
কোলিরা প্রাকৃতিক সংকেতের মাধ্যমে অতি সামান্য পরিবর্তনও বুঝতে পারেন। সমুদ্রের জল লাল হয়ে গেলে ওঁরা বুঝে যান জলে প্রচুর পরিমাণে অণুশৈবাল এসেছে। তাই সেই স্থানে তাঁরা মাছ ধরা বন্ধ করে দেন– নিজেদের এবং এই পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করা মাছেদের বাঁচাতে। কাঁকড়ার পাথরে উঠে পড়া, পমফ্রেট মাছের জলের ওপরে লাফানো বা দ্রুত বেগে পালানো দেখে প্রায় চার-পাঁচদিন আগেই সামুদ্রিক ঝড়ের আভাস পেয়ে যান তাঁরা। কারণ মাছ, কাঁকড়ারা ঝড় আসার আগে এরকম অদ্ভুত আচরণ করে– এমনটা তাঁরা বহু বছর ধরে দেখে আসছেন।
প্রায় ৮০০ বছর আগে আজকের মুম্বই– কোলাবা, মাজাগাঁও, মহিম, পারেল, ওরলি, বোম্বে আর ওল্ড উইমেন নামে সাতটা দ্বীপে বিভক্ত ছিল। গুজরাটের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে এক জেলেগোষ্ঠী এই সময় নতুন জায়গার খোঁজে গণপ্রচরণ শুরু করে, আরও দক্ষিণে এসে পৌঁছেছিল ওরলি দ্বীপে। এই জনগোষ্ঠীর নাম ছিল ‘কোলি’। কোলিরা প্রথম থেকেই সমুদ্রের সবরকম কাজে পারদর্শী ছিলেন, তাই ওরলি দ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করে মাছ ধরার কাজ শুরু করতে তাদের বেশিদিন সময় লাগেনি। আরব সাগরের তীরে এই নতুন জনপদ অচিরেই বেশ জমজমাট হয়ে উঠল। প্রচুর মাছ, মাছের নানা পদ এবং বর্ণময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ধীরে ধীরে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হল। যার প্রমাণ মেলে তাদের পোশাক, পরিচ্ছদ, আভরণের বৈচিত্রে, বাহারে। কিন্তু আজ হঠাৎ কোলিদের প্রসঙ্গ তোলা কেন?

ভারতের মতো একটা উপকূল পরিবেষ্টিত (১১০৯৯ কিমি) দেশে এমন গোষ্ঠী তো থাকতেই পারে! সমস্যা হল কোলি জনগোষ্ঠীর প্রায় হাজার বছরের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতি আজ বেপরোয়া উন্নয়নের দাপটে বিলুপ্ত হতে বসেছে। ১৬৬১ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্তমান মুম্বইতে পা রাখার পর থেকেই শুরু হয় এই সমস্যা, ধীরে ধীরে প্রশাসনিক প্রয়োজনে দ্বীপগুলোকে যুক্ত করে ফেলার কাজ শুরু হয় এবং ১৮৬৮ সালে কারনাক সেতু নির্মাণের মাধ্যমে তার সূচনা ঘটে। তারপর একে একে নতুন সেতু তৈরি হতে থাকে। শেষদিকের উদাহরণের মধ্যে ২০১০ সালের মুম্বই-ওরলি লিংক উল্লেখযোগ্য। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য গড়ে ওঠা এই সেতুগুলো হয়ে উঠল কোলিদের সমস্যার কারণ। সমগ্র মহারাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে বিপর্যয় বাড়তে থাকল। কেন?
ফেরা যাক কোলিদের কথায়, এই প্রাচীন গোষ্ঠীর সমস্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। সমুদ্রকে তাঁরা জীবনদায়ী মহাশক্তিরূপে পুজো করে। সামুদ্রিক অভিজ্ঞানে তাঁরা সমৃদ্ধ। বরুণদেবকে তাঁরা পুজো করেন ‘দারিয়াচা রাজা’ বা সমুদ্রের রাজা হিসেবে, এছাড়াও রয়েছেন দেবীপ্রধানা একভিরা। তাঁকে সকলে ডাকে ‘একভিরা আই’ নামে। এই গোষ্ঠী সমুদ্রকে দেখেন মাতৃশরীররূপে, তাই প্রাচীনকাল থেকেই মৌসুমী বায়ুর আগমন ও প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত পুরো ৬০ দিন মাছ শিকার বন্ধ রাখেন তাঁরা। বর্ষা বিদায় নিলে ‘নারিয়েল পূর্ণিমা’ উদ্যাপন করেন। মায়ের কাছে প্রার্থনা করে, মা-কে সোনায় মোড়া নারকোলের অর্ঘ্য দিয়ে পরের দিন মহানন্দে সমুদ্রযাত্রা করেন।

কোলিদের আরেক বিশেষ উৎসব হল ‘গৌরী উৎসব’। গৌরী– শিবের পত্নী পার্বতী। এই উৎসব সাধারণত ভাদ্র মাসে হয়ে থাকে এবং এই সময় কোলিরা নৈবেদ্য হিসেবে মায়ের কাছে সমুদ্র-কাঁকড়া ও মাডস্কিপার (সুন্দরবনে যাকে ‘ডাখুর’ বা ‘মিনুমাছ’ বলে) প্রদান করেন। মাডস্কিপার নদীখাঁড়ি অঞ্চলের পরিবেশের আদর্শ সূচক, কারণ এই মাছেদের জীবন নোনামিঠে জলের গুণগত মানের ওপরে নির্ভর করে। সহজেই এই মাছ, কাঁকড়া পেলে তাঁরা বুঝতে পারেন সেই বছর মোহনা দূষণমুক্ত আছে, মাছের আনাগোনা ভালো হবে। আর না-পেলে বোঝা যায় দূষণ বেড়েছে এবং মাছের সংখ্যা কম থাকবে।
কোলিরা এক বিশেষ ধরনের জাল ও জালের নকশা ব্যবহার করেন যা নির্দেশ করে কোন মাছ ছেড়ে দিতে হবে, কোন মাছ ধরা যাবে। এই জালকে বলে ‘ডোল’। প্রাকৃতিক তন্তু কয়ান, শন বা সুতি থেকে এই ডোল তৈরি হয়, তাই মাছ সহজে আহত হয় না। এই জ্ঞান প্রমাণ করে তাঁরা সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে কতটা সচেতন।

অন্যান্য উপকূলের মতো ওঁদের প্রধান খাদ্য মাছ-ভাত। বর্ষার সময় শুটকি মাছ, গৌরী পার্বণে মাডস্কিপার, কাঁকড়া এবং অন্যান্য সময়ে নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ খেয়ে থাকেন। খাবারে নারকোলের ব্যবহার বিশেষভাবে দেখা যায়। এছাড়াও কোকুম, তেঁতুল বা লঙ্কার ব্যবহার বিশেষ উল্ল্যেখযোগ্য। নারিয়েল পূর্ণিমার সময় ‘নারিয়েল ভাত’ বা নারকেল পোলাও, নারকেল বড়া, নারকেল বরফি খাওয়া হয়।
কোলিরা প্রাকৃতিক সংকেতের মাধ্যমে অতি সামান্য পরিবর্তনও বুঝতে পারেন। সমুদ্রের জল লাল হয়ে গেলে ওঁরা বুঝে যান জলে প্রচুর পরিমাণে অণুশৈবাল এসেছে। তাই সেই স্থানে তাঁরা মাছ ধরা বন্ধ করে দেন– নিজেদের এবং এই পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করা মাছেদের বাঁচাতে। কাঁকড়ার পাথরে উঠে পড়া, পমফ্রেট মাছের জলের ওপরে লাফানো বা দ্রুত বেগে পালানো দেখে প্রায় চার-পাঁচদিন আগেই সামুদ্রিক ঝড়ের আভাস পেয়ে যান তাঁরা। কারণ মাছ, কাঁকড়ারা ঝড় আসার আগে এরকম অদ্ভুত আচরণ করে– এমনটা তাঁরা বহু বছর ধরে দেখে আসছেন।

কোনও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী, বড় মাছ তাঁরা শিকার করেন না। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে এই বিশালাকার প্রাণীরা তাঁদের গ্রামকে রক্ষা করছে। এছাড়াও প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছ এঁরা কখনওই ধরেন না। নির্দিষ্ট মাপের মাছই ধরেন। মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করেন হাতে টানা ছোটো নৌকা, যাতে জলদূষণ না হয়। নৌকা ও জাল-সংক্রান্ত ভাবনা তাঁদের পরিবেশ চেতনার প্রমাণ দেয়। কোলিরা মনে করেন– ভূতনাথ শিবের অনুচর লোকদেবতা ‘ভেটাল’ বা ‘বেতাল’। তিনি তাঁদের গ্রামকে নানা ধরনের ভৌতিক ঘটনা, প্রেতাত্মার হাত থেকে রক্ষা করেন। তাই মাছ ধরতে যাওয়ার আগে, পরে তাঁরা দেবতাকে নানা উপহার দেন। কিন্তু কখনওই ‘রোস্ট্রাম ফিশ’ বা ‘sawfish’ ধরেন না; কারণ বেতালের তরবারি হল sawfish-এর মাথার অগ্রভাগ। যদি কখনও ভুল করে কোনও sawfish মারা যায়, তাহলে সেই মাছের মাথার উপর তার মৃত্যুর কারণ, কার ভুলে মারা গেছে, কখন মারা গেছে এবং নৌকার নম্বর লিখে ভগবানের কাছে নিবেদন করেন; এবং ভুল স্বীকার করেন। অর্থহীন মনে হলেও, পরিবেশ রক্ষায় এই ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ sawfish একটি বিলুপ্তপ্রায় মাছ; আর কোলিরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের রক্ষা করে আসছেন চোরা শিকারী বা অসৎ জেলেদের হাত থেকে।

বর্তমানে কোলি গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বেপরোয়া উন্নয়নের ঝড়ে সমুদ্রতীর সৌন্দর্যায়নের নামে যেভাবে কংক্রিটের জঞ্জাল বাড়ছে, প্লাস্টিক দূষণ বাড়ছে তাতে সমুদ্রে মাছের পরিমাণ কমেছে ব্যাপক হারে। সমুদ্রে সেতু তৈরি করার জন্য স্বাভাবিক স্রোত বিঘ্নিত হচ্ছে, নাব্যতা কমছে। জলদূষণ বাড়ার ফলে মাছেরা আসা বন্ধ করছে উপকূলে। এক প্রাজ্ঞ কোলির কথা অনুযায়ী–
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা বলতেন, ‘একদিন আসবে, যখন সমুদ্রে অনেক জল থাকবে কিন্তু মাছ থাকবে না’। তাহলে কি সত্যিই সেই দিন এসে গেল?

কোলিদের প্রধান চিন্তার বিষয় এটাই। আজ থেকে ৮০০ বছর আগে একটা জনগোষ্ঠী পরিব্রজন করেছিলেন তাঁদের অসাধারণ সামুদ্রিক দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে। তারপর তাঁরা শুধু মন দিয়ে সেই পেশাতেই নিযুক্ত থেকেছেন। আজ হঠাৎ সেই পেশা ছেড়ে তাঁরা কোথায় যাবেন? কী করবেন আগামী দিনে? তাঁরা কি এত বছরের প্রকৃতিলব্ধ জ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবেন? শশব্যস্ত মুম্বই শহরের বুকে শান্ত, রঙিন, মাছের গন্ধ-মাখা শেষ ২০-টা গ্রামের মানুষগুলো– সমুদ্রের গল্প বলতে বলতে যারা কেঁদে ফেলেন, তাঁরা কি হেরে যাবেন? আবার কোনও নতুন অজানা পেশার খোঁজে পাড়ি দেবেন অন্য কোনও স্থানে? হয়ে যাবেন শহর মফস্সলের কলকারখানার ‘হাফস্কিলড/ আনস্কিলড লেবার’? তারপর ওঁদেরকে আমরা কী বলব? ক্লাইমেট রিফিউজি না কি উন্নয়নের দাপটে জীবন-জীবিকা হারিয়ে ফেলা নিঃস্ব মানুষ!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved