Robbar

হিন্দুত্ববাদীদের মনীষী আত্মীকরণের তালিকায় সুভাষচন্দ্র সর্বাগ্রে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 22, 2026 9:04 pm
  • Updated:January 22, 2026 9:09 pm  

সুভাষ বোস সেই সময়ে ভাবতে পারেননি যে, ভারত স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরেও হিন্দুত্ববাদী শক্তিরা এতটা রাজনৈতিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। যে হিন্দুত্ববাদী শক্তিরা আজ রামরাজ্যের কথা বলেন এবং ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিদের যখন মারা হচ্ছে তখন সুভাষ বোসের এই কথাগুলো প্রণিধানযোগ্য। তাই যাঁরা আজকে সুভাষ বোসের ‘উত্তরসূরী’ হিসেবে নিজেদের দেখানোর চেষ্টা করছে, তাঁরা যদি একটু সুভাষ বোসের সম্পর্কে পড়াশোনার চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়তো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলতেন

সুমন সেনগুপ্ত

বাংলার নির্বাচন আসছে। আবারও হিন্দুত্ববাদী শক্তিরা বাংলার মনীষীদের আত্মীকরণের কাজে নেমে পড়েছেন। সংসদে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে যদিও প্রধানমন্ত্রী ভালোই সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র বা নেতাজিকে যে তাঁরা ‘আপন’ দেখানোর চেষ্টা করে যাবেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

গত ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল– কী করে নিজেদের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের উত্তরসূরি হিসেবে দেখানো যায়! এবার তাঁদের লক্ষ্য বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, আরও অনেকে। গতবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন প্রক্রিয়া জুড়ে রবীন্দ্রনাথ সেজে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকী, নেতাজির নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ অনুষ্ঠানে নেতাজিও সেজেছিলেন। এবারও যে সাজবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। এ ঘটনায় চূড়ান্ত বিতর্ক হয়েছিল, হয়তো এবারও হবে তেমন ঘটলে।

লেখার টেবিলে সুভাষচন্দ্র

আদপে এই বিজেপি আরএসএসের ধ্যানধারণা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া বিপ্লবীদের থেকে বহু যোজন দূরে– তা কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রাঙ্গণের অনুষ্ঠানে সেদিনেই বোঝা গিয়েছিল। স্মরণ করুন,  ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও। ওই সভায় হঠাৎ করে দর্শকাসন থেকে কেউ বা কারা ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান তুলেছিল। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই অনুষ্ঠানে কিছু কথা বলতে অস্বীকার করেন। তখন থেকেই এই বিতর্ক শুরু হয়, যে সুভাষ বোস অন্তর থেকে এই হিন্দুত্ববাদী শক্তিদের ঘৃণা করতেন, সেই সুভাষ বোসের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ অনুষ্ঠানে ওই শ্লোগান দেওয়া তো তাঁকে সম্মান দেওয়ার পরিবর্তে অসম্মান করা। ইতিহাস কিন্তু আমাদের এই তথ্যই দেয়।

৮ মে ১৯৪০ সালের ফরওয়ার্ড ব্লকের সাপ্তাহিক মুখপত্রের সম্পাদকীয়তে সুভাষ বোস লিখেছিলেন, ‘একটা সময়ে কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতারা হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনেরও সদস্য হতে পারতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এই সংগঠনগুলো আগের তুলনায় আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তার সংবিধানে একটি ধারা যুক্ত করেছে যে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগের মতো কোনও সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কোনও সদস্য কংগ্রেসের কোনও নির্বাচিত কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।’ ঠিক ১ সপ্তাহ পরে ঝাড়গ্রামে সুভাষ বোসের হুংকার ছিল– ‘হিন্দু মহাসভা ধর্মীয় কারণেই রাজনীতির বৃত্তে প্রবেশ করেছে, এবং সেই পরিসরটাকে অপবিত্র করেছে। প্রতিটি হিন্দুর দায়িত্ব এই বিষয়টির নিন্দা করা। শুধু তাই নয়, এই মানুষগুলিকে যাতে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিসর থেকে বিতারিত করা যায় সেই কাজটাও করা উচিত।’

ফরওয়ার্ড ব্লক ও সুভাষের স্বাধীন স্বপ্ন

ইতিহাসে আরও বেশ কিছু উদাহরণ আছে যে, সুভাষ বোস কতটা হিন্দুত্ববাদী শক্তির বিরোধিতা করতেন। যে-বিজেপি নিজেদের শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির উত্তরসূরি বলে, তাঁরা সমস্ত দেশ দখল করলেও তাঁদের অন্যতম প্রাণপুরুষের বাংলা তাঁদের অধরা। সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে সুভাষ বোসের একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যিনি বেশি কুখ্যাত ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর শুরুতে বাংলার রাজ্যপালকে চিঠি লেখার জন্য, যে ওই আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা দমন করার জন্য তাঁর সমস্ত উপায় ব্যবহার করতে হবে। সেই শ্যামাপ্রসাদ যখন হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন, তখন সুভাষ বোস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। একথা শ্যামাপ্রসাদ নিজের ডায়েরির পাতায় লিখে রেখেছিলেন, যা পরে প্রকাশিতও হয়েছিল ১৯৯৩ সালে ‘Leaves From a Diary’ নামে।

ওই ডায়েরির পাতায় পাওয়া যায় সুভাষ বোস তাঁকে বলেছিলেন, যদি হিন্দু মহাসভাকে ‘রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে বাংলায় প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন শ্যামাপ্রসাদ, তাহলে ‘প্রয়োজনে তিনি (সুভাষ বসু) জোর করে নিশ্চিত করবেন যে এটি সত্যিকার অর্থে জন্মের আগেই যেন ভেঙে ফেলা হয়।’ এই সাক্ষাৎকারের পরেই কি না, জানা নেই, তবে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেকথাও শ্যামাপ্রসাদ ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন। ১৫ মার্চ, ১৯৪০ সালে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের প্রাক্কালে একদিন শ্যামাপ্রসাদ ওই পুরসভার কর্মীদের উদ্দেশ্যে একটি রাজনৈতিক সভা করছিলেন। হঠাৎ একটি পাথর এসে তাঁর মাথায় লাগে। যে ব্যক্তি ওই পাথরটা শ্যামাপ্রসাদকে লক্ষ করে ছুড়েছিলেন, তাঁকে তখন ধরে ফেলেন ওই হিন্দু মহাসভার লোকজন। চূড়ান্ত গন্ডগোল শুরু হয় সেই সময়ে। জানা যায়, যিনি ওই পাথর ছুড়েছিলেন– তিনি সুভাষ বোসের সমর্থক।

ঠিক দু’দিন পরে তৎকালীন ‘অমৃত বাজার পত্রিকা’য় একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল: ‘ফ্যাসিসমের মহামারি’। এই সম্পাদকীয়তে সরাসরি হিন্দু মহাসভার সমস্ত প্রার্থীকে পরাজিত করার আবেদন করা হয়। এই সম্পাদকীয়টির উল্লেখ রয়েছে লেখক চন্দ্রচূড় ঘোষের ‘Bose : The Untold Story of an Inconvenient Nationalist’ বইটিতে।

২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী যখন ওই স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেন। সেই সময় থেকেই এই বিতর্কটা চলছে, কিন্তু তাও সুভাষ বোসের সঙ্গে এই হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক এককথায় খুব সরল, তা বলা যাবে না। উল্টে ‘জটিল’ বললে ঠিক হবে। যদিও সুভাষ বোস একসময়ে ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং তাঁর কাছে ধর্মের থেকেও শ্রেণির রাজনীতি অনেক বেশি প্রাধান্যকারী অবস্থায় ছিল। তাঁর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী শক্তির বিরোধ ছিল, কিন্তু তাও সাভারকারের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। ‘Free India and her Problems’ নামে একটি প্রবন্ধে এক সময়ে সুভাষ বোস স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত,তা নিয়ে লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধে তিনি রাষ্ট্র ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেবে এবং কোনও রাষ্ট্র-ধর্ম থাকবে না, তা লিখেছিলেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমগ্র জনসংখ্যার মধ্যে নিখুঁত সমতা থাকবে। যখন প্রতিটি ব্যক্তির কর্মসংস্থান, খাদ্য ও শিক্ষার সুযোগ থাকবে এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে স্বাধীনতা থাকবে, তখন আর কোনও সংখ্যালঘু সমস্যা থাকবে না। ব্রিটিশরাও যে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করেছিল, সেটাও সুভাষ বোস বহুবার তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্যের মধ্যে বলে গিয়েছেন, ‘The Mohammedan problem in India today is an artificial creation of the British similar to the Ulster-Problem in Ireland and the Jewish problem in Palestine. It will disappear when British rule is swept away.’

সুভাষ বোস সেই সময়ে ভাবতে পারেননি যে, ভারত স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরেও হিন্দুত্ববাদী শক্তিরা এতটা রাজনৈতিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। যে হিন্দুত্ববাদী শক্তিরা আজ রামরাজ্যের কথা বলেন এবং ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিদের যখন মারা হচ্ছে তখন সুভাষ বোসের এই কথাগুলো প্রণিধানযোগ্য। তাই যাঁরা আজকে সুভাষ বোসের ‘উত্তরসূরি’ হিসেবে নিজেদের দেখানোর চেষ্টা করছে, তাঁরা যদি একটু সুভাষ বোসের সম্পর্কে পড়াশোনার চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়তো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলতেন। নেতাজির জন্মদিনকে শুধু ‘পরাক্রম দিবস’ বলে দিলেই হয় না, তাঁর চিন্তাভাবনাকে আতস্থ না-করলে কিন্তু তাঁকে আত্মীকরণ করা যায় না।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

…………………….