Robbar

শ্যামল গাঙ্গুলির দেখা একেকটা বাজার আসলে একেকখানা উপন্যাস

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 28, 2026 4:47 pm
  • Updated:January 28, 2026 8:05 pm  
an article about shamal gangopadhyay's bajar safar by Debasish Mukhopadhyay

শ্যামলদা যে বাজারেই গিয়েছেন, তার আশপাশের যে সমস্ত বিশিষ্ট মানুষ থাকতেন বা থাকেন, তাঁদের কথা অবশ্যই উল্লেখ করেছেন। যদুবাবুর বাজারের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, বিস্তীর্ণ ভবানীপুরে দীর্ঘদিন যদুবাবুর বাজার ছাড়া আর বাজার ছিল উত্তরের হগ সাহেবের বাজার, দক্ষিণে কালীঘাট বাজার। ধরেই নিতে পারি, স্যর আশুতোষের বাবা, ডাক্তার গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্য়ায় যদুবাবুর বাজারে যেতেন। যেতেন সিদ্ধার্থশঙ্করের বাবা। দেশবন্ধুর বাজার হত এই বাজার থেকেই। উত্তমকুমার, হেমন্তকুমার, অখিলবন্ধুকে পাঁচের দশকে এখানে হঠাৎ হঠাৎ বাজার করতে দেখেছি। স্যর আশুতোষ, স্যর রমেশ মিত্তির নিশ্চয়ই যদু বাজারেই যেতেন। জাস্টিস দ্বারিক চক্রবর্তী যেতেন, যিনি থাকতেন ভবানীপুরে ঘড়ির মোড়ে।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

যাঁরা খেতে ভালোবাসেন, খেতে জানেন, তাঁরাই ঠিকভাবে বাজার করতে পারেন। সেদিন কী রান্না হবে– সে কথা ভেবে নির্দিষ্ট সবজিটি বিচার করে বাজার করে আনেন। বাজার মানে শুধুই নানা ধরনের আনাজ বা মাছ বিক্রির জায়গা নয়। বাজার হচ্ছে পৃথিবীর পাঠশালা। বাজার করার সময়, যে-সবজিটি কিনলেন, সেটি কোথাকার কোন খেতে জন্মেছিল, তার নাম জানতে হয়। তাহলেই সেই তরকারি বা ব্যঞ্জন খাবার সময় সেই জায়গাটির স্বাদ পাওয়া যায়। মানুষের মতো আলু-পটলেরও ঠিকানা লাগে। বাজার মানে ইতিহাস, ভূগোল, মানব চরিত্রের পাশাপাশি তাঁদের দর্শনও বুঝতে হয়।

বাংলা সাহিত্যে বাজার-হাটের উল্লেখ অনেক কাল আগে, সেই মঙ্গলকাব্যের সময় থেকেই রয়েছে। শুক্রবারের বকসিগঞ্জের পদ্মাপাড়ের হাটের কথা সব বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরাই জানেন। কিংবা দূরে দূরে গ্রাম দশ-বারোখানি মাঝে একখানি হাটের কথাও অনেকেই অবগত। আমি বাজার আর হাটকে একই সঙ্গে ধরছি। এসব কথা নতুন করে মনে এল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বাজার সফর সমগ্র’ বইটার পাতা উল্টোতে গিয়ে। শ্যামলদাই যে প্রথম কাগজে বাজার নিয়ে ধারাবাহিক কলম লিখেছেন, তা কিন্তু নয়। তার অনেক কাল আগে ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রথম বাজার নিয়ে সাপ্তাহিক কলম চালু করেছিলেন। তিনি লেখা বন্ধ করলে সেই কলম চালু রেখেছিলেন তাঁর ভাই ধীরেন্দ্রনাথ মিত্র। একসময় বিজনকুমার ঘোষ ‘বাজার সরকার’ ছদ্মনামে আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিক লিখতেন। সে লেখাও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। সে লেখাও একদিন বন্ধ হয়ে গেল। অনেককাল পর সেই স্রোতে নতুন করে জোয়ার আনলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ‘বাজার সফর’ লেখা শুরু হয়েছিল আজকাল-এ ১২ মার্চ, ১৯৯৭ থেকে। একটানা সাড়ে তিন বছর লিখেছিলেন।

তবে বাজারের প্রতি তাঁর দৃষ্টিকোণ ছিল একদম অন্য অনন্য। তিনি মনে করতেন, ‘এক-একটি বাজার এক-একখানি উপন্যাস। আর সেই উপন্যাস কখনওই পুরনো হয় না। বারবার পড়া যায়।’ তিনি লিখেছেন, ‘গত তিন বছর বাজারে বাজারে ঘুরে এখন আমার মনে হচ্ছে, মানুষের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ঘুরে বেড়াচ্ছি গেরস্থ মানুষজনের মহাফেজখানায়। বেঁচে থাকার সুখ, স্বাদ, দুঃখ, আনন্দ– সবার সঙ্গেই বাজারে দেখা হয়। দেখা হয় পরাজয়ের সঙ্গে– আবার জয়ের আনন্দোচ্ছ্বাসের সঙ্গেও।’

বাজারের অনেকগুলো চরিত্র বিদ্যমান। যেমন বাজার সাধারণত তিনটি ভাগে বিন্যস্ত– সবজি বাজার, মাছের বাজার আর ফলের বাজার। আবার কোনও কোনও সবজি বাজারের পাশে থাকে মুদি বাজার। কিছু পাকা বাজারের বাইরে, রাস্তার ধারে গ্রামের বয়স্ক মহিলারা টাটকা সবজি আর শাক নিয়ে বসেন। শ্যামলদার সব দিকে নজর। শ্যামলদার কাছে বাজার মানে শুধু আনাজপত্র নয়, সেই সব জিনিসের বিক্রেতারাও তাঁর কাছে অন্যতম আগ্রহের বিষয়। এমনকী, সাহিত্যিকের দৃষ্টিকোণে যাঁরা বাজার করতে আসেন, তাঁদের কথাও তিনি ভোলেন না। তিনি লক্ষ করেন, থানকুনি পাতা, কচুর লতি, সজনে পাতা বেচতে বসে খদ্দেরের অভাবে এক বুড়ি ঘুমিয়ে পড়েছেন। টালিগঞ্জ বাজারে চন্দ্রবাবুদের মুদিখানায় দুই ভাইয়ের দেখা পেয়েছিলেন তিনি। সনৎকুমার চন্দ্র আর ছোট ভাই জলধিকুমার চন্দ্র। সনৎবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত আইটেম আছে আপনার দোকানে?’
‘তা দেড় হাজার।’
‘দাম মনে রাখেন কী করে?’
নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বললেন, ‘ক্যালকুলেটর আমাদের এই মাথা।’
প্রায় ১৫০ বছর আগের দোকান। সময়টাকে ধরতে শ্যামল লিখলেন, পুরোদস্তুর কোম্পানির আমল। বঙ্কিমচন্দ্র স্কুল বসাচ্ছেন। মাইকেল বোধহয় বিলেতে। গিরিশ ঘোষও সম্ভবত তখন বালক। আর তখনকার এই দোকানে আমি ধূপের সঙ্গে গুগ্‌গুল কিনছি, যাতে মশা তাড়ানোর সময় সুগন্ধে ভরে যায় ঘর।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

শ্যামলদা যে বাজারেই গিয়েছেন, তার আশপাশের যে সমস্ত বিশিষ্ট মানুষ থাকতেন বা থাকেন, তাঁদের কথা অবশ্যই উল্লেখ করেছেন। যদুবাবুর বাজারের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, বিস্তীর্ণ ভবানীপুরে দীর্ঘদিন যদুবাবুর বাজার ছাড়া আর বাজার ছিল উত্তরের হগ সাহেবের বাজার, দক্ষিণে কালীঘাট বাজার। ধরেই নিতে পারি, স্যর আশুতোষের বাবা, ডাক্তার গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্য়ায় যদুবাবুর বাজারে যেতেন। যেতেন সিদ্ধার্থশঙ্করের বাবা। দেশবন্ধুর বাজার হত এই বাজার থেকেই। উত্তমকুমার, হেমন্তকুমার, অখিলবন্ধুকে পাঁচের দশকে এখানে হঠাৎ হঠাৎ বাজার করতে দেখেছি। স্যর আশুতোষ, স্যর রমেশ মিত্তির নিশ্চয়ই যদু বাজারেই যেতেন। জাস্টিস দ্বারিক চক্রবর্তী যেতেন, যিনি থাকতেন ভবানীপুরে ঘড়ির মোড়ে। তালিকা বিরাট হয়ে যাবে। থাক।

আর এক বাজারের ঘটনা। লিখছেন, একদিন আশুদা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। হাতে বাজারের থলি। উদ্বিগ্ন মুখে শ্যামলদাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও শ্যামল, কী বাজার করি বল তো? আজ বাড়িতে লতা মঙ্গেশকার আসবে। হেমন্ত সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। কে যে কী খায়, কিছুই জানি না।’ বলে চিন্তিত মুখে মাছের বাজারের দিকে এগিয়ে গেলেন। শ্যামল জানাচ্ছেন, তখন আশুদার গল্প নিয়ে সিনেমা হত। তাতে হেমন্ত-লতাকে গাইতে হত।

বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং লতা মঙ্গেশকর

কীভাবে বাজারের চরিত্র বদলাচ্ছে, সেটা দেখাতে গিয়ে লিখছেন, মোটরগাড়ি কলকাতায় এলে পাঞ্জাবিরা গত ৯০ বছরে ভবানীপুরে ঘরবাড়ি, গ্যারেজ, মোটর পার্টসের দোকান, হোটেল, গুরুদোয়ারা করেছেন। তাই যদুবাবুর বাজারে সবজির দোকানে প্রায় নাশপাতির চেহারা একটি নতুন সবজি দেখলাম। নাম টিনা। কেজি ২০ টাকা। আসছে আম্বালা থেকে। পাঞ্জাবিদের পরেই ভবানীপুরে জড়ো হয়েছেন গুজরাতিরা। সেলামি দিয়ে ঢুকেছিলেন ৫০ বছর আগে। এখন ওঁরা এই এলাকায় এডুকেশন সোসাইটি, নার্সিংহোম, লোন অফিসের মালিক। যদুবাজারে মুদিখানায় গুজরাতিদের প্রিয় মশল্লার ছড়াছড়ি। তাছাড়া উত্তর ভারতের অনেকেই যদুবাজারের এক দেড় মাইলের ভেতরে থাকেন। তাই যদুবাজারে ভর্তি উত্তরপ্রদেশের দশেরি আর চৌসা আম। কেজি ২০২২ টাকা। পুদিনা পাতা বান্ডিল দু’টাকা। সলেরি পাতা গোছা দু’টাকা।

ইলিশ কিংবা মশল্লার কথা বলতে গিয়ে কথার হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তিনি ফলতা, ডায়মন্ডহারবার, কোলাঘাট হয়ে অনায়াসে পৌঁছে যান টোকিও কিংবা নিউ ইয়র্কের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। নিজের অভিজ্ঞতায় লেখেন, মুম্বইয়ে ৩৫ বছর আগে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসে ভাত আর ইলিশের ঝোল খেয়ে বুঝেছিলাম, ওখানকার বাঙালিরা কেন ইলিশ নিয়ে মাথাই ঘামান না। ওদিকে ওঠে চন্দনা। যেমন পাওয়া যায় ওড়িশায় মহানদী বা কাঠজুরিতে। এ-ও জানান, আস্ত ইলিশ কিনে বাড়ি ফেরার একটা স্টাইল আছে। কানকো আর লেজে সুতোলি বেঁধে বড় কুমড়োর ফালি প্রায় ধনুক ভঙ্গিতে ইলিশকে হাতে ঝোলাতে হয়। সেই সময় ধুতি-পাঞ্জাবি সঙ্গে পায়ে পাম্প শু থাকলে ভালো মানায়।

এই বইয়ের প্রতিটা লেখার মধ্যে ছোঁয়া যায়, অনুভব করা যায় ইতিহাস, স্মৃতি আর অর্থনীতির মিশ্রণ। বোঝা যায়, একজন আকণ্ঠ মানবপ্রেমী এবং জীবনরসিকের পাশাপাশি আপনিও হেঁটে চলেছেন তাঁর সঙ্গে। গাইডের মতো আপনাকে প্রাচীন সময়ে পৌঁছে দিয়ে নিমেষে ফিরিয়ে আনছেন বর্তমানে।

লেখাগুলি যেন ছোটগল্প। কখনও ভেবে দেখেছি, ‘লোকে বাজার করে যার যার নিজের স্বপ্ন ও স্মৃতি অনুযায়ী। কবে কোনও একদিন ফুলকপি, কড়াইশুঁটি দিয়ে কই মাছ খেয়েছিলাম, সেই স্মৃতির পথ ধরে সারা জীবন কড়াইশুঁটি, ফুলকপি, কই মাছ কিনে চলেছি।’

সত্যি, এ এক অন্য অনন্য গ্রন্থ। পড়তে পড়তে কেবলই মনে হয়, বাজার শুধু কেনা-বেচার জায়গা নয়। বাজার একজন জবরদস্ত হেডমাস্টার। আপনাকে মানুষ চেনায়। রুচি শেখায়। মানুষে মানুষে সম্পর্ক বোঝায়। সহানুভূতিশীল করে তোলে। এই বই বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বিশেষ।