
বইমেলার প্রথম দিনের কড়চায় আমরা আশা করেছিলাম, বই বিক্রি ও ভিড় গত বছরের তুলনায় বাড়বে। গিল্ডের তরফে জানা গিয়েছে, গত বছর মেলার আসা মানুষের সংখ্যা ২৭ লক্ষ থেকে বেড়ে ৩২ লক্ষ হয়েছে। ২৩ কোটি থেকে বেড়ে বই বিক্রি হয়েছে ২৬ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকার। বিক্রির হার বেড়েছে ১৫ শতাংশ! দুরন্ত ব্যাপার– প্রকাশক, পাঠক, প্রকাশনা ও বইমেলার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মীকে আমাদের তরফ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু একটি প্রশ্ন মনে প্রতিবারই ঘা মারে, তা হল, এত বইপ্রেমী মানুষ থাকা সত্ত্বেও বাংলার গ্রন্থাগারগুলি এমন পাঠকশূন্যতায় ভুগছে কেন! তাহলে কি নিজস্ব গ্রন্থাগার তৈরিতেই মন মজেছে পাঠকদের? ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ বা ‘সাধারণ গ্রন্থাগার’ শব্দটি কি তাহলে ক্রমেই অচল হয়ে পড়বে?
কালীপুজো ফুরলেই শীত যেমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, বইমেলা ফুরলে তেমনই নাছোড়বান্দা হয়ে দাঁড়ায় ভ্যাপসা গ্রীষ্ম। বইমেলার শেষদিন, কমে এল গরম পোশাকের সংখ্যা। বিকেল বহু প্রাচীন, দায়বদ্ধ, মাইকে ঘোষণা করেনি তবুও জানিয়ে দিয়েছে– আর মাত্র কিছু ঘণ্টা। গিল্ড অফিসের সামনে বইমেলার সমাপ্তি অনুষ্ঠানের মঞ্চ বেলা থেকেই প্রস্তুত। যেতে-আসতে মনে করিয়ে দিচ্ছে: আজই শেষ। অতএব, এই আলো, এই মায়া, এই প্রিয় করস্পর্শ– সংগ্রহে রাখো। গ্রহে-গ্রহান্তরে ছড়িয়ে দাও এই স্মৃতির মেঘ।

৯ নম্বর গেটের বাইরে, চায়ের দোকানে অপূর্ব মেহফিল। চা-বিস্কুট-ধূমপান ছাড়াও চাঁদনি পাঁপড়– হাতের তালুর থেকেও বড়, মায়াবী, মশলাদার। খিদেয় উসখুস করা এক তরুণ শিল্পীর মন্তব্য: ‘বইমেলার বাইরে এমন হেলদি এগরোল ভাবা যায় না।’ পরে, তদন্তে জানা গেল, দ্রুত পরিবেশনের চাপে প্রায় না-ভাজা রোল তাঁর হাতে পড়েছিল বইমেলার প্রথম দিন। এক দিন অন্তর অন্তর তালপাতার সেপাই বেচতে আসা ভদ্রলোক সারাদিন পসরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেন গেটের বাইরে। যদিও সেপাই নয়, বিক্রি হচ্ছিল তাঁর অসামান্য কারুর টিয়াটি। জানালেন, টিয়ার থেকেও বেশি বিক্রি হয়েছে পেঁচা, তখন অমিল, যার চোখ দেখেই নিয়ে গিয়েছেন বহু মানুষ। জীবনানন্দ-প্রেমিক কেউ, জানি না ওঁর কানে কানে বলে গিয়েছেন কি না: ‘ঝিমায়েছে এ পৃথিবী–/তবু আমি পেয়েছি যে টের/ কার যেন দুটো চোখে নাই এ ঘুমের/কোনো সাধ!’

বিকেল যখন এসে পড়েনি, এদিন তখন থেকেই মেলা ভিড়ে টইটম্বুর! মান্দাস-এর কর্ণধার সুকল্প চট্টোপাধ্যায় কথায় কথায় জানালেন বিক্রিবাটা হয়তো গত বছরের তুলনায় বেশিই, কিন্তু আরও বেশি হতে পারত যদি মাস-শুরুর সপ্তাহটা বাগানো যেত। একথা ঠিক, ৩১ জানুয়ারি থেকে শেষদিন পর্যন্ত মেলার ভিড়ে আপন ছন্দে হাঁটা দায়। তিন নম্বর গেটের কাছে গতকাল দলবদ্ধ এক ছোকরা বলে উঠল: ‘এই নিয়ে ৯ নম্বর লোককে লাথি মারলুম!’ বইমেলায় এই গোনাগুনতির চল বোধহয় নতুন। ৯ নম্বর গেটের কাছে বার তিন কাপ চা খেয়ে তরুণ কবি ক্লান্ত, বললেন, ‘‘একের পর এক লোক আসছে, চায়ের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, ‘না’ করছি না। কিন্তু দুঃখিত হচ্ছি এই ভেবে যে, বারে বসলে এমন আমন্ত্রণের চল নেই কেন?’’ চায়ের দোকান-টোকান পেরিয়ে তেঁতুলতলার বাঁধানো চাতাল থেকে তখন গান ভেসে আসছে: চাঁদের অর্ধেক চাঁদ। সে জটলায় কেউ কেউ ঝাপসা, রঙিন। তবুও দোতারা, ডুবকিতে আঙুলের সহজিয়া চলাচল। শুভেন্দু সরকার, বিখ্যাত ‘ওয়ার্ডটুন’-এর জন্য, রহস্যময় গাছের তলায় তাঁর সাদা-কালো ছবির সিরিজ দেখালেন নিকটবন্ধুদের। সকলেই বিস্মিত ভিন্নস্বাদের এই সরকারকে দেখে।

এই ক’দিন অনেক প্রবীণ, এমনকী, নবীন-কিশোরের মুখেও আমরা শুনেছি– বইমেলায় সেই ‘ব্যাপারখানা’ আর নেই। এক তরুণ চনমনে প্রকাশক, গতকাল, স্বীকার করে নিয়েছেন– বইমেলায় এখনও ঢের প্রাণবন্ত। যদিও চরিত্র বদলেছে, কিন্তু চেষ্টাচরিত্র করলে পুরনো বহু জরুরি কিছুই ফেরানো যেতে পারে। যেমন মমার্ত, যেমন শিল্পীদের পসরা। মৃদুল দাশগুপ্ত এদিন নিজের সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট লিখেছেন, ‘গতবারই কী যেন নেই, কী যেন নেই– মনে হয়েছে, এবার স্পষ্ট দেখছি, কলকাতা বইমেলার একেবারে অঙ্গহানি ঘটে গেছে। বইমেলার রামধনু-রং ডানাগুলি একেবারে ছেঁটে ফেলেছে গিল্ড। বইমেলায় মমার্ত সুচতুরভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে। মেলার মাঠে মাটিতে বসে টুকিটাকি শিল্পকর্ম বিক্রি করতেন যাঁরা, ছবি আঁকতেন, পোট্রেট এঁকে দিতেন যাঁরা, সেই শিল্পীদের বইমেলায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বইমেলায় শিল্পীরা, আমাদের সহোদররা নেই! তাঁরা রাস্তায় বসে আছেন। এ কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এই বইমেলা অসম্পূর্ণ এবং আংশিক।’ মৃদুল দাশগুপ্তের এই অনুযোগ, নিশ্চিতভাবেই শুধু মৃদুল দাশগুপ্তের একার নয়। আশা করি, গিল্ড কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

এই মেলার শুরুতেই ‘খবর’ রটে গিয়েছিল যে, ‘গাঙচিল’ প্রকাশনী থেকে রঘুনাথ গোস্বামীর মিনিবুক প্রকাশিত হবে। ৯ দিন নিরন্তর ঢুঁ মারা ও গাঙচিল কর্মীদের পক্ষ থেকে ‘আগামিকাল আসবেই’ শুনে ক্লান্ত এক বই ক্রেতা এবারের মতো বইমেলা আসার উদ্যমই নাকি ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষদিন, তাঁর মুখে ম্যাক্সিমাম হাসি দেখে আন্দাজ করা গেল, নাহ, অবশেষে মিনি আসিয়াছে। মিনিবুক অবশ্য বইমেলার শুরু শুরুতেই এনেছে ‘আজকাল’ প্রকাশনী, গতবারের মতোই।
পুরনো বইয়ের দোকানে, এমনকী, এই শেষদিনও ভিড় যথেষ্টই। এক ক্রেতা, শুধুমাত্র বেড়ে পুস্তানির জন্যই কিনে ফেললেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি সাক্ষাৎকারের বই। দাম নিয়ে খানিক টেনশনে ছিলেন, কিন্তু উত্তর এল: ‘৫০ টাকা!’ বেজায় খুশ হয়ে তাঁকে দেখলাম পুরনো পত্রিকার ফাঁক থেকে জলার্ক পত্রিকার অসীম রায় সংখ্যাটি উদ্ধার করতে। যদিও জন রাস্কিনের ‘মডার্ন পেইন্টার্স’-এর পাঁচটি খণ্ডের দাম কত, এই প্রশ্নের উত্তর শুনে তিনি অক্কা পাচ্ছিলেন।

অবসরপ্রাপ্ত লিট্ল ম্যাগাজিনের দুই অনূর্ধ্ব চল্লিশ সম্পাদক, প্রায় জনসন-রনসনের মতো মেলায় হেঁটে বেড়ালেন। একে-অপরকে আশীর্বাদ করলেন যে, ভাগ্যিস এই ’২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাঁরা কাগজ বের করেন না। কাগজ দেখানোর যা চল হয়েছে, তাতে তাঁরা ‘ফিট’ করতেন না বলে দাবি করলেন তাঁদের চিরপরিচিত উৎসুক বন্ধুটি। তাঁদের মতে, বইমেলা ক্রমে ভূতের ভবিষ্যৎ, পেতনির ভবিষ্যতে পরিণত হবে একদিন। পাঠক যে ক্রমেই ভূতগ্রস্ত হচ্ছেন, এ ব্যাপারে তো গত কড়চাতেই আমরা জানিয়েছিলাম। ভূত যথেষ্ট হল, পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই, বাংলা গ্রাফিক নভেলে চার্বাক দীপ্ত এসে পড়েছেন। ‘লুবলুর পৃথিবী’তেই থেমে থাকেননি তিনি, ‘হ-য-ব-র-ল’ নানা কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন। সুকুমার রায়ের কাহিনি অবলম্বনে তাঁর কমিকস ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’টিও অনবদ্য। বাঙালি পাঠক চার্বাককে যত দ্রুত গ্রহণ করে নেবে, বাংলা ও বাঙালির রুচির পক্ষে তা হবে মঙ্গলজনক।
শেষমেশ রাত ৯টার ঘণ্টাধ্বনি। একযোগে হাততালি। স্টল থেকে রাস্তায় নেমে আসা। চারপাশ দেখে নেওয়া, চারপাশের মধ্যে আকাশের পতনোন্মুখ চাঁদটিও পড়ে। চোখ ছলছল। হাতে হাত, জড়িয়ে ধরা। বন্ধুবান্ধব, অর্ধপরিচিত-অপরিচিতর দিকেও কয়েক পলক বাড়তি দৃষ্টি। মলিন হাসি। বারেবারে আর আসা হবে না। ওই যে অলীক বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল বইপত্রিকা, প্রকাশন– হয়তো প্রকাশন আর নেই, বন্ধুত্বও– তবুও আলিঙ্গন, তবু কিছু মায়া রয়ে গেছে।
ছিল নেই, মাত্র এই– কলকাতা বইমেলা। বইমেলার প্রথম দিনের কড়চায় আমরা আশা করেছিলাম, বই বিক্রি ও ভিড় গত বছরের তুলনায় বাড়বে। গিল্ডের তরফে জানা গিয়েছে, গত বছর মেলার আসা মানুষের সংখ্যা ২৭ লক্ষ থেকে বেড়ে ৩২ লক্ষ হয়েছে। ২৩ কোটি থেকে বেড়ে বই বিক্রি হয়েছে ২৬ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকার। বিক্রির হার বেড়েছে ১৫ শতাংশ! দুরন্ত ব্যাপার– প্রকাশক, পাঠক, প্রকাশনা ও বইমেলার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মীকে আমাদের তরফ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু একটি প্রশ্ন মনে প্রতিবারই ঘা মারে, তা হল, এত বইপ্রেমী মানুষ থাকা সত্ত্বেও বাংলার গ্রন্থাগারগুলি এমন পাঠকশূন্যতায় ভুগছে কেন! তাহলে কি নিজস্ব গ্রন্থাগার তৈরিতেই মন মজেছে পাঠকদের? ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ বা ‘সাধারণ গ্রন্থাগার’ কথাটি কি তাহলে ক্রমেই অচল হয়ে পড়বে? ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের ভবিষ্যৎ বইমালিকের মৃত্যুর পর ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকানে এসে পড়লে, তাও ভালো, কিন্তু যদি তা-ও না হয়? যদি অনাদরে, অবহেলায় দীর্ঘদিন পড়ে থাকে? পোকায় কাটে? বিক্রি করে দেওয়া হয় পুরনো কাগজের দোকানে, স্বল্পমূল্যে?

এই টুকরো প্রশ্ন, প্রিয় পাঠক, আপনার মনে পাচার করে দিতে চাই। বইমেলার এই ক’দিন রোজ, আমরা মেলার নানা কাণ্ডকারখানা আপনার সামনে হাজির করেছি। বিশ্বাস করুন, পায়ে, হাতে, পিঠে অপূর্ব এক ব্যথা হয়েছে। অপূর্ব– তার কারণ সে ব্যথা বিফলে যায়নি। আপনারা পড়েছেন, আমাদের জানিয়েছেন। মেল করেছেন। সাক্ষাতে বলেছেন। এক তরুণ প্রকাশক, আখরকথা-র শুভঙ্কর মাজি প্রায় জীবন বিপন্ন করে র্যাপিডোয় চড়ে কড়চা পড়তে পড়তে মেলার মাঠে ঢুকেছেন, জানিয়েছেন আমাদের। আমরা এখনও বিশ্বাস করি, ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতার সেই অমোঘ পঙ্ক্তি: ‘ভালোবাসা মৃতসঞ্জীবনী।’ আপনারা ভালো থাকবেন, ভালোবাসায় থাকবেন। ফের দেখা হবে, করস্পর্শ হবে– এইবেলা বিদায়!
………. পড়ুন বইমেলার কড়চা-র অন্যান্য পর্ব ……….
১০. মেলায় পাবেন শ্রেষ্ঠ শত্রুর জন্য উপহারের বই!
৯. ‘না কিনুন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’
৮. বইমেলার লিটল ম্যাগ টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী
৫. দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভিড়ে পাঠকও কি দুষ্প্রাপ্য?
৪. ছাব্বিশের বইমেলা বাণীপ্রধান!
৩. বই পোড়ানোর চেয়ে গুরুতর অপরাধ বই না পড়া
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved