
ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব বলে ক্রীড়া জগতে প্রেষণা মহার্ঘ্য। খেলোয়াড় উৎসাহিত হয় দুই ভাবে– নাম যশ প্রতিপত্তির আশায়-নেশায়, আর এক অনুকূল টানে বা বিপরীত পরিস্থিতির চাপে। ক্রিকেটের অনুকূল পরিবেশে স্মৃতি বিজয়ী বিশ্বকাপ দলের উল্লেখযোগ্য খিলাড়ি। আবার ভালোবাসার যাতনা, ব্যক্তিগত বেদনা, সামাজিক অশ্রদ্ধা, ধারাবাহিক উপহাসের প্রতিকূল প্রভাবেও সাফল্য ছুঁয়েছে। এবার তিনি বিজয়ী দলের অধিনায়ক। সত্যিই স্মৃতি আদর্শ খেলোয়াড়। ইতিময় পরিসরে নিজের প্রতি বিশ্বাস ধরে রাখতে জানেন। অনুকূলতাকে হেলায় হারিয়ে ফেলেন না। ঠিক তেমনই তাঁর ক্রীড়ামন শত বিরুদ্ধতাতেও হাল ছাড়ে না। ঠিক খুঁজে নেয় গন্তব্যের অন্য কোনও পথ।
রুপোলি পর্দার অভিনেতা বা সবুজ মাঠের খেলোয়াড়, সাফল্য ব্যর্থতা উতরে দীর্ঘসময় মাটি আঁকড়ে টিকে থাকতে পারলে তবেই বিনোদন জগতের তারা হওয়া যায়। যদিও ভারতীয়দের কাছে খেলাধুলো সংস্কৃতির মূল প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া জীর্ণ শীর্ণ একটি উপধারা মাত্র। তবে ক্রিকেটের কথা আলাদা। ক্রিকেট দেশীয় সংস্কৃতির একটি পুরুষ্টু প্রবাহ। শুধু তাই নয়, এই মুহূর্তে সিনেমা বা রিয়েলিটি শো-র মতো উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র বিনোদনও। নাম যশ মান অর্থ বিত্ত প্রতিপত্তির ইতিময় সুখ অথবা তীব্র নেতিবাচক সমালোচনা বা ভুলের মাশুল গোনা; প্রাপ্তির এই দুই প্রান্ত জুড়ে গেলে তৈরি হয় দর্শকের পছন্দের খাঁটি বিনোদনাত্মক চরিত্রটি।
এই তো সবে মেয়েদের ক্রিকেটে এত বড় সাফল্য এল। এরই মধ্যে ওদের নিয়ে আড্ডার ঠেকে চর্চা হচ্ছে। খেলাটি আদ্যোপান্ত একটি বিনোদন হয়ে উঠেছে। কয়েকদিন আগেও হারমন, রিচা, জেমিমা, স্মৃতিকে কয়জনই বা চিনত? এখন এঁদের হাঁড়ির খবর পর্যন্ত মুখস্ত।

কিন্তু অতৃপ্ত অনুরাগী বা জনতা বিনোদ মঞ্চের কাল্পনিক চরিত্রটির আড়ালে থাকা অকাল্পনিক ব্যক্তি পরিসরেও অমার্জিত উঁকিঝুঁকি দেয় রুচিহীনের মতো। স্টারডামের বিড়ম্বনা! গ্ল্যামারে ঢাকা পড়ে থাকা সাধারণ মানবিক পরিসরে কয়জন মানুষই বা তারাদের নাগাল পায়! সাফল্য ব্যর্থতা আর একান্ত ব্যক্তিগত খাওয়া-পরার পছন্দ-অপছন্দ ও ব্যক্তি সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই তারাদের অনুরাগীদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অনুরাগীরা পছন্দের কৃতি মানুষটির সাফল্যকে উদ্যাপন করে, ব্যর্থতাকে তুলোধোনা করে, ব্যক্তিগত শঙ্কা-সংকট সুখ-অসুখকেও মুখরোচক করে। কিন্তু একাকীত্বের খবর রাখে না। কঠিন সংগ্রামের সংকীর্তন করে না।
আসলে তারার আলোয় ঝলমলে যাপনের ওপারে একটা সাধারণ মানুষ জীবন থাকে। সেই জীবনটি গড়পড়তা ভালোমন্দ ভাঙাগড়া রাগ-অভিমানের সমাহার। এই জীবনে আমজনতার প্রবেশাধিকার নেই। কিন্তু অনধিকার চর্চার আগ্রহ প্রবল। সেই আগ্রহেই গোটা দেশ এক ক্রিকেট-কন্যার পড়শি হল। স্মৃতি মান্ধানার সমব্যথী। সমব্যথী! নিশ্চয়ই। যার বিয়ে তার হুঁশ নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই। এই না হলে সাফল্য, অনুরাগীদের নয়নতারা। স্মৃতির ব্যক্তি জীবনের আড়াল-আবডাল সরিয়ে তাঁকে টেনে আনা হল চর্চায়। অসংখ্য স্মৃতি-অনুরাগী আর ক্রিকেট-পাগল জনতার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল সমাজমাধ্যম, প্রচারমাধ্যম, সংবাদ মাধ্যম। তাঁর ক্রীড়ার সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে এর সিকিভাগ আলোচনাও হয়নি। স্মৃতির বিবাহ-বিভ্রাট নিয়ে যে শোরগোল তৈরি হয়েছিল যেন মেগা সিরিয়ালের মহাপর্ব।

ক্রিকেটার স্মৃতির কাহিনি হওয়া উচিত এক ডাকসাইটে ক্রীড়া সংগ্রামী হিসাবে। কিন্তু জনতা মেতে উঠল তাঁর ব্যক্তি-জীবনের বেদনায় প্রলেপ দিতে। একজন আদর্শ অ্যাথলিট ফ্যান-সাপোর্ট চায় মাঠে। মাঠের বাইরে তাঁর প্রস্তুতিপর্ব। সেখানে একমাত্র প্রশিক্ষকের সাহচর্যে সনিষ্ঠ সাধনায় মগ্ন হওয়া। এই সাধনার নির্যাসই তো খেলোয়াড় নিবেদন করে দর্শককে। খেলোয়াড় ও দর্শকের মধ্যে এটাই একমাত্র সংযোগ। এর বাইরে চর্চা অনধিকারের। অশ্রদ্ধার। তবু সেই চর্চাই বেশি হয়। স্মৃতির বিয়ের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁকে ট্র্যাজিক নায়িকা বানানো হয়েছে। আর এতে চাপা পড়ে যাচ্ছে তাঁর ট্যালেন্ট, ক্রীড়া নৈপুণ্য, বীরত্বের কাহিনি। পাশাপাশি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রাম। সাফল্যের চূড়ান্ত সুখ উপভোগ করতে পারছে না ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনে। দুর্বিষহ। সেই সূত্র ধরে সহানুভূতির মোড়কে আসছে সামাজিক অসম্মান, উপহাস। তা সত্ত্বেও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প। নিজের দাপট দেখানো আর শেষপর্যন্ত সমষ্টিযুদ্ধে জয়ী হওয়া। দলকে সফল করা। এক অদৃশ্য বিপ্লবের বেপরোয়া নেত্রী হয়ে ওঠা। স্মৃতি শুধুই একজন সফল ক্রিকেটার নয়, ব্যাপক অর্থে ক্রীড়াবিদ এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে সে প্রথা ভাঙার কারিগর।
অথচ বিশুদ্ধ বিনোদনের কায়দায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে স্মৃতির মতো একজন বলিষ্ঠ খেলোয়াড়কে। এই দায় ক্রীড়াপ্রেমীর যতটা তার থেকে ঢের বেশি সমাজ প্রবণতার। খেলার মাঠে মেয়েদের উপেক্ষা, গৎ-বাঁধা স্যাক্রিফাইস, সামাজিক ক্রাইসিস, একঘেয়ে ব্যর্থতার কাহিনি, বড়জোর পদক জয়ের প্রতিস্পর্ধার দুর্ধর্ষ গল্পে লালিত হয়েছে আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতি। গল্প উপন্যাস বা চলচ্চিত্র জুড়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে মেয়েদের বাধাবিপত্তির ক্লোজ-আপ। কিন্তু প্রচলিত প্রবণতার বিপরীতে ময়দানি কন্যার এমন রোমহর্ষক প্রত্যাবর্তন উল্লাস বা উদ্যাপনের নাগালের বাইরে। স্মৃতির নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্যে আছে একটি উচ্চমানের ক্রীড়া মনস্তাত্ত্বিক ক্যারিশমা আর অবিসংবাদিত সংগ্রামীর দৃঢ়তা।

সারা দেশজুড়ে হাজার হাজার নারীবাদী প্রচেষ্টা মেধাদীপ্ত প্রকল্প। তবুও কোনওভাবেই মেয়েদের খেলাধুলা আমাদের সংস্কৃতির মূল স্রোতে মিশে যেতে পারছে না। এর প্রধান কারণ স্মৃতিদের মতো চূড়ান্ত সফলদেরও ক্রিকেটার বা খেলোয়াড় হিসাবে ভাবতে না পারা। সাধারণ মানুষ সাধারণ ঘরের মেয়ে বলেই ভাবছে ওঁদের। খুবই ভালো কথা। তবে এই আন্তরিকতার সাথে সমমাত্রায় থাকা উচিত তাঁদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা। পাশের বাড়ির নিতান্ত সাধারণ মেয়েটার সাথে যে অনৈতিক অমার্জিত আচরণ করতে আমাদের সমাজ অভ্যস্ত, সেই আচরণই হচ্ছে প্রতিষ্ঠার চূড়ায় থাকা মেয়েটির সাথেও। এসব আসলে অবিভাজিত নারীবাদী সমতার গিমিক। এর থেকে উপশমের উপায় নেতিশক্তিকে আত্ম-উদ্দীপনার উপাচার করে সদর্পে নিজেকে মেলে ধরা। যে পথ স্মৃতি মান্ধানা দেখালেন। স্মৃতি সো-কল্ড নারীবাদী নয়। কিন্তু রক্ষণশীল সমাজ খেলার মাঠে বা নিছকই খোলা মাঠে মেয়েদের বাড়বাড়ন্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে স্মৃতির মতো একজন সফল ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত নারী জীবনটিকে নিশানা করেছিল। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। নারীত্বের প্রতি ঠাট্টা-তামাশাও হবে, আবার বৃহত্তর অর্থে নারী প্রগতিশীলতার উপর লাগাম দেওয়াও যাবে। সমাজমাধ্যমে উস্কে দেওয়া হল স্মৃতির বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কথা। হুজুগে মানুষজন হামলে পড়ল। বোঝানো হল ‘মেন উইল বি মেন’। তার হাতেই গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষমতা। নারীর সাফল্য নিরীহ একটি স্ট্যাটাস।
বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে বারবার নানাভাবে স্মৃতি মান্ধানা শিরোনামে উঠে এসেছেন। যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা স্মৃতির ক্রিকেট আগ্রহে পরিবার ছিল তাঁর সহযোগী। তাঁকে জেমিমার মতো ধর্মীয় বিরুদ্ধতা পোহাতে হয়নি। রিচার মতো ভালো প্রশিক্ষণের আশায় মফস্সল থেকে শহরের অনাথ আশ্রমে এসে থাকতে হয়নি। শেফালির মতো লিঙ্গ বৈষম্যের জন্য নামধাম চলাবলাকে আড়ালও করতে হয়নি। খানিক অনায়াস নির্বিঘ্ন সযত্ন অধ্যবসায়েই এসেছিল আকাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ক্রিকেটের পাশাপাশি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম এসেছে। কিন্তু সেই প্রেম বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছয়নি। এ-ও তস্য সাধারণ একটা ব্যাপার। তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না স্মৃতি তারকা এবং একজন নারী। যারা তাঁকে মাথায় তুলে নেচেছে তাঁরাই তাঁর ব্যক্তি পরিসরে অনাহুতের মতো ঢুকেছে। তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করেছে।

ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব বলে ক্রীড়া জগতে প্রেষণা মহার্ঘ্য। খেলোয়াড় উৎসাহিত হয় দুই ভাবে– নাম যশ প্রতিপত্তির আশায়-নেশায়, আর এক অনুকূল টানে বা বিপরীত পরিস্থিতির চাপে। ক্রিকেটের অনুকূল পরিবেশে স্মৃতি বিজয়ী বিশ্বকাপ দলের উল্লেখযোগ্য খিলাড়ি। আবার ভালোবাসার যাতনা, ব্যক্তিগত বেদনা, সামাজিক অশ্রদ্ধা, ধারাবাহিক উপহাসের প্রতিকূল প্রভাবেও সাফল্য ছুঁয়েছে। এবার তিনি বিজয়ী দলের অধিনায়ক। সত্যিই স্মৃতি আদর্শ খেলোয়াড়। ইতিময় পরিসরে নিজের প্রতি বিশ্বাস ধরে রাখতে জানেন। অনুকূলতাকে হেলায় হারিয়ে ফেলেন না। ঠিক তেমনই তাঁর ক্রীড়ামন শত বিরুদ্ধতাতেও হাল ছাড়ে না। ঠিক খুঁজে নেয় গন্তব্যের অন্য কোনও পথ।
দূর থেকে কাশবন ঘন মনে হয়। সফল ব্যক্তিদেরও উত্থান-পতন আছে। আসে নানা রকমের মানসিক সংকট। তাদের জীবনের এই পর্যায়টি কেবল সহযাত্রীরাই পারে স্পর্শ করতে। যেমনটা করল জেমিমা রডরিগেজ। কখনও আন্তর্জাতিক প্রলোভন ত্যাগ করলেন সতীর্থ বন্ধুর আবেগ সহচরী হতে। কখনও মুখোমুখি দাঁড়ালেন স্মৃতিকে জীবনযুদ্ধে আরও দৃঢ় করার জন্য। আর ভারত-জোড়া বিশাল নারীবাদীরা চুপিচুপি প্রস্তুতি নিচ্ছে স্মৃতিকে ভাঙিয়ে ঝটপট নারী সাফল্যের গর্বের ইতিহাস লিখে ফেলার।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved