
এখন যে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে মানুষ তার জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে পারি না। যত তাপ বাড়ে কুকুরের মতো জিভ বের করে আমরা ‘প্যান্টিং’ করি অথবা ডানা দিয়ে হাওয়া করে নিজেদের ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করি। তাতে নিজেরা আরও ক্লান্ত হই। অত্যাধুনিক শহর বানাতে গিয়ে যেভাবে তোমরা পুকুর, খালবিল বুজিয়ে ফেলেছ, তাতে জলে ডানা ভিজিয়ে নিয়েও যে বাঁচব তাও পারি না।
নমস্কার। আমি ভারতীয় ফলবাদুড়। নিপা ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হলে আমাদের সম্পর্কে চর্চা শুরু হয়। চর্চা না বলে অপবাদ আর গুজব বলাই ভালো। তাই আজ কিছু কথা বলতে বাধ্য হলাম। আমরা নিরীহ প্রাণী। আমাদের সমাজে তোমাদের মতো মব লিঞ্চিং, হেট স্পিচ, থ্রেট কালচার নেই। স্তন্যপায়ী হলেও আমরা পৃথিবীতে তোমাদের ঢের আগে এসেছি, তাই আমাদেরকে এখন ‘আদিম পৃথিবীর ফলবাদুড়’ বলা হয়। আমাদের বেঁচে থাকা বড় বড় গাছ আর জঙ্গল নির্ভর। বট, অশ্বত্থ, পাকুড়, তেঁতুল, করঞ্জ, অর্জুন, মহুয়া এরকম নানা গাছে আমরা দল বেঁধে থাকি। মূলত ফুলের রস আর পাকা ফল খাই। পাকা ফল যেমন আম, কলা, পেঁপে, কাঁঠাল, সবেদা, পেয়ারা ইত্যাদি। আমরা নিশাচর। ইকোলোকেশন নয়, আমরা কাজে লাগাই আমাদের রাতের দৃষ্টি আর ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতাকে। রাতে এক কিলোমিটার পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই। আমাদের বড়সড় চেহারা, এক-দেড় কেজি ওজন, ডানা ছড়ালে চার-পাঁচ ফুট বিস্তার। ছোটবেলায় আমাদের বিজ্ঞানসম্মত নাম তোমরা বইতে পড়েছিলে, টেরোপাস মিডিয়াস। তবে তোমাদের বইতে আমাদের গুরুত্ব তেমনভাবে লেখা ছিল না (আসলে তোমাদের বইতে যে কী লেখা থাকে তা তোমরাই জানো!)।

জানি না কতজন আমাদের ভালো করে দেখেছ। আমাদের ঘাড়ে খানিকটা জায়গা জুড়ে ঘন লোম আছে। ফুলে মুখ দিয়ে জিভ বার করে রস পান করার সময় প্রচুর পরাগরেণু ওই লোমশ মাথায়, ঘাড়ে, মুখে জড়িয়ে যায়। সেই পরাগরেণু নিয়ে দূরে দূরে ফুলে ফুলে আমরা চলে যাই, পরাগমিলন ঘটে যায়। শুধু পরাগমিলন নয়, যেসব ফল আমরা খাই তাদের বীজও ছড়িয়ে দিই দূরে দূরে। বড় বীজ হলে খুব বেশি দূর নিয়ে যেতে পারি না, তবে ছোট বীজ হলে ৭০-৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বীজ ছড়িয়ে দিতে পারি। গাছেরা তো আর হাঁটতে পারে না তাই তারা পরাগমিলন এবং বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের উপর নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরাগমিলনকারী বলতে তোমরা অনেকে চাক-বাঁধা মৌমাছিদের চেনো শুধু। তাছাড়াও দিনে-রাতে আরও অনেকে পরাগমিলন করে। অনেক মৌমাছি একা মাটির নিচে থাকে। মাছিকে তো তোমরা পরাগমিলনকারী বলে জানোই না। শুধু জানো তারা পেটের রোগ ছড়ায়। সরাসরি তোমাদের টাকা রোজগারের কাজে লাগতে না পারলে দুনিয়ার কারও কোনও মূল্যই নেই যেন! ফল খাই বলে মানুষ গালাগালি দেয়। আমাদেরকে শত্রু ভাবে। কারণ খাবার মানে তোমরা অনেকেই শুধু তোমাদের খাবার বা খাবারের ব্যবসার কথা ভাব। যেন সেই খাবারে আর কারও অধিকার থাকা অন্যায়। আর কারও পেট ভরানো অন্যায়। কিন্তু ফল খেয়ে ওই বীজ আমাদের পৌষ্টিকতন্ত্রের ভিতর দিয়ে অতিক্রান্ত না-হলে ভালো করে সেই বীজের অঙ্কুরোদগম হয় না। আমাদের কাজের গুরুত্ব একবার ভেবে দেখো! শতাধিক গাছের প্রজাতি আমাদের উপর নির্ভর করে তাদের পরাগমিলনের জন্য। আবার বিভিন্ন গাছের পাকা ফল খেয়ে সেই বীজ দূরে দূরে ছড়িয়ে, গাছের চারা তৈরিতেও সাহায্য করি। জঙ্গল তো এভাবেই বাড়ে। তোমাদের ঘরের আশেপাশে শিমুল গাছ আছে। সন্ধেবেলা তাতে ফুল ফোটে। আমরাও তখন আসি। তোমাদের শহরে এই ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদেরকে শিমুল গাছে দেখতে পাবে। সঙ্গে থাকবে স্ফিংস বাদুড়ের দলও। তারাও ফল আর ফুলের রসই খায় মূলত। শিমুল গাছ স্বপরাগায়নে সক্ষম হলেও সে চায় তার মিলন ঘটুক অন্য আরেকটা শিমুল গাছের সঙ্গে। দুটো শিমুল গাছের মধ্যে যে দূরত্ব, তা মৌমাছিদের পক্ষে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না অনেক সময়। আমরা এই দূরত্ব অনায়াসে পেরতে পারি। কেবলই স্বপরাগায়ন হতে থাকলে গাছেরা জিনবৈচিত্র হারিয়ে ফেলবে। তারপর একসময় আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এখন যে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে মানুষ তার জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে পারি না। যত তাপ বাড়ে কুকুরের মতো জিভ বের করে আমরা ‘প্যান্টিং’ করি অথবা ডানা দিয়ে হাওয়া করে নিজেদের ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করি। তাতে নিজেরা আরও ক্লান্ত হই। অত্যাধুনিক শহর বানাতে গিয়ে যেভাবে তোমরা পুকুর, খালবিল বুজিয়ে ফেলেছ, তাতে জলে ডানা ভিজিয়ে নিয়েও যে বাঁচব তাও পারি না। বাচ্চারা আমাদের জড়িয়ে ধরে থাকে। জলে ভেজানো ঠান্ডা ডানা দিয়ে তাদের বুকে জড়িয়ে গরমের দুপুরগুলো আমরা বাঁচার চেষ্টা করি। শেষ পর্যন্ত অনেকেই পারি না। হাজারে হাজারে বাদুড় মারা যায়। সারা পৃথিবীজুড়ে বাদুড় মরছে। মরছে না খুন হচ্ছে কী বলি বলো তো? এইসব খবর তোমাদের কানে আসে না। আমরা মরে গেলে জীববৈচিত্রের যে কী ভীষণ ক্ষতি! জঙ্গলের, এমনকী তোমাদের শহর গ্রাম মফস্সলের বড় বড় গাছেদের যে কত বড় ক্ষতি– তা জানে সেই গাছেরা আর আমরা। তোমাদের শহর বাড়তেই থাকছে। গোটা পৃথিবীটাকেই শহর করে ফেলবে বলে তোমরা লেগে পড়েছ। চারিদিকের জঙ্গল উজাড় করে ফেলছ, অথবা সেই কাজে যারা যুক্ত তাদেরকে সমর্থন জানাচ্ছ। তোমাদের মধ্যে যারা আমাদের পক্ষে লড়ছে তাদের ‘পাগল’ বলে তামাশা করছ, অথচ না জেনে-বুঝেই বলছ আমরা ভাইরাস ছড়াচ্ছি।

আমরা জঙ্গলে থাকি– তোমরা জঙ্গল ধ্বংস করবে। আমাদের বড় বড় জলাশয়ের সান্নিধ্য প্রয়োজন– তোমরা সেসব বুজিয়ে ফেলবে। আমরা পুরনো কুয়ায় বাসা করলে, সেগুলোকে পরিষ্কার করে আমাদের তাড়িয়ে দেবে। তাহলে আমরা যাব কোথায়? তোমরা যেমন গ্রামে-শহরে একসঙ্গে অনেকে দল বেঁধে থাকো, আমরাও জঙ্গলে, জঙ্গলের আশেপাশে দলবেঁধে অনেকে থাকতাম। একসঙ্গে হাজার হাজার। এখন জলাশয় নেই বলে বড় বড় গাছ, ফুলফল নেই বলে আমাদের ছোট ছোট দলে ভেঙে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে হয়েছে। চলে আসতে হয়েছে লোকালয়ে, অথবা বলা ভালো, তোমাদের লোকালয় ঢুকে পড়েছে আমাদের থাকার জায়গায়। যদি-বা তোমরা ফুল, ফল চাষ করো, তা মূলত তোমাদের ব্যবসা অথবা খাওয়ার জন্য। আমরা সেখানে গেলে আমাদের নানারকম শাস্তি পাওনা হয়, জাল ঘেরা থাকে, অনেক পাখিকেও মরতে দেখি। তোমাদের বাজারে ভিমরুল, বোলতা, মিষ্টির দোকানে মৌমাছিরা ভিড় করে আসে। মনে হয় না কেন? কখনও তাদের হয়ে ভাবতে পারলে বুঝতে, তাদের স্বাভাবিক খাবারের অভাব হয়েছে বলে আজ তাদের এইসব করতে হচ্ছে। আমরা যথেষ্ট পরিমাণ ফুল, ফল না পেলে বাধ্য হয়ে অনেকসময় তোমাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে এসে খেজুরের রসে মুখ দিতে হয়। একবার ভেবে দেখো, সবসময় যদি এত বড় ঘরসংসার নিয়ে উদ্বাস্তু হতেই থাকি, যদি খাবারের এত অভাব হয়, এত দূষণ আর গরম সহ্য করতে হয় তাহলে আমাদের শরীর সুস্থ রাখা সম্ভব? আমরা ক্রমশ দুর্বল আর অসুস্থ হয়ে পড়ি অনেকে। নিপা ভাইরাস আমাদের শরীরে থাকলেও তাকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের আছে। আমাদের শরীরে নিপা-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু আমরা যদি খাদ্যাভাব, থাকার জায়গার অভাব, দূষণ, অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডায় দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে যাই, তাহলে আর এই ভাইরাসের সঙ্গে যুঝব কীভাবে? আমরা নিজেরা এত বিপন্ন বলেই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে পারি না। ভাইরাস চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অ্যান্টিবডি কমতে থাকে। আমাদের লালা, প্রস্রাবে ভাইরাস নির্গত হয়৷ সাধ করে তোমাদের এত দূষিত শহরে আমরা থাকতে আসিনি। দেখবে, শহরের যেসব জায়গায় বড় বড় পুকুর আর ছায়ানিবিড় গাছ আছে, সেখানেই আমরা আছি। আসলে আমরা লোকালয় থেকে দূরে আমাদের জংলা বাসাতেই থাকতে চাই। তোমাদের অসহিষ্ণু, অবোধ, অবৈজ্ঞানিক, হুজুগে, গুজব বা দোষারোপ-প্রিয় সমাজ কি আমাদের সেই হ্যাবিট্যাট, সেই থাকার জায়গা ফিরিয়ে দিতে পারবে? নিপা যদি আমাদের থেকে অহরহ ছড়াত, তবে এতদিনে মানুষ উজাড় হয়ে যেত। এখনও অবধি যেটুকু যা অন্বেষণ করেছে মানুষ সেগুলো চর্চা করে দেখো, আমরাই-বা কতজন নিপা বহন করি; অথবা তোমাদের যারা আক্রান্ত তারা আক্রান্ত হল ঠিক কী করে? সোর্সটা কী? তা না করে তোমরা মব লিঞ্চিং-এর মতো কোথাও কোথাও বড় বড় গাছ কেটে আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছ, আমাদের মারছ। এত মার খেয়ে আমরা মরছি, তারপরে আবার নিপা-র জন্য তোমাদের মার! তোমরা ভাবছ, নির্বিচারে আমাদের হত্যা করলেই নিপা থেকে মুক্তি পাবে। একেবারে ভুল ভাবছ। নিপা ভাইরাস আরও বেশি করে ছড়াবার সুযোগ পাবে। যা নিয়ে ভাবলে সুস্থ সমাধান সম্ভব সেগুলো নিয়ে ভাবো। আসলে গণহত্যা দেখে বা করে, কাউকে গোল হয়ে ঘিরে ধরে খুন করেই তোমরা মুক্তি খোঁজো। এত ভীতু ও স্বল্পবুদ্ধি যে নৃশংসতাকেই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার মনে করো। বিজ্ঞানচর্চা করো না তোমরা? এই তোমাদের বিশেষ জ্ঞান আহরণের উদাহরণ!

একদিকে জঙ্গল কমছে, আমাদের ঘর বাঁধবার বড় বড় গাছগুলো কাটছ। অন্যদিকে বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এত ঠান্ডা পড়ছে। বর্ষায়, শীতে খাবারের কী ভীষণ অভাব! এদিকে এত বড় সংসার। তোমাদের মতো গ্যালন গ্যালন সারবিষ দিয়ে আগাম ফসল ফলানো, হিমঘরে ফসল রাখা, ঘরের মধ্যে খাবার মজুদ করার অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া আমাদের তো নেই। গরমকালে তাই খাবার খেয়ে মোটা হতে হয়, যাতে এই অভাবী সময়গুলোতে খাবার কম পেলে বা না পেলেও বেঁচে যেতে পারি। এখন আর বুঝতে পারি না কোন ঋতুতে ঠিক কী হবে। কতদিন বর্ষা হবে, কতদিন শীত, কতটা শীত বা গরম। আর অন্যদিকে তোমাদের শহরের আগ্রাসন, তোমাদের মার। তোমরা তো মানুষ, তোমরা এত গান গাও, লেখো আরও কত কী করো, মানুষের মন নিয়ে একবার আমাদের কথা ভাবো? যাকে জানো না তাকে ভালোবাসবে কী করে? এত না জানা নিয়ে বাঁচবেই বা কী করে? অন্যকে জানার মধ্য দিয়েই তো নিজেকে জানতে হয়। তোমাদের মধ্যে এক শ্রেণির মানুষ আপ্রাণ লড়ছে, যাতে আমরা বাঁচতে পারি সুস্থ নীরোগ শরীরে তার জন্য। চেষ্টা করছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বসত ফিরিয়ে দিতে। আরও অনেক মানুষ তাদের সঙ্গ দাও। তোমাদের গানে গল্পে কথকতায় ছড়ায় আমরা তো ছিলাম। সেসব ছড়া মুখে মুখে ফিরেছে।
‘আদুড় বাদুড় চালতাবাদুড় কলাবাদুড়ের বে’

এ ছড়া তোমরা জানো। কলার পরাগমিলন, কলার জিন বৈচিত্র রক্ষা হবে না আমরা না থাকলে। তোমাদের মেয়েরা তাদের গানে আমাদের কথা কতবার বলেছে। শোনোনি? তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন কেমন করা ‘অন্য মা’ কবিতায় লিখেছেন–
কিন্তু হঠাৎ কোনোদিনে
যদি বিপিন মাঝি
পার করতে তোমার পারে
নাই হত মা রাজি।
ঘরে তোমার প্রদীপ জ্বেলে
ছাতের ’পরে মাদুর মেলে
বসতে তুমি, পায়ের কাছে
বসত ক্ষান্ত বুড়ী,
উঠত তারা সাত ভায়েতে,
ডাকত শেয়াল ধানের খেতে,
উড়ো ছায়ার মতো বাদুড়
কোথায় যেত উড়ি।

দেখো না কোথায় যায় তারা উড়ো ছায়া হয়ে, কী করে গাছে গাছে। দেখো না একটু যদি বন্ধু হওয়া যায়। তোমাদের তো মানুষের মন, এই পৃথিবী তো আমাদের সবার। পশুপাখি কীটপতঙ্গের বাসস্থান তছনছ হলে, এভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুত আরও নানা রোগের আক্রমণ দেখা দেবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved