
আমাদের সংবিধান শুরু হয়: ‘উই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া’, দিয়ে এই উই, এই ‘আমরা’ কারা তবে? আমরা ভারতবাসীরাই তো এই সংবিধান রচনা করেছি, লাগু করেছি, নিজেদেরকে নিজেরাই অর্পণ করেছি এই সংবিধান। তাই এই প্রজাতন্ত্রে যাঁরা বিচারাধীন হয়ে (under adjudication) ভোট দিতে পারছেন না এবার, তাঁরা কি ‘আমরা’ থেকে ‘ওরা’ হয়ে গেলেন তবে?
প্রচ্ছদের ছবি সুখময় সেন
২০ বছর বয়সে প্রথম মিছিলে হেঁটেছি। অভয়ার জন্য। সেই মিছিলে আমার মা-ও হেঁটেছিলেন, মায়েরও জীবনে প্রথম মিছিল অভয়ার জন্য। সেই মিছিলে অনেক মানুষ দেখেছি, অনেক দিদিদের, কাকিমণিদের দেখেছি। তাঁরাও যে প্রথম মিছিলে হাঁটছেন, সেটা বুঝতে পারছিলাম। এমন একটা মিছিল, যে-মিছিল কোনও ‘ভোটের মিছিল’ নয়, কোনও ‘দলের মিছিল’ নয় । রাত জেগে টি-শার্টে লিখেছি: ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।

আমি গয়না ডিজাইন করি। সবার গয়না তৈরি করলাম যোনির আদলে, পিতলের প্রদীপ, তামার কুশি– এইসব দিয়ে তৈরি বিশেষ গয়নাগুলি অনেকেই পরলেন, রাত দখল হল, অনেক মেয়ে পথে নামল। এই সব কিছুই হল একটি স্বাধীন দেশে, যাকে আমরা বলেছি একটি ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’। অভয়া ন্যায় পেলেন কি না বা অভয়ার মা একটি দলের হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে ন্যায় আদায় করতে পারবেন কি না– এসবের বাইরেও আমাদের এই নাগরিকদের পথে নামা খুব মনে রাখার মতো একটা বিষয়। আজ যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন খবরে দেখছি আজই ভোটের তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে, এমন এক বৃদ্ধ মানুষ রানাঘাটে ট্রাইব্যুনালের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন মানুষের জীবন নিয়ে নেবে! কার জন্য ভোট তবে? কার ভালোর জন্য?

আমাদের বাড়িতে যে-পিসি রান্না করেন, তিনি আমার জন্মের আগে থেকে আমাদের পাড়ায় রান্নার কাজ করেন। এবার তাঁর নাম কাটা গিয়েছে। পিসি গরিব। তাঁর মা-বাবা-দাদা মরে গিয়েছে অনেক দিন আগে। মরে যাওয়া মানুষের ডেথ সারটিফিকেট যে রাখতে হয়, পিসি সেটাও তো জানেন না। অথচ পিসিরা এই জেলার মানুষ, রাজবংশী মানুষ। গরিব, খেটে-খাওয়া শ্রমিক মানুষ ওঁরা। কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, কেউ এক চা বাগান থেকে অন্য চা বাগান। কেউ নানা জায়গা ঘুরেছেন, থেকেছেন, রাষ্ট্র তাঁদের স্থায়ী কাজ দেয়নি। কিন্তু অনেক বার ভোট দেওয়ার পর এটা সেটা সাতরকমের কাগজ চাইছে। এই গরিব শ্রমিক মানুষেরা, যাঁরা অনেকেই মহিলা, অনেকেই গরিব হিন্দু, কেউ জনজাতির মানুষ বা দিনমজুর মুসলিম– তাঁরা কি কাগজ, অধিকার, আদালত, ট্রাইব্যুনাল বোঝেন?

এই যে ২৬,০০০ শিক্ষকের চাকরি গেল, তার মধ্যে সবাই অসৎ পথে চাকরি পেয়েছিল, এমন জোর দিয়ে তো বলতে পারেননি দণ্ডমুন্ডের কর্তারা। তবুও দোষী নয়, অসৎ নয় এমন অনেকেরই তো চাকরি গেল। ঠিক যেমন অনেকের ভোট দেওয়ার অধিকার এখনও বিচারের অধীন। তাঁরা তো এবার অন্তত ভোট দিতে পারছেন না– এমনটাই তো পরিস্থিতি। এই গণতন্ত্র সবাইকে নিয়ে নয়? এই যে আমাদের সংবিধান শুরু হয়: ‘উই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া’, দিয়ে এই উই, এই ‘আমরা’ কারা তবে? আমরা ভারতবাসীরাই তো এই সংবিধান রচনা করেছি, লাগু করেছি, নিজেদেরকে নিজেরাই অর্পণ করেছি এই সংবিধান। তাই এই প্রজাতন্ত্রে যাঁরা বিচারাধীন হয়ে (under adjudication) ভোট দিতে পারছেন না এবার, তাঁরা কি ‘আমরা’ থেকে ‘ওরা’ হয়ে গেলেন তবে? আমাদের সংবিধানের মূল ভাবনা যাঁর– সেই বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন এসে গেল। তিনি কি এমন একটা দিন চেয়েছিলেন?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved