films against war became heart of 98th oscar ceremony। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পৃথিবীর স্বীকৃতি মিলল অস্কারে

সামরিক শাসনের ট্রমা লাতিন আমেরিকায় কেবল অতীতের বিষয় নয়, বরং বোলসোনারো-হাভিয়ের মিলেইদের যুগে তা রীতিমতো বর্তমান এক বিপদ। তদুপরি ব্রাজিল তার সামরিক শাসকদের বিচার করতে পারেনি কোনওদিনই, যা আর্জেন্টিনা করেছে। এই না-হওয়া বিচারের জগদ্দল পাথর ব্যক্তি-মানুষের আচমকা সন্ত্রাসে বিস্ফারিত হয় ফিলিওর প্রায় সব ছবিতে। ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ ছবিতে অতীতের সবকিছুই ছাপিয়ে গিয়েছেন ফিলিও। ১৯৭৫ এর ‘জস’ এর মতো এক ক্লাসিক ‘মার্কিন’ হররের সঙ্গে এ-ছবির সংলাপ এবং মার্কিন সমর্থনধন্য সামরিক শাসনের নানা আক্রমণ, অ্যাবসার্ড ও কুহক-বাস্তবের চেহারায় ফিরে আসা তার প্রমাণ।

শেষ আপডেট: মার্চ ২০, ২০২৬, ১৪:৪৯   
Facebook WhatsApp Messenger

এবারের অ্যাকাডেমি পুরস্কারের বা চলতি কথায় অস্কারের, আন্তর্জাতিক ছবিগুলির তালিকায় চোখ বুলিয়ে নিলে একটা চেনা পথ ধরা পড়তে পারে। দীর্ঘকাল, ২০২০-র আগে পর্যন্ত, এই পুরস্কারের নাম ছিল ‘শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার ছবি’, এখনও যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বেশ কিছু ফিল্ম পুরস্কারের এই নাম বহাল আছে। ফরাসি পরিচালক লিওস কারাক্স একবার এই বিষয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন, যা বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে।

zoom
ফরাসি পরিচালক লিওস কারাক্স

যুক্তরাষ্ট্রে এটা অস্বাভাবিক নয়। ও দেশে নাগরিক বাদে সবাইকেই সরকারিভাবে যে তকমা দেওয়া হয়ে থাকে, তা হল এলিয়েন! এই আন্তর্জাতিক ছবির পুরস্কারের শেষ পাঁচ মনোনীত ছবি এবং তা থেকে বেছে নেওয়া একটি ছবি মোটের ওপর আন্তর্জাতিক বৃহৎ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সার্কিট থেকেই আসে, তাদের প্রচারের একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকে, বৃহৎ ফেস্টিভ্যালের পুরস্কার তাদের প্রতিযোগিতায় কিছুটা এগিয়ে রাখে। মোটামুটি গত এক-দেড় দশক ধরে ‘গ্লোবাল আর্ট সিনেমা’ নামক যে ধারণাটির পুনরাবির্ভাব দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে কৃত্রিমতা বেশ অনেকটাই, তার পদচিহ্ন এই পুরস্কারের শ্রেণিবিভাজনে স্পষ্ট। আবার এই গ্লোবালের ধারণা যে ন্যাশনাল সিনেমা থেকে আলাদা, ন্যাশনাল সিনেমা বলে আদৌ কিছু আর অস্তিত্ববান কি না, এই বিবিধ আন্তর্জাতিক কো-প্রোডাকশনের যুগে (যা ইউরোপে চলে আসছে আরও অনেক আগে থেকেই), সেসব তর্কও ওঠে বইকি। পুরস্কার অবশ্য এখানে দেশভিত্তিক নমিনিকেই দেওয়া হয়ে থাকে, যদিও সে-দেশ পরিচালকের স্বদেশ হতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।

এবারের পুরস্কারে যেমন জাফর পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’-কে মনোনীত করা হয়েছে ফ্রান্সের এন্ট্রি হিসেবে। নিজ দেশে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে পানাহির সম্পর্কের চড়াই-উতরাই, গ্রেফতার-গৃহবন্দিত্ব, ছবি বানানোর ওপরে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি অজানা নয় কারওর। এই ছবিটিও ইরানে লুকিয়ে তোলা। তারপর কান-এ এটি শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পায়। যেটা কৌতূহলের বিষয়, তা হল, এবারের আন্তর্জাতিক ছবি বিভাগের প্রায় সবক’টি ছবিই নানাবিধ স্বৈরশাসন বা যুদ্ধ পরিস্থিতি, আগ্রাসন, তৎপ্রসূত দুঃসহ ব্যক্তি-স্মৃতি ও ট্রমাকে উপজীব্য করেছে। প্রায় বলছি, কেন-না অলিভার ল্যাক্সের ‘সিরাত’ এই তালিকায় একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।

এই ছবির শব্দসজ্জা, প্রথিতযশা ইলেকট্রনিক মিউজিক-শিল্পীর তত্ত্বাবধানে যা গড়ে উঠেছে এবং এর ল্যান্ডস্কেপ ব্যবহার, নানাবিধ সিনে-জঁরের নানা উপাদান মিশ্রণ, একে একটি অন্য অভিজ্ঞতার পথে নিয়ে গিয়েছে। যদিও এ-ছবিতেও কোনও এক অজ্ঞাত সশস্ত্র সংঘাতের অবশেষের মতো ছড়িয়ে থাকে ল্যান্ডমাইন। ছবিটির প্রতীকী অবস্থান একে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। পরিচালকের ইসলামী থিওলজিক্যাল উৎসাহ তার অন্যতম কারণ, যা ছবির নামেও স্পষ্ট।

বাকি ছবিগুলি, যার মধ্যে তিউনিশিয়ার ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ এখনও দেখিনি, কীভাবে একটি অপরটির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে, তা বলেছি। কিন্তু এই জোড়ের দাগ থেকেই ফাটল তৈরি হয়, আর তারা একে অপরের থেকে সরে যেতে থাকে। কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকতা থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চান, তার কারণ বিতর্ক এড়ানো। তাই এই ইরান যুদ্ধের মধ্যে ইরানিয়ান রেজিমের সঙ্গে নিয়ত দ্বন্দ্বে জড়ানো পানাহি বা গাজার অবরুদ্ধ শিশু হিন্দ রজবের কাহিনি অপুরস্কৃত থেকে গিয়েছে।

zoom
‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’-এর একটি দৃশ্য

ঠিক এই জায়গা থেকেই ছবিগুলির আলোচনা কিছুটা গতি পেতে পারে। পানাহির দীর্ঘ ও অতি-সফল কেরিয়ারে বর্তমান ছবিটি আমার দুর্বলতম মনে হয়েছে। এমনিতেও যাঁকে একসময় ইরানের ‘নবতরঙ্গ’ বলা হত, তা আজ আর ছবির দুনিয়ায় তেমন কোনও জায়গা নিয়ে নেই। ফেস্টিভ্যাল সার্কিটের পুরস্কারের রাজনীতির বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে, যে ধরনের প্রতিশ্রুতি পানাহির ছবি একদা রাখত, বিশেষ করে তাঁর কাহিনি-হীনতা এবং ছবি বানানোয় নিষেধাজ্ঞার পরে তিনি যে-সব বিপজ্জনক প্রস্তাব আমাদের সামনে রাখছিলেন, তা প্রায় এখন সবই অতীত, সবই ভস্মাবশেষ।

এইসব বিপজ্জনক প্রস্তাবের অন্যতম ছিল ছবির কথকতা। ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’-এ পানাহি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি ছবি তিনি ‘ন্যারেট’ করেই দর্শকের সঙ্গে সংলাপে জড়াতে পারেন, তাহলে আর ছবি ‘বানানো’ কেন? ছবির পর ছবিতে এই কথককে পানাহি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি এক দোলাচলের জায়গায় রাখেন, ‘ক্লোজড কার্টেন’-এ যেমন ছবির আপাত-কাহিনি হঠাৎ করেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানের ছবিটি এইসব কিছু থেকে সরে আসে এবং তার ভায়োলেন্স ও ট্রমার কথন দর্শককে চির-চেনা ন্যারেটিভের মধ্যেই দাঁড় করায়, আশ্বস্ত করে। তাঁর অতীতের কাজ ‘ক্রিমসন গোল্ড’-এর মতো আপাত পরিচিত কাহিনিরূপ সত্ত্বেও সরলরৈখিক চলন বর্জন এখানে দেখা যায় না।

zoom
জাফর পানাহির ‘ক্রিমসন গোল্ড’

নরওয়েজিয়ান পরিচালক জোয়াকিম ত্রিয়েরের অন্যান্য ছবির মতোই ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ও ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে বেশ সফল ছবি, তাঁর সবচেয়ে সফল ছবি বলাই ভালো। এ ছবিতেও রয়েছেন তাঁর পরিচিত অভিনেতাদের কয়েকজন।

তাঁর নানা ছবির বিষয়বৈচিত্র আকর্ষক, ছবির নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াটির ওপরে তাঁর দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণের নজির ছড়িয়ে থাকে। তাঁর ছবি সর্বার্থে ও সদর্থে ইউরোপীয় ছবি এবং তার কারণ শুধুই অর্থনৈতিক নয়, শুধুই সামগ্রিক মহাদেশীয় ফান্ডিং ও ডিস্ট্রিবিউশন নয়, যদিও সেটাও একটা কারণ, যে কারণে কেউ কেউ ইউরোপে নির্দিষ্ট ন্যাশনাল সিনেমার উপস্থিতি সম্পর্কেই সন্দিহান। ত্রিয়েরের এই ছবি তাঁর ক্যাননিক্যাল ইউরোপীয় পূর্বসূরিদের মাঝে মাঝেই মনে পড়ায়, গুস্তাভ বর্গ কি বার্গম্যানের আইজাক বর্গেরই উত্তরাধিকারী নন? কিন্তু সমকাল তাঁদের বিশেষ রসদ যোগায় না, তাই দুঃস্মৃতি ও ট্রমার বয়ান নির্মাণ ফিরিয়ে নিয়ে যায় নাৎসি অতীতে। এর কারণ এও কি নয় যে, ত্রিয়েরের চেনা ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে নতুন রুশ জার থাবা গেড়ে বসে রয়েছেন ২০২২ থেকে? অন্তত তাঁরা সেইরকমই মনে করছেন!

zoom
পরিচালক জোয়াকিম ত্রিয়ের

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র পুরস্কারপ্রাপ্তি তাই অস্কারের পক্ষে নিরাপদতম বলেই মনে হয়। সুনির্মিত এ-ছবি অবশ্যই হাঁটতে পারত অন্য নানা রাস্তায়, নানাবিধ মিডিয়া ফর্মের উপস্থিতি এ-ছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে ইঙ্গিত হয়ে। রয়েছে থিয়েটার এবং তৎসহ ইবসেন ও চেখভ, রয়েছে ডিভিডির মতো প্রায় অতীত মিডিয়া ফর্ম এবং পুরনো ইউরোপের পরিচালকের আজকের ভিওডি (বা দেশের ভাষায় ওটিটি) প্ল্যাটফর্মের সম্রাট নেটফ্লিক্সের পাল্লায় পড়ে হাঁসফাঁস দশা। কিন্তু এইসবই এ-ছবির বহিরঙ্গে থেকে গিয়েছে, যাকে আমরা সিনেমা ও মিডিয়া চর্চার ভাষায় বলি, ‘ইন্টারমিডিয়ালিটি’ বা বিভিন্ন মিডিয়া ফর্মের আন্তঃসম্পর্ক, তা এ-ছবিতে উন্মোচিত হয় না বিশেষ। দৃশ্য এবং শ্রাব্যসুখ ছাড়া ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ তেমন কিছুই তাই অফার করে না তার দর্শককে।

এবং, বিনা দ্বিধায় বলা চলে, আপাত-অতীতচারী হয়েও এই লাইন-আপের সবচেয়ে বিপজ্জনক ছবি অবশ্যই ক্লেবের মেনডোংসা ফিলিও-র ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’। আমরা, যারা ওঁর ছবি বহুদিন ধরে দেখছি, তাদের কাছে ওঁর বিপজ্জনক সব চলন, আপাত অসম্ভাব্যতা, মানুষ আর না-মানুষী বিশ্বের সংলাপ (সে ‘অ্যাকোয়ারিয়াস’-এর ঘুণপোকারা হোক, বা এই ছবির মৃত বা অদেখা হাঙর), আচম্বিতে ঘাই মেরে ওঠা কুহক-বাস্তব, যা একদা ওই মহাদেশের অভিজ্ঞান ছিল, এসবই কতকালের চেনা।

এই ছবির একটি প্রস্তুতিপর্ব আছে, ফিলিও ওঁর দেশ ও শহর Recife-এর অতীত নিয়ে বানানো নন-ফিকশন ছবিটির সময় সে-প্রস্তুতি সেরে রাখছিলেন। সামরিক শাসনের ট্রমা এই মহাদেশে কেবল অতীতের বিষয় নয়, বরং বোলসোনারো-হাভিয়ের মিলেইদের যুগে তা রীতিমতো বর্তমান এক বিপদ। তদুপরি ব্রাজিল তার সামরিক শাসকদের বিচার করতে পারেনি কোনওদিনই, যা আর্জেন্টিনা করেছে। এই না-হওয়া বিচারের জগদ্দল পাথর ব্যক্তি-মানুষের আচমকা সন্ত্রাসে বিস্ফারিত হয় ফিলিওর প্রায় সব ছবিতে। এই ছবিতে অতীতের সবকিছুই ছাপিয়ে গিয়েছেন ফিলিও। ১৯৭৫ এর ‘জস’ এর মতো এক ক্লাসিক ‘মার্কিন’ হররের সঙ্গে এ-ছবির সংলাপ এবং মার্কিন সমর্থনধন্য সামরিক শাসনের নানা আক্রমণ, অ্যাবসার্ড ও কুহক-বাস্তবের চেহারায় ফিরে আসা তার প্রমাণ। এ-ছবি বস্তুত একটি আলাদা নিবন্ধের দাবি রাখে।

zoom
‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র নাৎসিদীর্ণ সময়ের রোমন্থনের পাশে ফিলিওর ছবিটি রাখলে একটা অন্য ঘটনা মনে পড়ে যায়, যার কথা ফরাসি সিনেমার ইতিহাসকার ও বন্ধু ড্যানিয়েল ফেয়ারফ্যাক্স তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত দু’খণ্ডের ‘কাইয়ে দ্যু’ সিনেমার অতিকায় ইতিহাসে লিখেছেন।

zoom
ফরাসি ফিল্মতাত্ত্বিক সিলভি পিয়ের

ফরাসি ফিল্মতাত্ত্বিক সিলভি পিয়ের ১৯৬৮-র পরের ফ্রান্সকে হতাশাজনক এবং ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী মনে করে ব্রাজিলে চলে গিয়েছিলেন। রিও ডি জেনেইরোর সিনেমার ক্লাসে আইজেনস্টাইনের ছবি দেখিয়ে উঠতেই, এক বন্ধু তাঁকে সাবধান করে বলে গিয়েছিলেন, প্রতি ক্লাসে সামরিক প্রশাসনের গোয়েন্দা/সিক্রেট পুলিশ ছদ্মবেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ফ্রান্সকে কর্তৃত্ববাদী মনে করা সিলভি পিয়ের তাঁর নিজের বয়ানেই মেরুদণ্ডে আবিষ্কার করেছিলেন এক ঠান্ডাস্রোত। ত্রিয়ের এবং ফিলিওর অতীত এবং বর্তমানকে এমন করে পাশাপাশি সাজিয়ে দেওয়ার জন্যও এবারের অস্কার কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।

Crimson Gold It was just an accident Jafar Panahi Joachim Trier Kleber Mendonça Filho Leos Carax Oliver Laxe Oscar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sentimental Value Sirat The Secret Agent This is not a film

Share this article on