Robbar

কেন ইরানকে উচিত শিক্ষা দিতে চায় আমেরিকা?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 15, 2026 7:18 pm
  • Updated:March 15, 2026 7:18 pm  

ইরান জানত, এই ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে তাই সজারুর পন্থা নিয়েছে। সজারুকে মারতে গেলে যেন গায়ে কাঁটা বিঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা, ইরানকে মারতে গেলেও তাই। ইরান ইচ্ছে করেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্য তেল উৎপাদক দেশগুলোর তেলের পরিকাঠামো আক্রমণ করছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে তাদের তেল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জায়গা। একইসঙ্গে বন্ধ করে দিচ্ছে হরমুজ প্রণালী। কারণ– তেলের ব্যবসার ওপর চাপ পড়লে, চাপ পড়বে পেট্রো-ডলারে। গোটা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থায়। আর তাহলে আরও বাড়বে আমেরিকার ঋণের বোঝা।

শমীক ঘোষ

War is politics by other means.

তেহরানের আকাশ এখন কুচকুচে কালো। তেহরানের বাতাস এখন বিষ।
তেল পুড়ছে। লক্ষ লক্ষ গ্যালন পেট্রল। পুড়ে পুড়ে ধোঁয়া হয়ে মিশে যাচ্ছে আকাশে। সাধারণ ধোঁয়া নয়। বিষ-বাষ্প।
আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে তেহরানের তেলের ডিপো। সেই তেল জ্বলে জ্বলে হয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত সব গ্যাস– কার্বন মনোঅক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড। সেই সঙ্গে না-পোড়া কার্বনের কণা– বাতাসের মিশে যা চলে যাচ্ছে বহুদূর।
সালফার ডাইঅক্সাইড জলীয় বাষ্পে মিশে অ্যাসিড রেন হয়ে ফিরে আসছে মাটিতে।
আর এই বিষাক্ত বাতাসে যাঁরা শ্বাস নিচ্ছেন, তাঁদের ক্যানসার বা অন্য মারণ রোগের সম্ভাবনা ভীষণ। শুধু তাঁদের নয়, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মেরও।
এই বাতাস শুধু তেহরান বা ইরানেই আটকে থাকবে না। মিশে যাবে বায়ুমণ্ডলে। ক্ষতি করবে কয়েক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চলের শস্যের, পানীয় জলের, সামুদ্রিক প্রাণীদের। গ্রিনহাউজ গ্যাসে আরও ত্বরান্বিত হবে ক্লাইমেট চেঞ্জ।

তেহরানের আকাশে কালো ধোঁয়া

ইরান অবশ্য থেমে নেই। সেও মিসাইল আর ড্রোন ছুড়ছে পাল্টা। শুধু ইজরায়েলে নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হল কেন? যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তো ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছিল আমেরিকার। ওমানের বিদেশমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে রাজি হয়ে গিয়েছে।

এই যুদ্ধ কেন, সেটা বুঝতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ খানিকটা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে। সেই সময় গোটা পৃথিবীর সমস্ত দেশের মুদ্রার দাম ঠিক হত গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড-এ। অর্থাৎ সমস্ত মুদ্রার দাম ঠিক করা হত সোনার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। 

এক মার্কিন ডলার = ১.৫০৪ গ্রাম সোনা
এক গ্রেট ব্রিটেন পাউন্ড = ৭.৩২২ গ্রাম সোনা
এক ফরাসি ফ্রাঁ = ০.২৯০ গ্রাম সোনা
এক জার্মান মার্ক = ০.৩৫৮ গ্রাম সোনা 

অর্থাৎ এই সমস্ত দেশের মুদ্রার বিনিয়োগ মূল্যও নির্ধারিত হত সোনার ওজন দিয়ে। 

কিন্তু এর পরেই শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ করতে টাকা লাগে। অনেক অনেক টাকা। অথচ সোনার ভাঁড়ার সীমাহীন নয়। যুদ্ধের বিল মেটাতে তাই প্রায় সব দেশই সাময়িকভাবে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড মুলতুবি রাখল। যে যারই ইচ্ছে মতো টাকা ছাপিয়ে গেল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তো থামল। আবার গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ফিরিয়ে আনতে চাইল দেশগুলো। কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়। সব দেশই তো নিজের ইচ্ছেমতো টাকা ছাপিয়ে বসে আছে। তাদের অর্থনীতিও বদলে গিয়েছে। 

লেফটন্যান্ট কাসলের তোলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ছবি

এর মধ্যে আবার পরাজিত জার্মানিকে ভার্সেই চুক্তি সই করতে হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকে মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ব্রিটেন আর ফ্রান্সকে।
কিন্তু হেরে যাওয়া জার্মানি এত টাকা পাবে কোথায়? ধার মেটাতে খাবার ফুরোয় এমন অবস্থা। ঠিক হল, তাকে ঋণ দেবে আমেরিকা। এদিকে যুদ্ধের সময় আমেরিকার কাছে থেকে মোটা টাকা ধার করেছে ব্রিটেন আর ফ্রান্সও। ফলে শুরু হল আজব এক খেলা। জার্মানি আমেরিকার থেকে টাকা ধার নিয়ে ক্ষতিপূরণ দেয় ব্রিটেন আর ফ্রান্সকে। ব্রিটেন আর ফ্রান্স সেই টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করে আমেরিকার।

এর মধ্যেই ১৯২৯ সালে ভেঙে পড়ল ওয়াল স্ট্রিট। মুখ থুবড়ে পড়ল আমেরিকার অর্থ ব্যবস্থা। ঠিক হল, দেশের বাইরে সব ঋণ বন্ধ করে দেবে আমেরিকার ব্যাঙ্কগুলো।
তাহলে জার্মানি ক্ষতিপূরণ দেবে কেমন করে? ব্রিটেন আর ফ্রান্সই বা আমেরিকার ঋণ শোধ করবে কীভাবে? সব থেকে বড় কথা হল, ইউরোপের ব্যাঙ্কগুলোর কম খরচে ফান্ড পাওয়া জায়গা চলে গেল। 

আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ১৯২৯

টাকা না থাকলে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। বাণিজ্য বন্ধ হলে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়। আর ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে বেকারত্ব বাড়ে। অর্থনৈতিক মন্দা শুধু আমেরিকায় থাকল না। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করেছে, ঠিক তাই করেছিল আমেরিকা। ট্যারিফ বসিয়েছিল। ১৯৩০ সালে, মার্কিন দুই আইনপ্রণেতা স্মুট আর হাওলির তৈরি করা স্মুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট সই করেন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার। এর ফলে দেশে আমদানি করা প্রায় ২০ হাজার পণ্যের ওপর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ট্যারিফ বসায় আমেরিকা। আমেরিকা ট্যারিফ বসালে বাকিরা থেমে থাকে কেন? ক্যানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন সবাই পাল্টা ট্যারিফ বসিয়ে ফেলল। শুরু হয়ে গেল ট্যারিফ যুদ্ধ। 

১৯৩১ সালে ব্রিটেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বাতিল করে দেওয়ার ঘোষণা করল। তারপর পাউন্ডের দাম কমিয়ে দিল প্রায় ২০-৩০ শতাংশ। কেন? কারণ তাহলে ব্রিটেন থেকে পণ্য কিনতে কম অর্থ খরচ হবে বিদেশিদের। ব্রিটেনের রফতানি হু হু করে বাড়বে।
কিন্তু ব্রিটেন যদি পাউন্ডের দাম কমায়, তাহলে বাকিরা বসে থাকে কেন?
সব দেশ যে যার মতো নিজের মুদ্রার দাম কমাতে লাগল। দাম কমানোর কম্পিটিশন লেগে গেল। তার ফলে মুদ্রার বিনিময় হার (এক্সচেঞ্জ রেট) ঘেঁটে গেল। বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য দুটোই গোলমেলে হয়ে গেল। ১৯৩৩ সালের মধ্যে গোটা পৃথিবীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেল। পৃথিবী ভাগ হয়ে গেল তিনটে আলাদা অর্থনৈতিক গোষ্ঠীতে– ব্রিটেন আর তার কমনওয়েলথ, পূর্ব ইউরোপ নিয়ে জার্মানি আর পূর্ব এশিয়া নিয়ে জাপান।

বেকারত্ব বাড়লে, অর্থনীতি ভেঙে পড়লে, মানুষ শক্তিশালী নেতা খোঁজে। যে সুপারম্যান হয়ে তাকে উদ্ধার করবে। জার্মানি তেমনভাবেই খুঁজে নিয়েছিল হিটলারকে। হিটলার আক্রমণ করল পোল্যান্ড। আবার কিছুদিন পরেই পোল্যান্ড আক্রমণ করল সোভিয়েত রাশিয়াও। জাপান ইতিমধ্যেই দখল করেছে মাঞ্চুরিয়া। ইতালি ইথিওপিয়া।
১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
১৯৪৪ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে আগে, মিত্রশক্তির সদস্যরা ঠিক করল আরও যুদ্ধ এড়াতে যে করেই হোক বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাণিজ্যকে ঠিক করতে হবে। তাই নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন-উডস শহরে এক কনফারেন্স করা হল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হিটলার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ এবং এশিয়া প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের ফলে রমরমিয়ে বেড়েছে আমেরিকার অর্থনীতি। সব থেকে বড়। সব থেকে শক্তিশালী। গোটা পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ সোনাও ততদিনে আমেরিকার কাছে। অতএব নতুন বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রেও থাকবে আমেরিকা। মার্কিন ডলারের নতুন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হল– ১ আউন্স সোনার দাম হবে ৩৫ মার্কিন ডলার। আর পাউন্ড বা ফ্রাঁ-এর মতো মুদ্রার সঙ্গে ডলারের বিনিময় মূল্যের হার আগে থেকে নির্ধারিত করা থাকবে। 

এই ব্রেটন-উডস কনফারেন্সেই মুদ্রার বিনিয়োগমূল্য নির্ধারণ করার জন্য তৈরি হল ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড। কোনও দেশ সমস্যায় পড়লে তাকেও ঋণ দেবে এই আইএমএফ। ইউরোপ ভেঙে পড়েছে। তাকে আবার নতুন করে তৈরি করার জন্য তৈরি হল ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঠিক করার জন্য নতুন চুক্তির কথাও হল। সেই চুক্তি অবশ্য হল কিছুদিন পরে, ১৯৪৭ সালে। তার নাম গ্যাট চুক্তি। 

এই ব্রেটন-উডস কনফারেন্সেই ঠিক হয়ে গেল বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রে থাকবে মার্কিন ডলার। কোনও দেশ বা তার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক চাইলেই সেই ডলার ভাঙিয়ে সোনা করে নিতে পারবে। এই নতুন নিয়মে তরতর করে এগিয়ে চলল বিশ্ব-অর্থনীতি। ১৯৫০-৭০ এই দুই দশক কারও কারও মতে হয়ে দাঁড়াল পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগ। 

নিক উটের তোলা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই বিখ্যাত ছবি

কিন্তু ছয়ের দশকেই শুরু হয়ে গিয়েছে ভিয়েতনাম ওয়ার। সেই যুদ্ধ সামলাতে বিপুল ডলার ছাপিয়েছে আমেরিকা। আবার জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হওয়া লিন্ডন বি জনসনের জনদরদী নীতির জন্যও হয়েছে প্রচুর খরচ। ফিসক্যাল ডেফিসিট সামাল দিতেও ছাপাতে হয়েছে প্রচুর ডলার। এদিকে জার্মানি এবং জাপান অর্থনৈতিক ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাদের সঙ্গে আমেরিকার ট্রেড ডেফিসিট (বাণিজ্য ঘাটতিও) বিরাট বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে যত ডলার রয়েছে, তত সোনা নেই আমেরিকার কাছে। সে কথা বুঝেও গেছে অনেকে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল যেমন সোনা ফেরত চেয়েছেন আমেরিকার কাছ থেকে। 

এর মধ্যেই এল নিক্সন শক। ১৫ অগস্ট ১৯৭১, টেভিতে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা করলেন– আমেরিকা আর ডলারের বদলে সোনা দেবে না।
ভেঙে পড়ল ব্রেটন-উডস ব্যবস্থা। ডলারের দাম আর সোনার সঙ্গে বাঁধা রইল না। পৃথিবীর মুদ্রার বিনিময় মূল্য হয়ে গেল বাজার নির্ধারিত।

কিন্তু তাহলে গোটা পৃথিবী আর ডলারকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে রাখবে কেন? ডলার দিয়েই বা কেন বৈদেশিক বাণিজ্য করবে? ডলারের গুরুত্ব বজায় রাখতে নতুন এক সুযোগ খুলে দিল সৌদি আরব। ১৯৭৩ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের পর সৌদি আরব বলে দিল, ইজরায়েলের মিত্র দেশগুলোকে সে আর তেল বিক্রি করবে না। তেলের দাম বেড়ে গেল চারগুণ। ততদিনে তেল উৎপাদন করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব অগ্রগণ্য। এদিকে গোটা পৃথিবী জুড়ে ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ। মিশর, সিরিয়া, ইরাকে সোভিয়েত রাশিয়ার স্পষ্ট প্রভাব। 

ইরানের পালটা মিসাইলে ক্ষতিগ্রস্ত ইজরায়েলের ঘরবাড়ি। ছবি: টাইমস অফ ইজরায়েল।

১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে এক চুক্তি করল আমেরিকা। উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তার ভার নেবে পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী দেশ আমেরিকা। বদলে সৌদি আরবকে তেল বিক্রি করতে হবে মার্কিন ডলারে। সেই ডলার সে তার ইচ্ছেমতো মার্কিন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারবে। 

সৌদি আরব সব থেকে বেশি তেল উৎপাদন করে। আবার ডলার তখনও পৃথিবীর সব থেকে স্থিতিশীল মুদ্রা। এদিকে মার্কিন নিরাপত্তা পেলে আশপাশের কমিউনিস্টদের ভয়ও নেই। যাকে বলে একদম উইন-উইন সিচুয়েশন। 

সৌদি আরব ডলারে তেল বিক্রি করায়, বাকি তেল উৎপাদনকারী দেশরাও একে একে ডলারেই তেল বিক্রি শুরু করে দিল। শুরু হয়ে গেল পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা। পৃথিবীর সব দেশেরই তেল দরকার। তেল কিনতে গেলে তার ডলার চাই। ডলার পেতে গেলে হয় আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করে আয় করতে হবে; নয় আমেরিকার থেকে ঋণ নিতে হবে। দুনিয়ার সব দেশকেই তাই ডলার রাখতে হবে। 

বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় ঢেকেছে ইরানের নগরী

পেট্রো-ডলার আমেরিকাকে এক আশ্চর্য সুবিধে দিল। সব দেশকে ডলার আয় করতে হয়। অথবা ঋণ নিতে হয়। আমেরিকা ইচ্ছেমতো ডলার ছাপিয়ে নিয়েও তার বিনিময়মূল্য ধরে রাখতে পারে। বাণিজ্য ঘাটতিও মেটানো যায় আমেরিকার সুবিধেমতো। আবার সেই ডলার বিনিয়োগ হয় মার্কিন অর্থব্যবস্থাতেই। ফলে দেশের বাজেটের ঘাটতিও মেটানো যায় খুব সহজেই। যাকে বলে একদম ডবল ধামাকা।

আবার এই পেট্রো-ডলারকেই তার অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমেরিকা। কোনও দেশ তার কথা না শুনলে তাকে স্যাংশান করে আমেরিকা। স্যাংশান মানে তার ডলারের ভাঁড়ারে হাত দেওয়া। তুমি আমার কথা শুনবে না? তোমার সব টাকা আটকে রেখে দেব। তোমার নতুন ডলার রোজগারের পথ বন্ধ করে দেব। ডলার বিশ্ববাণিজ্যের মুদ্রা। এবার দেখি তুমি কেমন করে দেশ চালাও। 

সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ডলারের বদলে ইউরোতে তেল বিক্রি করা শুরু করে। সেই সময় ইউএন ফুড ফর অয়েল নামের একটা প্রোগ্রাম চালাচ্ছিল ইরাকের সঙ্গে। লিবিয়ার মুয়াম্মর গদ্দাফি তেল বিক্রির জন্য সোনার সঙ্গে যুক্ত একটা নতুন আফ্রিকান মুদ্রার কথা বলছিলেন। উগো চাভেসের ভেনিজুয়েলায় পৃথিবীর সব থেকে বড় তেলের ভাঁড়ার। মাদুরো ডলারের বদলে চাইনিজ ইউয়ান এবং অন্যান্য মুদ্রায় তেল বিক্রি শুরু করেন। ২০১৭ সাল নাগাদ তেল বিক্রির জন্য নতুন এক ক্রিপ্টোকারেন্সি পেট্রো চালু করে মাদুরো। 

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো

কিন্তু ভূ-রাজনীতি বদলে গিয়েছে। চিনের অর্থনীতি আমেরিকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। পৃথিবীর সব থেকে বেশি তেল আমদানি করে চিন। তাই তেল উৎপাদক দেশগুলোর ওপর সে চাপ দিচ্ছে ডলারের বদলে ইউয়ানে তেল বিক্রি করতে। রাজিও হচ্ছে কেউ কেউ। 

এর মধ্যেই আমেরিকার সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩৫ লক্ষ কোটি ডলার। এত ঋণ যার, সে সেই ঋণ সামাল দিতে আবার ডলার ছাপাবে। আর সেই ডলার আগের মতো স্থিতিশীল থাকবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? 

তেল উৎপাদক দেশগুলোর মাথাতেও কথাটা ঢুকে গেছে। এতদিন তারা তেল বিক্রি করা ডলার আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ডেই বিনিয়োগ করত। কিন্তু যদি এখন যদি ডলারের দাম পড়ে যায়? যদি মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়! তাহলে? 

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়াকে টাইট দিতে সেই স্যাংশানই করেছিল আমেরিকা। কিন্তু রাশিয়া বহাল তবিয়তেই আছে। তার অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে বটে, কিন্তু সে অন্য মুদ্রায় তেল বিক্রি করে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছে। ফলে ডলার ছাড়াও যে তেল বিক্রি করা সম্ভব সেকথা বুঝে গেছে সবাই। তাছাড়া চাইনিজ ইউয়ান ছাড়াও, রুবলের কথা তুলেছে রাশিয়া। ব্রিকসও তেল বিক্রির নতুন ব্যবস্থার কথা বলছে। তেল উৎপাদক দেশগুলোও তাই সব ডিম ডলারের ঝুড়িতে না রেখে, অন্য মুদ্রার ঝুড়িতে রাখার কথা ভাবছে। 

আর এখানেই বেড়ে যাচ্ছে ইরানের গুরুত্ব। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের ভাঁড়ার আছে ইরানে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যেও ইরান অন্যতম। ১৯৭৯ সালে শাহের পতনের পর থেকেই ইরান আমেরিকা-বিরোধী। ইরান মার্কিন স্যাংশানে। অথচ তারপরেও সেই স্যাংশনকে টপকে তেল ঠিক বিক্রি করে গেছে তারা। কিশ দ্বীপে খুলে ফেলেছে পেট্রল এবং পেট্রোলিয়াম জাত পণ্যের ডলার-বহির্ভূত বাণিজ্যের জন্য কমোডিটি এক্সচেঞ্জ– ইরানিয়ান অয়েল বোর্স। রাশিয়া এবং চিনের সঙ্গে পেট্রো-ডলার বিরোধী ব্লক তৈরি করেছে। এবং তার থেকে বড় কথা– মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট– হরমুজ প্রণালী যে কোনওদিন বন্ধ করে দিতে পারে ইরান। 

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু

ইরানকে তাই উচিত শিক্ষা দিতে নেমেছে আমেরিকা এবং ইজরায়েল। পারস্য উপসাগরের অন্যতম বড় ক্রুড অয়েল টার্মিনাল– যার মাধ্যমে ইরানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তেল রফতানি হয় সেই খার্গ দ্বীপে হামলা করেছে। তবে ইরান ইরাক নয়। ইরান জানত, এই ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে তাই সজারুর পন্থা নিয়েছে। সজারুকে মারতে গেলে যেন গায়ে কাঁটা বিঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা, ইরানকে মারতে গেলেও তাই। ইরান ইচ্ছে করেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্য তেল উৎপাদক দেশগুলোর তেলের পরিকাঠামো আক্রমণ করছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে তাদের তেল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জায়গা। একইসঙ্গে বন্ধ করে দিচ্ছে হরমুজ প্রণালী। কারণ– তেলের ব্যবসার ওপর চাপ পড়লে, চাপ পড়বে পেট্রো-ডলারে। গোটা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থায়। আর তাহলে আরও বাড়বে আমেরিকার ঋণের বোঝা। সেই সঙ্গে আমেরিকাকে চাপে রাখতে তার ট্রেজারি বন্ড ছাড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। একইসঙ্গে ডলারের বদলে বাণিজ্য করবে অন্য মুদ্রায়। ফলে আরও চাপে পড়বে পেট্রো-ডলার। 

ডি-ডলারাইজেশন শুরু হয়েছে। তবে একদিনেই মুছে যাবে না পেট্রোডলার। তার সময় লাগবে। বেশ কিছু বছর। ততদিন আরও যুদ্ধ হবে।