
ঘটনাটা বাঁকুড়া জেলার ইন্দাসের কুশমুন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের। সেখানে এক শিক্ষক যখন ক্লাসে ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন তখন সেখানে এলাকার বিধায়ক এসে উপস্থিত। বলা নেই, কওয়া নেই– তিনি একেবারে সটান ক্লাসে গিয়ে হাজির। শিক্ষকের পড়ানো থামিয়ে দিয়ে একঘর ছাত্রের সামনে তিনি দস্তুরমতো কৈফিয়ত তলব করলেন, ক্লাস কেন এত নোংরা? শিক্ষক প্রথমে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিধায়ক সেকথা শুনতে নারাজ। তখন শিক্ষক দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর নিজের দায়িত্ব আর কর্তব্যের কথা বললেন বিধায়ককে। জানালেন, তাঁর কাজ ছাত্রদের পড়ানো আর বিধায়ক সেকাজে বাধা দিয়েছেন ক্লাসে ঢুকে পড়ে। তাতে শিক্ষকের মর্যাদাহানি হয়েছে।
ঔরঙ্গজেবের একটা গল্প বলি। এক কবিতায় এ-গল্পের কাহিনি বর্ণিত। একদিন সকালে বের হয়ে বাদশাহ আলমগীর দেখলেন তাঁর পুত্র তাঁর শিক্ষকের পায়ে জল ঢেলে দিচ্ছে আর শিক্ষক নিজের হাত দিয়ে ঘষে ঘষে পা পরিষ্কার করছেন। শিক্ষক যখন জানতে পারলেন যে, স্বয়ং বাদশাহ এই দৃশ্য দেখে গিয়েছেন, তিনি তো ভেবে অস্থির! এই বুঝি গর্দান গেল; শাহজাদাকে দিয়ে তিনি কি না তাঁর পা পরিষ্কার করার জন্য জল ঢালিয়েছেন! তারপর তিনি ভয় জয় করলেন। ঠিক করলেন, যা হয় হোক, বাদশাহ ডেকে পাঠালে তিনি তাঁকে শিক্ষাগুরুর মর্যাদার কথা মনে করিয়ে দেবেন; শাস্ত্রকথা বলবেন।

এরপর ঘটল সেই অমোঘ ঘটনা। বাদশাহের দূত শিক্ষককে ডেকে নিয়ে গেলেন বাদশাহের কাছে। বাদশাহ শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেন, শাহজাদা সৌজন্যের পাঠ গ্রহণ করছে কি না। শিক্ষক তো কিছুই বুঝতে পারছেন না, কী বলবেন! তাঁকে কিছু বলতে হল না। রাজাই বলতে শুরু করলেন। বললেন, তিনি নিজের চোখে দেখেছেন শাহজাদা শিক্ষকের পায়ে জল ঢেলে দিচ্ছে কিন্তু নিজের হাতে করে শিক্ষকের পা পরিষ্কার করে দিচ্ছে না। শাহজাদার এই ‘বেয়াদবি’ দেখে বাদশাহ ব্যথিত। আর একথা শুনে শিক্ষক স্তম্ভিত। তিনি অভিভূত হয়ে বাদশাহ আলমগীরকে কুর্নিশ করে বলে উঠলেন, ‘আজ হতে চিরউন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির/ সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’ এ গল্প ইতিহাসনির্ভর কি না বলতে পারব না; তবে এটা ঘটনা না গল্প তা তত জরুরি নয়, তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই কবিতার কাহিনিতে শিক্ষাগুরুর মর্যাদাকে কালজয়ী করেছেন কবি কাজী কাদের নওয়াজ।
সত্যিই কি শিক্ষকের মর্যাদা ‘কালজয়ী’ হয়েছে? নাকি আজ এই ঘোর কলিকালে সে-মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত! এই কবিতায় বর্ণিত ঘটনার ঠিক উল্টোটাই সম্প্রতি ঘটতে দেখলাম আমরা। ঘটনাটা বাঁকুড়া জেলার ইন্দাসের কুশমুন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের। সেখানে এক শিক্ষক যখন ক্লাসে ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন তখন সেখানে এলাকার বিধায়ক এসে উপস্থিত। বলা নেই, কওয়া নেই– তিনি একেবারে সটান ক্লাসে গিয়ে হাজির। শিক্ষকের পড়ানো থামিয়ে দিয়ে একঘর ছাত্রের সামনে তিনি দস্তুরমতো কৈফিয়ত তলব করলেন, ক্লাস কেন এত নোংরা? শিক্ষক প্রথমে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিধায়ক সেকথা শুনতে নারাজ। তখন শিক্ষক দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর নিজের দায়িত্ব আর কর্তব্যের কথা বললেন বিধায়ককে। জানালেন, তাঁর কাজ ছাত্রদের পড়ানো আর বিধায়ক সেকাজে বাধা দিয়েছেন ক্লাসে ঢুকে পড়ে। তাতে শিক্ষকের মর্যাদাহানি হয়েছে।

প্রশ্নটা শুধু একজন শিক্ষক আর বিধায়কের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়। এ হল, ক্ষমতার ঔদ্ধত্যকে প্রশ্ন করা, চোখে চোখ রেখে অধিকারের কথা বলা। হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সঙ আর ব্যক্তিত্বহীন মানুষের ভিড়ে এমন শিক্ষকও তাহলে এখনও আছেন এ রাজ্যে! শিক্ষককে ক্লাস পরিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়ার গোলমালে যে জরুরি কথাটা হারিয়ে গেল তা হল স্কুলে কোনও সাফাইকর্মী নেই, নেই কোনও চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। সেই নেই-রাজ্যের কথাই তো বলার কথা বিধায়কের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টি না করে তাঁর তো একথা বলার কথা রাজ্যের বিধানসভায়। আইনসভায় আলোচনা করার জন্য তিনি নির্বাচিত। স্কুলে পড়া নষ্ট করার জন্য তো আর তাঁকে মানুষ বিধায়ক করেনি! প্রশ্ন হল, আমরা কি নিজের নিজের কাজের পরিধিটা জানি?
সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার কথা মনে পড়ে। হীরক-রাজা বসে আছেন রাজদরবারে। পেয়াদা একজনকে বেঁধে নিয়ে এসে জানাল যে সে গান করছিল। রাজা তাকে বললেন গান শোনাতে। সে শুরু করল তার গান, ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়…’। গান শুনে রাজা তো তাল দিতে লাগলেন; তাঁর তাল কাটল যখন সেই গায়ক গেয়ে উঠলেন, ‘দেখো ভাল জনে রইল ভাঙা ঘরে, মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে…’! সোনার ফসল ফলানো কৃষকের দু’বেলা আহার না-জোটার কথা বা হিরের খনির মজুর হয়ে কানাকড়ি না-থাকার কথাই বা রাজা সহ্য করবেন কী করে! তিনি থামিয়ে দিলেন সেই গান। বললেন, গায়ককে জঙ্গলে গর্তে ফেলে দিয়ে আসতে।

রাজা কীসের কাজ করলেন? গান শুনে গানের বিষয় বিচার করে গান থামানোর আদেশ দিলেন তিনি। কী হবে রাজদ্রোহী গান গাওয়ার শাস্তি? তা তো লেখা থাকার কথা আইনে। কিন্তু এখানে রাজা নিজেই আইন তৈরি করে গায়ককে বনে নির্বাসনে পাঠানোর কথা বলে দিলেন। (মনে রাখতে হবে, তখনও হীরকরাজের বৈজ্ঞানিক মগজধোলাই যন্ত্র উদ্ভাবন করেননি।) রাজপেয়াদারা ছুটল সেই আদেশকে কার্যকর করতে। অর্থাৎ, তা হল শাসনের কাজ। খেয়াল করে দেখুন, রাজসিংহাসনে বসে রাজা একইসঙ্গে করলেন বিচার, আইন আর শাসনের কাজ। অর্থাৎ, যা-ইচ্ছে-তাই করলেন তিনি। এই যা-ইচ্ছে-তাই তো যাচ্ছেতাই একটা ব্যাপার। আর তা আটকানোর জন্যই তো এই গণতন্ত্র যা আইন, শাসন, বিচারের ক্ষমতাকে আলাদা করে। করে তো বলছি কিন্তু চারদিকে তাকালে তা কি বলতে পারছি? বিচারকেরা নানা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করছেন কারণ আইনের শাসন চলছে না।
ইন্দাসে যিনি এই ঘটনা ঘটালেন তিনি রাজ্যের বিধায়ক। তাঁর দল আলমগীরকে কোনও ক্ষেত্রেই মহান উদার বাদশাহ হিসেবে স্বীকার করে না। তারা তো পাঠক্রম থেকে মুঘল ইতিহাসই বাদ দিয়ে দেওয়ার পক্ষে। তবে এটাও ভুললে চলবে না যে, শিক্ষকের অমর্যাদা সকলেই করে চলেছেন। এক বিধায়ক একটি কলেজের টিচার্সরুমে শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুড়ে মেরেছিলেন, তা ভুলে যাননি নিশ্চয়ই। আর এটাও নিশ্চয়ই মনে আছে যে, তার আগের শাসকের দীর্ঘ শাসনের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল তপন সিংহের ‘আতঙ্ক’ সিনেমা, যেখানে আমরা দেখেছিলাম ক্ষমতার চোখরাঙানিকে আর শুনেছিলাম সেই ভয়ালবাণী– ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি।’

অথচ শিক্ষাগুরুর শির উচ্চে তুলে ধরার ঘটনাও একসময় ঘটেছে বইকি। পাঁচের দশকে, হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায় তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর পদাধিকার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন হচ্ছে। সেখানে দীক্ষান্ত ভাষণ দিতে এসেছেন ঐতিহাসিক স্যর যদুনাথ সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি অনুযায়ী মঞ্চে প্রথমে উঠবেন আচার্য, তারপর উপাচার্য এবং অন্যরা। কিন্তু বেঁকে বসলেন আচার্য। বললেন, যদুনাথ তাঁর শিক্ষাগুরু আর শিক্ষকের আগে তিনি মঞ্চে উঠবেন না। তাঁকে প্রোটোকলের কথা বলা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘যে আইন ছাত্রকে শিক্ষাগুরুর আগে যেতে বলে সে-আইন আমি মানি না!’
তে হি নো দিবসাঃ গতাঃ!
…………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved