
গোদাবর্মন মামলা কীভাবে প্রধান নিরাপত্তা-ব্যবস্থা হয়ে উঠল ২০২৫ সালের আরাবল্লি মামলায়? গোদাবর্মন মামলার প্রেক্ষিতে বন সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেগুলি সম্প্রতি আরাবল্লি পর্বতমালা সংক্রান্ত শুনানিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কয়েক দশক ধরে ‘আরাবল্লি পর্বত’-এর কোনও অভিন্ন সংজ্ঞা না থাকায় রাজস্থান ও হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলো এমন অনেক এলাকায় খনির অনুমতি দিচ্ছিল, যা গোদাবর্মন মামলার রায় অনুযায়ী সংরক্ষিত বন হওয়া উচিত ছিল।
রাস্তাই একমাত্র রাস্তা। আরও একবার প্রমাণ করল আরাবল্লি আন্দোলন।
আর তিনি? তিনি তো না-থেকেই সারা আন্দোলনে জুড়ে রইলেন। ৮৬ বছর বয়সে ইহলোক ছেড়েছেন, ২০১৬ সালে। কিন্তু এই যে সুপ্রিম কোর্টে আরাবল্লি নিয়ে কেসটি হল (I.A. NO.105701 OF 2024) যার বিবাদীপক্ষ ভারত সরকার ও তারই কিছু সংস্থা, কিন্তু এই শক্তিশালী বিবাদীপক্ষ কোন পিটিশনারের বিরুদ্ধে গিয়েছিল? তাঁর নাম টি. এন. গোদাবর্মন থিরুমুলপাদ। যিনি না-থেকেও আজ দেশ জুড়ে বন বাঁচানোর আইনি লড়াইয়ের সুরক্ষার কবচটি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন।
কেরলের মালাবার অঞ্চলের নীলম্বুর কোভিলাকম রাজপরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইন তৈরি হলেও কেরল সরকার, নীলগিরি অঞ্চলের গুডালুরের গভীর বিপুল প্রাচীন বৃক্ষরাজি রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল। অজুহাত দেওয়া হল, এগুলি ব্যক্তিগত মালিকাধীন। কাজেই এই জনম্ম এসেস্টের গাছপালা ব্যক্তিগত সম্পদ। সুতরাং, গাছের পর গাছ কাটতে কোনও অসুবিধা নেই। বিশাল বিশাল কাঠের গুঁড়ি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে ফেলা চলছিল। তারপর তাদের নামিয়ে এনে মাইলের পর মাইল জুড়ে স্তূপ করে রাখা হচ্ছিল মহাসড়কের ধারে।

এই ধ্বংসলীলা দেখে বড়ই বিচলিত হলেন গোদাবর্মন থিরুমুলপাদ। কোনও উপায় না পেয়ে শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করলেন ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
১৯৯৫ সালের এই পিটিশনটি (Writ Petition (Civil) No. 202 of 1995) যা নীলগিরির একটি স্থানীয় সমস্যা থেকে শুরু হয়েছিল, ক্রমে সারা ভারতের বনরক্ষার একটি বিশাল বা ‘অমনিবাস’ (Omnibus) মামলায় পরিণত হয়। এই মামলার রায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ তৈরি করেছে, যা পরিবেশ আইনকে আমূল বদলে দিয়েছে।
‘বন’ বা ফরেস্ট-এর আভিধানিক সংজ্ঞার বিবর্তন ঘটেছে। আদালত ‘বন’ শব্দের পরিধি বিস্তৃত করেছে। মালিকানা বা সরকারি শ্রেণিবিন্যাস যাই হোক না কেন, যে কোনও এলাকা যা আভিধানিক অর্থে বন হিসেবে গণ্য হয়, তা-ই বন। এর ফলে বিশাল পরিমাণ ব্যক্তিগত অশ্রেণিবদ্ধ জমিও ১৯৮০ সালের বন (সংরক্ষণ) আইনের আওতায় চলে আসে। পাশাপাশি জোরদার কেন্দ্রীয় তদারকির ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, যে কোনও ‘বন’ ভূমিতে অ-বনজ কার্যক্রম (যেমন খনি, খনন বা করাত কল স্থাপন) শুরু করার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের আগাম অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

এই মামলার মাধ্যমেই কমপেনস্যাটরি অ্যাফরেস্টেশন ফান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং অথরিটি (Compensatory Afforestation Fund Management and Planning Authority) বা ‘CAMPA’ গঠিত হয়। এটা নিশ্চিত করার জন্য, যে বনভূমি ব্যবহারের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ কেবল বনসৃজনের কাজেই ব্যয় হবে।
আদালত পরিবেশগত আদেশ পালনে নজরদারি এবং পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি স্থায়ী সংস্থা হিসেবে সেন্ট্রাল এমপাওয়ারড কমিটি (CEC) গঠন করে।
আর কী কপাল! সেই সেন্ট্রাল এমপাওয়ারড কমিটি (CEC) কি না ৩০ বছর পরে গোদাবর্মন থিরুমুলপাদের বিরুদ্ধেই কোর্টের দ্বারস্থ হল? সঙ্গে আর কারা আছে? পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়! আর নেই? আরও আছে। ভারত সরকারের পাশাপাশি তিন তিনটি রাজ্য সরকার রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লি যারা ১৯৯৫ সালের সেই রিটের বিরুদ্ধে মামলা করল!
১৯৯৫ সালের টি. এন. গোদাবর্মন তিরুমুলপাদ বনাম ভারত ইউনিয়ন [Writ Petition (C) No. 202 of 1995] মামলাটি ভারতের বন সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক, কারণ সুপ্রিম কোর্ট ‘কন্টিনিউয়াস ম্যান্ডামাস’ বা ‘নিরবচ্ছিন্ন আদেশ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিবেশ রক্ষায় ধারাবাহিক নির্দেশনা প্রদান করে আসছে। ২০২৬ সালেও আরও একবার এটি ভারতের পরিবেশ শাসনের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হল। গোদাবর্মন থিরুমুলপাদ আরাবল্লির পাহাড়-জমি-বন-ইকোলজি রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে থাকলেন।

কিন্তু গোদাবর্মন মামলা কীভাবে প্রধান নিরাপত্তা-ব্যবস্থা হয়ে উঠল ২০২৫ সালের আরাবল্লি মামলায়?
গোদাবর্মন মামলার প্রেক্ষিতে বন সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেগুলি সম্প্রতি আরাবল্লি পর্বতমালা সংক্রান্ত শুনানিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কয়েক দশক ধরে ‘আরাবল্লি পর্বত’-এর কোনও অভিন্ন সংজ্ঞা না থাকায় রাজস্থান ও হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলো এমন অনেক এলাকায় খনির অনুমতি দিচ্ছিল, যা গোদাবর্মন মামলার রায় অনুযায়ী সংরক্ষিত বন হওয়া উচিত ছিল।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর একটি ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট একটি নতুন প্রযুক্তিগত সংজ্ঞা গ্রহণ করে: আরাবল্লি পর্বত বলতে সেই ভূমিরূপকে বোঝাবে যার উচ্চতা স্থানীয় সমতল থেকে কমপক্ষে ১০০ মিটার বেশি। অর্থাৎ, ফিতেরা ঠিক করবে– কে পাহাড় আর কে নয়!
পরিবেশবিদরা একে ১৯৯৫ সালের গোদাবর্মন মামলায় প্রতিষ্ঠিত ‘আভিধানিক সংজ্ঞা’র নীতির প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের মতে, এই প্রযুক্তিগত সংজ্ঞার ফলে পর্বতমালার প্রায় ৯০% এলাকা সুরক্ষার বাইরে চলে যেতে পারে, যা নিচু পাহাড় এবং পাদদেশে খনি ও নির্মাণ কাজের পথ প্রশস্ত করবে। যদিও আদালত একটি ‘টেকসই খনি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ (MPSM) সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন খনি লিজ দেওয়া স্থগিত রেখেছে, তবে এই ১০০ মিটারের নিদানটি যে আরাবল্লির বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস ডেকে আনবে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

আমরা তো বারবার যাব সুপ্রিম কোর্টের কাছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় আমাদের নিরাপত্তার যে ভরসা আছে, তা বিঘ্নিত বা চ্যালেঞ্জের সামনে পড়লে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের কাছে যাব। কিন্তু এই ২০২৫ যেন একটু ‘বেসুরো’। প্রায় আটটি কেসে সুপ্রিম কোর্ট নিজের রায় পুর্নবিবেচনা করেছে। দীপাবলির ঠিক আগে আদালত তাদের আগের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করে সীমিত আকারে ‘সবুজ বাজি’ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়ে আদালত তাদের ১৬ মে-র রায়টি প্রত্যাহার করে নেয়, যেখানে নিয়ম-লঙ্ঘনকারী প্রকল্পগুলোর জন্য ‘ব্যাকডেটেড’ বা পূর্ববর্তী পরিবেশগত ছাড় দেওয়াকে ‘গুরুতর বেআইনি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে সরকারকে এই ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মে মাসে আদালত সিভিল জজ পরীক্ষার জন্য তিন বছরের আইনি প্র্যাকটিসের বাধ্যবাধকতা পুনরায় চালু করে। তবে নভেম্বরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমানে কর্মরত বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের এই নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর ২০২৫ সালের শেষ কর্মদিবসে আরাবল্লি নিয়ে আদালত তাদের নিজস্ব ৪০ দিনের পুরনো আদেশটি স্থগিত করে। ব্যাপক জনরোষ এবং পরিবেশবিদদের প্রতিবাদের মুখে আরাবল্লি পর্বতের উচ্চতা সংক্রান্ত বিতর্কিত ১০০ মিটারের সংজ্ঞা আদালত বাতিল করে দেয়।

সবপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করার পর, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করা আবশ্যক এবং বর্তমান অস্পষ্টতাগুলি দূর করে সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত দিক নির্দেশনা করা জরুরি বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু কী আশ্চর্য, যেখানে জন বিস্ফোরণে ভারত কাঁপছে, প্রতি মুহূর্তে পরিবেশ ও ইকোলজির সংকট নজরে আসছে, সেখানে ৩০ বছর আগে যে বিবেচনায় বনসুরক্ষাকে জোরদার করা হয়েছিল, ৩০ বছর পর তার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে অনেক। তাহলে কার স্বার্থে এই বিরোধিতা?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved