Robbar

প্রিয়তম কেন, ইতি তোমার ব্যাট

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 15, 2026 8:33 pm
  • Updated:June 15, 2026 8:33 pm  

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে গিয়ে, তুমি খুঁজেছ বব মার্লের জন্মভিটে। বুঝতে চেয়েছ, বব মার্লের জীবন-দর্শন। যখন ভারতে এসেছ টেস্ট অধিনায়ক হয়ে, গল্প জুড়েছিলে দলাই লামার সঙ্গে। এ কোন অমোঘ যোগাযোগ সৃষ্টি করছিলে ক্রিকেটের সঙ্গে? উত্তরে বলেছিলে, ব্যাটিং ইজ জেন! ইটস অ্যা মাইন্ডসেট।

রোদ্দুর মিত্র

ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল স্কুলে। তুমুল হইহল্লায় মেতেছিল সকলে, তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই? অংশগ্রহণে, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিভাগের ছাত্রসকল। আমি দেখছিলাম, একজন ১২ বছর। তিন ম্যাচে তিন সেঞ্চুরি। ধারাবাহিক। এবং দলের প্রতিটি জয় বড় অনায়াস। কেমন একপেশে আর বিস্বাদ! স্মৃতি যদি প্রবঞ্চনা না-করে, টিমের শ্রেষ্ঠ বোলিং পারফর্ম্যান্সে ছিল: ১৩ বছরের ট্রেন্ট বোল্ট। টুর্নামেন্টে উইকেট-সংখ্যা: ১৪। গড়– প্রতি উইকেটে ৬ রান। 

পরবর্তী ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডার উল্টেপাল্টে দিলেন কোচ। সেই ১২ বছর ব্যাট করতে নামল ছ’নম্বরে। নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে, একজন টেলএন্ডার। ১০ নম্বর। ততক্ষণে পরাজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দল। সেই মুহূর্তে একটা সেঞ্চুরি, আবার। একটা অকল্পনীয় পার্টনারশিপ, বয়সোচিত নয়। একটা গলি তৈরি হয় ম্যাচ শেষে। তুমি বোধহয় দেখতে পেয়েছিলে, একা! যেখানে তোমার সতীর্থ, কোচ এবং কোচিং সদস্যদের বেশুমার হাততালি আর গর্বের ছটা। সেই গলিতে, তুমি হাঁটলে না প্রথমে। সামান্য থেমে এগিয়ে দিয়েছিলে, টেলএন্ডারকে। ইট জাস্ট ফিলস লাইক দ্য রাইট টাইম ফর মি টু স্টেপ অ্যাওয়ে। অবচেতনে কি গেঁথে যাচ্ছিল তখন থেকেই? 

কেন উইলিয়ামসন, অল্পবয়সে

তোমার উদ্দেশে সকলে উৎসুক প্রশ্ন করল, ‘কার মতো হতে চাও?’

উত্তরে বলেছিলে, ‘শচীন তেন্ডুলকর এবং রাহুল দ্রাবিড়।’

সেই গলি, প্রশস্ত হয় ধীরে। ১২, ১৩, ১৪… এভাবেই ১৭ বছর। মধ্যে ৪০টা ডোমেস্টিক সেঞ্চুরি। নিউজিল্যান্ডের অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হল তোমার নাম, কেন উইলিয়ামসন। সেমি-ফাইনালে, ভারতের কাছে হার। সেই ভারতীয় দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলি! সেই প্রথম সাক্ষাৎ! সেই থেকেই বোধহয় এক সময়গ্রন্থির ভেতরে প্রবেশ করলে। যাকে আমরা চিনেছি ‘ফ্যাব ফোর’ বলে। যুক্ত হয়েছেন, স্টিভ স্মিথ। জো রুট। বিরাট কোহলি। 

তারপর দেশে ফিরে, দীর্ঘক্ষণ নেট প্র্যাকটিস এবং কেন-সুলভ শট খেলছেন না কখনও কখনও। আশ্চর্য! কেন জানিয়েছিল, ‘নেটে ব্যাটিং করতে করতে, শচীন তেন্ডুলকরও এমন শট খেলে থাকেন। প্রায়শই।’ 

একটা ক্রিকেটীয় দর্শন। একটা বোধ। উল্লাস এবং প্রচারবিমুখ। কীভাবে তৈরি হয় একজন ক্রিকেটার? অফুরন্ত রান আর সেঞ্চুরি মানেই কি সে একজন ব্যাটসম্যান? জানি, পরিসংখ্যানই দিনশেষে নির্ধারণ কবে কে শ্রেষ্ঠ! তবু টেস্ট ক্রিকেটে প্রথমবার খেলতে নেমে, ২৯৯ বলে ১৩১। ভারতীয় উপমহাদেশের পিচ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিলকরত্নে দিলশান। বীরেন্দ্র শেহবাগ। ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম। ভয়ডরহীন ক্রিকেটের প্রতি তৈরি হচ্ছে ঝোঁক। তুমি সেই পথ বেছে নিলে না কেন? কেন ধ্রুপদী ক্রিকেট? সাদা পোশাক, লাল বল আর দ্রাবিড়ীয় দীক্ষা– তবু সবটুকু বলা হয় না। প্রথম বলেই আউট হয়েছ অনেক অনেক দিন। আমি জানি। তুমি একটি সাক্ষাৎকারে বললে, ‘শূন্য রানে আউট হওয়ার পরেও নিজের খেলার ধরন জটিল করে তুলিনি। নিজের মনে, মগজে এবং পেশির ভেতরে অহেতুক ধাক্কা মারিনি না কখনও। অন্যদের অনুকরণ করে খেলব, ভাবিনি। বরং, ফাঁকতালে গিটার শিখেছি!’ 

কেন এরকমই! স্থানু। ধ্যানমগ্ন। বুকের ভেতর একটা ধৈর্যের পাহাড়। বলেছিলেন তোমার কৈশোরের কোচ ডেভিড জনস্টোন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে গিয়ে, তুমি খুঁজেছ বব মার্লের জন্মভিটে। বুঝতে চেয়েছ, বব মার্লের জীবন-দর্শন। যখন ভারতে এসেছ টেস্ট অধিনায়ক হয়ে, গল্প জুড়েছিলে দলাই লামার সঙ্গে। এ কোন অমোঘ যোগাযোগ সৃষ্টি করছিলে ক্রিকেটের সঙ্গে? উত্তরে বলেছিলে, ব্যাটিং ইজ জেন! ইটস আ মাইন্ডসেট। আমাদের মনে পড়বে, বৌদ্ধ দর্শন। জেন, আদতে একটি চিনা শব্দ। অর্থ হয়, ধ্যান। কনসেন্ট্রেশন। মনের প্রশান্তি। 

আমার মনে পড়ছে, টেস্ট চ্যাম্পিয়ানশিপের ফাইনাল, ২০২১। সাউদাম্পটনে অনর্গল বৃষ্টি। ভিজে আউটফিল্ড। পিচ– বাউন্স এবং পেস-সহায়ক। সকলেই জানতেন, স্কোরবোর্ডে তুলনামূলক কম রান উঠবে। বল ব্যাটে আসবে না সহজে। দ্বিতীয় ইনিংসে যখন ব্যাট করতে নামলে, ম্যাচ গড়িয়েছে ষষ্ঠ দিনে। এ নেশন অন ইয়োর শোল্ডার। ৮৯ বলে ৫২ রানের একটা ইনিংস। প্রথম ইনিংসেও, ১৭৭ বল খেলে ৪৯। পরিসংখ্যান হিসেবে, ভীষণ অকিঞ্চিৎকর। কোনও রোয়াব নেই যে দু’টি ইনিংসে। বাঁ-কনুইয়ে চোট ছিল। সামনে যশপ্রীত বুমরাহ ছিলেন। তবু তোমার কনসেনট্রেশন ভাঙে না। আমার মনে পড়ে, অন্য কোনও দেশের দুপুরবেলা। স্কুলের মোজার ভেতরে পুরে রাখা ক্যাম্বিস বল। বারান্দা থেকে ঝুলছে। আর একজন ১২ বছর শ্যাডো প্র্যাকটিস করছে। 

তোমার নেতৃত্বে, নিউজিল্যান্ড পৌঁছল তিনটি আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনালে। জিতল প্রথম টেস্ট চ্যাম্পিয়ানশিপ। ২১ বছরে একটা আইসিসি ট্রফি। হর্ষ ভোগলে একটি সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মনে পড়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ২০১৯? আপনি টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হলেন, তবু ট্রফি নেই। ভাবলে কি দুঃখ হয়? ইচ্ছে করে, সকলকে তাড়িয়ে দিয়ে একা হয়ে যেতে? বলেছিলে, সেই দুঃখ গিলে নিতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু এ-ও ভেবেছিলাম, একটা-দুটো বিষাদের মুহূর্তের চেয়ে, আমাদের বিশ্বকাপের সমগ্র জার্নিটা বেশি ইন্টারেস্টিং। ভুল বলোনি। তোমার দর্শন থেকে সরে যাওনি। তারপরে সেই আশ্চর্য হাসি! ফাইনালে হেরে যাওয়ার পরে। ওভার বাউন্ডারির সংখ্যায়। আমার মনে পড়ল ভাস্কর চক্রবর্তীর গদ্যবই, শয়নযান। প্রথম গদ্য শুরু হয়েছে: 

“যদি না-জিততে পার তো জিতো না, কিন্তু তুমি হেরেও যেও না তা’বলে। এমন একটা মোলায়েম কথা নিজের মনে আওড়াতে আওড়াতে হাঁটছিলাম আমি। আমার মাথা আজকাল তেমন আর কাজ করে না। বড়ই মন্থর হয়ে এসেছে। তবুও বুঝতে পারছিলাম আমি, এক টুকরো হাসি ভেসে উঠল আমার মুখে, যখনই আবার মনে পড়ল কথাটা।”

ফাইনাল হারের পর, সেই আশ্চর্য হাসি

কেন, এরপরের লাইনেই ভাস্কর চক্রবর্তী কী লিখেছেন জানো? অমীমাংসিত খেলা। তারপর একটা জিজ্ঞাসাচিহ্ন।

তোমার আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের দিকে যদি তাকাই; টেস্ট ক্রিকেটে ৯৫১৫ রান। একদিনের ক্রিকেটে রান– ৭২৫৬। টি-টোয়েন্টিতে– ২৫৭৫। তিন ফর্ম্যাট মিলিয়ে, ১৯৩৪৬। অমীমাংসিত খেলা?

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজ। প্রথম টেস্টের পরেই অবসর ঘোষণা করলে। প্রায় ২৩ বছর পরে, সেই কথাগুলো শরীর পেল। ইট জাস্ট ফিলস লাইক দ্য রাইট টাইম ফর মি টু স্টেপ অ্যাওয়ে। সমস্ত ভালোই একদিন শেষ হয়ে যায়। ড্রেসিংরুমে রাচিন রাভিন্দ্রা। গ্লেন ফিলিপ্স। দুরন্ত খেলোয়াড়েরা তৈরি। শেষবার আউট হয়ে যখন প্যাভিলিয়নের পথে, লর্ডসের গ্যালারিতে ফিরে তাকালে কেন? কয়েক মুহূর্তের জন্য? তারপর নির্জন। একা। অ্যাবসোলিউট। 

তোমায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিন ফর্ম্যাটের ক্রিকেটেই আপনি কীভাবে অভ্যস্ত?

জানিয়েছিলেন, টেস্ট ভীষণ চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। কিন্তু সম্পূর্ণ মনের অন্তর্গত। আত্ম-নিয়ন্ত্রণের। শেষাবধি আউট হয়ে যেতেই হবে, তবুও কনসেনট্রেশন। ক্রিজে টিকে থাকার অঙ্গীকার। তারপরেই যখন একদিনের ফর্ম্যাটে খেলছি, খুঁজেছি নিজের সীমাবদ্ধতা। নিজেকে কীভাবে কীভাবে বদলে নিতে হবে? আর টি-টোয়েন্টিতে খেলার ধরন এবং মানসিকতা– পুরোপুরি বদলে ফেলতে হয়। 

এই কনসেনট্রেশন, এই অঙ্গীকার, এই যে একটা সময়গ্রন্থির মধ্যে নিজেকে ক্রমাগত জারিত করার পরেও, কোনও আউটবার্স্ট নেই। উদ্দামতা নেই। নিরালা দুপুরে শ্যাডো প্র্যাকটিস। একটা-দুটো বল ছেড়ে দেওয়া। তারপর আবার ফিরে আসা জীবনে। ক্রিজে। নেক্সট বল। রিপিট হয় না কখনও। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। একটি কবিতায় রাণা রায়চৌধুরী লিখেছিলেন: 

কিছু বল ছেড়ে দিতে হয়। কোনটা ছাড়তে হবে আর কোনটায় স্ট্রেট ড্রাইভ বা অফের দিকে খেলতে হবে সেটা আমি শিখেছিলাম কার কাছে? জীবনের কাছে।

বিরাট কোহলির সঙ্গে কেন উইলিয়ামসন

দেখো, চেতেশ্বর পূজারা অবসর নিয়েছেন। বিরাট কোহলি টেস্ট ক্রিকেট খেলবেন না আর। স্টিভ স্মিথও একদিনের ক্রিকেট-জীবনে ইতি টেনেছেন। থ্যাঙ্ক ইউ কেন। ইন্সটাগ্রাম রিল, ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ঘৃণাভাষ্যের গতিময় পৃথিবীতে একজন বেগানা, একজন অনুদ্বিগ্ন, একজন ব্যাটসম্যান। হেঁটে আসবে সেই গলিতে। আমি জানি, গলি-ক্রিকেটে অবসর গ্রহণের নিয়ম নেই কোনও।

ইতি,

তোমার ব্যাট