
সাম্প্রতিক একটি খবরে প্রকাশ– পশ্চিমবঙ্গের কোনও এক জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়েছে কিছু বেশি সংখ্যায়। এবং সেই সব খবরে বার বার চিহ্নিত করা হচ্ছে যে আক্রান্তরা বেশিরভাগ সমকামী পুরুষ। এমনকি এসব কথাও প্রচারিত হচ্ছে যে ধারা ৩৭৭ বিলোপ হওয়ার ফলে সমকামী মানুষদের মধ্যে যৌনসম্পর্ক এত বেড়ে গেছে যে তাতেই এইচআইভি-এইডস বাড়ছে!
বাংলার ছেলে ওনির নিঃসন্দেহে তাঁর সময়ের থেকে বহু ক্রোশ এগিয়ে থাকা একটি ছবি দু’হাজার শতকের প্রথমেই (২০০৫) বানিয়ে ফেলেছিলেন। যত দিন গিয়েছে এই সিনেমার বক্তব্য তত খোলতাই হয়েছে। বিশ শতকের আটের দশকে, ইউরোপ-আমেরিকায় এইচআইভির (HIV) প্রকোপ বাড়লে ডাক্তাররা দেখেন, রোগটি প্রাথমিকভাবে ছড়াচ্ছে সমকামী পুরুষদের থেকে। এই বিশেষ পর্যবেক্ষণ পৃথিবীজোড়া সমকাম-বিদ্বেষকে আরও অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। একঘরে হওয়া শুধু নয়, মারাত্মক সামাজিক হেয়-হিংসার শিকার হন সমকামী মানুষরা। কারও চাকরি যায়, কারও এইডস হয়, অনেকেই চিকিৎসার ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। নিখিল, যে এ-ছবির প্রধান চরিত্র, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪– এই সময়কালে তার জীবনের চড়াই-উতরাই ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ সিনেমার উপজীব্য।

মা-বাবা ও দিদি অনামিকাকে নিয়ে নিখিলের গোয়া রাজ্যে নিশ্চিন্তের জীবন। সে পেশাদার সাঁতারু। কিন্তু হঠাৎ এইচআইভি ধরা পড়ায় তার পুরো জীবননদী ভিন্ন খাতে বইতে শুরু করে। তার মা-বাবা তাকে ত্যাগ করে। সাঁতারের রাজ্যদল থেকে সে বাদ পড়ে। এমনকি স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা দেখিয়ে তাকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়। দিদি অনামিকা আর প্রিয় বন্ধু নাইজেল কেবল নিখিলের পাশে দাঁড়ায়। তার জামিন হয়। কিন্তু সামাজিক বয়কট থেকে মুক্তি মেলে না। কোথাও চাকরি পায় না সে। শেষে গানের শিক্ষক হিসেবে রুজি-রোজগার চালাতে হয়। নিখিলের যৌনতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। নাইজেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে মানুষ সন্দিহান হয়। অবশ্য পরিচালকও তাদের সম্পর্ক বিষয়ে কিছু খোলসা করেন না। যদিও দর্শক সেটা ভালোরকম আন্দাজ করতে পারে। নিখিলের এইচআইভি যখন এইডসে পরিণত হয়, তখন নিজের মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের উন্নতি হয়। পরে বাবার সঙ্গেও। কিন্তু নিখিল বেশিদিন আর বাঁচে না। নিখিলের প্রয়াণের পর তার মা-বাবা, দিদি নাইজেলকে নিজেদের পরিবারে আপন করে নেন। অনামিকা ও নাইজেল ‘পিপল্স পজিটিভ’ নামে এইডস সচেতনতার জন্য একটি সংস্থা শুরু করে।

সাম্প্রতিক একটি খবরে প্রকাশ– পশ্চিমবঙ্গের কোনও এক জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়েছে কিছু বেশি সংখ্যায়। এবং সেই সব খবরে বারবার চিহ্নিত করা হচ্ছে যে, আক্রান্তরা বেশিরভাগ সমকামী পুরুষ। সন্তর্পণে এটাও প্রচারিত হচ্ছে, সেই সব পুরুষেরা উচ্চশিক্ষিত এবং বড় বড় চাকরি করেন সকলে। কিন্তু এতসবের মধ্যে যা হচ্ছে তা হল, এই খবরের মধ্যে দিয়ে সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের বিরুদ্ধে অকারণ ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে সমাজে।
এইচআইভি-এইডস সংক্রমণ সমকামী-বিসমকামী মানুষ নির্বিশেষে সব মানুষের হতে পারে। অসুরক্ষিত যৌনাচার থেকে, বহু ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ থেকে এবং এইচআইভি-এইডস আক্রান্ত মায়ের থেকে সন্তানের মধ্যে ছড়াতে পারে এই রোগ। ১৯৮০-র প্রথম দিকে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে প্রথম যখন এইচআইভি-এইডস রোগটি আবিষ্কৃত হয়, তখন প্রাথমিকভাবে তা পাওয়া গিয়েছিল সমকামী পুরুষদের মধ্যে, প্রধানত যারা পায়ুকামে অভ্যস্ত। তাতে বহু ধর্মীয় সংগঠন; যাদের ধর্মাচরণে পায়ুকাম নিষিদ্ধ, তারা বলে উঠেছিল, ‘দ্যাখ! কেমন লাগে!’ গোছের কথাবার্তা। অর্থাৎ, তারা তো বহুযুগ থেকে নাকি বলে আসছে পায়ুকামে ভগবান পাপ দেয়, এখন ভগবানের সেই অভিশাপ সত্যিকারের পৃথিবীতে নেমে এল! এইচআইভি-এইডস রোগকে এক সময় ‘গে-ক্যান্সার’ নাম দেওয়া হয়েছিল! তখন এইচআইভি-এইডসের কোনও চিকিৎসা ছিল না। রোগটার ধরণধারণ স্পষ্ট হচ্ছিল না। তারপর ধীরে ধীরে যখন এইচআইভি-এইডসের গতিপ্রকৃতি পরিষ্কার হল, তখন আর এ-রোগ যে শুধুই রোগ, তথাকথিত কোনও ‘পাপ’ নয়, তা অন্তত চিকিৎসা বিজ্ঞান উপলব্ধি করল। কিন্তু সেই যে সমকামী মানুষদের ওপর দিয়ে চলা প্রাথমিক হেনস্থা-হিংসা, যেরকম এক সময় কুষ্ঠরোগীদের ওপর চলেছে, যে-কোনও ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত মানুষদের যে-অভিজ্ঞতা বারবার হয়, এই কিছুদিন আগে করোনা-আক্রান্ত মানুষদের যে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল; সেই ‘ট্রমা’ কখনও ঘোচেনি এবং সুযোগ পেলেই নানা দেশে, নানা সময় সেই সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতি বিদ্বেষ নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে চায়। পশ্চিমবঙ্গের জেলার খবরটি সেই চাপা বিদ্বেষেরই নামান্তর মাত্র। এমনকী এসব কথাও প্রচারিত হচ্ছে যে, ধারা ৩৭৭ বিলোপ হওয়ার ফলে সমকামী মানুষদের মধ্যে যৌনসম্পর্ক এত বেড়ে গিয়েছে যে, তাতেই এইচআইভি-এইডস বাড়ছে!

এইচআইভি-এইডস কীভাবে ছড়ায়, আমরা জানি। কিন্তু এ-ও আমাদের জানা দরকার, এইচআইভি-এইডস রোগের চিকিৎসা এখন ভীষণভাবে উন্নত হয়েছে। এইচআইভি আর যাতে এইডসে পরিণত না হতে পারে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এরকম অনেক পন্থা তৈরি হয়েছে, শুধু তাই নয়, ভারতে এই চিকিৎসা প্রায় বিনামূল্যে বিতরিত সেই প্রথম দিন থেকে, এতগুলো বছর। এমন ওষুধও ঝুঁকিপূর্ণ যৌনতায় লিপ্ত গোষ্ঠীর মানুষদের দেওয়া যেতে পারে, যা কখনও অসুরক্ষিত যৌনাচারে জড়িয়ে পড়লেও এইচআইভি আক্রান্ত হতে বাধা দিতে পারে। এমনকী এইচআইভি-এইডসে কেউ আক্রান্ত হলেও এত রকম ওষুধ আর চিকিৎসা আর কাউন্সেলিং আছে, যা সুস্থ এবং সুন্দরভাবে একজন রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, শুধু নয়, তারা জীবনের স্বাভাবিক মেয়াদ-ও পেতে পারে। সেই জায়গায় বরং এমন রোগ ভারতে আছে, যেমন, রক্তে শর্করা রোগ, উচ্চরক্তচাপ, থাইরয়েড, টিউবারকুলোসিস প্রভৃতি, যা স্বাভাবিকভাবে একজন রোগীকে বাঁচতে দেয় না। দীর্ঘ ওষুধ-সেবনে স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সেই তুলনায় যদি কেউ নিয়মিত ওষুধ সেবন করে, এইচআইভি-এইডস রোগের প্রকোপ তার শরীরে তেমন আঘাত হানতে পারে না।

তাই যে খবরে সকলে মশগুল যে, এইচআইভি-এইডস রোগ ছড়াচ্ছে সমকামী পুরুষদের মধ্যে, তাতে যেন আমাদের এ-ভুল না হয় যে, রোগটা যে-কোনও মানুষের হতে পারে, লিঙ্গ ও যৌনপরিচয় নির্বিশেষে। সঠিক চিকিৎসায় এইচআইভি নিরাময় না হলেও একজন রোগী প্রায় বাকি জীবন স্বাভাবিক ভাবে, সুস্থ ভাবে কাটাতে পারে। অসুরক্ষিত যৌনতায় (অর্থাৎ, কন্ডোম ব্যবহার না করা) জড়িয়ে পড়া একজন মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা; তার জন্য তার শিক্ষা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা কোনও গোষ্ঠী দায়ী থাকতে পারে না। অকারণ আতঙ্ক ছড়িয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী, যারা ইতিমধ্যেই সমাজে বিভিন্ন রকম হেনস্থা-হিংসার শিকার, তাদের প্রতি ঘৃণাবর্ষণ সহজ, কিন্তু একটি রোগ সম্বন্ধে সঠিক তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা আরও বেশি জরুরি।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ভাস্কর মজুমদার-এর অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved