

ধর্ষক তৈরি করার মূলে আঘাত হানতে না পারলে ধর্ষণ চলতেই থাকবে। বুঝতে হবে, ভারতে ধর্ষণ একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। যে অস্ত্র প্রয়োগ করে মহিলাদের খাঁচায় পোরার চেষ্টা করা হয়, মহিলাদের শাস্তি দেওয়া হয়। ধর্ষণকে তাই একটি অসামাজিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, দেখতে হবে পিতৃতন্ত্রের একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে।
আবার একটা ধর্ষণ। দেশটার যে কী হল! আর নেওয়া যাচ্ছে না। আচ্ছা কাল ধর্ষণটা কখন হয়েছে? ‘আজকালকার মেয়েগুলোও। যা বাড় বেড়েছে! ছোট্ট ছোট্ট পোশাক। কোনও কথা শোনে না। সিগারেট খায়।’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন পাশে বসা কাকু। ছোট ছোট পোশাক বা রাতে হওয়া ধর্ষণ– এর কোনও কিছু একটা হলেই তার পুরুষালি বিবেক তৎক্ষণাৎ জাস্টিফাই করে নিত সমস্ত ধর্ষণকে। আর ধর্ষিতাকে দোষ দিয়ে ‘সব চাঙ্গা সি’ বলে হাই তুলত। প্রতিটি ধর্ষণের (মানে, যে ধর্ষণের খবর জানা যায়) পর রাস্তাঘাটে, বাসে, ড্রয়িংরুমে এই হল চেনা সংলাপ। বক্তা নিজের পিতা থেকে স্বামী যে কেউ হতে পারে। নারীও হতে পারে। কারণ পিতৃতন্ত্রের ধারক, বাহক যে কেউ হতে পারে– নর আর নারী দু’জনেই।
ধর্ষণ পরবর্তী ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দিল্লির আস্থা কুঞ্জ পার্কে একটি ১৭ বছরের নাবালিকার গণধর্ষণের পর, যেমন এবার ধর্ষণ রুখতে দিল্লির বিখ্যাত লেডি শ্রীরাম কলেজে অফলাইন ক্লাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হল ও দিল্লির সমস্ত পার্কে সূর্যাস্তের পর প্রবেশের সময়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। আজব ব্যবস্থা। আরজিকর মেডিকাল কলেজে ধর্ষণের পর মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘মেয়েদের রাতে হস্টেল থেকে বেরনো ঠিক নয়’। আচ্ছা প্রতিটি ধর্ষণের পরে কেন সমস্ত এসওপি (SOP) আসে শুধুই মহিলাদের জন্য? সব পুরুষদের বেঁধে রাখার বিধান আসে না কেন?

আসলে ভারত নামক দেশটির মজ্জাগত পুরুষতন্ত্রের মস্তিষ্কে ঢুকে আছে কোথাও না কোথাও মহিলাদের ধর্ষণের জন্য মহিলারা নিজেরাই দায়ী। যে কোনও ধর্ষণ সেই পিতৃতন্ত্রকে দেয় মহিলাদের বাগে আনার এক সুযোগ। মহিলাদেরই খাঁচায় পোড়ার সমস্ত ব্যবস্থা করতে চায় পিতৃতন্ত্র– তাই এ হেন নিদান।
দিল্লির আস্থা কুঞ্জে ১৭ বছরের একটি মেয়েকে আসিফ, হেমন্ত ও তার ভাই মুকেশ গণধর্ষণ করে। আসিফ একজন পেঁয়াজ বিক্রেতা, হেমন্ত একজন উকিল ও মুকেশ একজন বিএসসি ছাত্র। দিল্লিতে ক্রমশ বাড়তে থাকা নাবালিকা ধর্ষণের এটা সাম্প্রতিকতম ঘটনা। সংবাদ সংস্থা দ্য হিন্দুর রিপোর্ট অনুসারে সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে একটি ১৬ বছরের নাবালিকাকে দিল্লির স্বরূপনগরে ধর্ষণের পর খুন করা হয়। সেপ্টেম্বরের ১৬ তারিখে একজন নাবালিকা দোকান থেকে স্টেশনারি কেনার পর ফেরার সময় যৌন হেনস্থার শিকার হন। সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখে কিষানগঞ্জে ৩৪ বছরের একজন পুরুষের হাতে যৌন হেনস্থার শিকার হয় একটি ছয় বছরের বাচ্চা। আরেকটি সংবাদ সংস্থা দ্য প্রিন্ট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসেই দিল্লিতে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার শিকার মহিলার সংখ্যা ১৩।
প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার পরে ধর্ষণ ঠেকানো নিয়ে কিছুদিন আলোচনা চলবে, তারপর চুপ থাকবে প্রশাসন থেকে জনগণ, তারপর আবার ধর্ষণ হবে। এই সমীকরণ চলতেই থাকবে এবং চলতেই থাকবে। তাই ধর্ষণের কথা লিখতে গেলেও এক ধরনের অসহায়তা গ্রাস করে। মনে হয় এক নিরেট, সিমেন্টের বোবা দেওয়ালে মাথা ঠুকছি আর উল্টোদিকে সংখ্যাটি বাড়তেই থাকছে। NCRB ডাটা অনুসারে বর্তমানে প্রতিদিন নথিভুক্ত ধর্ষণের সংখ্যা ৮০!
ভারতে ধর্ষণ-পরবর্তী ভিক্টিম ব্লেমিং, অর্থাৎ, যে ধর্ষিতা– তার উপরেই সব দোষ চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যেক ধর্ষণের পরের একটি রোজকার ঘটনা। দিল্লির আস্থা কুঞ্জের ধর্ষণের পর দিল্লির নেহরু পার্কে প্রবেশের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া ও কলেজে সাময়িক অনলাইন ক্লাস চালু করা এই ভিক্টিম ব্লিমিং-এরই একটি রূপ। এক্ষেত্রে ধর্ষণ বা যে কোনও যৌন হেনস্থা থেকে নিস্তার পেতে সমস্ত মহিলাদের ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে তাদের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করার স্বাধীনতা। বাড়ির পিতার মতন এক্ষেত্রে ভারত রাষ্ট্র যেন বলছে– খাঁচায় (এক্ষেত্রে বাড়ি) থাক, না হলে ধর্ষণের শিকার হতে পারিস। আর এই সতর্কবার্তা দিয়ে পিতৃতন্ত্র তার ধর্ষণকামী দাঁত-নখ লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। যেমনটা ধর্ষণের পরে বেরিয়ে পড়া হয় প্লাকার্ড নিয়ে যে, ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’, যেন ধর্ষককে ফাঁসি দিলেই ধর্ষণমুক্ত হবে দেশ। এভাবেই পিতৃতন্ত্র তার সমস্ত দায় ঝেড়ে আবার রোজ ধর্ষক তৈরি করে।

ধর্ষক তৈরি করার মূলে আঘাত হানতে না পারলে ধর্ষণ চলতেই থাকবে। বুঝতে হবে, ভারতে ধর্ষণ একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। যে অস্ত্র প্রয়োগ করে মহিলাদের খাঁচায় পোরার চেষ্টা করা হয়, মহিলাদের শাস্তি দেওয়া হয়। ধর্ষণকে তাই একটি অসামাজিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, দেখতে হবে পিতৃতন্ত্রের একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। ভারতীয় পুরুষরা ধর্ষণের ব্যাপারে শ্রেণি, ধর্ম, দল, মত নির্বিশষে সব কিছু অতিক্রম করে একই সারিতে দাঁড়িয়ে।
যেমন গত বছর হাজরা ধর্ষণকাণ্ডের পর তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, বর্তমানে ভালো তৃণমূল মদন মিত্র বলেছিলেন, ‘মেয়েটি ওখানে গিয়েছিল বলেই ধর্ষিতা হয়েছে, মেয়েটি না গেলে হত না।’ মদন মিত্রের তখনকার সহকর্মী একই দলের মহুয়া মৈত্র যখন অত্যন্ত কুরুচিকর এই মন্তব্যের সমালোচনা করেন, তার দিকে ধেয়ে আসেন মদন মিত্র ও আরেকজন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি। এই ব্যাপারে বর্তমান শাসকদলেও মণিমুক্তোর অভাব নেই। সদ্য বিহারের জামুইতে টিউশন থেকে ফেরার সময় একজন নাবালিকা যৌন হেনস্থার শিকার হলে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আসলে রিল না বানালে ক্রিমিনালরা ধরা পড়ত না। ভাবখানা এমন যেন সব দোষ ওই রিলের, রিল না বানিয়ে চুপচাপ ক্রাইম করলে সমস্যা নেই!
ধর্ষকদের পাশে দাঁড়ানো ও ধর্ষণকে জাস্টিফাই করার ক্ষেত্রে তাই শাসক ও বিরোধী কোনও রাজনৈতিক দলই ধোয়া তুলসীপাতা নয়। বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একই সারিতে দাঁড়িয়ে। বরং ধর্ষণের ব্যাপারে তারা বড়ই ধর্মনিরপেক্ষ। যোনি আর স্তন হলেই হল! দলিতদের হাতে খাওয়া অচ্ছুত হতে পারে, কিন্তু ধর্ষণে অনীহা নেই ভারতের মজ্জাগত ধর্ষণকামী পিতৃতন্ত্রের। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ১০ জন দলিত নারী ধর্ষিতা হন। আস্থা কুঞ্জের ঘটনা সেই দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধর্ষকরা ধর্মীয় দিক থেকে আলাদা হলেও তাদের গ্যাং রেপ করতে অসুবিধে হয়নি!

তাই শুধু পথবাতি বেশি করে লাগিয়ে, যত্রতত্র সিসিটিভি লাগিয়ে, পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যাবে না। পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র, কাস্টিজম, পুরুষতান্ত্রিক ভাষা, ধর্মের যে ককটেল ভারত রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড, সেই ককটেলকে আঘাত করতে না পারলে মহিলাদের নিস্তার নেই।
তাই আস্থা কুঞ্জের গণধর্ষণ কাণ্ডের পর লেডি শ্রীরাম কলেজ সাময়িক অফলাইন ক্লাস বন্ধ ও নেহেরু পার্কে মহিলাদের প্রবেশের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা হল মহিলাদের খাঁচায় পোরার চেষ্টা। ভারত রাষ্ট্রের পিতৃতন্ত্রের জেনে রাখা ভালো শীতল সাথের সেই ‘হাম আউরতে আজাদ হ্যায়’ কবিতার ভাবানুবাদ–
আমরা মহিলারা সমৃদ্ধির প্রতীক
হকের জন্য জান কবুল লড়াই আমাদের
আমরাই আওয়াজ
না আমরা কারও জমিদারির জাগির
না আমরা কারও সম্পত্তি
না আমরা কারও কৌশলের অস্ত্র
আমরা হলাম গল্প
আমরা হলাম এই ক্ষতবিক্ষত সময়ের আলো
আমরা হলাম লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি
আমরা হলাম আমাদের নিজেদের মালিক
মা, বোন, স্ত্রী হলাম পরে
আগে আমরা হলাম মানুষ
আমাদের আছে স্বপ্ন
আমরা মহিলারা হলাম আজাদ…
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved