
গ্রামের মানুষেরা মনের বাসনা পূরণের জন্য প্রার্থনা জানান। ঢিল বেঁধে যান থানে। ভক্তদের বিশ্বাস কৃষ্ণাচণ্ডী মনোবাসনা পূর্ণ করেন। আর মনোবাসনা পূর্ণ হলে ভক্তরা মিষ্টি, ফল, আতপ চাল দিয়ে মায়ের থানে পুজো দিয়ে যান। শোলার কদম ফুল ঝুলিয়ে দিয়ে যান। থানের মাটি, পুজোর ফুল ভক্তরা নিজের কাছে রাখলে সমস্ত রোগ দূর হয়– এমন বিশ্বাস নিয়েই ভক্তরা আসেন সেখানে।
অনেকটা সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়া হয়েছিল ফারাক্কা এনটিপিসি মোড়ে। বাস থেকে নামার পরেই টালির চালের ছাউনিওয়ালা একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। দোকানি তখনও চা করেনি। উনুনে সবে আঁচ উঠছে। হলুদ রঙের পিঠের ব্যাগটাকে চায়ের দোকানে বেঞ্চির উপর রেখে সবে বসেছি। একটা মোটর সাইকেল চালিয়ে এক মাঝবয়সি লোক এসে হাজির চায়ের দোকানে। নিজেই যেচে জিজ্ঞেস করলেন ‘কোথা থেকে এসেছেন?’, ‘ফারাক্কাতে কোথায় যাবেন?’– এমন একের পর এক প্রশ্ন।
কলকাতা থেকে এসেছি; ফারাক্কার এক বন্ধুর কাছে। এক বাক্যের এই উত্তরটুকু লোকটির পছন্দ হল না। ‘কোন বন্ধু? তাঁর বাড়ি কোন পাড়ায়?’– এমন নানা সব প্রশ্ন। যে বন্ধুটির কাছে ফারাক্কাতে গিয়েছিলাম, তাকে ফোন করলাম। ঘুম থেকে ওঠা ভাঙা ভারি গলায় সে জানাল, আসছে। তারপর ফোনে একটা মেসেজ এল। সেখানে লেখা– ‘একটু কোথাও বসুন। আমি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। আমি ভেবেছিলাম আপনি দশটা নাগাদ আসবেন। আমি আসছি। আধ ঘণ্টার মধ্যে।’

ওদিকে চায়ের দোকানের লোকের একের পর এক জিজ্ঞাসা পিছু ছাড়ছিল না। অগত্যা পিঠের ব্যাগটাকে একদিকের কাঁধে তুলে বাঁদিকে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ানো। এরকম ঘটনা নতুন কিছু নয়। সারা রাজ্য জুড়েই ক্ষেত্রসমীক্ষার সময় গ্রামবাংলার মানুষেরা বাইরের মানুষ দেখলেই আগ্রহের সঙ্গে কথা বলতে আসেন, নিজে থেকেই। আজ থেকে দু’দশক আগেও দেখেছি ক্ষেত্রসমীক্ষা করার সময় গ্রামবাংলার মানুষেরা ক্ষেত্র-সমীক্ষকের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যেতেন। আজ কাল বিষয়টা খুবই পালটে গেছে। বাইরের মানুষদের গ্রামবাংলার মানুষেরা সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করেছে। কারণটা গ্রাম-জীবনে রাজনীতির গভীর অনুপ্রবেশ। এর মধ্যেই আধ ঘণ্টা কেটে গেল।
একটা মোটর বাইক করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন অংশুমান ঠাকুর। সুঠাম শরীর, টিকোলো নাক, গৌরবর্ণ চেহারার অংশুমান ফারাক্কার একটি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। আজ ওঁর সঙ্গেই যাচ্ছি ‘কৃষ্ণাচণ্ডীর’ থানে। ফারাক্কার অম্বুজার মোড় থেকে সোজা রাস্তাটা মুসলিম গ্রাম কেন্দুয়া পেরিয়ে চলে যায় কৃষ্ণাচণ্ডীর থানে। এই জায়গাটাকে এলাকার আশেপাশের মানুষেরা চিনলেও, দূরের মানুষেরা একেবারেই এর খোঁজ জানে না। বেশ কিছুটা জঙ্গলের মেঠো পথ পেরিয়ে ডানদিকে কৃষ্ণাচণ্ডীর কুণ্ডকে রেখে পৌঁছে গেলাম কৃষ্ণাচণ্ডীর মন্দিরে। একটা বটবৃক্ষের ভিতর একটা কালো পাথরের পুজো হচ্ছে। তিনি কৃষ্ণাচণ্ডী। আগে মুখের একটা অবয়ব বোঝা গেলেও, এখন সিঁদুর লেপে মুখ আর বোঝা যায় না। তবে দেখে মনে হচ্ছিল কিছুটা বৌদ্ধদেবীর আদল। মন্দিরের সামনে তিনটে পাথরের টুকরো রয়েছে। সেগুলোকেও ফুল দিয়ে পুজো করা হয়।
থানের পুরোহিত হারাধন মিশ্র তখন মায়ের পুজো করছিলেন। পুজো শেষ হতেই উঠে এলেন। কয়েক পুরুষ ধরে তাঁদের পরিবার কৃষ্ণাচণ্ডীর থানের পুজো করে আসছেন। তাঁর হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৩০০ বছরের বেশি হবে। হারাধনবাবুর পরিবার মৈথিলী ব্রাহ্মণ। ভক্তের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হারাধনবাবু মন্দির থেকে নেমে একটু এগিয়ে এসে মন্দিরের সামনে দাঁড়ালেন। প্রশ্ন করলাম– কৃষ্ণাচণ্ডীর নাম কেন ‘কৃষ্ণাচণ্ডী’?

চণ্ডীদেবী (চণ্ডী/চণ্ডিকা) হিন্দু শাক্তধর্মে এক অত্যন্ত প্রাচীন ও তেজস্বিনী দেবী। যাঁর উৎস বহুস্তরীয়। বৈদিক ভাবনা, পুরাণ, তন্ত্র এবং লোকবিশ্বাস– সব জায়গাতে চণ্ডীর উৎসের খোঁজ পাওয়া যায়। সব বিশ্বাস মিলিয়ে তাঁর রূপ গড়ে উঠেছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ দেবী-মাহাত্ম্যম্ (দুর্গা সপ্তশতী/চণ্ডী) গ্রন্থেই চণ্ডীদেবীর সর্বাধিক প্রামাণ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে দেবীকে মহামায়া, চণ্ডিকা, দুর্গা, কৌশিকী প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে তিনটি প্রধান পর্বে দেবীর অসুরবধের কাহিনি বর্ণনা রয়েছে। মহাকালী– যিনি মধু ও কৈটভ রাক্ষসের বধ করলেন, মহালক্ষ্মী– যিনি মহিষাসুর বধ করলেন, আর মহাসরস্বতী বা চণ্ডী– যিনি শুম্ভ ও নিশুম্ভ বধ করলেন। ‘চণ্ডী’ নামটি এসেছে ‘চণ্ড’ (প্রচণ্ড, ভয়ংকর) শব্দ থেকে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেবীর উগ্র ও রক্ষাকারী শক্তির প্রতীক। কৃষ্ণাচণ্ডীর থানের দেবীর গায়ের রং কালো বা কৃষ্ণবর্ণ। তাই এখানে চণ্ডী ‘কৃষ্ণাচণ্ডী’ নামে পরিচিত।
এতটা বলে থামলেন থানের পুরোহিত। দুর্গাপুজোর দশমীর দিন কৃষ্ণাচণ্ডীর থানে মেলা বসে। থানে বিশেষ পুজো হয়। পাঁঠাবলির প্রথা এখনও এখানে রয়েছে। থানের পুরোহিত এই কথাগুলোই তুলে ধরলেন।

মধ্যযুগে বাংলার বিভিন্ন গ্রামে চণ্ডীমণ্ডপ গড়ে উঠেছিল, যা ছিল দেবী চণ্ডীর পুজোর কেন্দ্র। এই মণ্ডপগুলি গ্রামীণ সমাজে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। অনেক গ্রামে চণ্ডীর পুজো স্থানীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের সঙ্গে যুক্ত। যেমন নদিয়ার কৃষ্ণনগরে ঢেলাইচণ্ডী পুজোতে ভক্তরা গাছের ডালে মাটির ঢেলা ঝুলিয়ে মানত করেন। বিশ্বাস করা হয়, এতে মনোবাসনা পূর্ণ হয়। কৃষ্ণাচণ্ডীর থানেও দেখা গেল একই ভাবনার প্রকাশ। গ্রামের মানুষেরা মনের বাসনা পূরণের জন্য প্রার্থনা জানান। ঢিল বেঁধে যান থানে। ভক্তদের বিশ্বাস কৃষ্ণাচণ্ডী মনোবাসনা পূর্ণ করেন। আর মনোবাসনা পূর্ণ হলে ভক্তরা মিষ্টি, ফল, আতপ চাল দিয়ে মায়ের থানে পুজো দিয়ে যান। শোলার কদম ফুল ঝুলিয়ে দিয়ে যান। থানের মাটি, পুজোর ফুল ভক্তরা নিজের কাছে রাখলে সমস্ত রোগ দূর হয়– এমন বিশ্বাস নিয়েই ভক্তরা আসেন সেখানে।
থানের পাশেই রয়েছে থানের পুকুর। লোকমুখে এই পুকুরটির পরিচয় ‘কৃষ্ণাচণ্ডীর কুণ্ড’। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এই পুকুরের মাহাত্ম্য। থানের ‘পুকুর’ শব্দটা বলতেই পুরোহিত বললেন– একে ‘পুকুর’ বলবেন না।
–কেন?
–মন্দির বা থানের পাশে থাকা পুকুরের যদি কোনও বিশেষ মাহাত্ম্য থাকে, তাহলে সেই পুকুরকে বলা হয় ‘কুণ্ড’। এমনই ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে প্রবাহমান। ক্ষেত্রসমীক্ষার সূত্রে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরের পাশের পুকুরগুলোকে বেশিরভাগই ‘কুণ্ড’ বলা হয়।
জিজ্ঞেস করলাম– এই কুণ্ডের কী মাহাত্ম্য আছে?
পুরোহিত বিড়িতে দুটো টান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, এই কুণ্ডে স্নান করলে দূরারোগ্য ব্যাধি দূর হয়। গভীর রাতে পুকুরের পাড়ে মা কৃষ্ণাচণ্ডী লীলা করে বেড়ান। ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ হলে এই কুণ্ডে স্নান করে দেবীর পুজো দেন।

দেখেই বোঝা যাচ্ছিল খুব প্রাচীন পুকুর। পুকুরের শরীর জীববৈচিত্রে ভরপুর। আগেই জানিয়েছিলাম, মন্দিরের সামনে কালো রঙের পাথরের ভাঙা টুকরোগুলো রয়েছে। এবার প্রশ্ন করে বসলাম, পাথরের টুকরোগুলো কীসের?
পুরোহিত বললেন– শোনা যায় কালাপাহাড় এই মন্দিরের মূর্তি ভেঙে দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই ওই তিনটে টুকরো মন্দিরের সামনেই রয়েছে। যদিও এই কথার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
থানের পুকুরগুলো জীববৈচিত্র বাঁচিয়ে রাখার উপযুক্ত স্থান। অংশুমান আমাকে পুকুরটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা কাছিম উদ্ধার করলে এই পুকুর বা কুণ্ডে এসে ছেড়ে দিয়ে যান।’ আমাদের দেশে এইরকম ভাবেই জীববৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার প্রথা রয়েছে বহু প্রাচীন সময় থেকেই। এই প্রথা প্রায় সারা দেশ জুড়েই রয়েছে। পুরোহিত অংশুমানকে খুব ভালোভাবে চেনেন। অংশুমানের সঙ্গে গিয়েছি বলে হাতে প্রসাদ দিলেন। তারপর প্রসাদ খেয়ে ফিরে আসা, কিছুটা ভালো সময় অংশুমানের সঙ্গে কাটিয়ে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved