


উপন্যাসটি শুরু হচ্ছে একটি ভয়ংকর বাক্য দিয়ে। বাক্যটি এরকম– ‘The one thing I know is that Allah never forgives sodomy’। এই বাক্য লিখিত হওয়ার খানিক পরেই আমরা পাব আরও কয়েকটি বাক্য, যেগুলিকে আগের বাক্যের বর্ধিত অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরের অংশটি এরকম– “it’s immoral, impure, unpardonable and wretched. And if we let them get their way then others will find the courage to continue down their path. We can’t let any one of our boys become a……kuni” এই ‘কুনি’ শব্দের অর্থ যে সমকামী পুরুষ সেকথা সব পাঠকই ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছেন।
আফগান দেশে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে একটি কথা–
‘সৌন্দর্য কী, তা আপনার বোধগম্যই হবে না, যতক্ষণ না আপনি কাবুলের বসন্ত দেখছেন।’
আফগান কবি সাইব তাবরিজি লিখেছিলেন–
‘কী অপরূপ স্রোতে বয়ে চলেছে পুল-ই-বস্তানের জল,
আল্লাহ মানুষের কুনজর থেকে এই সৌন্দর্যকে রক্ষা করুন।’
কিন্তু কবির দোয়া শোনেননি আল্লাহ। কুনজর থেকে বাঁচানো যায়নি এই দেশকে। আফগানিস্তানের নাম শুনলেই যে অনুভূতি সবার আগে আমাদের মনকে গ্রাস করে, তা হল আতঙ্ক! অথচ এই দেশ কিন্তু এক সময়ে ছিল পারস্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পারস্য-সাহিত্যে নারী বা পুরুষের সৌন্দর্যের বর্ণনা বিশেষ লিঙ্গবৈষম্য দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। পারস্য কাব্যে নারীর রূপের প্রতি মুগ্ধতা, আকুলতা, বিষমকামী প্রেম যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে– ঠিক সেভাবেই সেইসব সাহিত্যে এসেছে সুন্দর তরুণ, পুরুষের নান্দনিকতা, পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেম এবং আবেগপ্রবণতার কথাও। এর পরে ইসলামিক শাসন কায়েম এবং গোত্রীয় সমাজব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পরও কিন্তু এই দেশে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এমন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি যেখানে মানুষের, বিশেষত নারী, সমকামী, উভকামী বা প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের ওপর রাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রচণ্ড নিপীড়ন বা কঠোর দমননীতি কার্যকর করতে হয়। গোত্রীয় সমাজব্যবস্থায় প্রান্তিক যৌনতাকে কখনও প্রকাশ্যে সামাজিক স্বীকৃতি না দেওয়া হলেও পরিস্থিতি তখনও এতখানি সংকটময় হয়ে ওঠেনি, যতটা হয়েছে ১৯৯৬-এর পর, যখন প্রথমবার আফগানিস্তানের শাসনভার আসে তালিবানের হাতে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালিবান শাসনাধীন আফগানিস্তানে নারীদের সমস্ত রকম অধিকার খর্ব করার পাশাপাশি সমকামী প্রেমকে অবৈধ সম্পর্কের তকমা দেওয়া হয়। যদিও ইসলামিক দেশ হিসাবে শারিয়া আইন অনুযায়ী, সমকামকে কোনওদিনই স্বীকৃতি দেয়নি এই দেশ। ১৯৭৬ সালে দাউদ খানের শাসনকালে একটি আধুনিক ফৌজদারী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারী-পুরুষের যৌনতা বাদে সমস্ত রকম যৌন সম্পর্ককে নৈতিকতা বিরোধী বা ‘contrary to morality’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭৮-এ কমিউনিস্ট পার্টি সাওর বিপ্লবের মাধ্যমে আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে। এরপর কমিউনিস্ট পার্টি এবং মুজাহিদিন গোষ্ঠীর মধ্যে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায়। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার তালিবান আফগানিস্তান দখল করে। ২০০১ সালে মার্কিন জোট আফগানিস্তানে অভিযান চালায় এবং তালিবান শাসনের পতন ঘটে। এরপর ২০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের মদতে আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠিত হয়। এই সময়কালে এই দেশের মানুষ স্বাধীনতা কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও, ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানির শাসনকালে সমকামী সম্পর্ক বা সমলিঙ্গ যৌনতাকে গুরুতর অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়। এরপর ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার এই দেশে শুরু হয় তালিবান শাসনকাল। তালিবান আমলে আবার আফগানিস্তানের সমাজ ফিরে যায় সেই মধ্যযুগীয় রক্ষণশীলতায়, যেখানে নারীরাই পায় না ন্যূনতম মানবাধিকার বা স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করবার অবকাশ। সেখানে সমকামী সম্পর্ক স্বীকৃতি পাওয়া তো এক দূরগত স্বপ্ন। এই আবহে আফগান কথাসাহিত্যিক নিমাত সাদাত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘The Carpet Weaver’-এ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন দুই আফগান কিশোরের সমকামী প্রেমের গল্প। লেখক এই উপন্যাসের কাহিনিস্রোত নির্মাণ করেছেন ১৯৭৭ সালের আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে। মনে রাখতে হবে, ১৯৭৬ সালেই যে কোনও রকমের সমকামী সম্পর্ককে নৈতিকতা বিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইরকম একটি উত্তাল সময়কে সামনে রেখে সাদাতের এই নির্ভীক সাহিত্য-নির্মাণ সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দেয়। প্রান্তিক যৌনতা বিষয়ে এমন সুস্পষ্ট এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক সাহিত্য এর আগে কোনও আফগান সাহিত্যিককে সৃষ্টি করতে দেখা যায়নি। এ যেন এক অসাধ্য সাধন। এই উপন্যাস প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। এখানেও মনে রাখতে হবে ঠিক তার আগের বছর অর্থাৎ, ২০১৮ সালে সমকামী সম্পর্ক বা সমলিঙ্গ যৌনতাকে ‘ক্রাইম’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে আফগানিস্তানে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যে সময়ের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে এবং যে সময় উপন্যাসটি প্রকাশ পেয়েছে দু’টিই আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে ভীষণভাবে অস্থির সময়। ফলে এই বইয়ের খোঁজ পাওয়ামাত্রই সেটি পড়ে ফেলা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারের পতনের পর আফগানিস্তানে দ্বিতীয়বার তালিবান শাসন কায়েম হওয়ায় এই দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠেছে বর্তমানে। বিশ্বের কোনও দেশ অবশ্য এখনও তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। এখন আফগানিস্তানের প্রশাসনিক দায়ভার সম্পূর্ণভাবে রয়েছে তালিবানের ওপর। এই দেশে কোনও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অনুপস্থিত, নেই কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দলও। মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমেরও নেই কোনওরকম স্বাধীনতা। এই দেশের নারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের নেই কোনও উচ্চশিক্ষার সুযোগ। অত্যন্ত সীমিত ক্ষেত্রে তারা কাজ করতে পারেন। নারীদের পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ সমস্ত কিছুই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তালিবান শাসকরা। সম্প্রতি এই দেশে এমন কিছু মানবতাবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় Margaret Atwood লিখিত “The Handmaid’s Tale”, Christina Dalcher-এর ‘Vox’ অথবা Louise O’Neill-এর উপন্যাস ‘Only Ever Yours’-এর মতো ডিসটোপিয়ান সাহিত্যের কথা। আমরা অবাক হয়ে ভাবি, নারীদের ওপর যে ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নিপীড়ন, অত্যাচার ও বঞ্চনার কথা এই উপন্যাসগুলোতে কল্পনা করা হয়েছে– তা কীভাবে বাস্তবে, আমাদের চোখের সামনে এমন অনায়াসে ঘটতে পারে? আফগানিস্তানে আমরা বইতে পড়া সেই সব ভয়ংকর দুঃস্বপ্নকে প্রতিদিন বাস্তব হতে দেখছি। সম্প্রতি আফগানিস্তানে একটি আইন কার্যকর হয়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে যে, কোনও নারীকে তাঁর শরীর থেকে রক্তক্ষরণ না হওয়া পর্যন্ত বা দেহের কোনও হাড় না-ভাঙা পর্যন্ত তাঁর পুরুষ অভিভাবক তাঁকে প্রহার করতে পারবেন। এর থেকেও আশ্চর্য ব্যাপার হল, প্রহারের সীমা লঙ্ঘন করার পরও কোনও নারী যদি অভিযোগ করতে চান, তবে তাঁকে সংশ্লিষ্ট দফতরে যেতে হবে কোনও পুরুষ অভিভাবকের সঙ্গেই। সেখানেও যিনি অভিযোগ নথিভুক্ত করবেন, যেহেতু তিনি ‘পরপুরুষ’ তাই শরীরের কোন অংশে ক্ষত হয়েছে– তা তাঁকে দেখানো তো নিষিদ্ধ। সুতরাং প্রহারকারী পুরুষের শাস্তি হওয়ার কোনও উপায়ই রইল না। আর যদি কোনওমতে প্রমাণ করাও যায় যে সত্যিই কোনও পুরুষ কোনও নারীকে সীমার অতিরিক্ত প্রহার করেছেন, তাহলেও তার শাস্তি হবে মাত্র ১৫ দিনের কারাবাস। অন্য একটি আইনের মাধ্যমে তালিবান এই নিয়ম কার্যকর করেছে যে, মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স বলে কিছু আর থাকবে না। মেয়েরা ঋতুমতী হলেই তার বিয়ে দেওয়া যাবে। এই আইন একরকম শিশু-ধর্ষণকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমান। যেখানে এই দেশে নারীদের অবস্থা এমন শোচনীয়, সেখানে সমকামী প্রেমে লিপ্ত পুরুষ বা নারীর কী অবস্থা হতে পারে, তা আমরা সহজেই আন্দাজ করতে পারি।
নিমাত সাদাত তার উপন্যাসের উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লিখছেন–
To LGBTQIA people around the world who are still criminalized and continue the struggle for their liberation.
এই উৎসর্গ থেকেই আমরা সাদাতের এই উপন্যাস লেখার কারণ অনেকটা বুঝতে পারি। এই উপন্যাস আসলে একটি বিপ্লব। না, কোনও বড় আন্দোলন নয়, এক ব্যক্তিগত বিদ্রোহ। আফগান সমাজ ব্যবস্থা প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের একরকম অদৃশ্য করে রাখে। এই উপন্যাস আসলে আফগানিস্তানে LGBTQIA মানুষদের অস্তিত্বকে দৃশ্যমান করে তোলার, তাদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক মরিয়া প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, উপন্যাসটি শুরু হচ্ছে একটি ভয়ংকর বাক্য দিয়ে। বাক্যটি এরকম– ‘The one thing I know is that Allah never forgives sodomy’।
এই বাক্য লিখিত হওয়ার খানিক পরেই আমরা পাব আরও কয়েকটি বাক্য, যেগুলিকে আগের বাক্যের বর্ধিত অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরের অংশটি এরকম–
“it’s immoral, impure, unpardonable and wretched. And if we let them get their way then others will find the courage to continue down their path. We can’t let any one of our boys become a……kuni”
এই ‘কুনি’ শব্দের অর্থ যে সমকামী পুরুষ সেকথা সব পাঠকই ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছেন। উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠাতেই আফগান সমাজে সমকামীদের অবস্থান সম্পর্কে পাঠকদের একটি স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছেন লেখক।
এই উপন্যাসে আমরা দেখি কণিষ্ক নুরজাদা, একজন আফগান কিশোর– তার বন্ধু মইহানের প্রেমে পড়ে। কণিষ্কর বাবা আফগানিস্তানের একজন নামকরা গালিচা-বিক্রেতা। এই দুই কিশোরের মধ্যে গড়ে ওঠা ভালোবাসার সম্পর্ক গোপন রাখা যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা সাদাত আমাদের এই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা কিছু বাক্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই দেশে যারা সমকামী প্রেমে লিপ্ত তাদের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হতে পারে। কণিষ্ক তার শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে সাক্ষী হতে থাকে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার। সে সাক্ষী হয় সোভিয়েত আগ্রাসনের। এরপর সে দেখে দেশের ভিতরই বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের আগুন। এরপর আফগানিস্তানে তালিবানের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দেশে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে তার পক্ষে। একসময় সে পাকিস্তানে যায় অভিবাসী হিসেবে এবং সেখান থেকে অবশেষে পৌঁছয় আমেরিকায়। কিন্তু এই দীর্ঘ সফরে কণিষ্ক আসলে আরও দীর্ঘতর এক অন্তর্ভ্রমণ করে অবশেষে যেখানে পৌঁছয়, তা হল একটি ‘বোধ’-এ। জীবনানন্দ দাশের এই কথাগুলোই যেন সে আপনমনে আওড়াতে থাকে–
‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?’

কৈশোরে যে মুহূর্তে সে বুঝতে পারে যে তার প্রেম বা যৌনতা-সংক্রান্ত অনুভূতি স্বাভাবিক প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না, তখন থেকেই শুরু হয় কণিষ্কর আত্ম-আবিষ্কারের এক অন্তর্লীন যাত্রা। মইহানের প্রতি কণিষ্কর ভালোবাসার উষ্ণ আবেগ, নানা ঘটনাচক্রে তাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হলেও থেকে যায় অপরিবর্তিত। কণিষ্ক নিজের প্রেম ও যৌন অভিমুখতা নিয়ে সামাজিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক হলেও, তার মধ্যে এই ব্যাপারে কখনও কোনও দ্বিধা দেখা যায় না। সমকামিতা কণিষ্কর কাছে একটি স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা। কণিষ্কর অন্তরে আত্মসংঘাত হানা দেয়, যখন তার সহজ স্বাভাবিক মানবসত্তাকে সে কঠোরভাবে রক্ষণশীল আফগান সমাজে নির্দ্বিধায় ও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে না। দেশে একের পর এক রাজনৈতিক চাপানউতোর কণিষ্ক এবং তার আশেপাশের মানুষজনের জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
সাওর বিপ্লবের পর মইহান তার পরিবারের সঙ্গে আমেরিকা চলে যায়। অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হন কণিষ্কর বাবা। কণিষ্ক তার মা ও বোনকে নিয়ে এরপর আশ্রয় নেয় পাকিস্তানের একটি শরণার্থী শিবিরে। উপন্যাসের এই অংশে আমরা দেখি, কণিষ্কর সমকামিতাকে কী নির্দয়ভাবে কাজে লাগানো হয় ব্যক্তিগত ভোগ ও সুবিধার স্বার্থে। চূড়ান্ত শোষণ, যৌন অত্যাচার এবং বঞ্চনার মধ্যেও কণিষ্ককে সাহস জুগিয়ে চলে মইহানের সঙ্গে তার পুনর্মিলনের সুপ্ত স্বপ্ন। এর বহু বছর পর অবশেষে কণিষ্ক তার পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ পায়। ভবিষ্যতের অনেক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে কণিষ্ক মইহানের সঙ্গে দেখা করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বপ্নভঙ্গ হয় তার। সে জানতে পারে মইহান এমন একটি জীবন বেছে নিয়েছে– যে জীবনকে তার পরিবার এবং সমাজ সহজেই স্বীকৃতি দেবে। সে এক নারীর সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পথে এগচ্ছে এবং নিজের সমকামী সত্তাকে সমাজে প্রকাশ করতে সে কুণ্ঠাবোধ করে। কণিষ্কর সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ককে মইহান অস্বীকার করে না, কিন্তু এই সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে সামাজিক পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সে অনিচ্ছুক থাকে।
মইহানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কণিষ্ক উপলব্ধি করে যে, তাদের সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। মইহানের প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা বিন্দুমাত্র না কমলেও, সে সিদ্ধান্ত নেয়– এই সম্পর্ককে পিছনে ফেলে জীবনে নতুন অভিজ্ঞতার দিকে এগিয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নপূরণ না হলেও কণিষ্ক বুঝতে পারে– অন্তত নিজের সঠিক পরিচয় রক্ষা করার ক্ষেত্রে এবং সমাজে নিজের যৌনপরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সে কোনওরকম আপস করেনি। এই উপলব্ধিও একরকমের আত্মআবিষ্কার। সামাজিক স্বীকৃতি ও প্রতিকূলতাবিহীন জীবনপ্রাপ্তির আশায় মুখোশ-পরা সামাজিকতা এবং সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার লোভে নিজের স্বকীয় পরিচয়কে বিক্রি করতে কোনওমতেই রাজি হয়নি কণিষ্ক।

অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর উপন্যাস ‘Picture of Dorian Gray’-তে লিখেছেন– ‘To define is to limit’। এই বাক্যটির অন্তরে প্রবেশ করলে আমরা পাব এক সীমানাবিহীন জগতের সন্ধান। কোনও কিছুকে সংজ্ঞায়িত করার অর্থ হল তার বহুত্বকে সীমিত করে দেওয়া। পুরুষত্ব বা নারীত্বকে যে পুরুষ ও নারীর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের নিরিখে সংজ্ঞায়িত করা হয়, একবার ভেবে দেখা দরকার যে, নারীত্ব বা পুরুষত্ব কি সেই সংজ্ঞা অতিক্রম করে যেতে পারে না? সেরকমই কোন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং কোনটাকে দেওয়া হবে না– তাও নির্ধারণ করে সমাজ। কিন্তু এই সীমানির্মাণ করা হয়েছে মানেই সেই গণ্ডি পেরিয়ে কেউ বাড়ির পাশের আরশিনগরে বন্ধু খুঁজতে যাবে না, তা তো হয় না। আর সত্যের আরশিতে নিজেকে সে দেখবে না– তাও ভাবা ভুল হবে। তাই আপাতদৃষ্টিতে কণিষ্ককে শেষ পর্যন্ত জীবনে হেরে-যাওয়া একজন মানুষ বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে সে জয়ী। নিজের জীবনকে স্বাধীনভাবে চালনা করার মতো সাহস বা সংকল্প অনেকেই সঞ্চয় করতে পারে না। অনেকেই ধাবিত হয় একটি আপাতভাবে নিরাপদ, সংঘর্ষবিহীন, আরামদায়ক এবং সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দ্বারা স্বীকৃত জীবনের দিকে। সেই জীবন হয় অস্তিত্বরক্ষার জীবন, প্রাণ খুলে বেঁচে থাকার জীবন নয়।
অন্যদিকে কোনও কোনও মানুষের কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাদের আত্মপরিচয়। সেই পরিচয় লড়াই করে হলেও সমাজে প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছেটা যেন আবির্ভূত হয় নিজের দিকে ছুড়ে দেওয়া একরকম চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এই আত্মদ্বন্দ্বের ভিতর থেকে জন্ম নেয় এক অন্য মানুষ, যার কাছে স্বাধীনতার থেকে মূল্যবান পৃথিবীতে আর কিছু নেই। তাই সাদাত লেখেন–
‘To be seen for who you are is a form of freedom.’
একজন শিল্পী যেমন নানা রঙের সুতো দিয়ে বিভিন্ন নকশার গালিচা বুনে চলেন, কণিষ্ককেও আমরা দেখি বিভিন্ন অনুভূতির সুতো নিয়ে নিজের জীবনকে নীরবে, সকলের অলক্ষে, পোক্ত বুনটে বুনে চলতে। হয়তো রংবেরঙের ফুলকারি গালিচার মতো সুন্দর, চকচকে নয় তার জীবন; কিন্তু নিজের সত্তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে যেভাবে সে তার আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই চালিয়ে গিয়েছে, তা একজন প্রকৃত দৃঢ়চেতা মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
‘Freedom is not a philosophy and not even an idea; it is a movement of consciousness.’ [Octavio Paz]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved