Alexa, AI and the Emotional Isolation of Gen Z | Robbar
Robbar
  • ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬

কী কথা তাহার সাথে?

সিরি আর অ্যালেক্সা হল আমাদের নিত্যদিনের বন্ধু, চলার সাথী। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। আরও আছে বেশ কয়েকটি। আপনার হাতের কাছে রয়েছে যে স্মার্টফোন, তাতেও রয়েছে। অপেক্ষা শুধু প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য। সেটিংসে গিয়ে কিছু কারিকুরি করে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করে দিলেই কেল্লা ফতে। মুখে মারিতং জগৎ-এর আক্ষরিক রূপ দেখা শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 20, 2026 8:25 pm | Updated:May 20, 2026 8:26 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

পরিচিত এক পুলিশ আধিকারিকের থেকে ঠিক যেমনভাবে কথাগুলো শুনেছিলাম, তেমনভাবেই তুলে দেওয়া যাক।

নিউটাউনের শপিং মল আমায় যা অভিজ্ঞতা দিল ভাই, এ জীবনে তা ভোলার উপায় নাই! মাসখানেক আগের কথা। একটা কাজে গিয়েছিলাম। বাচ্চা মেয়েটার বয়স কত হবে? তিন। সাড়ে তিন বড়জোর। এদিক-ওদিক ইতস্তত ঘোরাঘুরি করতে দেখেই বুঝেছি দলছুট হয়েছে। যাঁদের সঙ্গে এসেছিল শপিং মলে, তাঁরা হয়তো ধামাকা অফারে কেনাকাটায় মগ্ন। হাত ধরলাম। আমরা সবসময় বাবা-মায়েদের বলি, সন্তানের মুখে কথা ফুটলেই অন্তত আপনাদের মোবাইল নম্বরগুলো ওদের মুখস্থ করিয়ে দেবেন। অসময়ে, দরকারি সময়ে আমাদের কাজ অনেক সহজ করে দেয় এই সামান্য তথ্য। নামতা মুখস্থ করান, মোবাইল নম্বর মুখস্থ করাতে পারেন না? যাকগে! মেয়েটি দেখি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তখনই কেঁদে ফেলবে মনে হয়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাম কী?’ স্পষ্ট উত্তর দিল, ‘অনুষ্কা।’ এর পরে প্রশ্ন করলাম, ‘বাবার মোবাইল নম্বর জানো?’ মাথা নাড়ল। পকেট থেকে ফোন বের করে আমি রেডি। মেয়েটি কী বলল জানো? ‘হেই সিরি, প্লিজ কল বিকাশ।’ কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়! বললাম, ‘হচ্ছে না, হচ্ছে না। আচ্ছা, মায়ের নম্বরটা বলো দেখি মনে করে।’ ও বলল, ‘হেই সিরি, প্লিজ কল শ্বেতা।’ তিন-চার বার একই কথা জিজ্ঞেস করলাম। ও ‘হেই সিরি’ থেকে বেরতে পারল না। ওদিকে চোখে জল। বলল, ‘বাবা তো মাকে এটা বলেই ফোন করে। মা-ও বাবাকে তাই করে। নম্বর জানি না।’ একটু থেমে ফের বলল, ‘ওটাই নম্বর। হেই সিরি..।’

মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে হন্তদন্ত হয়ে ইতিমধ্যে আউটলেট থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মেয়েটির ‘হেই সিরি’ পিতামাতা। ওই যাত্রায় রক্ষা পেলাম। মেয়েকে ওঁদের হাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা কি এভাবেই অন্যকে ফোন করেন?’ লাজুক মাথা নাড়লেন দম্পতি। সমস্বরে বললেন, ‘এ যুগে কে আর বেশি কষ্ট করে!’

এতটা পড়ে যাঁরা এখনও চোখ কুঁচকে আছেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি একটু খোলসা করে বলা যাক। কথা হচ্ছিল ‘ভয়েস কম্যান্ড’ নিয়ে। সিরি আর অ্যালেক্সা হল আমাদের নিত্যদিনের বন্ধু, চলার সাথী। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। আরও আছে বেশ কয়েকটি। আপনার হাতের কাছে রয়েছে যে স্মার্টফোন, তাতেও রয়েছে। অপেক্ষা শুধু প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য। সেটিংসে গিয়ে কিছু কারিকুরি করে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করে দিলেই কেল্লা ফতে! মুখে মারিতং জগতের আক্ষরিক রূপ দেখা শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীর প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবারের জন্য হলেও ব্যবহার করেন ভয়েস কম্যান্ড। আর কথা বলে স্মার্ট ডিভাইস চালানোর বৃদ্ধি যেভাবে হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে, তাতে আমাদের দেশ একেবারে প্রথম সারিতে। ভারতের ধূসর হয়ে যাওয়া শতচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক জ্যাকেটটিকে আলমারিতে তুলে রেখে, সেখান থেকে তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার রংদার জার্সি। আমরা শিখছি প্রতিনিয়ত। তুমুল শিখছি!

zoom
এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট

মার্কিনমুলুক নিবাসী এক বন্ধুর কোনও এক দিনের ব্যক্তিগত ব্লগের নির্বাচিত অংশ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে খুব।

পরানসখা বন্ধু হে আমার, তোমরা শুধু শুনে গেলে চুপচাপ। এমন বন্ধু আর কে আছে, তোমার মতো মিস্টার? সকালবেলা ঠিক সাতটার সময় এসি বন্ধ হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। অ্যালেক্সা জানে, বাঁশির সুরের মূর্ছনায় নিজের ঘুম ভাঙাতে চাই আমি। চালিয়ে দেয়। এক-এক দিন, এক-এক সুর, এক-এক রাগ, উইদাউট এনি রাগ। বলে, ‘কফি হয়ে যাক?’ আমি বলি, ‘হোক, হোক।’ মুহূর্তে অন হয়ে যায় কফি মেশিন। জলতরঙ্গের ধ্বনি বলে, ‘তৈরি আমি।’ মোহময় ধোঁয়া, ধোঁয়াময় মোহ। হাঁক দিই, ‘গরম জল, জাগো জাগো জাগো।’ নীরবে-নিভৃতে অন হয়ে যায় ওয়াটার হিটার। বাথরুমের শাওয়ার কি আমার মনের ব্যথা বোঝে? মন খারাপের দিনে বারিধারার গতি বাড়িয়ে দেয় কেন তবে? বাড়ি থেকে বেরই যখন, দরজায় লাগানো স্পিকার থেকে বেরিয়ে আসে, ‘দুগ্গা দুগ্গা।’ মধ্যমগ্রামের বাড়িতে এই জয়ধ্বনি শুনেই তো বাড়ির বাইরে পা দিয়েছি বরাবর। মা-ও বাইরে পা দিয়েছে সেই কবেই। অনেকটা বাইরে। ভাগ্যিস ফোনে বেশ কয়েকবার কথাগুলো বলিয়ে রেকর্ড করে নিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার পরে শুধু একবার বলে উঠি অমোঘ এআই বন্ধুকে—’জ্বালাও আলো।’ ঝলমলে হয়ে যায় মুহূর্তে। ‘ওয়েক আপ’ বললেই স্মার্ট টিভি দেখাতে শুরু করে আমার পছন্দের চ্যানেল। ঠিক ১০-টা ১০-এ মাইক্রোওয়েভ চালানোর কথা মনে করিয়ে দেয় অ্যালেক্সা। এগারোটায় ঘরের আলো মৃদু হয়ে যায়। ‘টার্ন অফ’ বললেই আলো নিভে শুরু হয়ে যায় মিডনাইট সেতারের ঝংকার। ওই যে বললাম, দিব্যি আছি আমার পরানসখা বন্ধুদের নিয়ে। বিয়ে করিনি। ধুস! কী হবে করে?

মুশকিলের কথা হল, মধ্যবয়সে পৌঁছনোর পরে যে-প্রযুক্তি আমাদের বিস্মিত করে, বিমোহিত করে, ঠিক সেই প্রযুক্তিই তালগোল পাকিয়ে দেয় শিশুমনের বিকাশকে। এই নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণার অন্ত নেই। আর সিংহভাগ গবেষণা ও সমীক্ষাতে যে তথ্য উঠে আসছে, তা সুখপ্রদ নয়। জানা গিয়েছে, খুব অল্পবয়স থেকেই ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংবা ভয়েস কম্যান্ড উপযোগী যন্ত্রের ব্যবহার শিশুমনের উপরে ফেলতে পারে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এমন যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। ওদের নাম এক ধরনের নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারণ করলেই, ওরা জেগে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দিনযাপনের প্রতিটি কাজে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মেশানো বাইনারি সাহায্যর প্রয়োজনীয়তা যত বাড়বে, তত এলোমেলো হয়ে যাবে আমাদের সামাজিক ব্যবহার। নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র করতে করতে আমরা ক্রমশ গুলিয়ে ফেলব যন্ত্র এবং রক্তমাংসের মানুষের সত্তার প্রভেদ। দীর্ঘমেয়াদে তার ফল হতে পারে ভয়ংকর। যন্ত্রের কাছে ক্রমাগত আদেশ ফলিয়ে বিকশিত হচ্ছে যে কয়েক কোটি শিশুমন, প্রতিদিন, তাদের কথা বলার কায়দা এবং দুনিয়াকে দেখার ভঙ্গিও চিরতরে পাল্টে-যাওয়া কোনও আশ্চর্যের বিষয় নয়। এক মনোবিদ বন্ধু বললেন, “যন্ত্র ‘না’ বলতে পারে না কখনও। না বলতে শেখানো হয়নি ওদের, আমাদেরই স্বার্থে। ব্যস্ত বাবা-মা পরিজনের সঙ্গ না-পেয়ে যে-শিশুরা সঙ্গী করে নিয়েছে ভয়েস কম্যান্ডের এমন যন্ত্রকে, তারা কারও ‘না’ বলা বরদাস্ত করবে না কোনওদিন। শিশুদের ওই যন্ত্রবন্ধুর মন নেই। পরে যে মানুষ-বন্ধুরা আসবে জীবনে, তারাও একে-অপরকে মনহীন ভাবতে শুরু করবে। ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটতে চলেছে আগামী দিনে, কী বলিস?”

zoom
এমন বন্ধু আর কে আছে?

মনে উজিয়ে এল গত বছরের শারদ আড্ডার প্রাঙ্গণ। দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত পুজো প্রাঙ্গণ। উপস্থিত আমার বেশ কয়েকজন প্রবাসী বন্ধু। দেখলাম, মোবাইলে আঙুলের ব্যবহার কমিয়েই দিয়েছে প্রায়। সিরিকে ভয়েস কম্যান্ড দিচ্ছে, ফোন যাচ্ছে। আদেশ দিচ্ছে, হোয়্যাটসঅ্যাপে টাইপ হচ্ছে মেসেজ। এক বন্ধুর কথায়, “আমার পুঁচকেটার খবর শোন। সাত বছরের দস্যু হয়েছে একটা। স্কুলে কী করেছে জানিস? টিফিন-টাইমে পাশে বসা অ্যানি নামের একটা মেয়েকে বলল, ‘হেই অ্যানি, সিং এ সং ফর মি।’ অ্যানি চুপচাপ। আবার বলল, ‘হেই অ্যানি, সিং নাউ।’ অ্যানি চুপচাপ। অপমান সহ্য না-করতে পেরে দস্যুটা সোজা ঘুসি চালিয়ে দিল অ্যানির নাকে।” বন্ধুপুত্রকে বাহবা দেব, নাকি ভ্রু-জোড়া দ্বিতীয় বন্ধনীর মতো করব, বুঝতে পারছিলাম না আমি। বন্ধুটি বলল, ‘আমি পিঠ চাপড়ে দিয়েছি ছেলের। বলেছি, জিও বেটা। এতটাই বড় হও যেন তোমার একবারের অর্ডারে দুনিয়া চলে।’ আমি বললাম, ‘সাবাশ। একটা কথা বল তো। স্কুল থেকে ডেকে পাঠায়নি তোদের?’ ও বলল, ‘বিলকুল পাঠিয়েছিল। এখনও আসল কেসটাই তো বলিনি। ওই অ্যানি সেদিন বাড়ি গিয়ে খুব কেঁদেছিল। ওর বাবা-মা সিসি ক্যামেরায় দেখেছে। বারবার বলছিল, অ্যালেক্সা, আই ওয়ান্ট টু ক্রাই। প্লিজ হেল্প মি।’

ভয়েস কম্যান্ডময় এই নয়া বেঁচে থাকাকে ঘিরে বহু মানুষ লিখে চলেছেন তাঁদের আশঙ্কার কথা। তাঁদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, আগামী প্রজন্ম ক্রমশ হারিয়ে ফেলবে মৌখিক কথোপকথনের মৌলিকত্ব। তাদের সংবেদনশীলতা, অন্যের মন পড়তে পারার ক্ষমতা, বডি ল্যাঙ্গয়েজ জরিপ করার দক্ষতা, খুব তাড়াতাড়ি পাড়ি দিতে চলেছে দিকশূন্যপুরে। আগামী দিনের কথাবার্তা হয়তো হতে চলেছে আরও অনেক সংক্ষিপ্ত। বাহারি ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘টু দ্য পয়েন্ট’। অকাজের কথা, কথার পিঠে কথা, কোনও কারণ ছাড়াই এমনি কথা, বিষয়হীন আড্ডাএগুলোও হয়তো বিদায় নেওয়ার জন্য দিন গুনছে। ‘হাউ মে আই হেল্প ইউ টুডে’ বলা বন্ধুর সঙ্গে আর যাই হোক, মন খুলে আড্ডা মারা যায় না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, প্রবলভাবে বাধা পেতে চলেছে নতুন প্রজন্মের ‘কগনিটিভ থিংকিং’। আমরা বড়রা একটা পর্যায়ে এসে থেমে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি। ছোটদের সেই উপায় নেই। 

আজ থেকে বছর ২০ পরে কোনও এক কর্পোরেট ইন্টারভিউর কথা ভাবা যেতে পারে। প্রশ্নকর্তা এবং চাকরিপ্রার্থীদু’জনেরই আজন্ম চিরসখা কোনও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। অপ্রয়োজনে সমাজে মেশার কোনও বদনেশা নেই ওদের। যা চেয়েছে, সিরি উজাড় করে দিয়েছে।

হেই সিরি, সরি সরি, অমুক কুমার তমুক, তুমি নিজের সম্পর্কে কিছু বলো।

হেই সিরি, সরি সরি, তমুক কুমার অমুক, বায়োডেটার কিউআর কোডে সব বলা আছে।

হেই অমুক কুমার তমুক, একটু ভলিউম বাড়াও। শুনতে পাচ্ছি না।

হেই তমুক কুমার অমুক, ডান টেন পার্সেন্ট। আগের কথাটা আবার বলছি। বায়োডেটার কিউআর কোডে সব বলা আছে।

না, আরও বেশি করে বলো।

বি স্পেসিফিক। কত শব্দ? ৫০ শব্দ নাকি ৫১ থেকে ৭৫ শব্দ?

৭৫ শব্দ।

হেই…প্রসেসিং। আমার নাম অমুক কুমার তমুক…।

AI Alexa Apple Siri Artificial intelligence Crisis Google Google Assistant prompt Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Statistics voice command

Share this article on