
ইদানীং স্মার্টফোনের দ্রুত প্রসার, ইন্টারনেটের অবাধ প্রাপ্যতা এবং অনলাইন কনটেন্টের অ্যালগরিদম নবপ্রজন্মকে দ্রুত আকর্ষণ করছে। দেশের বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, কিশোরদের মধ্যে পর্ন বা যৌন উত্তেজক কনটেন্টে এক্সপোজ হওয়া অভাবনীয় হারে বেড়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত ইউডিএওয়াইএ (UDAYA) সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৭% কিশোর ছেলে এবং ৬% কিশোরী কোনও না কোনও ভাবে পর্নোগ্রাফিতে এক্সপোজড হয়েছে, যা যৌনতা সম্পর্কে তাদের ভাবনা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
বয়ঃসন্ধিকালের মাহেন্দ্রক্ষণ বেশ রোমাঞ্চকর। একদিকে অজানা পৃথিবীর হাতছানি আর অন্যদিকে নিজেকে সংযত রাখার লড়াই। সময়ের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে সেই লড়াইয়ের ধরন বদলায়। এটাই নিয়ম। এমনটাই হয়ে আসছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাওয়া যাবে, প্রতিটা যুগের বয়ঃসন্ধিকালের ধরন বিভিন্ন রকমের। প্রতিটা যুগেই এমন কিছু ভয়ভীতি ছিল, যা গুরুজনেরা ছেলেমেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালেই সতর্ক করে দিতেন। সেইভাবে ছেলেমেয়েদের বড় করে তুলতেন। নবপ্রজন্মও সেই সতর্কমূলক বার্তাকে পাথেয় করে জীবনে এগিয়ে যেত।
বিগত কিছু বছরে সমাজমাধ্যমের প্রভাব বিশেষভাবে নবপ্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। বয়ঃসন্ধিকালকে জটিল করে তুলেছে। মুদ্রার যেমন দুই পিঠ, তেমনই এই প্রভাবের দুই দিক আছে। এক ক্লিকেই যেমন অজানাকে সহজেই জানা যায়, তেমনই অন্ধকার জগতের দিকে পা বাড়ানো যায়। গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাওয়া যায়। কৈশোরেই জীবনে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সমীক্ষার দেখা গিয়েছে নবপ্রজন্মের কিশোর বয়সেই মাদকের প্রতি আসক্ত হওয়া, যৌনতার প্রতি লালসা এবং অপরাধ জগতের প্রতি মারাত্মক ঝোঁক বেড়েছে। যা ক্রমশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইদানীং স্মার্টফোনের দ্রুত প্রসার, ইন্টারনেটের অবাধ প্রাপ্যতা এবং অনলাইন কনটেন্টের অ্যালগরিদম নবপ্রজন্মকে দ্রুত আকর্ষণ করছে। দেশের বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, কিশোরদের মধ্যে পর্ন বা যৌন উত্তেজক কনটেন্টে এক্সপোজ হওয়া অভাবনীয় হারে বেড়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত ইউডিএওয়াইএ (UDAYA) সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৭% কিশোর ছেলে এবং ৬% কিশোরী কোনও না কোনও ভাবে পর্নোগ্রাফিতে এক্সপোজড হয়েছে, যা যৌনতা সম্পর্কে তাদের ভাবনা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলেছে। টিনেজারদের যৌন এক্সপোজার বলতে বোঝানো হয় কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েদের এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে তারা অজান্তেই বা কৌতূহলের টানে খুব অল্পবয়সেই যৌনতা-সংক্রান্ত নানা তথ্য, ছবি, ভিডিও, কথাবার্তা বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যায়। আজকের ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন, সোশাল মিডিয়া, রিল, ওয়েবসিরিজ, অনলাইন চ্যাটে হঠাৎ ভেসে ওঠা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট তাদের খুব দ্রুত এই জগতে টেনে আনছে। পাশাপাশি বন্ধুদের আড্ডায় যৌনকৌতুক, সম্পর্কের চাপে অন্তরঙ্গ ছবি আদানপ্রদান অথবা অপরিচিত কারও-র যৌন আবেদন, যৌন এক্সপোজারের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, মানসিকভাবে এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকা সত্ত্বেও যখন কিশোররা অতিরিক্ত যৌন তথ্য বা অভিজ্ঞতার সামনে এসে পড়ে, যা তাদের আবেগ, নিরাপত্তাবোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে– তখনই সেই ঘটনাকে যৌন এক্সপোজার বলা হয়।
এটি কেবল পর্নোগ্রাফি দেখার বিষয় নয়। বরং অনলাইন ও অফলাইন দু’ধরনের সামাজিক বাস্তবতাই মিলেমিশে গড়ে তোলে এই অকাল সংস্পর্শ। আজকাল খুব অল্পবয়সেই ব্যক্তিগত স্মার্টফোন হাতে চলে আসছে আর সেই ব্যক্তিগত পর্দার আড়ালে গোপনীয়তার সুযোগে কিশোরেরা সহজেই নানা ধরনের কনটেন্টে পৌঁছে যাচ্ছে, যার অনেকটাই বয়সের অনুপযোগী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশাল মিডিয়া ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম। একবার কোনও সংবেদনশীল বা ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিওতে চোখ থামলেই পরের দিন থেকে আরও বেশি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজেস্ট হয়। স্কুল বা পরিবারে যৌনশিক্ষার অভাব এই প্রবণতাকে আরও বাড়াচ্ছে। যৌনতা সম্পর্কে স্বাভাবিক কৌতূহলের উত্তর না পেয়ে কিশোররা ইন্টারনেটকেই আশ্রয় করছে। সেই খোঁজই তাদেরকে ভুল, অতিরঞ্জিত বা ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, নজরদারির ঘাটতি এবং বন্ধুদের মধ্যে লিংক বা ভিডিও শেয়ার করার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিশোরদের একটি বড় অংশ মাঝারি থেকে গুরুতর ইন্টারনেট আসক্তিতে ভুগছে, ফলে তারা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনে থাকে। যা আকস্মিক বা অনিচ্ছাকৃত যৌন এক্সপোজারের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কলকাতার কিশোরদের মধ্যে খুব অল্প বয়সে সম্পর্ক ও ইন্টিমেসির চাপ এখন চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ শহুরে অঞ্চলের প্রায় ২৫% পকসো (POCSO) মামলা রোমান্টিক সম্পর্ক থেকে এসেছে। অর্থাৎ, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর বয়স ১৬-১৮ এবং তাদের মধ্যে আগে থেকেই প্রেম ছিল। অনেকক্ষেত্রেই এগুলো পরিবার বা সামাজিক চাপের কারণে আইনি জটিলতায় গড়িয়ে যায়, ফলে কিশোর-কিশোরীরা মানসিক আঘাত, ভয়, অপরাধবোধ ও সামাজিক লাঞ্ছনার মুখে পড়ে। ইদানীং দেখা গিয়েছে, শহরের ৩-৫% কিশোর-কিশোরীরা খুব অল্পবয়সেই ডেটিং বা যৌন অভিজ্ঞতার মধ্যে জড়াচ্ছে, যা আগের প্রজন্মের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

সামনে এসেছে আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর-কিশোরীদের মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যার পিছনে রয়েছে সহজ প্রাপ্যতা, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ডিজিটাল প্রলোভনের জটিল সমন্বয়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ড্রাগ-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত নাবালকদের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৫-৩০% বেড়ে গিয়েছে। ইউনিসেফের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের শহরাঞ্চলে ১৪-১৮ বছর বয়সী প্রায় ১৮% টিনেজার অন্তত একবার নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করেছে এবং এর মধ্যে বড় অংশই মাদক গ্রহণ শুরু করেছে বন্ধুবৃত্ত, কৌতূহল, মানসিক দুশ্চিন্তা মোকাবিলার ভুল উপায় হিসেবে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হল, ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন প্যাচ– এগুলোর বাজার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে উঠছে, যা টিনেজারদের কাছে নিরাপদ নেশা বলে ভুল ধারণা তৈরি করছে। কোভিড মহামারির পর ডিজিটাল সময় বেড়ে যাওয়ায় কিশোরদের মানসিক চাপ, একাকিত্ব এবং স্ক্রিন নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘হু’ (WHO) জানিয়েছে– এই সময়ে কিশোরদের মানসিক সমস্যা বেড়েছে প্রায় ৩০%, যা অনেককেই নেশার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সোশাল মিডিয়ার ‘কুল’ কালচার, রিল, ইনফ্লুয়েন্সার, ওয়েবসিরিজে মাদককে গ্ল্যামারাইজ করা কিশোরদের মনের উপর তীব্র প্রভাব ফেলেছে। ফলে নেশা তাদের কাছে হয়ে উঠছে উত্তেজনা, পরিচয় নির্মাণ এবং মানসিক চাপ কমানোর দ্রুত পথ। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোরদের অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় কিশোরদের বিরুদ্ধে মোট ৩১,৩৬৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ২% বেশি। সেই বছরের মধ্যে মোট ৪০,০৩৬ জন কিশোর আইনগতভাবে আটক বা অভিযুক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৭৯% অপরাধীর বয়স ১৬-১৮ বছর। এই সংখ্যা প্রমাণ করে, কিশোর বয়সে অপরাধ এখন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নানা কারণে উদ্ভূত একটি বৃহৎ সমস্যা। যদিও পিছনের কারণগুলোও বহুস্তরীয়। অনেক কিশোরই এমন পরিবার বা পরিবেশ থেকে আসে, যেখানে অভিভাবকের নজরদারি কম, পারিবারিক ভাঙন বা গৃহহিংসা থাকে বা মানসিক সহায়তা অপর্যাপ্ত। দারিদ্র, বেকারত্ব ও শিক্ষার অভাব কিশোরদের জন্য দ্রুত অর্থ বা সুবিধার লোভকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যধিক ক্রাইম থ্রিলার দেখার নেতিবাচক প্রভাব। ক্রাইম থ্রিলার কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক বোধে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের কনটেন্টে হিংসা, চুরি, প্রতারণা এবং প্রতিশোধকে উত্তেজনাপূর্ণভাবে দেখানো হয়, যা কিশোরদের মধ্যে রোমাঞ্চ ও আগ্রাসনের অনুভূতি বাড়াতে পারে। বিশেষত যখন অপরাধীদের চরিত্রকে বুদ্ধিমান, সাহসী বা শক্তিশালী হিসেবে গ্ল্যামারাইজড করা হয়, তখন তা কিশোরদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং তারা বাস্তব জীবনে অনুকরণ করার প্রলোভনে পড়ে। ক্রমাগত হিংসা দেখার ফলে তারা সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে এবং অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব না দিয়ে হিংসা বা অপরাধকে স্বাভাবিক মনে করছে।

বয়ঃসন্ধিকাল চিরকালই জটিল ছিল। আগামীতেও থাকবে। নিজেকে বোঝা, নিজের শরীর, চাওয়া-পাওয়া, ঠিক-ভুল ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রতিটা প্রজন্মের কাছেই বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে ছিল। গুরুজনেরা বুঝিয়ে দিতেন সীমারেখা। বই, সিনেমা, রেডিও, সংবাদপত্র তখন ছিল দোসর। কিন্তু বিগত কিছু বছরে সমাজমাধ্যম এবং ইন্টারনেট প্রধান দোসর হয়ে উঠেছে টিনেজারদের। ওই ছোট্ট স্ক্রিনের অন্দরে কী চলছে, তা বোঝা মুশকিল। গুরুজনেরাও জানতে পারছেন, তার ছেলেমেয়ে সারাদিন ফোনে কী দেখছে, সেই দেখা তার জীবনে কী প্রভাব ফেলছে। বয়ঃসন্ধিকালের এই জটিল সময়ে সবচেয়ে জরুরি কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ, বোঝাপড়ায় ভরা পরিবেশ তৈরি করা। প্রথমেই প্রয়োজন ফোন ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। পরিবার ও স্কুলে খোলামেলা কথাবার্তার জায়গা থাকা দরকার, যাতে তারা ভয় না পায়। কারণ যত বেশি তারা বলতে পারবে, তত কম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে। সম্পর্ক, ইন্টিমেসি, কনসেন্ট, বাউন্ডারি ও অনলাইন সেফটির বাস্তব শিক্ষা আজ বাধ্যতামূলক। সাইবার বুলিং, স্ক্যাম, ফেক প্রোফাইলের মতো বিপদ সম্পর্কে আগেই সচেতন করলে অনেক ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব। এছাড়া খেলাধুলো, সৃজনশীল কাজ, অফলাইন বন্ধুত্ব এগুলো তাদের মানসিক ভারসাম্যকে শক্ত করতে সাহায্য করে। তাই বয়ঃসন্ধিকালের মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের সতর্ক থাকা লক্ষ্য হওয়া উচিত। নবপ্রজন্মের ভাষা এবং ভালোবাসা আমাদের বোঝা উচিত। আমাদেরও তাদের জীবনের সীমারেখা সম্বন্ধে সচেতন করা কর্তব্য। নয়ত উদ্বেগ আরও বাড়বে। আরও আরও জটিল সময় আমাদেরকে সংকুচিত করবে। এখনও সময় আছে, নবপ্রজন্মকে সচেতন করে সঠিক পথে ফেরানোর।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved