


স্টেডিয়ামের নাম-স্পনসর হল লিভাই’স জিন্স! পরিচিত ব্র্যান্ড, পরিচিত লোগো। ব্যাটম্যানের ডানা ছড়ালে যেমন হয়, ঠিক তেমন একটি অসমঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যে লিভাই’স লেখা, এ তো জিনস পরা সামান্য বাচ্চাও জানে। তো যখন লিভাই’সকে বলা হল স্টেডিয়ামের নামের প্রথমাংশ ঢেকে রাখতে, তারা বুদ্ধি করে ধূসর কাপড় দিয়ে আঁটোসাঁটো করে এমনভাবে লিভাই’স নামটি ঢাকল যে, ওই ব্যাটম্যানের আকৃতিটি বজায় রইল। অর্থাৎ, ঢেকে দেওয়া অংশের নিচে যে লিভাই’স লেখা থাকছে, সেটা স্টেডিয়ামের বাইরে এবং স্কোরবোর্ডের ওপরে স্টেডিয়ামের নামের ঢেকে দেওয়া অংশ দেখলেও সেই জিনস পরিহিত বাচ্চাও যেন চিনতে পারে।
১৯৯৬, ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া’র সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া প্রথমবার ক্রিকেট বিশ্বকাপটাকে সফলভাবে মার্কেটিং করছেন। ১০ কোটি টাকায় সফ্ট ড্রিঙ্কসের ব্র্যান্ড– ‘কোক’ জিতে নিয়েছে বিশ্বকাপের সফট ড্রিঙ্কস হওয়ার অধিকার। অফিশিয়াল সফট ড্রিঙ্কস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ। যে লড়াইয়ে তারা হারিয়েছে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘পেপসি’কে।
বিজ্ঞাপনও তৈরি। ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপ, কোক নুসরত ফতেহ আলি খানের ‘দম মস্তকলন্দর’ গানকে আবহ সংগীত রেখে উপমহাদেশের ক্রিকেটের পাগলামিকে ধরার চেষ্টা করে এক অত্যন্ত মার্জিত ও চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন নিয়ে এল।

কিন্তু পেপসি কি হেরে যাওয়ার জন্য এত কষ্ট করে ‘পাঞ্জাব-অ্যাগ্রো’ আর ‘ভোল্টাস’-এর সঙ্গে মিলে ভারতের বাজার ধরতে এসেছে? তারা বরাত দিল ‘হিন্দুস্তান টমসন অ্যাসোসিয়েটস’কে। আর তারা আজহারউদ্দীন, শচীন তেণ্ডুলকর, বিনোদ কাম্বলি, এমনকী আম্পায়ার স্বর্গত ডিকি বার্ডকে দিয়ে বিজ্ঞাপন বানিয়ে ফেলল, ‘নাথিং অফিশিয়াল অ্যাবাউট ইট’! এবারে, বিশ্বকাপ চলাকালীন মানুষ বেশি কোক পান করেছিল না পেপসি, সেটা সহজেই অনুমেয়।

স্টেডিয়ামের বাইরেও তো একটা বিশাল বড় জগৎ আছে! সেটায় আধিপত্য বিস্তার করার জন্যই তো স্টেডিয়াম রক্তিম কোক আভায় সাজানো। কিন্তু সেখানে তো এই বিজ্ঞাপনই জনপ্রিয়! অতএব!
গোদা বাংলায় এবং ইংরাজি আইনি ভাষায় এই ঘটনাটিকে বলে ‘অ্যামবুশ মার্কেটিং’। অর্থাৎ সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে বিপণন ব্যবস্থায় কোনও কোম্পানি কোনও নির্দিষ্ট ইভেন্টের (যেমন: বড় কোনও স্পোর্টস ইভেন্ট) একজন এক্সক্লুসিভ বা অনুমোদিত স্পনসর না হয়েও, অফিসিয়াল ফি প্রদান না-করেই নিজেদের পণ্য বা পরিষেবাকে সেই ইভেন্টের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার ও বিজ্ঞাপন চালানোর চেষ্টা করে।
তা তার বিরুদ্ধে অনুমোদিত স্পনসরদের তো কিছুটা সুরক্ষা দিতেই হবে! তাই বিভিন্ন স্পোর্টস ইভেন্টের সংগঠকরা সরাসরি অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড় বা দলকে বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে আয়োজকদের নিজস্ব স্পনসরদের উক্ত স্পোর্টিং ইভেন্ট চলাকালীন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আইন মেনেই। তা এমনই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই একটা মজার ঘটনা ঘটে গেল পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন সান ফ্রান্সিসকোর ‘বে এরিয়া’ স্টেডিয়ামে।

পুঁজিবাদের গল্পে স্টেডিয়ামের স্পনসরের নামে নাম রাখা তো আজকের ঘটনা নয়। সেই সুদূর ১৯১২ সালেই। আমেরিকার বোস্টনের রেডসক্স বেসবল দলের নিজস্ব স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয় বোস্টন রেডসক্সের মালিক ফেনওয়ে রিয়েলটির নামে, ‘ফেনওয়ে পার্ক’। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রথমে আমেরিকায় এবং পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়েই সিটি ফিল্ডস, বার্কলে’স সেন্টার, আলিয়াঁজ এরিনা, এমিরেটস স্টেডিয়াম, কিয়া ওভাল বা স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু নামকরণ।
এমনকী বিশ্বখ্যাত মেহিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম, যেখানে এই ক’দিন আগেই রেকর্ড তৃতীয় বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলা হল, তারও নাম বদলে এস্তাদিও বানোর্তে রাখা হয়েছে মেহিকোর ‘ফিনান্সিয়াল কোম্পানি’র নামে। সোফি স্টেডিয়াম, মেটলাইফ স্টেডিয়াম, এ টি অ্যান্ড টি স্টেডিয়াম, মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়াম, জিলেট স্টেডিয়াম, ইত্যাদিদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। এ যেন ঠিক মেট্রো স্টেশনের নাম স্পনসরের নামে রাখার মতো ব্যাপার।

এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষজন মেনে নেয়, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ নতুন নাম প্রত্যাখ্যানও করেন। এই যেমন সুইডেনের মালমো ফুটবল ক্লাবের স্টেডিয়ামের নাম স্পনসরের নামে নয়, নিজস্ব নামেই জনপ্রিয়। (স্ব্যেডব্যাঙ্ক স্টেডিয়াম নয়, ন্যেয়া মালমো স্টেডিয়াম নামেই লোকে উল্লেখ করে)। আবার ঐতিহ্য মেনেই নিউ ইয়র্কের ইয়াঙ্কি স্টেডিয়ামের নামের স্বত্ব বিক্রি হয় না। এটা সম্পূর্ণভাবে মানুষের অভ্যাস বা ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্যের বিষয়।
দিল্লিতে রাজীব চকের অস্তিত্ব যেমন শুধু মাত্র মেট্রো স্টেশনেই, আবার অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম আজও সেই ফিরোজ শাহ কোটলাই রয়ে গেল লোকের মুখে মুখে। কলকাতাতেই তো ক’টা লোক আর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন বা রবীন্দ্র সরোবর বা সুভাষ সরোবর বলে! সেই তো সল্টলেক স্টেডিয়াম, ঢাকুরিয়া লেক বা কাদাপাড়া লেকই থেকে যায় তারা।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বকাপ মানবাধিকার নিয়ে টুঁ শব্দটি না-করলেও বা গলা টিপে ধরলেও বিজ্ঞাপনদাতাদের অধিকারে একেবারেই হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। ফিফা অনুমোদিত আফ্রিকার সেরা রেফারি সোমালিয়ার ওমর আর্তান ভিসা পাওয়ার পরেও বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনা করতে আমেরিকায় প্রবেশাধিকার পায় না, ফিফা চুপ। ইরানকে ম্যাচের দিন আমেরিকায় এসেই বিকেলে ম্যাচ খেলেই মেক্সিকোয় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাদের ১১জন আধিকারিককে ভিসা প্রদানই করা হয় না, ফিফা চুপ। ইরাকের নামকরা স্ট্রাইকার আইমেন হুসেনকে শিকাগো এয়ারপোর্টে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সাত ঘণ্টা আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, ফিফা চুপ। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী হাইতি বা কঙ্গোর কোনও সমর্থককে আমেরিকার সাম্প্রতিক নীতি অনুযায়ী ঢুকতে দেওয়া হবে না, ফিফার কোনও বক্তব্য নেই। বিশ্বকাপ চলাকালীন যুদ্ধ বিরামের প্রস্তাবে আমেরিকার কোনও মন্তব্য নেই, ফিফা রাজনীতিতে ঢুকবে না।

অথচ ফিফা হাইতিকে তাদের ইতিহাস বিধৃত জার্সি পরতে বাধা দেয়, কারণ তা না কি রাজনৈতিক! ফিফা রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণের জন্য শাস্তি দেয়। কিন্তু একই কারণের পরে আমেরিকার কিস্সুটি হয় না, ইজরায়েল অনায়াসে যোগ্যতা নির্ধারণ পর্বে বিনা বাধায় অংশ নিতে পারে।
আসলে সুবিধা অনুযায়ী নিয়মকানুন তৈরি হয়। সে রাজনীতিই হোক বা স্টেডিয়াম নামকরণ নীতি। এই যেমন ফিফা এই পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজকদের হুকুম দিয়েছে যে, কোনও স্টেডিয়ামের নাম তাদের স্পনসরের নামে থাকবে না, কারণ এটা ফিফার টুর্নামেন্ট আর যারা এই বিশ্বকাপের স্পনসরকল্পে টাকা ঢালবে না (পড়ুন ফিফার ট্যাঁকশাল ভরবে না) তাদের নাম কোনওভাবেই বিশ্বকাপের কোনও ক্ষেত্রেই যুক্ত রাখা যাবে না। তাই সবক’টা স্টেডিয়ামের নাম জায়গার নামে হয়ে গিয়েছে! মানে আপনি মহানায়ক উত্তমকুমার বলতে পারবেন না, বলতে হবে টালিগঞ্জ স্টেডিয়াম থুড়ি স্টেশন!
স্টেডিয়ামের নাম স্পনসররা অবশ্যই গোঁসা করেছে। বিনা প্রয়াসে খানিকটা নামমাহাত্ম প্রচারের এমন সুবর্ণসুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে দেখে তারা যে বত্রিশ বিকশিত করে রসগোল্লা বিলি করবে না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বলশালীর বিরুদ্ধে লড়া তো সহজ নয়। আর যেখানে লড়েও বিশেষ লাভ হবে না! সেখানে?
এই ঠিক এইখানেই ‘বে এরিয়া’ স্টেডিয়ামের নামটা উঠে আসে! স্টেডিয়ামের নাম-স্পনসর হল লিভাই’স জিন্স! পরিচিত ব্র্যান্ড, পরিচিত লোগো। ব্যাটম্যানের ডানা ছড়ালে যেমন হয়, ঠিক তেমন একটি অসমঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যে লিভাই’স লেখা, এ তো জিনস পরা সামান্য বাচ্চাও জানে। তো যখন লিভাই’সকে বলা হল স্টেডিয়ামের নামের প্রথমাংশ ঢেকে রাখতে, তারা বুদ্ধি করে ধূসর কাপড় দিয়ে আঁটোসাঁটো করে এমন ভাবে লিভাই’স নামটি ঢাকল যে, ওই ব্যাটম্যানের আকৃতিটি বজায় রইল। অর্থাৎ, ঢেকে দেওয়া অংশের নিচে যে লিভাই’স লেখা থাকছে সেটা স্টেডিয়ামের বাইরে এবং স্কোরবোর্ডের ওপরে স্টেডিয়ামের নামের ঢেকে দেওয়া অংশ দেখলেও সেই জিনস পরিহিত বাচ্চাও যেন চিনতে পারে। এটাকে কি ‘অ্যামবুশ মার্কেটিং’ বলা যায়?

এই যেমন ধরা যাক, মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের নাম ঢেকে দিয়ে দিয়ে আটলান্টা স্টেডিয়াম বলা হল, কিন্তু মার্সিডিজের লোগো বেলুনের আকারে উড়িয়ে দেওয়া হল স্টেডিয়ামের ত্রিসীমানার সামান্য বাইরেই, যাতে ম্যাচ চলাকালীন আকাশের দিকে তাকালেই মার্সিডিজের লোগো দেখতে পাবে দর্শক। সেটাকে কিন্তু অ্যামবুশ মার্কেটিংয়ের আওতায় ফিফা নিয়ে আসতে পারবে।
কিন্তু এই ঢেকে দেওয়া? ফিফার হাত থেকে তির বেরিয়ে গিয়েছে, এখন কিস্সু করার নেই! কিন্তু ইনফান্তিনো কি ভাবছেন না, এই ভাবে চালাকি করে আমায় ফাঁকি দিয়ে গেলে, পরেরবার ঠিক এটাকেও একটা আইনি ধারার মধ্যে ফেলে দিয়ে বলব– শুধুমাত্র আয়তাকার কাপড় দিয়েই ঢাকা যাবে বা ওইরকম আর কি!
কিন্তু পরেরবার আর কে দেখেছে! সে না-হয় পর্তুগাল, মরক্কো এবং স্পেন বুঝবে। আমরা বরং লিভাই’সের মার্কেটিং দলের বুদ্ধিকে তারিফ করি তদ্দিন! কী বলেন ইনফান্টিনো?
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সৌরাংশু-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved