

পচনটা তখন আর শুধু খাবারে নয়– ব্যবসার মানসিকতায়। যিনি সবজিতে ভেজাল দিয়ে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন, তিনিই আবার মাছ-মাংসের ভেজালের শিকার। এভাবে আমরা পচনের একটা চক্রব্যূহ তৈরি করে ফেলেছি। বাজারে শক্তিশালী খাদ্যদালালচক্র তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালী খাদ্যমাফিয়া। প্রতিটি মানুষ, পশুপাখি, কোনও না কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
পুজোর আগে কলকাতার কয়েকশো রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকানে অভিযান করে পচা খাবার পাওয়া গিয়েছে। যার পরিমাণ ১২২৪ কেজি। পচা খাবার নষ্ট করা হয়েছে। ৪০টি দোকানের লাইসেন্সও সাময়িকভাবে বাতিল। এমনকী একটি নামী মিষ্টির দোকানের ফ্রিজে আরশোলাও পাওয়া গিয়েছে।
এসব খবর পড়ে আমাদের প্রচুর উল্লাস হয়। কিছুটা নাচনকোঁদনও। দারুণ ভালো হয়েছে, এবার বোধহয় একটু শিক্ষা হবে! কিন্তু সত্যিই কি হবে? কারণ পচনটা তো শুধু ফ্রিজের বাসি খাবারে নেই। পচনটা শুরুই হয়েছে অনেক আগে।

যে জমিতে শস্যদানা ফলছে, সেখান থেকেই গল্পের শুরু। বেশি ফলনের জন্য কম পুষ্টিকর হাইব্রিড বীজ, মাত্রাতিরিক্ত সার, নিষিদ্ধ কীটনাশক, নানারকম রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবহার। বাজারে নিয়ে আসার আগেভাগেই তাজা ফুলটুস দেখানোর জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক– যার জন্য সবজি চার-পাঁচদিন ঝুড়িতে রাখলেও চকচকে দেখায়। পোকা ধরে না। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, পোল্ট্রির উৎপাদনে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার। সেই খাবারই ঢুকছে প্রসেসিং কারখানায়। সেখানে প্যাকেজিংয়ের সময় কতরকম সংরক্ষণকারী রাসায়নিক, কৃত্রিম রং, গন্ধ, স্বাদ ব্যবহার হচ্ছে, তার কতটা আমরা জানি?
তারপর আসে রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, রান্নাঘর। ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে যেসব অচেনা রান্নাঘর থেকে খাবার আমাদের বাড়িতে পৌঁছয়, সেখানেও একই খেলা। কম খরচে বেশি লাভ। পুড়ে যাওয়া ডিজেলের মতো কালো তেল, নিম্নমানের কাঁচামাল, ভেজাল মশলা, কৃত্রিম রং, বাসি-পচা খাবার, প্লাস্টিকের কৌটোয় গরম খাবারের ক্ষতিকর মিথষ্ক্রিয়া– যা দিয়ে দুটো টাকা বেশি লাভ করা যায়।

পচনটা তখন আর শুধু খাবারে নয়– ব্যবসার মানসিকতায়। যিনি সবজিতে ভেজাল দিয়ে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন, তিনিই আবার মাছ-মাংসের ভেজালের শিকার। এভাবে আমরা পচনের একটা চক্রব্যূহ তৈরি করে ফেলেছি। বাজারে শক্তিশালী খাদ্যদালালচক্র তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালী খাদ্যমাফিয়া। প্রতিটি মানুষ, পশুপাখি, কোনও না কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
হ্যাঁ, মাঝেমাঝে অভিযান হয়। কয়েকটা দোকানে জরিমানা, কিছু খাবার বরবাদ, কয়েকটা লাইসেন্স বাতিল হয়। আমরাও হুজুগে মেতে উল্লাস করি এবং সোশাল মিডিয়ায় কাটাছেঁড়া করি।
কয়েকদিন পর, সব আগের মতো চলে! কারণ শুধু বিক্রেতাই দোষী নয়। দোষী আমরাও। ক্রেতারা।

আমরা কম দামে বেশি চাই। দেখতে সুন্দর চাই, স্বাদ গন্ধ ভালো চাই, পরিমাণে বেশি চাই। কিন্তু কী দিয়ে তৈরি হল, সেটা জানতে চাই না। মিষ্টির ছানা শৌচাগার পরিষ্কারের অ্যাসিড দিয়ে কাটা হল কি না জানতে চাই না। রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার সময় আমরা ক’জন ভাবি, ভেতরের রান্নাঘরটা দেখতে যাব? দোকানটা কতটা পরিষ্কার– সেটা দেখব? খাবারটা কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেসব নিয়ে মাথা ঘামাব?
আমরা কিচ্ছু ভাবি না। ভাবতে চাই না। নিজের পেটটুকু ঠিক থাকলেই সব ঠিক!
মুশকিল হল, শরীর তো তখনই প্রতিবাদ করে না। আজ যে খাবারটা খেলাম, তার মধ্যে কী ছিল, সেটা হয়তো আজ বোঝা গেল না। কালও গেল না। বছরের পর বছর কী খাচ্ছি, কী জমছে শরীরে, তার হিসেব কে রাখছে? কোন খাবারের প্রভাবে পরবর্তীকালে আমাদের কী কী অসুখ হচ্ছে, তার সত্যিকারের হিসেবই বা আমাদের হাতে কতটা আছে? কোনও পরিসংখ্যানগত তথ্য নেই। এখানেই হয়তো অপদ্রব্যগুলো শরীরের কোষে কোষে ঢুকে মারণব্যাধি শুরু করে।

ভেজাল আমাদের অভ্যাসেও। নিয়ম ভাঙা, চোখ বন্ধ করে থাকা, জেনেও না-জানার ভান করা, এগুলোও তো এক ধরনের পচন। গতরে না খাটা, জীবনযাপনের অভ্যাসে পচন। ডায়বেটিস, হৃদরোগ ঘরে ঘরে। এমনকী তরুণদেরও।
প্রবাদ আছে, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। এখানে চোর কে, আর ভাই কে, ঠিকঠাক বলা কঠিন। কিন্তু লাভের জন্য যারা ভেজাল দেয় আর জেনেশুনে সেই নিকৃষ্ট খাবার যারা কিনে খায়– তাদের সম্পর্কটা কি খুব একটা অচেনা?
………………………….

………………………….
অথচ বাজারের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা আমাদের হাতেই। গণতন্ত্রে যেমন জনগণ, বাজারেও শেষ কথা বলতে পারে ক্রেতা। আমরাই যদি গণহারে নিম্নমানের, অস্বাস্থ্যকর খাবার কেনা বন্ধ করি, ব্যবসায়ীকে বদলাতেই হবে। যে জিনিস কেউ কিনবে না, সেটা বানিয়ে লাভ কী?
সরকারের কাজ নিয়মিত পরীক্ষা করা, অপরাধ করলে শাস্তি দেওয়া। ফড়ে, দালালচক্র ভাঙা। চাষীর কাজ বৈধ উপাদান দিয়ে ফলন। ব্যবসায়ীর কাজ সৎভাবে বিক্রি। আর আমাদের কাজ চোখ খুলে কেনা, প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনে বয়কট করা। বিজ্ঞাপনের প্রলোভনের ফাঁদে না পড়া। সচেতনতা বাড়ানো। তাই কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা মিটবে না।

পচন যদি ধীরে ধীরে গোটা ব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কয়েকটা প্যাকেট, কয়েকটা দোকান বা কয়েকটা রান্নাঘর পরিষ্কার করে লাভ কী? আসল পচনটা তাই খাবারে আটকে নেই। কোথাও সেটা লোভে, কোথাও অসততায়, অসচেতনতায়, নিয়ম না মানায়, কোথাও আবার আমাদের অজ্ঞানতার কারণে, নীরব সম্মতিতে, জিভের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণে, আরাম আয়েশের লাইফস্টাইলে। এই সমস্ত ভেজাল, সীমাহীন দুর্নীতি, মারাত্মক লোভের মধ্যে ‘ফুড সেফটি’ কথাটা তাই একটা অলীক শব্দ! ডিকশনারিতে আছে। কিন্তু বাস্তবে ‘সোনার পাথর বাটি’।
আসলে, আমরা মানুষরাই একটু একটু করে পচে যাচ্ছি। লোভের কাছে। বিক্রেতা ক্রেতা দু’য়ে মিলে খাবারে নরক গুলজার! এমনকী বেবিফুডেও ভেজাল দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোকে বিষিয়ে তুলছি আমরা। আজকের ঈশ্বরী পাটনি করজোড়ে প্রার্থনা করে: দুধেভাতে নয়– আমার সন্তান যেন বিষমুক্ত থাকে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved