

যে রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন প্রথার অনর্থক খাঁচাগুলি ভাঙতে ভাঙতে চলেছেন, মার্কা দেওয়ার সংস্কৃতিকে নস্যাৎ করতে চেয়েছেন– তাঁরই রচিত আশ্রম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই গানের আত্মাকে আড়াল করেছে অনুষঙ্গের ভার। আর এভাবেই ‘রাবীন্দ্রিক’ শব্দটি ক্রমশ দূরে সরে গিয়েছে স্বয়ং এবং সমগ্র রবীন্দ্রনাথের থেকে!
শোনা যায়, পূর্ব দিক থেকে কলাভবনের অবস্থানগত পরিবর্তন ক্রমশ পশ্চিমদিকে সরে আসায় নন্দলাল একটু রসিকতা করেছেন। ঘনিষ্ঠ বৃত্তে গল্পচ্ছলে তিনি বলেছেন, কলাভবনের গতি দেখছি ক্রমে পুব থেকে পশ্চিমে চলেছে। অর্থাৎ শিল্পের অভিমুখ যেন প্রাচ্য থেকে ধীরে ধীরে পাশ্চাত্যের দিকেই এগিয়ে চলেছে।
প্যারিসে আন্দ্রের আতিথ্যে থাকাকালীন ফ্রেস্কো আর বাটিক ছাড়াও প্রতিমা আরেকটি কাজ শিখেছেন, সে হল ইউরোপীয় পটারি। কলাভবনের সিলেবাসে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে সিরামিক পটারির যে কোর্স চালু হয়েছে– তার সুদূর নেপথ্যেও প্রতিমা দেবী।
অবনীন্দ্রনাথের মনে কি কোনও অভিমান লুকিয়ে ছিল? কীসের সে অভিমান? শিল্পের সমকালীন অবস্থা কি তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না? এমতাবস্থায় অবনীন্দ্রনাথ আগামী পাঁচ বছর চিত্রপ্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে বললেন। আরও কঠিন স্বরে তাঁর প্রিয় শিষ্যদের কাছে গুরুদক্ষিণা চাইলেন তিনি!
স্টেলার ক্লাসে ইম্প্রেশনিস্ট থেকে কিউবিস্ট আর্ট পর্যন্ত বিশদ আলোচনা হত। উল্লেখ করতে হয়, এই সব আলোচনা তিনি যখন করেছেন, তখন আমাদের দেশের শিল্পী ও শিল্পরসিকরা পশ্চিমের এই আধুনিক বিষয় সম্পর্কে একেবারেই অবহিত ছিলেন না।
আজ থেকে বছর কুড়ি পূর্বে পূর্ণশশীর বাড়িটি যখন বিক্রয় হয়ে গেল তখন সেটি খালি করে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপরে। সেই বাড়ির একটি ঘরে দেখলাম কাদামাটি আর বর্ষার পচা জলের তলায় পড়ে আছে প্রচুর স্লেট-কাটিংয়ের নমুনা। পূর্ণশশীর উত্তরাধিকারীরা এই শিল্পকর্মের মর্যাদা বুঝেছিলেন বলে আমার মনে হয় না।
পুলিশের চোখ এড়াতেই শান্তিনিকেতনে ভর্তি হওয়া। বিপ্লবী, কিন্তু শান্ত ও স্থিতধী, এক দৃঢ় অথচ কোমল ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী ইন্দু। নন্দলাল, গৌরগোপাল আর প্রভাতমোহন বাদে কেউ তাঁর এ সত্তাটির কথা জানেন না। তাঁর পাশে দাঁড়ালেন নন্দলাল। বিনা আয়াসে সুন্দরভাবে রাখী বেঁধে দিলেন তাঁর শিল্পপ্রেম আর স্বদেশপ্রেমের।
শিক্ষক নন্দলাল, আপামর ছাত্রকুলের ‘মাস্টারমশাই’– যিনি ভারতীয় পরম্পরার প্রতি ভাবে প্রবল নির্ভর থেকেও ভারতীয় ট্র্যাডিশন ভাঙার শক্তিকে আহ্বান করেন। খুব সহজ ভঙ্গিতে আর্টের গোড়ার কথাটুকু মেলে ধরতে তাঁর জুড়ি ছিল না।
রবীন্দ্রনাথের গান অবলম্বনে একাধিক শিল্পী ছবি এঁকেছেন। অথচ রবিঠাকুর কোনও শিল্পীর ছবি দেখে গান রচনা করেছেন, এমন নজির একেবারে হাতে-গোনা। এঁদের মধ্যে নন্দলাল আর অসিতকুমারের কথাই সবার আগে মনে পড়ে।
নন্দলাল চলে যাওয়ায় অসিতকুমার পুনরায় আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে কলাভবনে যুক্ত হতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়েছেন। নন্দলাল ফিরে গিয়েছিলেন নভেম্বরের শেষে। জানুয়ারির গোড়াতেই রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে অসিতকুমারের শান্তিনিকেতনে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved