

বাদল সরকারের নাট্যদর্শনে আদি পাপের ধারণাটি কেবল সমাজ বা রাষ্ট্রের বৃহত্তর ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা প্রবেশ করেছে ব্যক্তিমানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরতম স্তরে। বাদল সরকারের ঈশ্বরবিহীন পৃথিবীতে ‘কনফেশন বক্স’ হল– খোদ থিয়েটারের অঙ্গন, আর তার ফাদার হল– চরিত্রের দংশিত বিবেক।
এমনটাই মনে করতেন বিজন ভট্টাচার্য। বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষের কল্যাণে রুটির লড়াই-এর সঙ্গে প্রাণের লড়াইকে এক সূত্রে বেঁধে নাট্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই গণনাট্যের মর্মকথা।’ তিনি চিরকালই জনমুখী, বিজন পথের মানুষ নন।
রানাঘাট স্টেশনের বিকটাকৃতি মানুষটির ওই ‘নরহিংসা’ বলা জীবনে বারবার ধ্রুবপদের মতো ফিরে এসেছে।
কোনও তালবাদ্য নেই, শুধু একটা হারমোনিয়াম নিয়ে উনি গাইছেন। ‘এমন দেশ টি কো-থাও খুঁজে...’– 'কোথাও' এর 'কো'-টা এক জায়গায় থাকছে, 'থাও'টা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। থাও-এর সুরটা একটা ঢেউয়ের মতো উঠে নেমে যেন ভেসে যাচ্ছে।
সফদর জানতেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হল মানুষের হাসি। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে দেশে শিশুরা খোলা ছাদে নিশ্চিন্তে ঘুড়ি ওড়াতে পারে না, সে দেশে ‘বিপ্লব’ নিছকই একটা ফাঁকা, কেতাবি শব্দ। বিশ্বাস করতেন, একটা বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী গড়তে গেলে সবার আগে একরত্তি বাচ্চাদের মগজের জানলা দরজা খুলে দিতে হবে।
গত ১৫ বছরে তো বটেই, বিশ্ব নাট্য দিবসের এই ৬৪ বছরের ইতিহাসে, আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে গোটা বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার জন্য একজনও বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্বেরও ডাক পড়ল না! কেন মশাই? আমাদের কি বলার মতো কোনও কথা ছিল না? আমাদের শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার বা তৃপ্তি মিত্ররা কি আন্তর্জাতিক মানের ভাবুক ছিলেন না?
যাত্রাশিল্প ফের গ্রামবাংলার মাঠে-ময়দানে ফিরলেও, চটুল বিনোদনের থাবা এড়াতে পারেনি। অনীক ব্যানার্জি সেই বিরল পালাকারদের একজন, যিনি দর্শকদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর নির্দেশনায় ‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ তেমনই এক উল্লেখযোগ্য কাজ।
তখন ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ ত্রিপুরা-তে থিয়েটার-ইন-এডুকেশন নিয়ে পড়াশুনা করছি। সেই সময় রতন থিয়ামের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল। একদিন ক্লাসে পেন আনতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার অস্থিরতা লক্ষ করে তিনি বলেছিলেন, ‘পেহলে খুদকো ঢুন্ডো’। একটা ছোট্ট কথা, কিন্তু কী গভীর ব্যঞ্জনাপূর্ণ উক্তি!
শুধুই দুর্বোধ্য বিষয় নয়, স্বল্প আঁচড়ে গভীর দাগ কাটাই স্রষ্টার কাজ। আবার বিষয়ের মধ্যে নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাত থাকাও বাঞ্ছনীয়। রমাপ্রসাদ বণিক সাধারণ বুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের জন্য নাটক নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে রয়েছে বিষয়ের গভীরতা ও সত্যের অন্বেষণ।
পূর্ব-পশ্চিম নাট্যদলের প্রযোজনায় ‘আ-শক্তি’র প্রথম শো হয়ে গেল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। এই ধরনের নাটক দেখতে গিয়ে একটা আশঙ্কা মনে কাজ করে। আমরা যারা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমাদের শহরের এখানে-ওখানে দাপটে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি, যারা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মুগ্ধ ভক্ত হিসেবে প্রতিটি লাইন পড়েছি তাঁর রচনার, যারা ক্যাসেটে তাঁর স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠ শুনেছি বারবার, তাদের সেই রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা কোথাও ধাক্কা খাবে না তো?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved