
নানাদিক থেকেই এ এক ব্যতিক্রমী, অনন্য প্রদর্শনী। নবতিপর অধ্যাপক-শিল্পীর প্রাত্যহিক উপস্থিতি, প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অনায়াস কথোপকথন এক অনবদ্য প্রাপ্তি। দীর্ঘ জীবনের সাধনার ফসল এই প্রদর্শনীটি পথিকৃতের কাজ করেছে। ছাত্র-শিল্পীরা তো বটেই, প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও বিমোহিত এইসব কাজ দেখে। শিল্পী জানালেন, টেম্পেরা বা ওয়াশ-এ করা ছোট কাজগুলি করতে কখনও কখনও মাসাধিক কাল সময় লেগেছে। উভয়ার্থেই তাঁর জীবনদর্শনের ছবি এগুলি। আবার এগুলির মধ্যে ধরা আছে আধুনিক ভারতশিল্পের মর্মকথাটিও। কীভাবে বিভিন্ন শৈলীর আত্মস্থকরণ ঘটেছে– তার নজিরও রয়েছে এইসব শিল্পকর্মের পরতে পরতে।
‘পথে চলে যেতে যেতে কখন কে জানে তোমার পরশে লাগে’
অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর প্রথম তিনটি ঘরে সাজানো নরেন্দ্রচন্দ্র দে সরকারের প্রদর্শনীটি দেখে এ কথাটি মনে হল। ১ জানুয়ারি উদ্বোধন হয়েছে প্রদর্শনীটি। তার আগে অনেকেই হয়তো নরেন্দ্রবাবুর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। আদ্যন্ত বাঙালি, মিতভাষী। সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। আজ ৯৪ বছরেও তাঁর তুলি সমানভাবে সচল। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ– একটি চোখে প্রায় দেখতে পান না বললেই চলে। তবুও ছবি আঁকায় বিরতি নেই। তাঁর চিত্রকলার বৃহৎ সম্ভার, মূলত তাঁর কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্রের উৎসাহে ও উদ্যোগে তুলে ধরা হয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

দেখে ভালো লাগল, এই প্রদর্শনীর শেষদিনেও দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। তার মধ্যে বিভিন্ন আর্ট কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা যেমন আছেন, তেমনই আছেন বহু নামকরা শিল্পী। তাঁরা সকলেই মুগ্ধ নরেন্দ্রবাবুর শিল্পকর্মের বিন্যাসে।


কিন্তু কী তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য, যা আজও দর্শককে এত গভীরভাবে আকর্ষণ করছে? যে শব্দটি পোস্টারে ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ‘বেঙ্গল স্কুল’। এ ব্যাপারটি একটু বুঝে নিলে হয়তো তাঁর ছবির যথার্থ মূল্যায়ন করা যাবে। আজ থেকে শতাধিক বর্ষ আগে, অর্থাৎ গত শতকের প্রথম ভাগে যখন আধুনিক ভারতশিল্পের নব্য বয়ানের অনুসন্ধান চলছিল, এবং পাশাপাশি চলছিল ভারতশিল্পের মর্মানুসন্ধানের সাধনা; তখন অবনীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে একদল নবীন শিল্পী এই দুই সন্ধানকে মিলিয়ে সৃষ্টি করলেন এক শৈলী– যা পরবর্তীকালে পরিচিত হল নব্যবঙ্গীয় শিল্পশৈলী নামে। এই শৈলীতে মিলে গেল অজন্তা রাজস্থানি ও পাহাড়ি মিনিয়েচার এবং খানিকটা জাপানি ওয়াশ পেইন্টিং-এর শৈলী। সরকারি আর্ট স্কুলে ই বি হ্যাভেলের বদান্যতায় ভারতশিল্পের নতুন দিকদর্শন বিস্তার লাভ করল। ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বসুমতী’ ইত্যাদি পত্রিকার পাতায় পাতায় এই নব্য শৈলীর চিত্রকলা দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল ‘ছবি’ কাকে বলে। নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার এই ঘরানার অন্যতম বরিষ্ঠ শিল্পী। তাঁর শিল্পকর্মের প্রধান ভিত্তি হল তার সুকৌশলী ড্রয়িং। এই শৈলীতে আঁকা ছবিগুলি মূলত বিবরণধর্মী। বিষয়ের দিক থেকে সেগুলিকে পৌরাণিক, গ্রাম এবং শহুরে জীবনযাত্রার ছবিতে ভাগ করা যায়।



প্রধানত রামায়ণ ও মহাভারতের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছাড়াও গণেশ, কার্তিক, দুর্গা, সরস্বতীর ছবিও এঁকেছেন তিনি। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার ছবিটির মধ্যে লালিত্য ও তেজস্বিতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ‘সরস্বতী’ ছবিটিও মনোমুগ্ধকর। কিন্তু সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বোধহয় নৃত্যরত কার্তিকের ছবিটি। কার্তিকের ছবি বড় একটা দেখা যায় না, কিন্তু নরেন্দ্রবাবুর কল্পনায় নৃত্যরত শিশু কার্তিক যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ছবিগুলির কম্পোজিশন লক্ষ করার মতো।


বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে গীতবাদ্যে ভুলিয়ে অযোধ্যায় নিয়ে আসার ছবিটি। মনে রাখতে হবে, ঋষ্যশৃঙ্গের দেহটি মানুষের হলেও মাথাটি হরিণের, যুবতীরা নানারকম বাদ্যযন্ত্রে তাঁর মন ভোলানোর চেষ্টা করছেন। আশ্চর্য এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে ঋষ্যশৃঙ্গের মুখে। একটি পশুর মুখে এ ধরনের অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটানো বড় সহজ কথা নয়। যদিও যুবতীরা সারিবদ্ধভাবে বসে রয়েছে, তবুও প্রতিটি যুবতীর অভিব্যক্তি আলাদা। খুব হালকা রঙের পোশাক তাদের পরনে, অথচ অলংকারের ঔজ্জ্বল্য বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা রাজপুরনারী। ছবিটির কেন্দ্রস্থলে নৌকাবিহারী এই ফিগারগুলি ছাড়া ছবির বাকি অংশ প্রায় নীলাভ অনুজ্জ্বল রঙে করা।


আরেকটি ছবির কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। অর্জুন যুদ্ধ করতে চাইছেন না। গাণ্ডীব ত্যাগ করে বসে রয়েছেন হতচেতনের মতো এবং শ্রীকৃষ্ণ তাকে উদ্বোধিত করার চেষ্টা করছেন। যদিও অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণ দু’জনের দেহাবয়বেই গাঢ় নীল রং ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও অর্জুনের অপারগতা এবং কৃষ্ণের উত্তেজিত ভাবভঙ্গি দু’টি চরিত্রের পার্থক্য সহজেই প্রকাশ করে। ছবিটির তলায় খানিকটা মিনিয়েচারের ঢঙে গীতার শ্লোকদু’টি নিখুঁত অক্ষরে লেখা।

এই পর্যায়ের আরও একটি ছবির উল্লেখ করতে হয়। বিরহিণী রাধা দাঁড়িয়ে রয়েছেন দরজা ধরে। আকাশে কালো মেঘ, সেখানে বলাকারা উড়ে চলেছে। কালো মেঘ তাঁকে মনে করাচ্ছে কৃষ্ণের কথা। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিরাহিনীর ব্যাকুলতা। সামনে একটি ময়ূর। কিন্তু তাকে পুরোটা দেখা যাচ্ছে না, যেন সেটি বিরহিণীর সুখস্বপ্ন। রাধা-বিরহের অসংখ্য ছবি পাহাড়ি অনুচিত্রে দেখা যায়; কিন্তু এই চিত্রটিতে রাধাকে দেখানো হয়েছে সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে। উল্লেখযোগ্য যে, ছবিটির নাম ‘বলাকা’। ছবির গভীরতা বোঝাতে ধ্রুপদী ভারতীয় শিল্পশৈলী অনুসারে দরজাটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ ছবিতে রেখার বিন্যাস চমৎকারভাবে রঙের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সীমিত হালকা রঙের ছোঁয়ায় ছবিগুলির মধ্যে অদ্ভুত ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছেন; যা মুহূর্তের অনুভূতিকে আমাদের সামনে জীবন্ত করে দেয়। তাই বারবার দেখতে ইচ্ছে করে এইসব ছবি। কারণ সময়ের গতি সেখানে রুদ্ধ হয়নি বরং তা চলমান। সূক্ষ্ম তুলিরেখায় আঁকা বহিরেখাও যেন ছবির অভ্যন্তরীণ অর্থকে স্পষ্ট করে তোলে।

এখানেই নরেন্দ্রবাবু ব্যতিক্রমী। নব্যবঙ্গীয় চিত্রসম্ভারে পৌরাণিক ছবি কিছু কম নেই। কিন্তু সেই ঘরানার প্রতি বিশ্বস্ততার অভাব না থাকলেও তাঁর ছবিগুলি আপন ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর। অনেক ছবিতেই অজন্তা শৈলীর প্রভাব সুস্পষ্ট– দীর্ঘ আঙুল, লীলায়িত দেহভঙ্গি; বিশেষত নারী চরিত্রের ক্ষেত্রে কুসুমকোমল অঙ্গবিন্যাস। কিন্তু এক আন্তরিক দর্শনে শিল্পী তাদের জীবন্ত করে তুলেছেন। এমনকী দেবদেবীর ছবিও নিছক ভক্ত-শিল্পীর অর্ঘ্য নয়; সেখানেও দেবদেবীর আপন বৈশিষ্ট্যটি বড় করে তুলে ধরা হয়েছে। সরস্বতীর দু’টি ছবি যেমন ভিন্নধর্মী। লক্ষ্মীর ছবিটিতে আবার পটশৈলীর অভিঘাত সুস্পষ্ট। বিশেষত হাতের গড়নে ও বসার ভঙ্গিতে।


এইসব ছবির সঙ্গে রয়েছে যিশুখ্রিস্টের একটি ছবি। প্রচলিত ছবির মুখাকৃতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই ছবিটিতে যিশু যেন এক ভারতীয় সন্তপুরুষ। তাঁর চারপাশে ঘিরে রয়েছে মেষদল। তাঁর মুখের অভিব্যক্তিতে এক অতীন্দ্রিয় ব্যঞ্জনা।

এখানে একটি ঐতিহাসিক ছবির কথাও উল্লেখ করা উচিত। ছবিটি হর্ষবর্ধনের যুদ্ধযাত্রার। কত গভীর ভাবনা ও বিশ্লেষণ কাজ করেছে এই একটি ছবির জন্য– তার লিখিত সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাঁরই লেখা কিছু টুকরো ভাবনায়, যা প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত বইটিতে সংকলিত হয়েছে। ছবিটিতে সেই বিস্মৃত অতীত ধরা দিয়েছে তার সামগ্রিক বর্ণাঢ্যতায়। অনুপুঙ্খ দৃশ্যায়নে ধরা দিয়েছে সেসময়কার বেশবাস, রাজ দরবারের খুঁটিনাটি।


গভীরে ডুব দেবার আশ্চর্য ক্ষমতা এই আত্মমগ্ন শিল্পীর। প্রাত্যহিক গ্রাম্য জীবনের দৃশ্যাবলি, যা এই প্রদর্শনীর এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সেগুলির মধ্যেও ধরা পড়ে এই গভীর অনুধাবন। দৃশ্যগুলি সাধারণ– মা ও শিশু, প্রতিদিনের জীবনযাত্রার পরিচিত চলচ্চিত্র। শিশুদের খেলার চিত্র; সুপুরিগাছের ছালের গাড়িতে বসা বালক– টেনে নিয়ে চলেছে তারই বন্ধুরা; কোথাও-বা গেরস্থের উঠোনে চলছে বহুরূপীর নাচ, চারিদিকে উৎসুক মহিলাদের ভিড়; কোনও বাড়ির আঙিনায় চলছে ব্রতের প্রস্তুতি, ছোট মেয়েটি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে; কোথাও-বা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শিশু কোলে জননী, পাশে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আঁচল ধরে– খানিকটা উৎকণ্ঠিত কি? কিন্তু এইসব চরিত্ররা নায়িকা নয়, নিতান্তই বাঙালি গৃহবধূ। কোনও ছবিতে দেখা যায় মা ও শিশু চলেছে, একটু দূরে বৃদ্ধা ঠাকুমা। কোথাও-বা মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে নাতিকে জড়িয়ে ধরে জীবনের ওম ভাগ করে নিচ্ছেন বৃদ্ধা। কোথাও উদ্গ্রীব কিশোর মাছ ধরবার জন্যে ছিপ ফেলেছে জলে, তার চোখ ফাতনার দিকে, কিন্তু সমস্ত শরীরী বিভঙ্গে ফুটে উঠেছে উত্তেজনা। এরকম অসংখ্য মুহূর্তের অনুভূতির দর্পণ তাঁর ছবিগুলি। সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ নির্মাণ করেছে তাদের। চালের উপর বসা কাক, দাওয়ার উপর আয়েসী বিড়াল, ছিটকে যাওয়া খেলনা– ছোট ছোট সম্পূর্ণতা দিয়েছে ছবিটিকে। চালের পাশ দিয়ে ওঠা কলাগাছ কিংবা বড় গাছের উপরিভাগ– এসব অনেক ক্ষেত্রেই পাহাড়ি মিনিয়েচারের সাদৃশ্যে আঁকা। কোনও কোনও ছবিতে গাছের সাহায্যে ছবিতে নৈকট্য-দূরত্ব-গভীরতা বোঝানো হয়েছে। ধ্রুপদি ভারতীয় ছবির রেখাভিত্তিক দ্বিমাত্রিকতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার। প্রতিটি ছবির রেখাই চলমান, গতিশীল, অথচ শান্ত, সংহত। তাই এত সহজেই তারা ফুটিয়ে তোলে গ্রামের সরল মানুষগুলির জীবনালেখ্য। রঙের ব্যবহারও সুপরিকল্পিত, মার্জিত। ফলে কোনও ছবির বিন্যাসে ভারসাম্যের অভাব ঘটে না।



তবু কেন জানি মনে হল, এ ছবিগুলি তাঁর প্রতিভার সমন্বয়ী স্বাক্ষর নয় বোধহয়। তা উপস্থিত শহুরে মানুষগুলির চিত্রায়নে। শহরের সেইসব উদ্বৃত্ত মানুষেরা– যারা শানের ফুটপাথে তাপ্পি-মারা প্যান্ট পরে পা তুলে কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে; অথবা সেই ছাতাওয়ালা, যে শহুরে অলিগলিতে ছাতার বাঁট বগলে ঘুরে বেড়ায় ছাতা সারাইয়ের উদ্দেশ্যে; কিংবা বাসন বিক্রি করে, ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এই সিরিজের সেরা ছবিটি সম্ভবত ফুটপাথের এক অংশে ছেঁড়া কাপড় টাঙিয়ে আব্রু রক্ষায় সচেষ্ট সর্বহারা পরিবারটির ছবি– যেখানে কঙ্কালসার শিশুকে কাঁখে নিয়ে ভাত রান্নায় ব্যস্ত মা, উদাসীন বাবা এবং প্লীহাগ্রস্ত উলঙ্গ বালকটি নিঃশব্দে তৈরি করে বহুপরিচিত শহর জীবনের অন্ধকার সাজঘর। এই ছবিটির মর্মস্পর্শী তীব্রতা দর্শককে চোখ ফেরাতে দেয় না। মা এবং দুই শিশুর জগৎ কেন্দ্রীভূত ওই ফুটন্ত হাঁড়িতে। অন্যদিকে সামনে তাকানো পুরুষের ফিগারের ব্যবহার ছবিতে এক অদ্ভুত ভারসাম্য এনেছে।

শহুরে যাপনের এই ছবিগুলিতে রেখা কিন্তু লীলায়িত নয়, বরং অনেক দৃঢ়, সন্নিবদ্ধ। রংও পালটে যাচ্ছে এই ছবিগুলিতে। গাঢ় বাদামি, নীল রঙের প্রয়োগ বেশি। অবয়বে কঠিন। এবং মুখের অভিব্যক্তিতেও জীবন সংগ্রামের ছাপ সুস্পষ্ট। একুশ শতকের স্ক্রল পেইন্টিংয়ের মতো শ্রমজীবী মানুষের মিছিলের ছবি এঁকেছিলেন তিনি। তাঁদের অভিব্যক্তিতেও একইরকম লড়াকু মনোভাবের প্রকাশ। ছবিটি এত প্রাণবন্ত যে মনে হয়, কান পাতলেই শোনা যাবে স্লোগানের আওয়াজ। আর একটি তুলনায় ছোট স্ক্রলে ধরা আছে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত কারখানার শ্রমজীবী মানুষের ছবি। এই ধরনের ছবি নব্যবঙ্গীয় শিল্পশৈলীতে খুব কমই দেখা যায়।


গাছপালা পশুপাখির উপস্থিতি তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই। কিন্তু তাদের ব্যবহার বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন ধরনের। খুব অল্প কয়েকটি ল্যান্ডস্কেপ ছিল এই প্রদর্শনীতে। পাহাড়ের দৃশ্যায়নটি সুন্দর, কিন্তু শহরের ধোঁয়াশায় ঢাকা প্রায় একরঙা বহুতল বাড়িটির ছবি যেন শহুরে জীবনের প্রতীক। বেশ কয়েকটি প্রতিকৃতিও ছিল। বেশিরভাগই পাশ থেকে করা কিন্তু ব্যক্তির অন্তর্জগতের নিখুঁত ছায়া ধরা দেয় তাতে। ছিল অনবদ্য কিছু ড্রয়িং ও স্কেচ। রেখার চমকপ্রদ গতিশীলতা সেগুলির মধ্যে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর সম্ভবত গ্রামীণ বিয়ের খসড়া ড্রয়িংটি। আসল রঙিন চিত্রটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে, তাই প্রদর্শনীতে দেখানো সম্ভব নয়। তবু এই জীবনসায়াহ্নে বসে নরেন্দ্রবাবু এই বিরাট ড্রয়িংটি করে দিয়েছেন। সে ড্রইংয়ের সূক্ষ্ম রেখার অনুপুঙ্খ বিস্তারের সত্যিই তুলনা মেলা ভার।


নানাদিক থেকেই এ এক ব্যতিক্রমী, অনন্য প্রদর্শনী। নবতিপর অধ্যাপক-শিল্পীর প্রাত্যহিক উপস্থিতি, প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অনায়াস কথোপকথন এক অনবদ্য প্রাপ্তি। দীর্ঘ জীবনের সাধনার ফসল এই প্রদর্শনীটি পথিকৃতের কাজ করেছে। ছাত্র-শিল্পীরা তো বটেই, প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও বিমোহিত এইসব কাজ দেখে। শিল্পী জানালেন, টেম্পেরা বা ওয়াশ-এ করা ছোট কাজগুলি করতে কখনও কখনও মাসাধিক কাল সময় লেগেছে। উভয়ার্থেই তাঁর জীবনদর্শনের ছবি এগুলি। আবার এগুলির মধ্যে ধরা আছে আধুনিক ভারতশিল্পের মর্মকথাটিও। কীভাবে বিভিন্ন শৈলীর আত্মস্থকরণ ঘটেছে– তার নজিরও রয়েছে এইসব শিল্পকর্মের পরতে পরতে। এইসব ছবি গল্প বলে, জীবনের গল্প, মানুষের গল্প, চেনা ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছোট-ছোট নিতান্তই সহজ-সরল গল্পকথা। তাই প্রদর্শনী শেষ হয়ে গেলেও মনে হয়, ‘হইল না শেষ’। প্রদর্শনী উপলক্ষে শিল্পীর কাজ নিয়ে যে সুদৃশ্য বইটি ছাপা হয়েছে, সেখানে এই শৈলীর অপর বরিষ্ঠ শিল্পী শুক্তিশুভ্রা প্রধানের প্রতিধ্বনি করে বলতে ইচ্ছা হয়– ‘জয় শিল্পের জয়, জয় শিল্পীর জয়’!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved