভারতকে এক ধর্ম, ভাষা, রেস, জাতিতে পরিণত করার জঘন্য কারসাজি শেষ করা যাবে আগামীতে।