
চলতি এআই সামিটে ওপেনএআই-এর কর্ণধার স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, এই মুহূর্তে ভারতে চ্যাটজিপিটি সমেত এআই টুল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। আমেরিকার পরেই…। তিনি চান, ভারতের মতো বিরাট জনসংখ্যার দেশে কোনও মানুষ যেন এআইয়ের সংস্পর্শ থেকে রেহাই না পায়! তবেই সারা পৃথিবীকে এনে ফেলা যাবে হাতের মুঠোয়। তবে, নজরুল বলেছিলেন ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু, আনমনে’। তিনি যে সময়ে এই সংগীত রচনা করেন সেই সময় এআই ছিল না। কিন্তু,বর্তমান সময়ে এআই-এর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এআই নামক বিরাট শিশুর হাতে মানবজাতির চাবিকাঠি সম্পূর্ণরূপে তুলে দিলে পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা এখনই অনুমান করা সম্ভব নয়!
নয়াদিল্লিতে সদ্য শেষ হল, পাঁচদিন-ব্যাপী ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’। এই অনুষ্ঠানটি মানুষ, পৃথিবী ও অগ্রগতি– এই তিনটি সূত্রের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সামিটে ‘ডায়লগ টু ডেলিভারি’ পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে কর্মসূচি তৈরি করতে হবে, তারপর দরকার সেটির সঠিক ও বাস্তব রূপায়ণ। এই বিরাট কর্মযজ্ঞে আমাদের দেশের তাবড় বাঘব-বোয়ালরা তো বটেই, আমন্ত্রিত হয়েছেন সারা পৃথিবীর হাই প্রোফাইল ডিগনিটিরা। প্রায় শতাধিক দেশের মানুষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি নিয়ে তাঁদের মতাদর্শ ব্যক্ত করেছেন এই সামিটে। মুকেশ আম্বানি থেকে শুরু করে ২৯ বছর বয়সি মেটার চিফ এআই অফিসার আলেক্সজান্ডার ওয়াংগ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ সামিটে উপস্থিত হয়েছেন।

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে ভারতের স্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের পরই। ১৪০ কোটির দেশ এই ভারতের অর্থনীতি তথা সমাজনীতির একটা বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চলেছে এআই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য হল মানুষের অপরিহার্য তথা মৌলিক অধিকার। বর্তমানে এআই দখল নিয়েছে এই তিনটিতেই।

কেরলের তিরুবন্তপুরমের একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল প্রথম এআই চালিত রোবট শিক্ষিকা চালু করেছে। রোবটের নাম ‘আইরিশ ম্যাম’। শাড়ি পরিহিতা সুদর্শনা এই রোবো-টিচার ইংরেজি-সহ ২৫টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। বিদ্যার্থীরা এই আইরিশ ম্যামের কাছে পড়াশোনো করতে উদগ্রীব। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই ঘটে গিয়েছে বিরাট পরিবর্তন। তামাম ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে জটিল ও কঠিন ওপেন সার্জারি, ল্যাপরোস্কোপিক সার্জারিগুলো করানো হচ্ছে দক্ষ রোবট দিয়ে! এআই প্রচুর ক্লিনিক্যাল ডেটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ করে অতি শীঘ্র রোগ নির্ণয়ের বিষয়ে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত পৌঁছতে সাহায্য করছে।
কিছুদিন আগেই খবরে পড়েছিলাম, একজন তরুণী ওজন কমানোর জন্য চ্যাট জিপিটির সাহায্য নিয়েছিলেন এবং কমিয়ে ফেলেছিলেন দু’মাসে ১০ কেজি ওজন। চমকপ্রদ তথ্য নিঃসন্দেহে। মানুষ কী খাবে, কখন খাবে, কতটা খাবে এমনকী, কেন খাবে– তার সিদ্ধান্ত মানুষ স্ব-ইচ্ছায় তুলে দিচ্ছে এআই-এর হাতে।

এমনকী, মনখারাপ হলে এখনকার প্রজন্ম অন্য একজন মানুষের চেয়ে নির্ভর করছে এআইয়ের পরামর্শের ওপর! সেটা করলে বিষয়টির গোপনীয়তা যেমন বজায় থাকে, তেমনই এআই জাজমেন্টাল না হওয়ার কারণে উপযুক্ত ও সঠিক মতামত অনায়াসেই পাওয়া যাচ্ছে!
আমাদের রাজ্যে দরজায় করা নাড়ছে বিধানসভা ভোট। এই ভোটে ভুয়া ভোটার নির্ধারণ থেকে শুরু করে, স্পর্শকাতর বুথের সংখ্যা কত হবে, কোন দল কী ভোট পাবে, জনতা জনার্দন কার হাতে তুলে দেবে রাজ্যের শাসনভার তারও নিঁখুত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম এআই!
অতএব ‘চালাও পানসি বেলঘরিয়া’ থুরি এআইওয়ালা! এআই-এ ছেয়ে ফেলো চারিদিক!
যত বেশি সংখ্যায় মানুষ এআই ব্যবহার করবে তত বেশি হবে লাভের মুনাফা। চলতি এআই সামিটে ওপেনএআই-এর কর্ণধার স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, এই মুহূর্তে ভারতে চ্যাটজিপিটি সমেত এআই টুল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। আমেরিকার পরেই…। অর্থাৎ, ভারতের মতো বিরাট জনসংখ্যার দেশে কোনও মানুষ যেন এআইয়ের সংস্পর্শ থেকে রেহাই না পায়! তবেই সারা পৃথিবীকে এনে ফেলা যাবে হাতের মুঠোয়। তবে, নজরুল বলেছিলেন ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু, আনমনে’। তিনি যে সময়ে এই সংগীত রচনা করেন সেই সময় এআই ছিল না। কিন্তু বর্তমান সময়ে এআই-এর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এআই নামক বিরাট শিশুর হাতে মানব জাতির চাবিকাঠি সম্পূর্ণরূপে তুলে দিলে পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা এখনই অনুমান করা সম্ভব নয়!

বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, এআইকে যদি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হয় তাহলে সেইদিন দূর নেই যখন সেটি নিজেই নিজের মতো আপগ্রেডেড হবে। নিজের মতো করে তৈরি করবে মারণাস্ত্র, মানব সমাজের জন্য তা হবে ভয়ংকর।
আমরা যখনই অনলাইনে কোনও বিষয়ে সার্চ করছি বা ব্রাউজ করছি যেমন টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, প্রাইম ভিডিও বা নেটফ্লিক্স আমাদের কিন্তু প্রতিটি কাজ ও ক্লিক এআই নথিভুক্ত করছে! কোন প্ল্যাটফর্মে কী দেখছি, কতক্ষণ দেখছি অর্থাৎ, আমাদের বিহেভিয়েরাল প্যাটার্ন সেই সিস্টেমের অ্যালগোরিদম পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সময়ে সেই সম্পর্কীয় বিষয়গুলি আমাদের সামনে পরিবেশন করছে!
এ তো গেল না-হয় আমরা কোনও গ্যাজেটে কিছু দেখছি। কিন্তু যখন কিছুই দেখছি না, শুধু স্মার্ট ফোনটিকে রেখে দিয়েছি পাশে, বা স্মার্ট-টিভির সামনে বসে গল্প করছি। সেই গল্পেও কিন্তু অনায়াসে আড়ি পাতছে আমার আপাত নিষ্পাপ গ্যাজেটটি! সমস্ত এআই-যুক্ত যন্ত্রে বিল্ট ইন মাইক্রোফোন আছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকের ওপর নজরদারি করার প্রক্রিয়ার নাম ‘অ্যাক্টিভ লিসনিং’। এই লিসনিং-এর দ্বারা কথাবার্তাকে তথ্য হিসাবে ব্যবহার করে গ্যাজেট। সেই তথ্য চলে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন সংস্থার কাছে। সেই সংস্থা এবার গ্রাহকদের ‘টার্গেটেড অ্যাডভার্টাইজিং’-এর মাধ্যমে ফোনের পর্দায় বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করছে! এত সব কিছুই কিন্তু আমাদের অলক্ষ্যে ঘটে যায় আমাদের চোখের সামনেই, নিশ্চুপে। অর্থাৎ, আগে দেওয়ালের কান ছিল, এখন গ্যাজেটেরও কান হয়েছে! এই কারণে একদল মানুষ ঝুঁকছেন ডাম্ব ফোনের দিকে।

মা যা ছিলেন আর মা যা হয়েছেন, তাই নিয়ে আলোচনা চলবে এবং এই আলোচনা করার প্রয়োজনও আছে। আমরা যত আত্মসমালোচনা করব, তত বেশি করে এগিয়ে যাব সুস্থ প্রযুক্তির পথে।
গীতায় আছে– ‘পরিবর্তনই জীবনের নিয়ম’। মানুষ একসময় গুহায় বাস করত, তারপর সেই গুহা থেকে বেরিয়ে আর গাছ থেকে নেমে এত হাজার হাজার বছরে মানুষই বানিয়েছে তাদের জগৎ। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত আবহ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত। কাজেই, নিঃসন্দেহে এআই আমাদের ভবিষ্যৎ। এই এআইকে সম্বল করে আমরা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে নতুন করে গড়তে পারব কি না বা সবকিছু ধ্বংস হয়ে আবার গুহা ও গাছমানবের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা কিন্তু পুরোটাই মানুষের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে! শেষ কথা কে বলবে? মানুষ নাকি যন্ত্র? আমরাই বা কী বলব? মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ নাকি প্রযুক্তি?
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি নির্ভর ভবিষ্যতের গায়ে কী লেখা আছে বা মানুষ তার গায়ে কী লিখবে, তা কিন্তু এখনও রয়েছে কালের গর্ভে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved