
‘হিমালয় শীর্ষে আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, কিন্তু আপনার আসল উচ্চতা কত?’ এমনই উদ্ভট প্রশ্ন করেছিলেন শংকর, স্বয়ং সত্যজিৎকে। চলচ্চিত্রচর্চার বাইরে গিয়ে সত্যজিৎকে খানিকটা ভেতর থেকে, কাছ থেকে দেখার আগ্রহ সেই সাক্ষাৎকার জুড়ে। শংকরের ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন-অরণ্য’ নিয়ে ছবি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে সত্যজিতের শংকর নিয়ে দু’-চার কথা।
মানুষটি বড় খাঁটি এবং স্নেহপ্রবণ।
শংকরের গল্প নিয়ে দু’টি ছবি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ‘জন-অরণ্য’ আর ‘সীমাবদ্ধ’। ছবি হওয়ার আগে দুটো উপন্যাসই আমার পড়া ছিল। যেটা বিস্মিত করেছিল উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্যে পরিবর্তনের সময় অত্যাশ্চর্য বদল। যত দিন গিয়েছে– সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের দ্বন্দ্ব ও মিল নিয়ে আলোচনায় সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য রচনার দক্ষতা নিয়ে একমত হয়েছি আমরা। চিত্রনাট্য রচনা করার আগে সত্যজিৎ রায় লেখককে ডেকে এনে, তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে জেনে নিতেন ডিটেলসের খুঁটিনাটি। লেখক যেমন বিভিন্ন মহল থেকে তিলে তিলে তথ্য সংগ্রহ করে উপন্যাস লিখতে বসেন, তেমনই চলচ্চিত্রকাররাও উপন্যাসটিকে কড়া সমালোচকের দৃষ্টিতে পড়েন। যে অভাবগুলো উপন্যাসে থাকে, সেগুলো পূরণ করতে করতেই এগিয়ে চলে চিত্রনাট্য। আমরা সত্যজিৎ-ভক্ত আঁতেলের দল টিপ্পনি কাটতাম, লেখক ছবি দু’টি দেখে, বিশেষ করে ‘সীমাবদ্ধ’, উপন্যাসটি লিখলে অনেক উন্নতমানের হত। বলা বাহুল্য, এটা নিছকই রসিকতা মাত্র।

পরবর্তীকালে শংকর বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়কে কেন্দ্র করে। তার মধ্যে কয়েকটি ছিল, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন-অরণ্য’ ছবি করার আগে লেখকের সঙ্গে আলোচনা। দু’টি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, সত্যজিৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সীমাবদ্ধ’ নামটা আপনার মাথায় কীভাবে এসেছিল? আরেকটি প্রশ্ন ছিল যে ‘সীমাবদ্ধ’-র ইংরেজি নাম কী হবে! জেনে নিয়েছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের কার্যাবলির খুঁটিনাটি।

তবে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শংকরের শ্রদ্ধা কতটা ছিল, সেটা মানিকদা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি লেখা ও সাক্ষাৎকারে খুঁজে পাওয়া যায়। সাক্ষাৎকারগুলিতে সাহিত্য বা চলচ্চিত্র ছাড়াও একটু বিষয়ে আলোচনা চলছিল কিছু প্রশ্ন ছিল যা আগে কখনও কেউ করতে সাহস করেনি। যেমন শংকর নিজেই লিখেছেন, ‘লালমোহন গাঙ্গুলি স্টাইলেই আমার প্রথম কঠিন প্রশ্ন– হিমালয় শীর্ষে আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, কিন্তু আপনার আসল উচ্চতা কত?’ কিংবা পরের প্রশ্ন: আপনার জন্ম কবে, কখন, কোথায়? সত্যজিৎ স্মিত হেসে জবাব দেন, তাঁর জন্ম ভোররাতে, ইংরেজি মতে সোমবার ২ মে, বাংলা মতে, রবিবার– ১৯ বৈশাখ। কিংবা তাঁর মা,সুপ্রভা রায় প্রসঙ্গে সত্যজিৎ জানাচ্ছেন, গানকে ভালোবাসা আর কাজকে ভালোবাসা– এ দুটোই মা আমাকে দিয়েছেন।
মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে সত্যজিৎ প্রিয় বিষয় নিয়ে জানাচ্ছেন, ‘আমার প্রিয় খাবার অড়হর ডাল আর সোনা মুগের ডাল। আগে মুরগি খুব খেতাম, এখন গা সওয়া। সপ্তাহে একদিন। ভালো ইলিশ কিংবা ভালো রুই। তবে ভেটকি মাছের ফ্রাই আলাদা একটা ব্যাপার। সবজির ভক্ত নই, বড় জোর কড়াইশুটি। মিষ্টি বলতে বর্ধমানের মিহিদানা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, জয়নগরের মোয়া, রাজস্থানের জিলিপি। নতুন গুড়ের সন্দেশ, সে সবাই জানে। বোথ কড়া অ্যান্ড নরম পাক। দই ভালো লাগে আর ভালো লাগে ছানার গজা।একটা জিনিস আজকাল পাই না, বোধহয় উঠে গিয়েছে– মুগের নাড়ু।’

এই খাবারের বিষয়টা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল, শংকরের সঙ্গে আমার দু’-একবার দেখা হওয়া প্রসঙ্গে। ১৯৮৩-’৮৪ সাল হবে। রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে, ডানলপের দফতরে তাঁর অফিসে।
প্রথম সাক্ষাতেই মনে হয়েছিল, মানুষটি বড় খাঁটি এবং স্নেহপ্রবণ। একই সঙ্গে আড্ডাবাজ। তাঁর কথাতেই জানতে পেরেছিলাম, ‘শংকর’ নামটা তাঁর ডাকনাম। বাড়িতে মা ওই নামে ডাকতেন। লেখার চর্চা ছিল ছোটবেলা থেকেই। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন খ্যাতনামা নাট্যকার। কলেজে পড়াকালীন তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশ পেয়েছিল ‘দৈনিক বসুমতী’তে। আর্থিক অনটনের সংসার চালাতে কি না করেছেন! সাবান বিক্রির ফেরিওয়ালা থেকে রেলের অফিসের রিপোর্টারের চাকরি।

তখন দুপুর দুটো-আড়াইটে হবে। শংকর বললেন, ‘এখন আমার টিফিন টাইম। বাদশার রোল অর্ডার দেব। আপনারা খাবেন?’
আমরা সম্মতি জানাতে, উনি পিয়নকে ডেকে কিছু বললেন। পিয়ন চলে যেতে আমাদের জানালেন, ‘এই যে আপনাদের অফার করলাম, এটা কার কাছ থেকে শিখেছি জানেন! আমার প্রথম বস্, মিস্টার বারওয়েলের কাছ থেকে।’
পিয়ন রোল এনে এক থালাতে সাজিয়ে দিলেন। আমরা একটি করে তুলে নিলাম। উনি এক এক করে খুব তৃপ্তি করে চারটি রোল খেলেন। বুঝতে পারলাম, এই কর্পোরেট অফিসের পরিশ্রমী চাকরির পরেও এত বিশাল মাপের সাহিত্য রচনার ক্ষমতা কোথা থেকে আসে!
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন দেবাশিস মুখোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved