সবার মতো আমিও শুনেছি এবং পাঠও করেছি এই দেবীস্তোত্র; কিন্তু সেভাবে লক্ষ করিনি যে, এর মধ্যে একটি মন্ত্র ভ্রান্তিরূপে দেবীকে নমস্কার করছে। চোখে পড়ল যখন, মনেও লাগল বিষম খটকা! দৈবীশক্তির অন্যতম কাজই তো অজ্ঞান থেকে জ্ঞানে, মিথ্যা থেকে সত্যে, নিয়ে আসা। তাহলে, ভ্রান্তিকে মহিমান্বিত করার অর্থ কী? ভ্রান্তি নিয়ে আমার এই বিভ্রম কিছুতেই আর দূর হয় না! বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে যা মনে হল, তাই পেশ করা গেল; ভুল নিয়ে আর কতই বা ভুল হবে!
‘কোন দুটি বিশেষ বয়সের নর-নারীকে কোন একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে দেখিতে পাওয়ামাত্রই একটা বিশেষ সম্বন্ধ কল্পনা করা যে কত বড় ভ্রান্তি – এ শিক্ষা আমার হইয়া গিয়াছিল; এবং ভবিষ্যতের জটিল সমস্যাও ভবিষ্যতের হাতে ছাড়িয়া দিতে আমার বাধে না।’
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে অভয়া ও রোহিণীদাদাকে তাদের ‘নতুন বাসায় নতুন ঘরকন্নার মধ্যে’ প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে কথক বেরিয়ে পড়েছে রেঙ্গুনের পথে, নিজের জন্য স্বতন্ত্র একটা মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজতে। অভয়া-রোহিণীর বাসা থেকে সে বেরিয়ে পড়েছে বটে, তবে তাদের নিয়ে চিন্তা পিছু ছাড়েনি। অসম্পর্কিত এই দু’জন নারী-পুরুষের সম্পর্কের এতটা ঘনিষ্ঠতা আমাদের কথকের মনে গ্লানির ছায়া ফেলেছে। সে খানিক বিচলিত; মনের মধ্যে বেশ একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, কারণ নর-নারীর মধ্যে ‘বিশেষ সম্বন্ধ’ কল্পনা করার একটা ঝোঁক আসছে তার। অবশ্য পবিত্রতা নিয়ে এমনতর চিন্তাকে সে বিদায় দিয়েছে শেষমেষ; বেশ বোঝা যায় যে, পূর্বতন কোনও অভিজ্ঞতার দরুন সেই ঝোঁককে আমল দেওয়া হচ্ছে না। সচেতনভাবেই। কারণ, এইরকম সম্বন্ধ কল্পনা করার মধ্যে একরকম ‘ভ্রান্তি’ রয়েছে, সেটা এর আগেই কথক শিখে নিয়েছে। অভয়া-রোহিণীর বিষয়ে এইসব জল্পনা সংগত কিনা, সে-প্রশ্নটিকে আপাতত তাকে তুলে রেখে, আমি ভ্রান্তির এই সামান্য লক্ষণটি শ্রীকান্তের ভাবনা থেকে গ্রহণ করতে চাই।
ভ্রান্তি সত্য নয়। ভ্রান্তি এমন একটি ধারণা যা আমার মনের মধ্যে এক সময় উদিত হয়েছিল। তখন তাকে সত্যি বলেই জেনেছি। পরে, ঘটনাচক্রে, সে ধারণা দূর হয়েছে। আমি মনে মনে সেই সময়ে ফিরে গিয়ে মনে মনেই ঠিক করে নিচ্ছি যে, ধারণাটি ভুল ছিল তবে! সুতরাং ভ্রান্তির মধ্যে এক ধরনের পারম্পর্য আছে: ভ্রান্তি যখন ঘটে তখন তা ‘ভ্রান্ত’ বলে বিবেচিত হয় না; পরবর্তী কালে সঞ্জাত নতুন জ্ঞানের নিরিখে আগের জানাটি এক সময় বাতিল হয়ে যায়। শ্রীকান্তের কথকের ছোট এই মন্তব্যটি তাই বৃহত্তর প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। যে-জ্ঞান পরে এসে আগের জ্ঞানকে ‘ভ্রান্ত’ বলছে, সে কি শুধু ভুলটুকুই বাতিল করছে? না কি, আগে যেভাবে দেখেছিলাম আমরা, সেই দেখার অর্থটিকেও বদলে দিচ্ছে?

ভ্রান্তি নিয়ে আমার ফেরে পড়ার কারণ সকলের পরিচিত ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শ্লোক-সমন্বিত স্তোত্রটি। সবার মতো আমিও শুনেছি এবং পাঠও করেছি এই দেবীস্তোত্র; কিন্তু সেভাবে লক্ষ করিনি যে, এর মধ্যে একটি মন্ত্র ভ্রান্তিরূপে দেবীকে নমস্কার করছে। চোখে পড়ল যখন, মনেও লাগল বিষম খটকা! দৈবীশক্তির অন্যতম কাজই তো অজ্ঞান থেকে জ্ঞানে, মিথ্যা থেকে সত্যে, নিয়ে আসা। তাহলে, ভ্রান্তিকে মহিমান্বিত করার অর্থ কী? ভ্রান্তি নিয়ে আমার এই বিভ্রম কিছুতেই আর দূর হয় না! বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে যা মনে হল, তাই পেশ করা গেল; ভুল নিয়ে আর কতই বা ভুল হবে!
২
‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ স্তোত্রটি খুবই প্রসিদ্ধ এবং এই প্রসিদ্ধির বেশ খানিকটা দায়িত্ব হয়তো আকাশবাণীর অধুনা-খ্যাত মহালয়ার অনুষ্ঠানের ওপরেও বর্তায়। অবশ্য এখন তো আর মহালয়ার দিনেই ব্যাপারটা আটকে নেই; পাড়ার প্যান্ডেলে সারা বছর শিবরাত্রি থেকে গণেশ পুজো অবধি মাইক সহযোগে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মশাইকে আমরা ধরেবেঁধে চণ্ডীপাঠ করিয়েই চলেছি! সুতরাং এ স্তোত্রটি সকলেই জানেন। তবে এর ভেতরকার খুঁটিনাটি তেমন করে খেয়াল করা হয়নি, সুতরাং এইবার একটু নেড়েচেড়ে দেখতে হল ব্যাপারটা কী!

এই স্তবটি ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ গ্রন্থেই বিরাজমান, অর্থাৎ ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর ‘দেবী সপ্তশতী’ বা ‘দেবীমাহাত্ম্য’ নামক অংশেই এর আদি অবস্থান। তবে কোনও কবিতা বিখ্যাত হয়ে গেলে যেমনটা হয়, কাব্যগ্রন্থের বাইরেও তার স্বতন্ত্র জীবন গড়ে ওঠে। সেইরকমই এই স্তোত্রটিও পরবর্তীকালে ‘অপরাজিতা স্তব’ নামে স্বমহিমায় মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এইরকম নামকরণের কারণ হিসেবে ফলশ্রুতির কথাই সচরাচর চালু আছে।
এ-পর্যন্ত লিখেই আবার থমকাতে হলো, যেকালে মহামহিমেরা ‘ফলশ্রুতি’কে বেমালুম ‘ফল’কথাটির প্রতিশব্দ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছেন, এর একটা টীকা না-দিলেই নয় মনে হল! ওয়াকিবহাল যাঁরা এহেন ধৃষ্টতার জন্য তাঁরা আমায় মাপ করবেন, কিন্তু আমি এমন দুশো ব্যবহারের উদাহরণ এখুনি দিতে পারি। সাধু সাবধান, অতএব কথাটা স্পষ্ট করে বলে না-দিলে আমারও প্রাণ আঁকুপাঁকু করতে থাকবে! ফলশ্রুতি মানে হল কিনা, কোনও গ্রন্থ শ্রবণ, পাঠ, লিখন, পুনর্লিখন, দান ইত্যাদির মহিমা– গ্রন্থের শেষের দিকেই যা সাধারণত সংযুক্ত থাকত। পুরাণ, মহাভারত থেকে সত্যনারায়ণের পাঁচালি অবধি এই ফলশ্রুতির ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন। সুতরাং ‘অপরাজিতা স্তোত্র’-এর ফলশ্রুতি অপরাজেয় হওয়া– ইত্যাকার একটি ব্যাখ্যা আছে। তবে আমার মনে হয়, ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এ কাহিনিসূত্রটি দেখলে এই নামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরেকটু ভালো করে বোঝা যাবে।

‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর পঞ্চম অধ্যায়ে আখ্যানটির সূত্রপাত। শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দুই প্রবল অসুরের হাতে দেবতারা পর্যুদস্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছেন। স্বর্গরাজ্যের অধিকার হারিয়ে তাঁরা যেন নির্বাসনে আছেন। ঠিক তখনই, পরাস্ত দেবতারা স্মরণ করছেন অপরাজিতা দেবীকে– মহাসুরাভ্যাং তাং দেবীং সংস্মরন্ত্যপরাজিতাম্।
মুহূর্তটির মধ্যে একরকম অনুচ্চারিত আয়রনি আছে। যাঁরা পরাজিত– হেঁজিপেঁজি কেউ নন, দেবতা তাঁরা– তাঁরা অপরাজিতাকে স্মরণ করছেন। দেবতাদের পরাজয় এক বিশেষ ঘটনা, সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেই এই স্মরণ। দেবতারা ভাবছেন যে, দেবী তো পূর্বে আমাদের বর দিয়েছিলেন– ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করলেই আমি আবির্ভূতা হয়ে তোমাদের সমস্ত বিপদ নাশ করব।’ সুতরাং তাঁরা পর্বতরাজ হিমালয়ে গিয়ে দেবীর স্তব করতে আরম্ভ করলেন–
নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ। নমঃ প্রকৃত্যৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্মতাম্।।
কালীমোহন বিদ্যারত্নের অনুবাদে: তুমি সমস্ত ইন্দ্রিয়-প্রকাশনশীলা, তুমি মহাদেবী, তুমি কল্যাণরূপিণী, তোমাকে নমস্কার, তুমি জগতের মূল প্রকৃতি, তুমি পালনকর্ত্রী, তোমাকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার। তারপর দেবতারা বিবিধ নামে দেবীর বন্দনা করছেন– রৌদ্রা, নিত্যা, গৌরী, ধাত্রী, জ্যোৎস্না, ইন্দুরূপা, সুখা, কল্যাণী, বৃদ্ধা, সিদ্ধা, কূর্মা, নৈর্ঋতা (অলক্ষ্মী), রাজ্ঞী, লক্ষ্মী, সর্বাণী। এই সমস্ত নামেরই গূঢ় অর্থ রয়েছে, তবে আপাতত তার মধ্যে আমরা যাব না। এরপরে বলা হয়েছে:
দুর্গায়ৈ দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বকারিণ্যৈ। খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্রায়ৈ সততং নমঃ।।
তুমি অতীব দুরধিগম্য, আবার তুমিই সংকটে শরণাগতের ত্রাণকর্ত্রী, তুমি সর্ব-জননী, সুতরাং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠা, তুমি প্রতিষ্ঠারূপা, তুমি কৃষ্ণবর্ণা আবার কখনও ধূম্রবর্ণা, তোমাকে সতত নমস্কার। দেবতারা বলে চলেছেন– তুমি অতিসৌম্যা আবার অতিরৌদ্রা, তোমাকে প্রণাম করি। তুমি জগৎপ্রতিষ্ঠাত্রী দেবী, তুমিই ক্রিয়া, তোমাকে নমস্কার করি। তারপর কবিতাটির প্রকরণ পাল্টে যাচ্ছে; আরম্ভ হচ্ছে সেই অংশটি যার ধ্বনি আমাদের মোহিত করে রেখেছে–
যা দেবী সর্বভূতেষু বিষ্ণুমায়েতি শব্দিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।

বিষ্ণুমায়া রূপে দেবীর বন্দনা থেকে এই বিশেষ আঙ্গিকটি শুরু হয়। পরবর্তী শ্লোকগুলিতে একটি-দু’টি পদ পাল্টে যায়; বিষ্ণুমায়া শব্দটি চেতনেত্য, বুদ্ধি প্রভৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়, কিন্তু আঙ্গিকটি একই থাকে। প্রতিটি পঙ্ক্তিই দেবীপ্রণাম। এই পর্যায়ের শেষতম শ্লোক–
যা দেবী সর্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
অর্থাৎ, যিনি সকল প্রাণীর অন্তঃকরণে ভ্রান্তিরূপে বাস করেন, সেই দেবীকে বারবার প্রণাম।
দেবতারা তো শুম্ভ-নিশুম্ভ কর্তৃক হতমান হয়ে দেবীকে প্রসন্ন করে ত্রাণ পেতে চাইছেন, তাঁদের এই ভ্রান্তি-বন্দনার অর্থ কী?
৩.
আগেই বলা হয়েছে যে, পরাজিত হয়েই দেবতারা এই সময় অপরাজিতা স্তবে ব্রতী হয়েছেন। একটাই যা বাঁচোয়া, এই প্রচণ্ড সর্বনাশের মধ্যেও তাঁরা দেবীর বরদানের কথাটা ভোলেননি! একথাটা কিন্তু ঠিকই ধরে রেখেছিলেন যে, স্মরণ করা মাত্র দেবী প্রকট হয়ে তাঁদের বিপদ নাশ করবেন।
আজ তাঁরা সত্যই বিপন্ন এবং বিপন্ন বলেই তাঁরা বিভ্রান্ত। নইলে এত মহা মহা দেবতা নিজেদের বাহুবলে ও কৌশলে এই দু’জন শত্রুর সঙ্গে পেরে উঠছেন না কেন? কোথাও যে একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে, একটা ভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেকথাটা দেবতারা একটুও বুঝছেন না, তেমনটাও নয়। আমার মনে হয়, নিজেদের ভ্রান্তির সম্ভাবনা আঁচ করতে পারছেন বলেই, দেবীকে এতশত নামে বন্দনা করার পরে শেষে গিয়ে ভ্রান্তির মধ্যেও তাঁর সংস্থান করছেন। কারণ দেবী যদি সর্বকারিণী হন, তাহলে ভ্রান্তির মধ্যেও তাঁরই প্রকাশ ঘটেছে। তাই রাজ্যভ্রষ্ট, বুদ্ধিভ্রষ্ট দেবতাসমাজ উচ্ছন্নে যাবার ঠিক আগে, নিজেদের বুদ্ধিভ্রংশের মধ্যেও মরিয়া হয়ে দেবীর আবাহন করছেন।

তবে এই ভ্রান্তিকে সচরাচর যেভাবে অনুবাদ করা হয়– মায়া, অজ্ঞান, ভুল, মিথ্যা– এর মধ্যেই তাকে সীমায়িত করে দিলে বড় গন্ডগোল হবে। ‘দেবী সপ্তশতী’র সবচেয়ে প্রামাণ্য টীকাগুলির মধ্যে অন্যতম ভাস্কররায়ের ‘গুপ্তবতী’ টীকা। ভ্রান্তি শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘গুপ্তবতী’ শুধুমাত্র এইটুকু নিরুক্তি করেছেন– ‘ভ্রান্তিরপ্রমা’। ভেঙে বললে দাঁড়ায়: ভ্রান্তি অপ্রমা। অর্থাৎ ভ্রান্তি প্রমা নয়, বৈধ জ্ঞান নয়। প্রমা শব্দের ইতিহাস বড় জটিল। ন্যায়দর্শনের ভাষায় প্রমা হল যথার্থ জ্ঞান। প্রমায় পৌঁছনোর উপায় হল প্রমাণ। ন্যায়ের মতে চারটি প্রধান প্রমাণ– প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শব্দ– এদের যথাযথ ব্যবহারে উৎপন্ন জ্ঞানই হলো প্রমা।
লক্ষ করুন, অপ্রমা কিন্তু ‘অজ্ঞান’ নয়। তা হল জ্ঞানের এমন অবস্থা যা কিনা প্রমায় পৌঁছয়নি। সুতরাং, ‘অপ্রমা’ বলতে জ্ঞানের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি বোঝাচ্ছে না, বোঝাচ্ছে এমন জ্ঞান যার অর্থবোধ যথাযথ প্রমাণে অধিগত হয়নি। এই ফারাকটি খুব জরুরি। কারণ প্রমাণের এই ফাঁক থেকেই ন্যায়ে ভ্রান্তির ধারণা করা যায়। প্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত হল, চকচকে শুক্তি বা ঝিনুক দেখে রূপা বলে মনে হওয়া। ঝিনুকই সত্য, তাকে রূপা বলে ভ্রম হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে, খুঁটিয়ে দেখলেই ভুলটি ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু তাই বলে রূপা মনে হওয়ার মুহূর্তের প্রতীতি যে কোনওকালেই ঘটেনি এমনটা বলা যাচ্ছে না। তুলনীয় দৃষ্টান্ত, রজ্জুতে সর্পভ্রম। বেদান্ত, যোগসূত্র বা প্রত্যভিজ্ঞা দর্শন ধরে এই জাতীয় অনেক বিশ্লেষণই হয়তো করা যেত, কিন্তু মোটের ওপর কথাটি মনে হয় বোঝা গিয়েছে। পরবর্তী জ্ঞান পূর্ববর্তী জ্ঞানটিকে ভ্রান্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
পোস্টট্রুথের আমলে একথা বলার মুশকিল আছে। মনে হতে পারে যে, ভ্রান্তিকে সত্য জ্ঞানের সমকক্ষ হিসেবে ধরে নেওয়া হল বুঝি! তা কিন্তু মোটেই নয়। ভ্রান্তি অযথার্থ। তাকে ভুল বলে চেনাও যাচ্ছে। শুধু যে-মুহূর্তে সে-জ্ঞানটি প্রতীত হয়েছিল তাকে নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে না।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় চৌকো পৃথিবী থেকে গোল পৃথিবী, কিংবা পৃথিবীর চারদিকে সূর্যের পাক খাওয়া থেকে সৌরজগতের তত্ত্ব, বা আকাশগঙ্গা থেকে ব্ল্যাক হোল– ধারণার কতরকম পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে! আগের জ্ঞানটি ভুল প্রমাণিত হলেও, সংশোধিত বা বর্জিত হলেও, সেই জ্ঞান যখন সত্য বলে প্রতীত হয়েছিল, সেই সময়কে বা তখনকার বিজ্ঞান-চিন্তার মানুষী ইতিহাসকে কিন্তু আমরা অস্বীকার করিনি। ভ্রান্তি মহিমান্বিত নয় কখনওই, তবে তা আমার সামূহিক ও ব্যক্তিগত ইতিহাসের অচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে।
বোধহয়, সেই জন্যই দেবতারা বিপন্ন হয়ে যখন দেবীর শরণ নিতে চাইছেন, তাঁর সমস্ত প্রকাশের মধ্যে ভ্রান্তিকেও বাদ দিচ্ছেন না। পরব্রহ্মারূপা দেবী যদি সকল কার্যের কারয়িত্রী হন, তাহলে তিনি তো ভ্রান্তিরও অধিষ্ঠাত্রী। বিশেষ করে দেবসমাজের এই সংকটাপন্ন অবস্থায় ভ্রান্তির চেয়ে সত্য আর কী? তাই ভ্রান্তিরূপে সম্যক স্থিতা দেবীকে তাঁদের প্রণাম, পুনঃ পুনঃ প্রণাম।
৪
গীতা ঘটক গাইছেন, তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে– ‘বাহিরে ভুল হানবে যখন অন্তরে ভুল ভাঙবে কি।’ ঢেলে গাওয়া, চরণের শেষে ‘কি’ এর ওপর যখন এসে দাঁড়াচ্ছেন, বেশ ক’টি দানায় প্রসারিত। মনে হয়, প্রশ্ন আর হাহাকার যেন একই সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। ছ্যাঁৎ করে ওঠে ভেতরটা। স্বর থেকে স্বরান্তরে চলে যাচ্ছেন, তার মাঝে একবার কোমল গান্ধার এসে লাগে, আর জীবনের যত ভুল, যত ভ্রান্তি ওই ক্ষণিকের মধ্যে একবার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। যেখানে বিস্মৃতির মধ্যে তলিয়ে ছিল তারা, নাভির তলায় অনুভূতির সেই পাতাল থেকে, আমার সমস্ত ভ্রান্তিকুল বুক ছাপিয়ে কণ্ঠ ছাপিয়ে মাথা পর্যন্ত উঠে আসতে চায়। যেহেতু বিস্মৃত, নির্বাসিত, স্মৃতির মধ্যে তাদের এসে পড়া নিষেধ। কোমল গান্ধারে এসে সেই বিস্মৃত স্মৃতি একবার গুমরে উঠে ফের ঋষভে নেমে যায়। গীতার ঠোঁটের কোণে কী যেন একটা হাসির আভাস, আর চোখের কোণে জল টলটল করে, পড়ে না যদিও। ওই না-পড়া অশ্রুজলের মধ্যে চিকচিক করছে আমাদের সকল ভুলের না-লেখা জীবনচরিত।

পিছনে তাকিয়ে যখন স্বীকার করি আজ, আমি ভ্রান্ত ছিলাম; আমার সমস্ত সত্তা তখন যেন গুমরে উঠে বলে– ‘আমায় মাপ করো, আমি ভুল করেছিলাম!’ তাতে করে আমার জানা-বোঝা-করা সব তো ভুল হয়ে গেল। তাহলে প্রথম অভিজ্ঞতাটির এবার কী হবে? সে কি মিথ্যা হয়ে গেল? নাকি তার সত্যতা অন্য কোনও স্তরে ছিল? ঘটনাটি ঘটেছিল, আমি তা অনুভবও করেছিলাম, কেবল তার অর্থ নির্ধারণে ভ্রান্তি রয়ে গিয়েছিল আমার!
সাধ করে নিজের ভুলভ্রান্তি লিখে রাখতে কেই-বা চায়! ভুলকে ভুলে যেতে পারলেই বরং ল্যাঠা চোকে। সেইজন্যেই স্তোত্র যখন ভ্রান্তিরূপা দেবীকে বারবার প্রণাম করে, আমাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত ভুল-বোঝাগুলিও আর দুর্বিষহ থাকে না। মানুষের বোঝা না বোঝা, পারা না পারা, ভালো ও মন্দ– কাউকেই আর নির্বাসনে যেতে হয় না। এইসবই যেন অনুভূতির আলোয় দৃশ্যমান হয়। সুতরাং ভ্রান্তিরও পুনরুজ্জীবন ঘটে; সত্যি হিসেবে নয়, আবার শুধুমাত্র ভুল হিসেবেও নয়। কারণ অর্থটি ভুল বলে চিহ্নিত হওয়ার পরও সেই সময়ের অনুভব ও তার অভিজ্ঞতা সত্যি থেকে যায়। একভাবে দেখলে বলা যায়, ভ্রান্তি অযথার্থ জ্ঞান হতে পারে, তবে তাই-ই আবার যথার্থ জ্ঞানের সম্ভাবনা প্রস্তুত করে দেয়।
পরের জ্ঞান কি কেবলমাত্র আগের জ্ঞানকে ধ্বংস করে? নাকি পরের জ্ঞান না ঘটলে আগের জ্ঞানকে আমরা যে-অর্থে ভ্রান্তি বলছি, সেই পরিচয়টিই সম্ভব হয়ে উঠত না? বাইরে যাকে ভুল বলে হানা দিতে দেখছি, ভেতরে ভেতরে তা কি ভুল ভাঙাচ্ছে আমার? নাকি, বাইরের ভুলের সঙ্গে অন্তরের ভুলের, এবং জ্ঞানের সঙ্গে অনুভূতির স্তরায়িত কোনও সম্পর্ক আছে?
বাহিরে ভুল হানবে যখন অন্তরে ভুল ভাঙবে কি?
৫.
কোনও একটি বিষয়ে আমার জ্ঞান প্রামাণ্য নয়, এটা না-হয় জানা হয়ে গেল। তারপর কী হবে? আমার যাবতীয় ভ্রান্তিকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?
দেবীমাহাত্ম্যে বিষ্ণুমায়া থেকে শুরু করে, চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, ছায়া, শক্তি, তৃষ্ণা, ক্ষান্তি, জাতি, লজ্জা, শান্তি, শ্রদ্ধা, কান্তি, লক্ষ্মী, বৃত্তি, স্মৃতি, দয়া, তুষ্টি, মাতৃ এবং ভ্রান্তিরূপে সংস্থিতা দেবীকে প্রণাম করছেন দেবতারা। ‘গুপ্তবতী’ টীকায় ভাস্কররায় বিষ্ণুমায়া থেকে ভ্রান্তি পর্যন্ত এই অংশটিকে দেবীর ২১টি তত্ত্ব বলে অভিহিত করেছেন। বিষ্ণুমায়া, যোগমায়া, মহামায়া ইত্যাদি আখ্যার পৃথক পৃথক তাৎপর্য রয়েছে যদিও, তবুও সাধারণভাবে এদের যদি একই পর্যায়ভুক্ত বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে মায়া থেকে ভ্রান্তি পর্যন্ত একটি পরিক্রমা হয়ে যায়।

কী আশ্চর্য সেই ক্রম!
জীবনের মৌল সব ক্রিয়াকর্ম এই একবিংশ তত্ত্বের মধ্যে সংহত হয়ে আছে। নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, বৃত্তি (জীবিকা অর্থে), স্মৃতি– দেবীস্তোত্রে এদের উপস্থিতি আমাদের বিস্মিত করে। ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এই সবই তো অভিজ্ঞতালব্ধ, অনুভূতিরও বিষয়। স্তবের উদ্গাতা দেবতারা, কিন্তু এই অনুভূতিমালা তো মানবিক। তাহলে কি অপরাজিতা স্তোত্র আসলে জীবনের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে দেবীর অধিষ্ঠানের জয়গাথা?
আরেকবার মনে করা যাক, স্তোত্রের শুরুতেই দেবী প্রকৃতি নামধ্যেয়। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি ও পুরুষ তত্ত্বের কথা সকলেই জানেন। পুরুষ সেখানে নির্বিকার, প্রকৃতি সগুণাত্মিকা। প্রকৃতি তত্ত্বের বিকাশে মহৎ বা বুদ্ধি, অহংকার, মন এবং ইন্দ্রিয় সমূহ নিয়ে জগতের অভিজ্ঞতার কাঠামো তৈরি হয়। এতক্ষণ ধরে তো জগতের কথাই হল, জাগতিক কথাই হল। তাই নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, মায়া, দয়া, স্মৃতি, লজ্জা, শান্তি, কান্তি, জাতি– এইসব জুড়ে জগত-প্রপঞ্চের গুণকীর্তন। সগুণাত্মিকা প্রকৃতির জয়ঘোষণা। শেষমেষ, দেবতারা সন্তান-বুদ্ধিতে জননী-স্বরূপা দেবীর আশ্রয় নিলেন–
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
মা বলে যেই ডাকা হল তাকে, শরণাগতি হল, অমনি বিপন্ন সন্তান অনুভব করলেন যে, মাতৃক্রোড়ের নিরাপদ আশ্রয়, সন্তানের বুদ্ধি বা আর কোনও গুণাবলির ওপর নির্ভর করে না আদপেই। বরং সন্তান যে ভ্রান্ত হবে সেটাই স্বাভাবিক এবং নিজের সমস্ত ভ্রান্তিসমেত সে মায়ের কোলে দিব্যি ঠাঁই পেয়ে যায়। এই প্রেক্ষিতেই ভ্রান্তির মধ্যে অবস্থিত জগজ্জননীর প্রতি প্রণত হচ্ছেন দেবতারা। লক্ষণীয় যে, এই অনুভূতিমালার চূড়ান্ত বিন্দুতে অবস্থান করছে ভ্রান্তি। এতক্ষণ অবধি ভ্রান্তি নিয়ে যত কথা হল, এই স্তোত্র সেসবই অতিক্রম করে যায়। কারণ অনুভূতি থেকে অনুভূতিতে দেবীকে খুঁজতে খুঁজতে এবার আমাদের মনে হচ্ছে ভ্রান্তির অন্যতর অর্থও হয়তো রয়েছে।

দেবী যদি পরব্রহ্ম-স্বরূপিণী হন, তাহলে সংজ্ঞা অনুসারেই, তিনি বাক্য ও মনের অগোচর। অর্থাৎ কোনও ধারণাই তাঁকে সম্পূর্ণত ধারণ করতে পারে না। অন্যদিক থেকে বলা যায় যে, তাঁর বিষয়ে সমস্ত ধারণাই অপূর্ণ, যাবতীয় জ্ঞানই সেই অর্থে ভ্রান্ত। এইরকম একটি দার্শনিক পাঠের সম্ভাবনাকেই হয়তো দেবতারা ঊন্মোচিত করেছেন। তাঁরা পরাজিত শুধু শুম্ভ-নিশুম্ভের কাছে নন, অপরাজিতা দেবীর স্মরণটি গোড়া থেকেই পরাজিত হয়ে আছে। যে শরণাপন্ন, সে বোধহয় আর পরাজয়ের সম্ভাবনায় কাতর নয়, তার নিবেদনের মূল কথাই তাই সমর্পণ। ‘হার-মানা হার’ যে পরাতে চায়, তার চরম আকাঙ্ক্ষা হল ‘পরম মরণ লভিব চরণতলে’।
এবার দেখুন, এই পর্যন্ত এসে পৌঁছনোর পর দেবতারা কী বলছেন–
ইন্দ্রিয়াণামধিষ্ঠাত্রী ভূতানাঞ্চাখিলেষু যা। ভূতেষু সততং তস্যৈ ব্যাপ্তিদেব্যৈ নমো নমঃ।।
চিতিরূপেণ যা কৃৎস্নমেতদ্ব্যাপ্য স্থিতা জগৎ। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
অর্থাৎ, যিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী এবং যিনি সমস্ত ভূতে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন তাঁকে প্রণাম। যিনি সর্বভূতে ও ভৌতিক জগতে চিৎ রূপে বিরাজমান, তাঁকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম।
সমস্ত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতায় দেবীর অনুসন্ধান করে স্তবটি এখন ইন্দ্রিয়ের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে এবং তার ঠিক পরেই চিত্তরূপে ব্যাপ্ত দেবীকে প্রণাম করছে। সেই চিত্ত কিন্তু সর্বভূতে অধিষ্ঠিত। খেয়াল করুন, ভ্রান্তির সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নিয়েও নিতান্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের মধ্যে, দৃশ্য-শ্রব্য-স্পর্শযোগ্য ধুলোমাটির পৃথিবীর লৌকিকতায়, দেবীকে পাবার প্রয়াস চলছে। ইন্দ্রিয়ের অনুভববেদ্য অভিজ্ঞতার থেকেই চিত্তে দেবীর আরাধনা ঘটবে এই কথাটিও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছে এই স্তোত্র।
৬
আমাদের দেখা, জানা, স্মৃতি, কামনা প্রভৃতি কোনও কিছুই তো শরীরহীন, সীমাহীন জ্ঞানের মধ্যে ঘটে না! ঘটে দেহ ও দেহীর মধ্যেই। এর মধ্যে তন্ত্রের প্রকরণের আভাস পেতে পারেন কেউ, তবে সে পথে আমরা আজ যাব না। শুধু মনে পড়তে পারে, মায়া-কায়া-ছায়াকে বাদ দিয়ে নয়, দেহভাণ্ডের মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনুরণনই তন্ত্রের পথ। সে পথে ক্ষুধা তৃষ্ণা বর্জনীয় নয়, বরং ইত্যাকার প্রবৃত্তির মধ্যে দিয়েই যত সাধ্য-সাধনা।
তন্ত্র-তত্ত্বে প্রবেশ এ-লেখার পরিসরে সম্ভব নয়, সেকথা না হয় বাদ থাক। অপরাজিতা স্তোত্রের একেবারে সমাপ্তি বিন্দুতে আমরা উপনীত হয়েছি। দেবতারা এবার বললেন যে, ‘পূর্বে মহিষাসুর বধের সময়ে দেবগণ যাঁর স্তুতি করেছিলেন, যাঁকে দেবেন্দ্র নিত্য সেবা করে থাকেন, দৈত্যদের দ্বারা উদ্বিগ্ন হয়ে আমরা এখনো ভক্তি সহকারে যাঁকে প্রনাম করছি, যাঁর স্মরণমাত্রেই সমস্ত আপদ বিনষ্ট হয়, আপনি সেই শুভদাত্রী ঈশ্বরী, অতএব আমাদের সর্বদা মঙ্গল বিধান করুন, সমস্ত বিপদ নাশ করুন।’
এই বলে দেবতারা থামলেন। আবার আমরা ফিরে এলাম আখ্যানে।
কথক ঋষিঠাকুর বললেন, এবার কী হল জানো তো! দেবতারা স্তব করছেন, তাঁদের সম্মুখে দেবী পার্বতী গৌরী রূপে আবির্ভূতা হলেন। যেন তিনি গঙ্গায় স্নান করতে চলেছেন। মুহূর্তটি অত্যন্ত নাটকীয়। দেবতারা যাঁর শরণ নিয়ে পরিত্রাণ পেতে চাইছেন, তিনি স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন। অথচ দেবতারা তাঁকে চিনতে পারেননি, কারণ তিনি এসেছেন, গৌরী হয়ে, নিশ্চয় তাঁকে দেখে সাধারণ পার্বত্য বালিকাই মনে হয়ে থাকবে দেবকুলের। দেবীর কৌতুক লক্ষ করুন, স্তবপরায়ণ দেবতাদের দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, ‘হে দেবগণ! আপনারা এখানে কার স্তব করছেন?’ তাঁর কৌতুক এবার চরমে পৌঁছে যায়। কারণ দেবতারা কিছু বলে ওঠার আগেই, এই নিরীহ বালিকার দেহকোষ থেকে দেবী শিবার আবির্ভাব হল এবং তিনিই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন। দেবতাদের অবস্থাটা কল্পনা করুন। তাঁরা যুদ্ধে হেরে এমনিতেই বিভ্রান্ত হয়ে ছিলেন, তাঁদের সামনে বালিকা রূপে আগমন, নিরীহ প্রশ্ন, এবং শিবারূপ ধারণ করে উত্তর– ‘শুম্ভ এবং নিশুম্ভ কর্তৃক যুদ্ধে পরাজিত এই দেবতারা আমারই স্তব করছেন’।

এর পরের শ্লোক ক’টির ব্যাখ্যা নিয়ে একটু মতভেদ আছে, কিন্তু তার মধ্যে আমরা যাব না। মোটকথা হলো, দেবতারা কিন্তু একই সঙ্গে দেবীর দু’টি রূপ দেখছেন– পার্বতী বা অম্বিকা এবং কৌষিকী বা কালিকা। এক দেবী আরেক দেবীতে পরিণত হলেন এমন নয়, একই অঙ্গ থেকে আরেক দেবীর উৎপত্তি এবং একই সঙ্গে দু’জনের অবস্থান। তাঁরা আবার পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তাও বলছেন! অনুমান করা যায়, এইসব দেখেশুনে বিভ্রান্ত দেবতারা নিশ্চয়ই আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।
আমার মনে হয়, ভ্রান্তিরূপা দেবীর বন্দনার পর দেবীর এই বিভ্রান্তিকর কৌতুক, আখ্যানের মধ্যে, এবং স্তবটির মধ্যেও এক ধরনের ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি তৈরি করে।
৭.
হাজার হলেও ভ্রম তো ব্যক্তিগত অনুভববেদ্য; তাই ন্যায়, যোগ, বেদান্ত বা সাংখ্যের দার্শনিকতা থেকে বিরতি নিয়ে সাধকের ধ্যানে, ভ্রম কেমন তা একটু দেখা যাক। রামপ্রসাদ বলছেন–
মন তোমার এই ভ্রম গেল না।
কালী কেমন তাই চেয়ে দেখলে না।
ওরে ত্রিভুবন যে মায়ের মূর্তি
জেনেও কি তাই জান না।
জানা হয়ে গিয়েছে। অজ্ঞতা নেই। তবুও, জানা হয়ে গেলেও, তা এখনো না-জানার মধ্যে রয়ে গিয়েছে। ভ্রান্তিকে আমরা পরবর্তী জ্ঞান দ্বারা পূর্ববর্তী জ্ঞানের বাধিত হবার ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলাম। রামপ্রসাদের গানে কিন্তু উলটপুরাণ। কারণ, এই বিশ্বভুবন যে মায়েরই রূপ, সেকথা জেনে আবার না-জানার মধ্যে পর্যবসিত হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী জ্ঞানকে পরবর্তী ভ্রান্তি এসে আচ্ছাদন করেছে। সেজন্যেই মনের ‘ভ্রম’ও যায়নি। কালী কেমন তা আর দেখা হয়নি!
চেয়ে দেখাকে এত গুরুত্ব দেন রামপ্রসাদ, মনে হয় দর্শনের অভিজ্ঞতা এখানে জানার চেয়ে, জ্ঞানের চেয়ে মহত্তর ও গভীরতর হয়ে ওঠে। ভ্রম এখানে কেবল না-জানা জিনিস নয়, আপাত-জানা জিনিসের মধ্যে থাকা এমন কিছু যা আবার দেখতে বাধ্য করে। এই দেখা একটি নিরন্তর অনুশীলনের মতো। একই রূপকে বারবার দেখতে হয়। দেখতে দেখতে নিজের পুরনো দেখার মধ্যে কোন ফাঁকে ধারণা ঢুকে পড়েছিল, তাকে নির্ধারিত করেছিল, তাকেও চাক্ষুষ করতে হয়।

মনে হয় যে, ভক্তির মধ্যে, সাধনার মধ্যে, সাহিত্য বা শিল্পের চর্চার সঙ্গেও এর একটা সম্পর্ক আছে। পুনরাবৃত্তি শুধু হুবহু নকল নয়, পুনরাবৃত্তির মধ্যে দেখার, এবং জানার পরিবর্তনও ঘটে যায়। আমাদের ঈশ্বর, দেবী, বা ব্রহ্ম বিষয়ক জ্ঞান-তন্ত্রের ভেতরে এই বদলের সম্ভাবনা সতত ক্রিয়াশীল থাকে। সীমিত ভাষা, ইন্দ্রিয়, স্মৃতি, বুদ্ধি ইত্যাদি দিয়ে জ্ঞান-প্রকরণ অসীমকে চিহ্নিত করতে চায়, ধারণা করতে চায়। এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপই তাই পুনর্বিচারযোগ্য। কিন্তু তা বলেই প্রতিটি পদক্ষেপ অর্থহীন হয়ে যায় না।
৮.
ভ্রান্তি নিয়ে আমার এই তাবৎ প্রশ্নের সরল কোনও উত্তর নেই।
মানুষ কীভাবে জানে, কীভাবে ভুল জানে এবং কীভাবে নিজের ভুল জানাকে ভুল বলে জানে– এই তিনটি স্তরে প্রশ্নটি পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।
ভ্রান্তিকে সত্য জ্ঞান বলা যাবে না, আবার জ্ঞানহীনতাও নয়। ভ্রান্তির মধ্যে প্রতীতি আছে, অভিজ্ঞতা আছে, স্মৃতি আছে। ভ্রান্তি পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণের পরবর্তী নাম। পরের সময় যখন অতীত সময়ের মধ্যে চারিয়ে যায়। এক অর্থে অতীতও প্রবিষ্ট হয় ভবিষ্যতে। সেই জন্যই বলতে চেয়েছি যে, ভ্রান্তিই বস্তুত জ্ঞানের সম্ভাবনা। জ্ঞান যখন নিজের পূর্ববর্তী অবস্থাকে ভ্রান্ত বলে চিনে নিতে পারে, তার ভেতর সীমা অতিক্রম করার প্রতিস্পর্ধা তৈরি হয়ে গিয়েছে।
‘রূপসী বাংলা’–য় জীবনানন্দ দাশ লিখছেন –
তবু তাহা ভুল জানি… রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা;
তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ়–
আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার, আরো ঢের জল, জয় আরো;
তোমারো পৃথিবী পথ; নক্ষত্রের সাথে তুমি খেলিতেছ পাশা:
ভুল এখানে ব্যক্তিগত। আবার সেই চৌহদ্দি ছাপিয়ে ইতিহাসের গতিকেও সূচিত করে। মানুষের তৈরি স্মারক স্থাপত্য যাকে কীর্তি বলে জেনে এসেছি আমরা, কীর্তিনাশা পদ্মানদী সেই মাপকাঠিটাকেই ভুল প্রতিপন্ন করে। পদ্মাকে মাপতে গিয়ে মানুষ নিজের মাপের ক্ষুদ্রতা হঠাৎ করে বুঝতে পারে।

আর এই যে শব্দবন্ধ, ‘তবু তাহা ভুল জানি’– এ যেন প্যারাডক্সিকাল। কোন জানার কথা বলছেন কবি? তা ভুল কেন? সূচনার ‘তবু’ শব্দটির প্রয়োগ এমনই মোক্ষম যে, তা আমাদের সমস্ত মানুষী জানার প্রক্রিয়াকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কারণ এই জল এত বেশি, তার জয় এত বড় আর গাঢ়! যে-মানুষ নক্ষত্রের সঙ্গে পাশা খেলছে বলে ছদ্ম-গৌরবে গর্বিত হয়ে আছে, তার সমস্ত জারিজুরি জলের, বাতাসের একটি ঢেউয়ে, বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যেতে পারে। একে ‘প্রকৃতির নিয়ম’ বলে ধারণা করার চেষ্টা করতে পারি আমরা, যদিও মনে রাখা দরকার, ইতোপূর্বে আলোচিত সাংখ্যের প্রকৃতির সঙ্গে এই পরিবেশ-প্রকৃতির বিস্তর অমিল রয়েছে। তবে এই আধুনিক অর্থের প্রকৃতিও অপরাজিতা এক অর্থে। এবং স্তোত্রের দেবীর মতোই, ভ্রান্তিতেও তার সম্যক অধিষ্ঠান। কারণ, আমাদের সমস্ত দেখার মতোই, সকল জ্ঞানের মতোই, তা সতত অপূর্ণ। নিয়ত পরিবর্তনশীল। সর্বদাই ভাবতে বাধ্য করছে যে, এইসবই যদি ভ্রান্তি মাত্র, তাহলে আমি যা দেখেছিলাম, যা জেনেছি বলে ভেবেছিলাম, তা কী ছিল আসলে?
এসেছে সন্ধ্যার কাক ঘরে ফিরে;– দাঁড়ায়ে রয়েছে জীর্ণ মঠ;
মাঠের আঁধার পথে শিশু কাঁদে– লালপেড়ে পুরোনো শাড়ির
ছবিটি মুছিয়া যায় ধীরে ধীরে—কে এসেছে আমার নিকট?
‘কার শিশু? বল তুমি’: শুধালাম; উত্তর দিল না কিছু বট;
কেউ নাই কোনোদিকে—মাঠে পথে কুয়াশার ভিড়;
তোমারে শুধাই কবি: ‘তুমিও কি জান কিছু, এই শিশুটির।
কবি দ্রষ্টা, সুতরাং তার তো সবটাই জানার কথা। এককালের সমৃদ্ধ মঠের জীর্ণতার মধ্যে, সন্ধ্যার অন্ধকার পথের মধ্যে, অচেনা শিশুটির কান্নার অজানা বৃত্তান্তও কবির হয়তো জানা আছে। কিন্তু শেষ পঙ্ক্তির প্রশ্ন শুনে কেন যেন মনে হয়, কবিও কিছু জানেন কি না, তাই নিয়ে দ্বিধা রয়ে গিয়েছে। জীর্ণ, ভগ্ন কীর্তির মতো এই শিশুটিও তো সময়ের সন্তান, তাই তাকে জানার মধ্যেও ভ্রান্তির সম্ভাবনা পদে পদে। প্রথম পঙ্ক্তির ‘তবু তাহা ভুল জানি’ আমাদের সমস্ত জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করে। তবুও শিশু কাঁদে এবং তার অর্থ না-জানলে আমাদের চলে না। সেই জানা পরবর্তীকালে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হতে পারে তা জেনেও, আমরা জানার চেষ্টা চালিয়ে যাই।
সতর্কীকরণ বার্তায় বলা থাক যে, ইচ্ছে করে ভুল জানা বা জানানো কিন্তু ভ্রান্তি নয়। তার নিজস্ব সময়ে, ওই মুহূর্তটির জন্য ভ্রান্তি সত্য, তাই তা প্রণম্য।
দেবীপক্ষে, সমস্ত ভ্রান্তিকে, জানার সমস্ত সীমায়িত সম্ভাবনাকে, আমার প্রণাম।
পড়ুন শারদ সংখ্যা-র অন্যান্য লেখা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved