


আর্ট কলেজে শিক্ষকরূপে গণেশ হালুইকে পেয়েছিলাম ৫ বছরই। ১৫ জন ছাত্রকে ১৫ রকমভাবে কাজ দেখাতে পারতেন তিনি। তিনি সমস্ত ফর্মই জানতেন। কিন্তু নিজের ছবির জন্য বেছে নিয়েছেন একটা ধরন। যা শিল্পী গণেশ হালুইকে চেনাবে। এই বয়সে এসে কেন তিনি গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাজ করে যাবেন? তিনি তো গণেশ হালুই। আমি মুগ্ধ তাঁর কাজ দেখে। তিনি দুর্গা আঁকবেন না, সেটাই তো স্বাভাবিক। পুজোসংখ্যার প্রতিটা লেখায় কি দুর্গার রেফারেন্স থাকে? তাহলে কি জমজমাট হবে পুজোসংখ্যা?
বছর দুয়েক আগে আমস্টারডমে গিয়েছিলাম। আমস্টারডমের মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে। ছবি দেখছিলাম। দেখতে দেখতে একজনের ছবি দেখে কেঁদে ফেলেছিলাম। দুঃখে নয়, আনন্দে, চিৎকার করে। কার ছবি? গণেশ হালুই। তাঁর ছ’টা ছবি ছিল সেখানে। ছবির পাশে কার কার ছবি রাখা? পল ক্লি, কাডিনেস্কি, জন মিরো– কে নেই! শিল্পীমহলের বাইরে এই ভারতে গণেশ হালুইকে ক’জন চেনেন? চেনার দরকারও নেই বোধহয়, কারণ বিশ্ব তাঁকে চেনে।

সম্প্রতি গণেশ হালুইয়ের করা এক পুজোবার্ষিকীর প্রচ্ছদ দেখে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অনেকেই ‘ট্রোল’ করেছেন শিল্পীকে। এই মেটার যুগে সেই ভাষা ব্যবহার দেখে আমি বিস্মিত! আমার মতে, সেইসব ‘শিল্পবিজ্ঞ’ অহেতুকই কথা বলছেন। গণেশ হালুই কে, তাঁর কাজ কী, তা জানা দরকার। ভারতের খুব বড়মাপের একজন বর্ষীয়ান শিল্পী তিনি। এমন একজন শিল্পী, যাঁকে সারা পৃথিবীর শিল্পীরা চেনে। ভারতের শিল্পপ্রতিনিধি তিনি। তাঁর প্রতি যে বিদ্বেষ দেখলাম, তাতে বাঙালির শিল্পরুচি সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে বাধ্য। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা বলা হত। এখন আমি বলব, নেটদুনিয়া শয়তানের কারখানা। কয়েকটা পয়সা খরচ করে এখানে যাকে খুশি, যেরকমভাবে খুশি সুলভে অপমান করা চলে। একজন শিল্পী কীভাবে জীবনযাপন করবে, কী খাবে, কত রোজগার করবে– এমনকী, সবথেকে বড় কথা, সে কীভাবে ছবি আঁকবে তা কি জনতা বলে দেবে? আমি নিজেও তো এই আক্রমণ পেয়েছি। ‘মা আসছেন’ বলে একটা ছবি দিয়েছিলাম আমি ফেসবুকেই। একটি মেয়ে, মুখে সাদা কাপড় চাপা দিয়ে, লিপস্টিকটা ঘাঁটা। তা দেখে ‘বিদগ্ধ শিল্পরসিকরা’ হুমকি দিয়েছিল। আমাকে তো বটেই আমার পরিবারকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল তারা। আমি তো অন্য কারও পয়সায় ছবি আঁকিনি। আমি ট্যাক্স দিই। আমি আমার মতো করে ছবির চর্চা করি। জীবনযাপন করি। কেউ আমাকে বলে দেবে কেন কী আঁকব?
গণেশ হালুইয়ের এই প্রচ্ছদে আমি দেখলাম শরতের আকাশের মধ্যে কিছু জিনিস ঘুরে বেড়াচ্ছে। হতেই পারে তা ঘুড়ি, কিংবা আরও কিছু এলিমেন্ট। সব উপাদান তো খালি চোখে দেখা যায় না এই মেটাযুগে। শিল্পী তো সেটা দেখবেন, দেখানোর চেষ্টা করবেন আরও মানুষকে। তাঁর ওই দিব্যচক্ষু আছে। শরতের আকাশ মানেই পেঁজা মেঘ আর পুঞ্জ পুঞ্জ কাশফুল? এছাড়া কি কিছু হয় না শরতের আকাশে? সারা দুনিয়ায় গণেশ হালুই পরিচিত বিমূর্ত শিল্পী হিসেবেই। তিনি তাঁর মতো করে দেখেছেন শরতকে। শরতকালে শুধু যে দুর্গাপুজো হয়, তা তো না। এ তো আরেকটা অকালবোধনও হতে পারে। কোনও শিল্পীকে বুঝতে গেলে, তাঁর ডিসকোর্স বুঝতে হবে। তাঁর যাত্রাপথ না জানলে, তাঁকে চেনা হয় না। যাপনচিত্র ছাড়া তাঁকে আবিষ্কার করা যান না। আপনারা অবাক হবেন হয়তো, তিনি যখন প্লেনে চড়েননি, তখন ল্যান্ডস্কেপ করেছেন বার্ডস আই ভিউ থেকে। বাংলার নদী-পথ-ঘাট– জীবনানন্দের কবিতার মতো তো তিনিই দেখিয়েছেন ছবিতে। যা করেছেন, বেশ করেছেন গণেশ হালুই। এতদিন কিছু করেননি কেন, তাই ভাবছি। তিনি যদি এমনটা করতেন তাহলে আমরা আরও সাহস পেতাম। আরও ভাঙতাম নিজেকে। সামনে যে ক’টা পুজোবার্ষিকীর প্রচ্ছদ করব, আমি ভাবছি, কোনওভাবেই ত্রিনয়ন কিংবা দুর্গার মুখ ব্যবহার করব না। শিল্প তো চিন্তার বৃত্তটা বড় করে, শিল্পবিচারের সময় বৃত্তটা কেন ছোট হতে যাবে? এর আগে পুজোবার্ষিকীর প্রচ্ছদে আমি দেখেছি দুর্গার হাতে বন্দুক, সেটাও তো একটা প্রকাশভঙ্গি।

আমার মনে আছে ’৯৮ সালে, হাতিবাগানে যখন আমি ঠাকুর গড়েছি, তখন দেবীর হাতে আমি অস্ত্র দিইনি। এটা দুর্গাপুজোর ইতিহাসে একটা ধাক্কা ছিল। তখন এসেছিলেন আমার স্যর– গণেশ হালুই। এসে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, ‘এইটাই চাই। ভাঙো। না ভাঙলে শিল্প এগোয় না। নতুন করে দেখাতে হবে।’
আর্ট কলেজে শিক্ষকরূপে গণেশ হালুইকে পেয়েছিলাম ৫ বছরই। ১৫ জন ছাত্রকে ১৫ রকমভাবে কাজ দেখাতে পারতেন তিনি। তিনি সমস্ত ফর্মই জানতেন। কিন্তু নিজের ছবির জন্য বেছে নিয়েছেন একটা ধরন। যা শিল্পী গণেশ হালুইকে চেনাবে। এই বয়সে এসে কেন তিনি গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাজ করে যাবেন? তিনি তো গণেশ হালুই। আমি মুগ্ধ তাঁর কাজ দেখে। তিনি দুর্গা আঁকবেন না, সেটাই তো স্বাভাবিক। পুজোসংখ্যার প্রতিটা লেখায় কি দুর্গার রেফারেন্স থাকে? তাহলে কি জমজমাট হবে পুজোসংখ্যা? পুজোসংখ্যার প্রচ্ছদে দুর্গা থাকতেই হবে, এটাও একধরনের ফ্যাসিজিম।

শিল্পের ইতিহাসে গণেশ হালুই এক বিস্ময়। কলেজ শেষের পরও দিনের পর দিন যোগাযোগ ছিল ওঁর সঙ্গে। এখন শরীর অসুস্থ। কিন্তু এখনও আমি নিশ্চিত আমাদের এই বাঁচা-মরার বিশ্বের বাইরের এক বিশ্বের কথা ভাবেন। তাঁর ছবি, তাঁর লেখা, কথা বলা সেই বিশ্বকে কেন্দ্র করেই। সে বিশ্বে প্রবেশ করার জন্য একটু ছবি দেখা দরকার। গণেশ হালুইয়ের অন্যান্য কাজ দেখা দরকার।
জীবনানন্দর একটা কবিতা মনে পড়ছে ‘সমারূঢ়’। ‘‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা–’ ?/ বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর; / বুঝিলাম সে তো কবি নয়– সে যে আরূঢ় ভণিতা:/ পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর/ ব’সে আছে সিংহাসনে— কবি নয়– অজর, অক্ষর/ অধ্যাপক; দাঁত নেই– চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি’’। যারা একটা লাইনও লেখেনি, মৃত কবিদের কৃমি খুঁটে খেয়ে তারা এখন সমালোচনায় বসেছে। এ অবশ্য হওয়ারই কথা। যুগে যুগে তা হয়েই এসেছে। যদিও শিল্প তাতে পিছিয়ে পড়েনি। পড়বেও না।
…আরও পড়ুন ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন…
পর্ব ১৬: সাধারণ মানুষের কাছেই শিল্পের পরশপাথর রয়েছে
পর্ব ১৫: রাষ্ট্র যদি রামের কথা বলে, শিল্পীর দায় সীতার কথাও বলা
পর্ব ১৪: মানচিত্র মোছার ইরেজার শিল্পীর কাছে আছে
পর্ব ১৩: তৃতীয় নয়নকে গুরুত্ব দিই, তৃতীয় লিঙ্গকেও
পর্ব ১২: লাখ লাখ টাকা কামানোর জন্য দুর্গাপুজো করিনি, করব না
পর্ব ১১: বাদল সরকারের থিয়েটার পথে নেমেছিল, আমার শিল্পও তাই
পর্ব ১০: যে কারণে এখন দুর্গাপুজো শিল্প করছি না
পর্ব ৯: এদেশে শিল্প সেক্যুলার হবে না
পর্ব ৮: শুধু শিল্প নিয়ে যারা বাঁচতে চায়, তারা যেন বাঁচতে পারে
পর্ব ৭: ক্যালেন্ডারের দেবদেবীর হুবহু নকল আমি করতে চাইনি কখনও
পর্ব ৬: সাধারণ মানুষকে অগ্রাহ্য করে শিল্প হয় না
পর্ব ৫: দেওয়ালে যামিনী রায়ের ছবি টাঙালে শিল্পের উন্নতি হয় না
পর্ব ৪: দেবীঘটও শিল্প, আমরা তা গুরুত্ব দিয়ে দেখি না
পর্ব ৩: জীবনের প্রথম ইনকাম শ্মশানের দেওয়ালে মৃত মানুষের নাম লিখে
পর্ব ২: আমার শরীরে যেদিন নক্ষত্র এসে পড়েছিল
পর্ব ১: ছোট থেকেই মাটি আমার আঙুলের কথা শুনত
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved