

এই নীরব যাত্রার সুযোগ চালু করা হয়েছে শুধুমাত্র ‘প্রিমিয়াম সার্ভিসেস’-এর আওতায়। প্রিমিয়াম সার্ভিস মানে হল বিলাসবহুল গাড়ি এবং তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া, মাঞ্জা দেওয়া ভাড়া। অ্যাপ ক্যাবে সাধারণ যাত্রার তুলনায় এই যাত্রা বেশ মহার্ঘ। খুঁতখুঁতে মানুষরা বিড়বিড় করে বলছেন, ‘দামি মানুষ না হলে কি চুপ করে থাকারও অধিকার নেই?’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘সাধারণ’ যাত্রায় অ্যাপ মারফৎ আগে থেকেই চুপচাপ রাইড-চাওয়ার অপশন এখনও পর্যন্ত আসেনি।
–ওটিপি ৯৩০১। চলুন।
–থ্যাংক ইউ স্যার। অফিস ফেরত মনে হচ্ছে তো। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে। আসলে আমিও খুব ক্লান্ত। সেই সকাল সাতটায় গাড়ি বের করেছি জানেন! ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা সাড়ে বারোটা হয়ে যাবে। তাও এই অ্যাপ ক্যাবের সেবা করার প্রথমদিকে যা রোজগারপাতি হত, এখন তার অর্ধেকও হয় না। কী করব বলুন। লড়াইটা তো চালিয়ে যেতে হবে, না কি?
–হুমম্।
–রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখছেন? আগে যে রাস্তা আধঘণ্টায় যেতাম, এখন কপাল খারাপ থাকলে সেটুকু যেতেই এক ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। আপনারা শুধু সার্জ, বেশি ভাড়া বলে অভিযোগ করেন। আমাদের পকেটে দিনের শেষে আর কতটুকু ঢোকে? সবই কোম্পানি নিয়ে নেয়।
–বুঝলাম।
–তার ওপরে পার্কিং নিয়ে মহা সমস্যায় পড়েছি আজকাল। মানছি ব্যস্ত রাস্তা। কিন্তু প্যাসেঞ্জারকে লোকেশনে আসার জন্য দু’-চার মিনিট বাড়তি সময় তো দিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশগুলো সব তক্কে তক্কে থাকে। সুযোগ পেলেই কেস দিয়ে দেয়। আরে! খেটে খাওয়া মানুষদের থেকে জোরজবরদস্তি তোলাবাজি করে আর কতকাল? ওদিকে বড় বড় সব রাঘববোয়ালেরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আমার আপনার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
–আপনি একটু থামবেন প্লিজ? আমার এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
–ওহহ্। শরীরটা খারাপ লাগছে না কি স্যর? অবশ্য শরীরকে দোষ দিয়েই বা কী হবে? যা খেয়ে প্রতিটা দিন কাটাচ্ছি, তার অধিকাংশই তো ভেজাল। এমনকী ওষুধেও ভেজাল। এযুগে বিষেও ভেজাল। হি হি। আমাদের আগের জেনারেশনকে কি এত সহজে কাবু হয়ে যেতে দেখেছি বলুন? তাঁরা খাঁটি জিনিস খেতেন। শরীর চনমনে থাকত। মন তাজা। খাটতে পারতেন। আর আমরা?
–হাতজোড় করছি। আপনি দয়া করে চুপ করুন এবারে।
–ঠিক আছে। আপনার কথা বলতে ভালো না-লাগলে থেমে যাচ্ছি। অনেকেই এমনটা শুরু করেছেন এখন। বেশি চুপচাপ থাকলেও তো বিপদ আমাদের। অনেক সময় আমারও কথা বলতে ইচ্ছে করে না। অবাক হয়ে দেখেছি, ট্রিপ শেষ করার পর সেই প্যাসেঞ্জার খুব খারাপ রেটিং দিয়েছেন আমাকে। আবার কমেন্টে লিখেছেন, আমি না কি অ্যাবনর্মালি সাইলেন্ট ছিলাম। আনসোশাল। অস্বাভাবিক রকমের চুপচাপ। আমরা কোনদিকে যাই বলুন তো?
–কথা বলতে ইচ্ছে করছে কি না, তা প্যাসেঞ্জারকে জিজ্ঞাসা করে নিলেই তো সমস্যা মিটে যায়।
–কথার পিঠে কথা ওঠে স্যর। হাই হ্যালো দিয়ে শুরু করে এক-দেড় ঘণ্টার ট্রিপে কোনও কোনও যাত্রীর সঙ্গে যত কথা হয়, তা দিয়ে লেখা হয়ে যেতে পারে একখানা গোটা উপন্যাস। কিন্তু যদি কাউকে প্রশ্ন করি, ‘আপনার কি আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে’ কিংবা ‘ক্যায়া ম্যায় আপকে সাথ বাত কর সকতা হুঁ’– কী অদ্ভুত এবং বিরক্তিকর শোনাবে না কথাগুলো?
–আপনি এবারে থামুন। প্লিজ থামুন। এসিটা আরও একটু বাড়িয়ে দিন। গাড়ি আরও ঠান্ডা হোক। আমি স্তব্ধতা চাইছি।
–যো হুকুম স্যার। তবে বড় বিচিত্র এই দুনিয়া।
আমরা বড় হয়েছি যখন, বিনা ঝগড়ায় কখনও হলুদ ট্যাক্সিতে উঠতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না। যাত্রী না নিতে চাওয়া, মিটার ডাউন না-করা, মিটারের যন্ত্রে কারসাজি, মিটারের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া– ঝগড়ার কারণ ছিল বৈচিত্রময়। গাড়িতে ওঠার সময়েই হয় চালক কিংবা যাত্রী– এই দু’ পক্ষের এক পক্ষ জিতে যেতেন। অধিকাংশ সময়ে জয়মাল্য পরতেন চালকই। জয়ী আর পরাজিতর মধ্যে তেমন কিছু কথাবার্তা হত না। অ্যাপ ক্যাবে চালকদের সৌজন্য সেই নিয়ম বদলে দিল। তবে গাড়িতে ওঠার পরেই চালকের উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং তারপরে পথে এলোমেলো কথোপকথন– এই ট্রেন্ডে বদল আসছে ক্রমশ। অ্যাপ ক্যাব সংস্থাগুলির কর্তাব্যক্তিরা যাত্রীদের মধ্যে স্তব্ধ থাকার এই সুপ্ত ইচ্ছের কথা বুঝেছেন। তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অ্যাপের মাধ্যমে প্রথমেই ঠিক করে নেওয়া যাচ্ছে ‘কনভার্সেশন লেভেল’। সেখানেই অপশন থাকছে ‘কোয়ায়েট রাইড’-এর। নীরব যাত্রা। অর্থাৎ, গাড়ির চালক প্রথমেই বুঝে যাবেন, বকবক করতে একেবারেই উৎসাহী নন ওই যাত্রী। ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি শহরে এই পরিষেবা চালু হলেও কলকাতায় এখনও আসেনি। তবে এই পরিষেবা নিয়ে ইতিমধ্যেই কিছু প্রশ্ন তুলেছেন নিন্দুকেরা।

জানা গিয়েছে, এই নীরব যাত্রার সুযোগ চালু করা হয়েছে শুধুমাত্র ‘প্রিমিয়াম সার্ভিসেস’-এর আওতায়। প্রিমিয়াম সার্ভিস মানে হল বিলাসবহুল গাড়ি এবং তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া, মাঞ্জা দেওয়া ভাড়া। অ্যাপ ক্যাবে সাধারণ যাত্রার তুলনায় এই যাত্রা বেশ মহার্ঘ। খুঁতখুঁতে মানুষরা বিড়বিড় করে বলছেন, ‘দামি মানুষ না হলে কি চুপ করে থাকারও অধিকার নেই?’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘সাধারণ’ যাত্রায় অ্যাপ মারফৎ আগে থেকেই চুপচাপ রাইড-চাওয়ার অপশন এখনও পর্যন্ত আসেনি। বেশ কিছু ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ ক্যাবের অন্দরমহলের খবর-দেওয়া ব্লগ বলছে, এই পরিষেবা চালু করার কোনও আশু পরিকল্পনা অ্যাপ ক্যাব সংস্থাগুলোর কাছে এখনই নেই।
আমার এক বন্ধু সম্প্রতি একটি অ্যাপ ক্যাব যাত্রা শেষ করে, গাড়ি থেকে নেমে, এক গাল হেসে বলেছিল, ‘কী যে শান্তভাবে এলাম! প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ড্রাইভারের হয়তো কোনও কারণে মনমেজাজ ভালো ছিল না। আমি কিন্তু ওঁকে ফাইভ স্টার রেটিং দেব।’ একটু থেমে ও আবার বলল, ‘সব ড্রাইভারই যদি এমন হত! একটু চুপচাপ থাকতে কার না ভালো লাগে বল্?’ দুনিয়ার কত শতাংশ যাত্রী নীরব রাইড বেছে নিয়েছেন, তা নিয়ে কোনও প্রকাশিত তথ্য নেই অ্যাপ ক্যাব সংস্থাগুলির তরফ থেকে। তবে এই বিষয়ে বেশ কিছু সমীক্ষা হয়েছে। আকর্ষণীয় তথ্য হল, ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সব যাত্রীদের জন্য নীরব সফরের সুবিধা থাকা উচিত। অনুমান করা যায়, এমন যাত্রার জন্য চাহিদা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ওয়াকিবহাল শিবিরের মানুষরা আশা করছেন, সাধারণ অর্থাৎ ইকনমি রাইডের জন্যও এমন পরিষেবা অ্যাপ সেটিংসের মাধ্যমে চালু হয়ে যাবে দ্রুত।

তবে মজার বিষয় হল, চুপ থাকার জন্য অ্যাপের তোয়াক্কা না-করে অনেকেই বিভিন্ন উপায় কিংবা কৌশলের জন্ম দিচ্ছেন। না, তাঁরা গাড়ি বুক করার অ্যাপের মধ্যে কোনও অপশনের সৃষ্টি করেননি। তাঁরা সাধারণ মানুষ। অ্যাপ ডেভেলপার নন। চুপ থাকার জন্য এক পক্ষ অন্য পক্ষের সঙ্গে কোনওরকম অস্বাভাবিক আচরণও করেননি। কিন্তু তাঁরা স্তব্ধ থেকেছেন নিজেদেরই তৈরি করা উপায়ে। সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট খুব জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিল সম্প্রতি। টানা তিন দিন, বিরক্তিকর অফিস মিটিংয়ের শেষে, বিমানবন্দর থেকে অ্যাপ গাড়ি বুক করেছিলেন এক যাত্রী। ক্লান্ত। শ্রান্ত। বিধ্বস্ত। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পোস্ট বলছে, ‘তখন আমার সোশাল ব্যাটারি শূন্য।’ গাড়িতে ওঠার পরেই চালক একটি ল্যামিনেট করা কার্ড এগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর দিকে। চারটি অপশন উল্লেখ করা ছিল সেখানে। নিঃশব্দ রাইড (পুরোপুরি শান্ত ও স্তব্ধ, কথা বলার জন্য কোনও জোরাজুরি নয়), থেরাপিস্ট রাইড (সারাদিন কী কী ঘটল আমার কাছে নিশ্চিন্তে উগরে দিতে পারেন, আমি শুনব), ট্যুরিস্ট রাইড (যেখান দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেই অঞ্চলের টুকটাক গল্প বলতে পারি), রেডিও রাইড (একটু পুরনো দিনের গানবাজনা শোনা যাক)। ওই যাত্রী শেষ অপশনটি বেছে নিয়েছিলেন। এই ‘আশ্চর্য’ সফর শেষে তিনি লিখছেন, ‘কিছুক্ষণ সময়, এই দুর্লভ থেমে-থাকাটা আমার জন্য খুব জরুরি ছিল।’

সাধারণ যাত্রীদের মনের কথা কি বুঝতে পারছেন আলট্রা-লাক্সারিহীন, প্রচলিত ক্যাবের চালকরাও? লেখাটি শুরু হয়েছিল যে চালকের গল্প দিয়ে, তাঁদের সংখ্যা কি বাড়ছে ক্রমশ? এক অদ্ভুত অ্যাপ ক্যাব চালকের কথা মনে পড়ছে। ‘আলাপ’ হয়েছিল বলা ঠিক হবে কি না জানি না। বলতে পারি, দেখা হয়েছিল। ওঁর গাড়িতে উঠলাম। উনি নিজের ঠোঁটের সামনে ডান হাতের তর্জনী ঠেকালেন। তারপর ভ্রু-জোড়া একবার দ্রুত উপরে তুলে নামিয়ে দিলেন। শরীরী ভাষা পড়তে অসুবিধা হয়নি। এর অর্থ ছিল, ‘চুপ থাকি। চলবে তো?’ আমিও ঘাড় নাড়িয়েছিলাম, উপর নিচে।
তবে বহে নিরন্তর অনন্ত রঙ্গ ধারা। এক প্রবাসী বন্ধু ফোনের ওপার থেকে গজগজ করতে করতে বলল, ‘কী সার্ভিস মাইরি! পরিচিত একজনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলাম গাড়িতে, মানে ওই অ্যাপক্যাবে আর কী! একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখলও না ড্রাইভার। কিছু জিজ্ঞেস করা তো দূরের কথা। এটাই কি কোয়ায়েট রাইড বেছে নেওয়ার শাস্তি ছিল? হায় রে!’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved