

রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলাতে পারে, শাসকের নাম বদলাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাবান যখন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মনে করেন, তখন পুরনো মানসিকতা নতুন পোশাকে ফিরে আসে। প্রেসিডেন্সির সেই চুম্বন থেকে আজকের সরশুনা, মাঝখানে কত সরকার, কত নির্বাচন, কত উন্নয়নের ঘোষণা পেরিয়ে এসেছি আমরা। অথচ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা যদি থেকে যায়, তবে সময়ের অগ্রগতিকে সামাজিক অগ্রগতি বলা কঠিন।
প্রচ্ছদ শিল্পী: দীপঙ্কর ভৌমিক
কিছু খবর মানুষকে চমকে দেয়। কিছু খবরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শহরটাকেই নতুন করে চিনতে হয়। সরশুনার ঘটনাটি আমার কাছে দ্বিতীয় ধরনের। ছেলেবেলায় বন্ধু পবিত্রর বাড়িতে যেতাম সরশুনায়। সেই সময় পাড়াটির নামের সঙ্গে কোনও ভয়ের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল না। ছিল বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, চেনা রাস্তা, বিকেলের আলো।
এত বছর পর সংবাদপত্রে সেই সরশুনার নাম পড়ছি সম্পূর্ণ অন্য এক কারণে। অভিযোগ, এক ১৩ বছরের কিশোরীকে চুম্বন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৮ বছরের এক তরুণ, তাঁর বাবা এবং এক বন্ধুকে মারধর করা হয়। অস্ত্র দেখিয়ে তাঁদের পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় এবং নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় হাঁটানো হয়। এই ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
একটি ১৩ বছরের মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। তার বয়সের কারণে সম্পর্ক, সম্মতি এবং সম্ভাব্য অপরাধের প্রশ্নগুলি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা দরকার। কিন্তু সেই বিচার করার অধিকার কোনও পরিবারের ব্যক্তিগত ক্রোধের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। অভিযোগ থাকলে পুলিশ আছে, শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে, আদালত আছে। তার পরিবর্তে কাউকে আটকে রেখে মারধর করা, অস্ত্রের ভয় দেখানো, তার বাবাকে ডেকে এনে অপমান করা হলে, তা আর নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রকাশ্য প্রদর্শন।

সরশুনার ঘটনাটি আমাদের পরিচিত একটি সামাজিক অসুখের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেই অসুখের নাম ‘নীতিপুলিশি’। প্রেম ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করার সামাজিক আকাঙ্ক্ষা ভারতীয় সমাজে নতুন নয়। বদলেছে তার পোশাক, মঞ্চ এবং প্রচারের মাধ্যম। কখনও পরিবারের সম্মান, কখনও ধর্ম, কখনও জাতপাত, কখনও সংস্কৃতির অজুহাতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে পাহারা দেওয়ার চেষ্টা চলে। প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষ কোথায় বসবেন, কার হাত ধরবেন, কাকে বিয়ে করবেন, তাঁদের সম্পর্ক পরিবারের পছন্দের কি না– এসব প্রশ্নে সমাজের একাংশ এমন কর্তৃত্ব দাবি করে, যেন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও পরিবারের সম্পত্তি।
১৪ ফেব্রুয়ারি এলেই ভারতের নানা প্রান্তে এই প্রবণতা প্রকাশ্যে দেখা যায়। ভালোবাসার দিন উদযাপন করতে বেরনো তরুণ-তরুণীদের পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া, সম্পর্কের বৈধতা নিয়ে জেরা করা, অভিভাবকদের ফোন করার হুমকি দেওয়া, পার্ক থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, এমনকী মারধরের ঘটনাও সংবাদে এসেছে। ২০২৫ সালের ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের ইন্দিরাপুরমে লাঠি হাতে একদল ব্যক্তি পার্কে ঘুরে ঘুরে যুগলদের জেরা করেন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ মামলা করে এবং একজনকে গ্রেফতার করে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেরলের কোঝিকোড়ের কনাড সমুদ্র সৈকতে মহিলাদের একটি দল ঝাঁটা হাতে যুগলদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। ঘটনাটি ঘিরে নীতিপুলিশির অভিযোগ উঠেছিল (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)। এই ঘটনাগুলির সঙ্গে সরশুনার সরাসরি তুলনা করা যায় না। কোথাও হয়রানি, কোথাও তাড়িয়ে দেওয়া, কোথাও গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ। কিন্তু প্রত্যেকটির নেপথ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন রয়েছে: কোনও রাজনৈতিক সংগঠন, পরিবার কিংবা স্বঘোষিত সংস্কৃতির রক্ষককে কে অধিকার দিয়েছে, অন্য মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর পাহারা বসানোর?
ভারতের সংবিধান ব্যক্তিগত নৈতিকতাকে অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কাউকে দেয় না। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত। কোনও সম্পর্কের মধ্যে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু দু’জন মানুষ প্রেম করছেন বলে তাঁদের জেরা করা, হুমকি দেওয়া কিংবা অপমান করা কোনও সাংস্কৃতিক অধিকার হতে পারে না।
যে সমাজ প্রেমিক-প্রেমিকার হাত ধরা দেখে বিপদ অনুভব করে, অথচ সেই হাতই যখন অন্য মানুষের গায়ে আঘাত করে তখন নীরব থাকে– তার নৈতিকতার ভিত নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আমার নিজের জীবনেও এমন কিছু স্মৃতি রয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক বন্ধু তার বান্ধবীকে নিয়ে ঢাকুরিয়া লেকে হাত ধরে বসে গল্প করছিল। চারপাশে আলো-আঁধারি। ঘোর বাম আমলের সেই সময়ে পুলিশ তাঁদের হেনস্তা করেছিল বলে আমার মনে আছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের (তখনও বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি) দুই তরুণ-তরুণী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে হলুদ ট্যাক্সির ভিতরে চুম্বন করায় পুলিশ বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু নিয়েছিল। অ্যাপ ক্যাব তখনও আমাদের কল্পবিজ্ঞানের জগতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের মৌখিক অপমান সহ্য করতে হয়েছিল। সেই ঘটনাটিও আমার স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি। এগুলির পক্ষে স্বাধীন নথি বা সংবাদসূত্র আমার হাতে নেই। তাই এগুলিকে যাচাই করা ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দাবি করছি না। তবু ব্যক্তিগত স্মৃতিরও একটি সামাজিক তাৎপর্য থাকে। যে শহরে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত সান্নিধ্যও কখনও পুলিশের হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে উঠেছিল বলে মনে পড়ে, সেখানে আজ সরশুনার ঘটনা দেখে প্রশ্ন জাগে– আমরা সত্যিই কতটা বদলেছি?

রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলাতে পারে, শাসকের নাম বদলাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাবান যখন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মনে করেন, তখন পুরনো মানসিকতা নতুন পোশাকে ফিরে আসে। প্রেসিডেন্সির সেই চুম্বন থেকে আজকের সরশুনা, মাঝখানে কত সরকার, কত নির্বাচন, কত উন্নয়নের ঘোষণা পেরিয়ে এসেছি আমরা। অথচ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা যদি থেকে যায়, তবে সময়ের অগ্রগতিকে সামাজিক অগ্রগতি বলা কঠিন।
কলকাতা একসময় ‘হোক কলরব’-এর প্রতিবাদ দেখেছে। পরে ‘হোক চুম্বন’-এর মতো প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়েও তরুণ প্রজন্ম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভালোবাসার অধিকার নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। এই প্রতিবাদগুলির মধ্যে শুধু প্রতিরোধ ছিল না, ছিল একটি নাগরিক ঘোষণা। মানুষের শরীর ও সম্পর্ক নিয়ে সমাজের অযাচিত কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া হবে না।
এই শহর রিজওয়ানুর রহমানকে ভুলে যায়নি। ২০০৭ সালে রিজওয়ানুর রহমান ও প্রিয়াঙ্কা টোডির বিয়ে, তাঁদের সম্পর্কে পরিবারের আপত্তি, পুলিশি হস্তক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে রেললাইনের ধারে রিজওয়ানুরের মৃতদেহ পাওয়ার ঘটনা কলকাতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিষয়টি শুধু দু’টি পরিবারের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবারের সামাজিক ও আর্থিক প্রভাব, একজন তরুণের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। সুপ্রিম কোর্টের ২০১১ সালের রায়ে এই দম্পতির বিবাহিত জীবনে পুলিশি হস্তক্ষেপের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা হয়েছে। (Ashok Kumar Todi v. Kishwar Jahan, Supreme Court, ২০১১)। রিজওয়ানুরের মৃত্যুকে সরশুনার ঘটনার সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। দু’টি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু রিজওয়ানুরের স্মৃতি আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: মানুষের সঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা কি সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার কাছে পরাজিত হবে?

দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তে গড়ে ওঠা সম্পর্ক পরিবারের আপত্তিতে বাতিল হয়ে যেতে পারে না। সম্পর্কের মধ্যে প্রতারণা, জবরদস্তি কিংবা অন্য কোনও অপরাধের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের ওপর সামাজিক শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া এবং অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সরশুনায় সেই পুরনো প্রশ্নই আবার ফিরে এসেছে। পারিবারিক সম্মানরক্ষার নামে অন্যের শরীরকে অপমান করা যায়? একটি সম্পর্কের ওপর আপত্তি থাকলে তার শাস্তি কি সেই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত মানুষটির বাবা ও বন্ধুকেও ভোগ করতে হবে? এখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্মিলিত অপমানের রাজনীতি। একজনকে শাস্তি দিতে গিয়ে তাঁর পরিবারকে অপমান করা, তাঁকে নগ্ন করে জনসমক্ষে হাঁটানো, সেই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, এসবের মধ্যে শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, মানুষটিকে সামাজিকভাবে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতাও কাজ করে।
২০১৪ সালে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হোস্টেলে মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহকে কেন্দ্র করে এক জরি-শ্রমিক কোরপান শাহকে মারধর করে হত্যার ঘটনা সংবাদে এসেছিল। ঘটনার বিবরণ ও দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রতিবেদনই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এখানে সেই ঘটনার প্রতিটি আইনি খুঁটিনাটি পুনর্গঠন আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার মনে পড়ে ঘটনাটির ভয়াবহ মূল প্রশ্নটি: সন্দেহের ভিত্তিতে একজন মানুষকে পিটিয়ে মারার অধিকার কারও আছে? কোরপান শাহ থেকে সরশুনা, এই দুই ঘটনার মাঝখানে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে। শহরের গায়ে আরও আলো জ্বলেছে, মানুষের হাতে এসেছে স্মার্টফোন। অথচ একটি বিপজ্জনক প্রবণতা যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোরপান শাহের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহ কয়েকজনের হাতে বিচার করার অজুহাত হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ। সরশুনায় একটি সম্পর্ক এবং এক কিশোরীকে ঘিরে ক্ষোভের পরিণতি কীভাবে প্রকাশ্য অপমানের অভিযোগে পৌঁছল, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার। দু’টি ঘটনা এক নয়। একটিতে প্রাণহানির ঘটনা, অন্যটিতে শারীরিক নির্যাতন ও মর্যাদাহানির অভিযোগ। তাদের সমান করে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং উভয়ের মধ্যে যে বিপজ্জনক মানসিকতাটি চিনতে হয়, তা হল আইনের বিকল্প হয়ে ওঠার প্রবণতা! সন্দেহ প্রমাণ নয়, ক্ষোভ আইন নয়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্রোধ কোনও আদালত নয়।

কোরপান শাহের মৃত্যুর পরও যদি আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাই, সরশুনার ঘটনা আমাদের আবার সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আজ মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহ, কাল কোনও সম্পর্ক, পরশু অন্য কোনও সামাজিক বিধি। অভিযোগের বিষয় পাল্টাতে পারে, কিন্তু বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা থেকে গেলে বিপদও থেকে যায়। যে সমাজে অভিযোগই শাস্তির যথেষ্ট কারণ হয়ে ওঠে, সেখানে শেষপর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়। আজ যে মানুষটি অন্যকে ঘিরে জনতার ক্রোধে যোগ দিচ্ছেন, কাল তিনিও সেই জনতার ভুল সন্দেহের শিকার হতে পারেন।
আইনের শাসনের পরীক্ষা শুধু আদালতের রায়ে হয় না। হয় সেই মুহূর্তেও, যখন উত্তেজিত মানুষ নিজেকেই আইন বলে ভাবতে শুরু করে। কোরপান শাহের মৃত্যুর স্মৃতি এবং সরশুনার অভিযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতা শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থার নাম নয়, নিরপরাধকে জনতার শাস্তি থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থার নামও। একসময় জনসমক্ষে অপমানের সাক্ষী থাকত একটি পাড়া। এখন একটি স্মার্টফোন সেই অপমান কয়েক মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। সরশুনার ঘটনায় নগ্ন অবস্থায় হাঁটানোর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ভিডিওটির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি (২৬ অক্টোবর ২০২৬)।
ভিডিওটির সত্যতা, সম্পূর্ণতা এবং প্রেক্ষাপট তদন্তের বিষয়। কিন্তু এর বাইরেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। কেউ যদি অপমানের শিকার হন, তাঁর অপমানের দৃশ্য ছড়িয়ে দিয়ে কি আমরা তাঁকে দ্বিতীয়বার শাস্তি দিচ্ছি না?
যে মানুষটি রাস্তায় অপমানিত হয়েছেন, তাঁকে হয়তো পরদিন আবার কর্মস্থলে যেতে হবে, পরিচিত মানুষের মুখোমুখি হতে হবে, পরিবারের সঙ্গে বসতে হবে। কিন্তু ভিডিওটি থেকে যায়। অচেনা মানুষের চোখে তাঁর পরিচয় আটকে যায় কয়েক সেকেন্ডের একটি দৃশ্যে। যে অপমান একসময় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারত, প্রযুক্তি তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে। এখানে প্রযুক্তি অপরাধের সাক্ষ্যও হতে পারে, আবার অপরাধের সম্প্রসারণও হতে পারে। কোনও ভিডিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলে সেটি সংরক্ষণ করা দরকার। কিন্তু নিছক কৌতূহল মেটাতে, হাসাহাসি করতে কিংবা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করতে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া নাগরিক দায়িত্বের পরিচয় নয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের গতি বেড়েছে। কিন্তু তথ্যের সঙ্গে দায়িত্ববোধের গতি কি একই হারে বেড়েছে? সরশুনার ঘটনার পর আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। পুলিশ অভিযুক্তদের নিয়ে যে পদ্ধতিতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা কি মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কোরপান শাহকে মারধর করে হত্যার ঘটনা সংবাদে এসেছিল। ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তদের খালি গায়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে এবং জুতোহীন অবস্থায় এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশ এটিকে তদন্তের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে বলে সংবাদে উল্লেখ রয়েছে (২৭ অক্টোবর ২০২৬)।

এই ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে। যাঁদের বিরুদ্ধে অন্য মানুষকে নগ্ন করে অপমান করার অভিযোগ, তাঁদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের প্রকাশ্য অপমান গ্রহণযোগ্য? উত্তরটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। অভিযোগের বিচার হবে আইনে, অপমানের প্রতিশোধ দিয়ে নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তাঁকে প্রকাশ্যে হেয় করা, তাঁর মর্যাদা অকারণে ক্ষুণ্ণ করা কিংবা জনতার সামনে অপমানের বস্তুতে পরিণত করা ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গ্রেফতার ও হেফাজত-সংক্রান্ত নির্দেশিকায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁকে জনসমক্ষে প্রদর্শন বা প্যারেড না-করানোর কথা বলা হয়েছে (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশিত NHRC নির্দেশিকা)।
এই প্রশ্নে মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিছক আনুষ্ঠানিক হওয়া উচিত নয়। ২০২৪ সালে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় প্রকাশ্যে এক দম্পতিকে মারধরের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব ও পুলিশপ্রধানের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল এবং কমিশন নিজস্ব অনুসন্ধানকারী দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল (NHRC-র সরকারি বিবৃতি, ১ জুলাই, ২০২৪)। একইভাবে, ২০২৬ সালের মে মাসে হাওড়ায় অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় দড়ি বেঁধে জনসমক্ষে হাঁটানোর অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (২০ জুন, ২০২৬)। তাহলে সরশুনার ঘটনায় পুলিশি আচরণের প্রশ্নটিও কি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হবে না? অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের পোশাক, দড়ির ব্যবহার, জনসমক্ষে প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা এবং তদন্তের বিকল্প পদ্ধতি ছিল কি না, এসব বিষয়ে কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার।
পুলিশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। ঘটনার পুনর্নির্মাণ তদন্তের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু সেই পদ্ধতি যদি অভিযুক্তকে জনসমক্ষে অপমান করার রূপ নেয়, তবে তার বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশকেও আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের হাতে ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
শেখর কাপুরের ‘Bandit Queen’ ছবিতে বেহমাই গ্রামের সেই দৃশ্য মনে পড়ে। ফুলন দেবীকে নগ্ন করে গ্রামবাসীদের সামনে কুয়ো থেকে জল তুলতে বাধ্য করা হয়। দৃশ্যটির ভয়াবহতা শুধু তাঁর ওপর নির্যাতনে নয়, সেই নির্যাতনকে জনসমক্ষে প্রদর্শনের মধ্যেও নিহিত। মানুষের শরীরকে অপমানের ভাষায় পরিণত করে ক্ষমতা নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে।

সরশুনার ঘটনার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু জনসমক্ষে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগের মধ্যে একই ধরনের অপমানের ভাষা চিনতে অসুবিধা হয় না। মানুষের শরীরকে অসহায় করে, তার সামাজিক নিরাপত্তা ভেঙে দিয়ে, তাকে অন্যের ইচ্ছার অধীন করে দেওয়ার চেষ্টা। এই আচরণের মধ্যেই মধ্যযুগীয় মানসিকতার চিহ্ন রয়ে গিয়েছে। এই মানসিকতা শুধু গ্রামাঞ্চলে, অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে কিংবা কোনও একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষিত মানুষও তা বহন করতে পারেন। আধুনিক পোশাকের আড়ালে পুরনো সামাজিক কর্তৃত্ব বেঁচে থাকতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মানুষ অন্যের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে পারে।
পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে ভারত। ডিজিটাল লেনদেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ অভিযান, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা– সব ক্ষেত্রেই আমরা দ্রুত এগতে চাই। অথচ একই সমাজে কোনও তরুণ-তরুণীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে জনতার আদালত বসতে পারে; কোনও নারীকে পোশাক বা চলাফেরার জন্য হেনস্তা করা হতে পারে; কোনও দম্পতিকে ধর্ম কিংবা জাতের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খাপ পঞ্চায়েতের নামে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও তথাকথিত সম্মানরক্ষার যুক্তিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর হস্তক্ষেপের ঘটনাও আমাদের পরিচিত। অর্থাৎ, একদিকে আমরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখছি, অন্যদিকে সমাজের একাংশ এখনও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, ভালোবাসা ও স্বাধীনতার ওপর মধ্যযুগীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই দুই ভারত কি সত্যিই একই সময়ে বাস করছে?
এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরোধিতা করার প্রশ্ন নেই। উন্নয়ন দরকার, প্রযুক্তিও দরকার। কিন্তু অর্থনীতির আকার বাড়লেই সমাজের নৈতিক পরিণতি ঘটে না। মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে, হাতে স্মার্টফোন পৌঁছতে পারে, অথচ অন্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি স্মার্টফোন মানুষের হাতে পৃথিবীর বিপুল তথ্য তুলে দেয়। অন্য প্রান্তে কী ঘটছে, তা মুহূর্তে জানতে পারি। ভিডিও ধারণ করতে পারি, প্রমাণ সংরক্ষণ করতে পারি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারি। তবু প্রযুক্তির এই বিস্তারের সঙ্গে সহমর্মিতার বিস্তার কি সমান তালে ঘটছে? একজন মানুষকে প্রকাশ্যে অপমান করা হলে সেই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁর মানসিক আঘাত, পরিবারের অসহায়তা, পরবর্তী জীবনের অনিশ্চয়তা কি একই গুরুত্ব পায়? আমরা কি একবারও ভাবি, একটি ভিডিও বারবার দেখার কৌতূহল কারও জীবনে কত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে?

সভ্যতা কেবল যন্ত্রের উন্নতি নয়। সভ্যতা হল নিজের ক্ষমতার সীমা বুঝতে শেখা, অন্যের জীবন সম্পর্কে কৌতূহল থাকলেও তার ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান করা। প্রকৃত আধুনিকতা শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট নয়, অন্য মানুষকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার ক্ষমতাও।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নীতিপুলিশির ভিতরে কাজ করে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি বিশেষ ব্যবস্থা। পরিবার, পাড়া, ধর্মীয় পরিচয়, জাতপাত, রাজনৈতিক সংগঠন, কখনও পুলিশ, এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠী মিলে ঠিক করতে চায় কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক সম্মানজনক এবং কার শরীর কীভাবে প্রকাশ পাবে। এই নিয়ন্ত্রণের বোঝা প্রায়ই নারীদের ওপর বেশি পড়ে। তাঁদের পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব, যৌনতা, এমনকী ধূমপানের মতো ব্যক্তিগত অভ্যাসও সামাজিক নজরদারির বিষয় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কলকাতার নেতাজিনগরে তরুণীদের ধূমপানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বয়স্কদের হেনস্তার একটি খবরের কথা আমার মনে পড়ে। তবে সেই নির্দিষ্ট ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা সংবাদসূত্র এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই।
এই নজরদারির অভ্যন্তরে রয়েছে এক ধরনের সামাজিক অসাম্য। কে কাকে প্রশ্ন করবে, কে কার আচরণকে অশালীন বলবে, কে কার শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করবে, এই অধিকারগুলি সমানভাবে বন্টিত নয়। যারা নিজেদের সামাজিক কর্তৃত্বের অধিকারী বলে মনে করেন, তাঁরা অন্যের স্বাধীনতাকে খুব সহজেই শৃঙ্খলাভঙ্গ বলে চিহ্নিত করতে পারেন। সমস্যাটি এখানেই। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা তখন আর ব্যক্তির থাকে না। তা হয়ে ওঠে সমাজের অনুমোদনসাপেক্ষ। সরশুনার ঘটনার পর স্থানীয় ক্ষোভের মধ্যে অভিযুক্ত পরিবারের বাড়ি ভাঙচুরের খবরও এসেছে। সেই ক্ষোভের কারণ বোঝা যেতে পারে, কিন্তু বাড়িতে হামলা চালানোর অধিকার জনতার তৈরি হয় না। কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাঁর পরিবারকে আক্রমণ করার অনুমতি কাউকে দেওয়া যায় না।
একইভাবে, অভিযুক্তদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁদের জনসমক্ষে অপমান করা হলে সেটিকেও নিছক প্রতিশোধের আনন্দ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নাগরিকের হাতে বিচার যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, রাষ্ট্রের হাতেও অপমান বিচার প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
মানবাধিকারের অর্থ এই নয় যে, অপরাধের অভিযোগকে হালকা করে দেখা হবে। বরং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এমনভাবে নিতে হবে, যাতে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াটিই অভিযুক্তের কথিত আচরণের অনুকরণে পরিণত না হয়। সরশুনার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, চিকিৎসার নথি এবং কথিত অস্ত্রের ব্যবহার যাচাই করা দরকার। কিশোরীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, অভিযুক্তদের জনসমক্ষে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি এবং তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে।
আমাদেরও নিজেদের দিকে তাকানো দরকার। কোনও তরুণ-তরুণীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হলে আমরা কি প্রতিবাদ করি? এমন ঘটনার ভিডিও দেখলে সেটি আরও ছড়িয়ে দিই, না ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা করি? রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অপরাধের বিচার করি, না অপরাধের প্রকৃতি দেখে অবস্থান নিই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নাগরিক সমাজের চরিত্র ধরা পড়ে। সরশুনায় আমার ছেলেবেলার স্মৃতি রয়েছে। পবিত্রর বাড়িতে যাওয়ার সেই দিনগুলো আর ফিরবে না। কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে আজকের সংবাদ জুড়ে গিয়ে একটি অস্বস্তিকর উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। যে শহরকে ভালোবাসি, তার প্রতি ভালোবাসা মানে তার অন্যায়কে আড়াল করা নয়। বরং অন্যায়ের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং রাষ্ট্রের কাছেও মানবাধিকারের হিসাব চাওয়া।

কলকাতা শুধু একটি শহর নয়, একটি সাংস্কৃতিক দাবি। এখানে কবিতা লেখা হয়, সিনেমা তৈরি হয়, মানুষ স্বাধীনতার কথা বলে, প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। সেই শহরের কোনও গলিতে যদি মানুষকে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগ ওঠে, আর পরদিন অভিযুক্তদেরও জনসমক্ষে অপমানের দৃশ্য তৈরি হয়, তবে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি একই বৃত্তের মধ্যে ঘুরে চলেছি? একদল মানুষ অন্যকে অপমান করে নিজেদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। তারপর রাষ্ট্রের আচরণেও যদি সেই অপমানের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, দর্শক হাততালি দেন, সংবাদমাধ্যম ছবি ছাপে, সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ঘুরতে থাকে, তখন একটি প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে যায়: এই পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের মর্যাদা কোথায়?
ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও বারবার বলেছে, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া কোনও ব্যক্তিকে আইন সম্মত প্রক্রিয়ার বাইরে অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শিকার করা যায় না। এর অর্থ এই নয় যে, পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না। বরং সেই ব্যবস্থাগুলি যথাযথ, প্রয়োজনীয় এবং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সরশুনার ঘটনায় অভিযোগ, কয়েকজন মানুষকে নগ্ন করে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছিল। যদি তদন্তের সময় অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় প্রকাশ্য অপমান ঘটে থাকে, তবে সেই অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা উচিত। দু’টি পরিস্থিতি এক নয়। নাগরিকের হাতে নির্যাতন এবং পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার সময় পুলিশের আচরণের আইনগত কাঠামোও এক নয়। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় অপমানকে ন্যায়বিচারের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের কাছে একটি যুক্তিসঙ্গত আবেদন রাখা যায়। প্রকাশিত অভিযোগ ও দৃশ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে কমিশনগুলি যেন নিজেদের আইনগত এক্তিয়ার এবং প্রযোজ্য পদ্ধতি অনুসারে বিষয়টি বিবেচনা করে। প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া, উপলব্ধ তথ্য পরীক্ষা করা এবং পুলিশি আচরণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনও প্রাথমিক ইঙ্গিত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এটি কোনও নির্দিষ্ট পুলিশকর্মীকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করার দাবি নয়। এটি একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার দাবি। কমিশনের কাছে আরও জানতে চাওয়া যেতে পারে– ঘটনাস্থলে অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়ার সময় কী তদন্তগত প্রয়োজন ছিল, তাঁদের পোশাক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন, প্রকাশ্য উপস্থিতি এড়ানোর কোনও বিকল্প ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। প্রয়োজন হলে পুলিশি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পরীক্ষা করে কমিশন তার নিজস্ব এক্তিয়ারের মধ্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে।
একইসঙ্গে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মূল মামলার তদন্ত যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং অভিযোগকারিণী নাবালিকার পরিচয়, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা যেন সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা এবং অভিযোগকারিণীর সুরক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ন্যায়বিচারের একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ায় দু’টিই সমান গুরুত্ব পায়। আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু এই নয় যে, অপরাধের অভিযোগে কত দ্রুত গ্রেফতার করা হল। পরীক্ষাটি এটিও, তদন্তের প্রতিটি পর্যায়ে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা আইনসম্মত ও সংযতভাবে প্রয়োগ করছে কি না।
আমাদের প্রতিবাদ হওয়া উচিত মানুষের মর্যাদার পক্ষে। কোনও অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাঁকে দোষী ঘোষণা করা যেমন অন্যায়, তেমনই কারও ব্যক্তিগত আচরণের অজুহাতে তাঁকে হেনস্তা করার অধিকারও কারও নেই। যাঁরা এমন দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে দেন, তাঁদেরও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবা দরকার। কোনও ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং অপমানের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া এক কাজ নয়। ভুক্তভোগীর পরিচয়, গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার দায় আমাদের সকলের।
সরশুনার ঘটনায় তাই দাবি হওয়া উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং পুলিশি আচরণ সম্পর্কে ওঠা প্রশ্নের যথাযথ পর্যালোচনা। কাউকে আগাম অপরাধী ঘোষণা না করেও এই দাবিগুলি জোরের সঙ্গে তোলা যায়।
মানবাধিকার কোনও অভিযুক্তকে শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়ার উপায় নয়। মানবাধিকার হল, শাস্তি নির্ধারিত হবে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় এবং সেই প্রক্রিয়ার রক্ষকরাও থাকবেন আইনের সীমার মধ্যে। কোরপান শাহের মৃত্যুর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সন্দেহের ভিত্তিতে জনতার শাস্তি কত ভয়াবহ হতে পারে। রিজওয়ানুরের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বাধীনতার প্রশ্নে সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ব্যবহার কত জটিল হয়ে উঠতে পারে। আর সরশুনার অভিযোগ আমাদের আবার জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য করে, আমরা কি এখনও অন্য মানুষের শরীর ও ব্যক্তিগত জীবনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বিষয় বলে মনে করি?

এই ঘটনাগুলির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাদের এক সূত্রে বেঁধে কোনও সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামনে একটি কঠিন নৈতিক প্রশ্ন রাখে: অন্যের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করার আগে আমরা কি তার মানুষ হয়ে থাকার অধিকারটুকু স্বীকার করি? একটি সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের আচরণে যতটা প্রকাশ পায়, তার চেয়েও বেশি ধরা পড়ে সবচেয়ে অসহায় মানুষের সঙ্গে সে কেমন ব্যবহার করে, তাতে। যে মানুষটি আজ রাস্তায় অপমানিত হলেন, তাঁর পাশে দাঁড়ানো মানে তাঁর জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু এটুকু বলা: আপনার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু আপনাকে মারধর করার, আটকে রাখার, নগ্ন করে ঘোরানোর কিংবা আপনার অপমানকে বিনোদনে পরিণত করার অধিকার কারও নেই। এই কথাটি বলার জন্য একই মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। একই ধর্ম, একই শ্রেণি, একই রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা একই নৈতিক বিশ্বাসেরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু এটুকু স্বীকার করা যে, মানুষের মর্যাদা কোনও পুরস্কার নয়, সমাজ অনুমোদন করলে তবেই যা পাওয়া যায়।
আমরা যদি এই ন্যূনতম সত্যটুকু ভুলে যাই, তবে নগ্ন শরীরের ভিডিও দেখে ক্ষুব্ধ হওয়ারও কোনও অর্থ থাকে না। কারণ তখন আমরা শুধু অন্যের শরীরের অপমান দেখছি, নিজেদের সভ্যতার নগ্নতাকে দেখতে চাইছি না। সরশুনার রাস্তায় কী ঘটেছিল, তার সম্পূর্ণ সত্য তদন্তে উঠে আসুক। কিন্তু সেই সত্যের অপেক্ষায় আমাদের বিবেক যেন ঘুমিয়ে না পড়ে। একটি মানুষকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটানো যায়। তার শরীরকে অপমান করা যায়, তার দুর্বলতাকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা যায়। কিন্তু সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কী হয়ে উঠছি– সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে নিজেদের এবং নিজেদের নগ্নতাকে আড়াল করা যায় কি?
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved