
বইটির এটি দ্বিতীয় সংস্করণ। ভূমিকাতে লেখক স্বয়ং জানিয়েছেন যে এই এডিশনে বইয়ের বেশ কিছু রদবদল হয়েছে। প্রথম সংস্করণ প্রতিবেদকের দেখার সুযোগ হয়নি, তবে বর্তমান রূপটি দেখেও মনে হয় যে বেশ কিছু জায়গায় তথ্য, ব্যাখ্যা এবং পাঠশুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। ছবির লে-আউট এবং ক্যাপশনেও রয়েছে বিন্যাসের অভাব। সব ছবির সন তারিখ বা মাধ্যমের উল্লেখ নেই। তৃতীয় সংস্করণে এই ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়া ভীষণ জরুরি বলে মনে হয়।
বাংলা তথা ভারতের দুই দিকপাল শিল্পীর জীবন ও কাজ নিয়ে লেখা ‘অবন গগন’ বইখানি পড়ে যে প্রতিক্রিয়া হল, তাকে বোধ করি ‘পুলকবেদনা’ বলা চলে। মাত্র ৮৬ পাতার মধ্যে গগনেন্দ্রনাথ ও তাঁর সহোদর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কীর্তি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা সহজ কাজ নয়। ফলে, লেখক সুব্রত ঘোষ এবং ইতিকথা পাবলিকেশনের এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু কেতাবি আলোচনার পরিসরে ভালোমন্দ দ্বিধাদ্বন্দ্ব সবই বুঝে নেওয়া জরুরি। তাই চোখে-পড়া, মনে-ধরা আঁতের কথাগুলি এক্ষেত্রে না-বললেই নয়।

মূলত দু’টি ভাগে বিন্যস্ত এই বইয়ের প্রথম অংশে বর্ণিত হয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত ‘ভারতমাতা’ ছবিটির সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব। সহজ গদ্যের টানে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে লেখকের অনায়াস যাতায়াত। অবনীন্দ্রনাথের আঁকা চতুর্ভুজ মাতৃমূর্তি ‘ভারতমাতা’র ছবিটি দেখে আপ্লুত ভগিনী নিবেদিতার দৃশ্য দিয়ে যে লেখার শুরু, তা অবলীলায় পৌঁছে যায় ফ্ল্যাশব্যাকে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্মগ্রহণ, কেশবচন্দ্র সেনের অনুপ্রেরণার মতো ঘটনা পেরিয়ে কথক সাবলীলভাবে ফিরে আসেন ১৯০৫-এ। রবীন্দ্রনাথের রাখীবন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বাঁকবদলের উল্লেখ প্রেক্ষাপটকে করে তোলে সজীব। পাশ্চাত্য কায়দায় দক্ষ অবনীন্দ্রনাথ তখন স্বকীয়-শৈলী তৈরী করতে মরিয়া। ‘শাহজাহানের মৃত্যুপ্রতীক্ষা’, ‘কৃষ্ণলীলা’র মতো ছবি আঁকার পর জাপানি চিত্রকর ইয়োকোইয়ামা তাইকানের সংস্পর্শে এসে আঁকার ধরণ সম্পূর্ণ বদলে গেল তাঁর। এই বদলে যাওয়া শৈলীতেই প্রথম অভাবনীয় সাফল্য ‘ভারতমাতা’ ছবিতে। বঙ্গভঙ্গের ঘটনায় তীব্র আঘাত পান অবনীন্দ্রনাথ, সেই ব্যথাই যেন রূপ নিল এই চতুর্ভুজা মাতৃমূর্তির। পুঁথি, বস্ত্র, ধানের শীষ এবং রুদ্রাক্ষের মালা হাতে দেবী যে ঠিক কোন দ্যোতনায় ধরা দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথের ভাবনায়, তা খুঁজতে গিয়ে লেখক ডুব দিয়েছেন বাংলার মাতৃসাধনার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে।

‘অবন গগন’ বইটির দু’মলাটের মধ্যে ঠাসা হয়েছে বিস্তর আইডিয়া। আর্ট কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ হ্যাভেল সাহেব, ভগিনী নিবেদিতা এবং আনন্দ কুমারস্বামীর মতো সহযোদ্ধাদের সান্নিধ্যে অবনীন্দ্রনাথের শিল্পোদ্যম যে কতখানি প্রশ্রয় পেয়েছিল, লেখকের বর্ণনায় মেলে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। শিল্পী তাইকান-কে যিনি জাপান থেকে পাঠিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত চিত্রসমালোচক ওকাকুরা কাকুজোর কথাও উঠে আসে ‘বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট’ প্রসঙ্গে। আবার ওকাকুরার সূত্রেই এসে পড়ে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য, মাতৃপূজা, ভগিনী নিবেদিতা এমনকী, স্বামী বিবেকানন্দের লেখা ‘কালী দ্য মাদার’ কবিতার উল্লেখ! বিক্ষিপ্তি বা প্রসঙ্গান্তরে এ লেখা ভরপুর!
ভগিনী নিবেদিতা নিজ-উদ্যোগে ‘ভারতমাতা’ ছবিটিকে ছেপে পোস্টার বানিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বিলি করেছিলেন। স্বদেশি আন্দোলনের জন্য সেই পোস্টার প্রবলভাবে ব্যবহারও হয়েছিল। এমনকী, উ্যজেন দ্যলাক্রোয়ার আঁকা ফরাসি বিপ্লবের বিখ্যাত ছবি ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল্’ (১৮৩০)-এর সঙ্গে ভারতমাতার সাদৃশ্য এবং পার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়। পাশ্চাত্য কৌশলী দক্ষতার সঙ্গে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চেতনা মিশে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা দেবীমূর্তি হয়ে যে হয়ে উঠেছেন ধ্যানমগ্ন, সমাহিত, সে প্রসঙ্গ লেখক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পাঠকদের। দ্যলাক্রোয়া যেমন গুণমুগ্ধ হিসেবে পেয়েছিলেন শার্ল বোদলেয়ারের মতো বিখ্যাত কবি ও শিল্প সমালোচককে, তেমনই অবনীন্দ্রনাথের গুণগ্রাহী ছিলেন স্বয়ং ভগিনী নিবেদিতা। ইতিহাস যে বারবার ফিরে ফিরে আসে, এ দৃষ্টান্ত সে কথাই মনে করিয়ে দেয় না কি?

পাঠের পথ সবটুকুই প্রশস্ত ও মসৃণ এমনটা বললে অর্ধসত্য বলা হয়। বস্তুত এ বইটিতে স্বল্প পরিসরে এত ধরনের প্রসঙ্গান্তর এসেছে যে অবনীন্দ্র-গগনেন্দ্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল পাঠকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি পুনঃপাঠের মতো, কিন্তু নতুন পাঠককে শিল্পীদ্বয় সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা পেতে এ বই আদৌ সেভাবে সাহায্য করবে না। তার জন্য দায়ী অনেকগুলি কারণের মধ্যে প্রধান হল– ‘তথ্যবিভ্রান্তি’। দু’-একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে: ৩০ নম্বর পাতায় উল্লেখ: ‘ব্রাহ্ম পরিবেশে মানুষ হলেও অবনীন্দ্রনাথের শিল্পচর্চায় অন্য ধর্মীয় চিত্র বা কাহিনি কখনো বাধা হয়ে আসেনি।’ এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি জোড়াসাঁকোর পাঁচ এবং ছ’-নম্বর বাড়ির সৌহার্দ্য অটুট থাকলেও ধর্মীয় অবস্থান ছিল আলাদা। ছ’-নম্বরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধরেরা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন পাঁচ নম্বর বাড়ির গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান। এঁরা ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ। পূজা-উপাচার তাঁদের ভদ্রাসনে যথাবিহিত নিয়ম মেনেই হত। কাজেই হিন্দু দেবদেবীর ছবি ও সংশ্লিষ্ট শিল্প যে অবনীন্দ্রনাথকে অতি সহজেই আকৃষ্ট করবে এতে আশ্চর্য কী?
বইটির এটি দ্বিতীয় সংস্করণ। ভূমিকাতে লেখক স্বয়ং জানিয়েছেন যে এই এডিশনে বইয়ের বেশ কিছু রদবদল হয়েছে। প্রথম সংস্করণ প্রতিবেদকের দেখার সুযোগ হয়নি, তবে বর্তমান রূপটি দেখেও মনে হয় যে বেশ কিছু জায়গায় তথ্য, ব্যাখ্যা এবং পাঠশুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। ছবির লে-আউট এবং ক্যাপশনেও রয়েছে বিন্যাসের অভাব। সব ছবির সন তারিখ বা মাধ্যমের উল্লেখ নেই। তৃতীয় সংস্করণে এই ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়া ভীষণ জরুরি বলে মনে হয়।

বইটির দ্বিতীয় অংশের বিষয়বস্তু গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্প ও জীবনচর্যার বিশ্লেষণ। ঠাকুরবাড়ির আবহ, গগনেন্দ্রনাথের আঁকার ধাঁচধরন-সংক্রান্ত নানান কথা সহজ গদ্যে শুনিয়েছেন লেখক। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব পালনের পর গগনেন্দ্রনাথের আঁকার কম্পোজিশনে দস্তুরমতো পরিবর্তন আসে এবং তারও পরে তিনি কিউবিজম ও মিনিয়েচার ছবি নিয়ে মেতে ওঠেন । গগনেন্দ্রনাথের ‘বিরূপ বজ্র’, ‘অদ্ভুত লোক’ সিরিজের বেশ কিছু ছবি বইয়ে ছাপলেও, ক্যাপশনে ‘মাধ্যম: লিথোগ্রাফ’ কথাটি পাঠকমনে ভুল ধারণা দেয়। ছবিগুলি অধিকাংশই জলরং, কালি-কলম, টেম্পেরা অথবা মিশ্র মাধ্যমে আঁকা। লিথোগ্রাফ সম্পূর্ণতই ছবি ছাপার একটি পদ্ধতি। বরং কিউবিজমের পদ্ধতিগত বিভিন্ন কারিগরি প্রতিশব্দের সহজ ব্যাখ্যা দিয়ে, পিকাসো বা জর্জ ব্রাখের ছবির সঙ্গে গগনেন্দ্রনাথের প্রয়োগপার্থক্য সম্পর্কে লেখক হয়তো আরেকটু সবিস্তার হলেও পারতেন। তবে বাউহাউস আন্দোলন, জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট গ্রুপের শিল্পীদের কাজ, কান্দিনস্কি, পল ক্লি প্রমুখের আশ্চর্য শিল্পকর্ম যে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই প্রথম প্রদর্শিত হয় কলকাতায়, এই জরুরি কথাটি লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন। সেজন্য তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

ক্ষেত্রবিশেষে সময়কাল ও সমান্তরাল উল্লেখযোগ্য ঘটনার বিস্তারিত বিবরণের দরুন মূল বিষয় থেকে পাঠকের মন সরে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যায় বইয়ের শেষার্ধে। ৫৫ পাতার শেষ অনুচ্ছেদে লেখকের বক্তব্য: কোনও পাহাড়ে না গিয়ে গগনেন্দ্রনাথ কীভাবে এমন সব ছবি আঁকতেন? এটি আবারও ভ্রান্ত ধারণা। ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক ভ্রমণ প্রতি বছর হত হয় দার্জিলিং নয়তো পুরীতে। রানী চন্দের লেখা ‘হিমাদ্রী’ বইতেও এমন ভ্রমণের উল্লেখ মেলে। কাজেই ‘গগনেন্দ্রনাথ খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোতেন না’ জাতীয় বক্তব্য আদৌ সঠিক নয়। আন্তরিক পাঠকমাত্রেই তা বলবেন। তেমনই গগনেন্দ্রনাথকে ‘ব্রাহ্ম’ ভেবে তাঁর ‘চৈতন্য চরিত মানস’ সিরিজকে ‘বিরল আকর্ষণ’ বলে চিহ্নিত করে সবিস্তারে লিখেছেন লেখক, যা আবারও একই বিভ্রান্তির পুনরুক্তি। জীবদ্দশায় গগনেন্দ্রনাথ একেবারেই শিল্পী হিসেবে খ্যাতি পাননি, এমন ধারণাও সম্পূর্ণ সত্য নয়। লেখক নিজেই এক্ষেত্রে খানিক পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেছেন দু’টি ভিন্ন অধ্যায়ে। ১৯২২-এ বিখ্যাত শিল্প-সমালোচক স্টেলা ক্রামরিশের প্রবন্ধ ‘An Indian Cubist’ লেখা হয়েছিল গগনেন্দ্রনাথকে নিয়েই। এর থেকে শিল্পীর আন্তর্জাতিক খ্যাতির খানিকটা আভাস মেলে বইকি!
ছবিবহুল এই কেতাব বইমেলায় সময়মতো পৌঁছে দিতে ‘প্রিন্ট অন ডিমান্ড’ পদ্ধতিতে ছাপানোয় প্রোডাকশনে সেই ওজনদার ব্যাপারটা নেই। উপরন্তু কলেবরের নিরিখে দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রিত মূল্যও হয়ত পাঠকের কাছে বেশি মনে হতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ থেকে লেখক সরাসরি গদ্যে ব্যবহার করেছেন– ‘মা যা ছিলেন, মা যা হইয়াছেন, এবং মা যা হইবেন’। বইটির উদ্দেশ্যে পাঠকের বক্তব্যও যেন কতকটা একই সুরে বাঁধা পড়ে, প্রথম দু’টি এডিশনে ‘বই যা ছিলেন’ এবং ‘যা হলেন’ দেখার পর, তৃতীয় সংশোধিত রূপে ‘বই যা হইবেন’ এর দিকেই আপাতত তাকিয়ে বাংলার অসংখ্য শিল্পপ্রেমী বইপোকারা!
অবন গগন
সুব্রত ঘোষ
ইতিকথা পাবলিকেশন
৩৫০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved