Robbar

ভিনি ভিডি ভিসি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 20, 2026 6:06 pm
  • Updated:June 20, 2026 6:06 pm  

ভিনিসিয়াস কেমন? নোভাল খরচ করেছেন তিনটে শব্দ। ‘আনপ্রেডিক্টবল, ফিয়ারলেস অ্যান্ড আনস্টপেবল।’ দুর্দমনীয়ই বটে। ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডো-উত্তর রিয়াল মাদ্রিদে ভিনি-ই মুখ। বর্ণবিদ্বেষের বিষফলা ব্রাজিলীয় তারকাকে রক্তাক্ত করেছে, কিন্তু ধার কমাতে পারেনি। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ঘরের মাঠে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন ভিনি। সেই শুরু। স্প্যানিশ ফুটবল এজেন্ট পেড্রো ব্রাভো তাঁকে ‘বানরের নাচ’ নাচতে বারণ করে বিতর্ক উসকে দিয়েছিলেন। বিপক্ষের গ্যালারি থেকে সোশাল মিডিয়ায় তাঁকে ঘিরে ‘মিম’-এর ছড়াছড়ি। চেনা ফর্মে ছায়া পড়লেই শুনতে হয়েছে ভিনি আসলে ‘ক্রায়িং বেবি’!

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

মাঠের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সমানে ছুটে চলেছে ছেলেটা, অবিরাম। কতই বা বয়স পাঁচ কি ছয়! যেখানে বল, সেখানেই হাজির। মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই, বদলে লেগে আছে একটা আনন্দের হাসি। বিপক্ষে যারা খেলছে, তাদের মধ্যে অনেকেই তার চেয়ে বয়সে বড়। তারাও ওই দামাল ছেলেকে বাগে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। কচি-কাঁচাদের ম্যাচ। তা দেখতে বেশ ভিড় গ্যালারিতে। অধিকাংশ অভিভাবক। হঠাৎ সেই গ্যালারি থেকে ভেসে এল টিপ্পনি, ‘ভিনিকে বাইসাইকেল নিয়ে ধাওয়া কর!’

সেদিনের সেই কচিকাঁচাদের ভিড়ে মিশে থাকা ভিনি, আজকের ভিনিসিয়াস জুনিয়র। রিও দে জেনেইরোর ফুটবল-পাগল জনতার হৃদয় জয় করে তিনি এখন মাদ্রিদিয়েস্তার নয়নের মণি, সেলেকাও শিবিরেরও। আর? এই বিশ্বকাপে ‘ডন’ কার্লোর বিশল্যকরণী, ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নের ‘শিবরাত্রির সলতে’।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র

রিও দে জেনেইরো শহরের পাশেই ঘিঞ্জি মেট্রোপলিটান এলাকা নাম সাও গনসালো। আলো-আঁধারি ঘেরা সরু গলি। ছিনতাই থেকে মাফিয়াদের নিত্য আনাগোনা। সেই অন্ধকারে জোনাকি হয়ে বেড়ে ওঠা ভিনিসিয়াসের। সঙ্গে বেড়ে উঠেছে তাঁকে ঘিরে অজস্র ফুটবল মিথ। হাসতে হাসতে তাই বলে চলেন কার্লোস আবরান্তেস। যাঁর হাত ধরে ফুটবলে পা-জড়ানো ব্রাজিল সুপারস্টারের।

মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে

রিও-র ফুসফুস বলা হয় ফ্ল্যামেঙ্গোকে। জিকো, রোমারিওদের ফুটবল পীঠস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রিও শহরের কমবেশি ১৫০টি স্কুল। তেমনই একটায় বছর পাঁচেকের ভিনিকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন তাঁর অভিভাবকরা। সেখানেই প্রথম ভিনিসিয়াসের ড্রিবলিংয়ের দক্ষতা আর গতির আঁচ পান কোচ আবরান্তেস। আবরান্তেসের হিরে চিনতে ভুল হয়নি। অতীতের স্মৃতি হাতড়ে তাই যখন আবরান্তেস বলে ওঠেন, ‘ভিনিসিয়াস জুনিয়র? আ ট্রু ড্রিবলার, আ রিয়াল জেম।’ তখন সেটা শাশ্বত-বাণীর মতো শোনায়।

ফ্ল্যামেঙ্গোর জার্সি হাতে

মাত্র ১০ বছর। সেই বয়সেই ফ্ল্যামেঙ্গোর যুব দল, ১৭-তে সিনিয়র টিম। শুরুর দিনে অবশ্য ভিনিসিয়াসের স্বপ্ন ছিল লেফ্ট ব্যাক হবেন, ফ্ল্যামেঙ্গো-তারকা রেনাতো আবরিউয়ের মতো। অথচ হয়ে উঠলেন বিপক্ষ রক্ষণের ত্রাস! ফ্ল্যামেঙ্গোর যুব দলের দায়িত্বে তখন কার্লোস নোভাল। প্রথম দর্শনে ভিনিসিয়াসকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘ফুটবলের শৈল্পিক সত্তার সঙ্গে ঈশ্বর আরও একটা জিনিস দিয়েছেন ওকে– বুদ্ধি!’

হাইতির বিরুদ্ধে গোলের পর

ভিনিসিয়াস কেমন? নোভাল খরচ করেছেন তিনটে শব্দ। ‘আনপ্রেডিক্টবল, ফিয়ারলেস অ্যান্ড আনস্টপেবল।’ দুর্দমনীয়ই বটে। ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডো-উত্তর রিয়াল মাদ্রিদে ভিনি-ই মুখ। বর্ণবিদ্বেষের বিষফলা ব্রাজিলীয় তারকাকে রক্তাক্ত করেছে, কিন্তু ধার কমাতে পারেনি। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ঘরের মাঠে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন ভিনি। সেই শুরু। স্প্যানিশ ফুটবল এজেন্ট পেড্রো ব্রাভো তাঁকে ‘বানরের নাচ’ নাচতে বারণ করে বিতর্ক উসকে দিয়েছিলেন। বিপক্ষের গ্যালারি থেকে সোশাল মিডিয়ায় তাঁকে ঘিরে ‘মিম’-এর ছড়াছড়ি। চেনা ফর্মে ছায়া পড়লেই শুনতে হয়েছে ভিনি আসলে ‘ক্রায়িং বেবি’! এভাবেই বিদ্রুপের বিষে নীলকণ্ঠ হয়েছেন ভিনিসিয়াস। তা সত্ত্বেও কেউ তাঁকে ‘দাবায়ে রাখতে পারেনি’! আজও না! বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাম্বা-জাদুতে মোহিত করেছেন। তেমনই বদলে দিয়েছেন মাঠের শত্রুতাকে বন্ধুত্বে।

রিয়ালের জার্সিতে ভিনি

২০২০-র চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বরুশিয়া মনচেনগ্ল্যাডবাচের বিরুদ্ধে বিরতিতে সেই বিতর্কিত মুহূর্ত। মাঠে নামার আগে টানেলে দাঁড়িয়ে সতীর্থ ফার্লান মেন্ডিকে বেনজেমা বলছেন, ‘ওকে (ভিনিসিয়াস) বল দিও না। ও আমাদের বিরুদ্ধে খেলছে।’ অথচ আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সেই ছবিটাই আমূল বদলে গিয়েছে। রিয়াল জার্সিতে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন বেনজিমা। নেপথ্যে ভিনিসিয়াসের ঠিকানা লেখা পাসের জাদু কম নয়। রোনাল্ডা-পরবর্তী রিয়ালে সাফল্যের যে ইমারত, সেখানে টনি ক্রুজ, লুকা মডরিচের মতো কারিগরের ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন ভিনিসিয়াস। শুরুর দিকে রিয়াল জার্সিতে হোঁচট খাওয়া ভিনির এই উত্থানের পিছনে কার্লো অ্যান্সেলোত্তির ভূমিকাও কম নয়।

হাইতির বিরুদ্ধে গোলের মুহূর্ত

প্রশ্ন এখন একটাই। কোটি টাকার প্রশ্ন। যে সাম্বা-ম্যাজিক তিনি সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দেখাতে পেরেছেন, পারবেন তা মার্কিন মুলুকে মেলে ধরতে? পারবেন হতাশার ভস্ম থেকে উদ্ধার করে সেলেকাওদের বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘হেক্সা’ নক্ষত্র এনে দিতে? অনেক যদি-কিন্তু, আশা-আশঙ্কার দোলাচল। চলতি বিশ্বকাপ সেই মঞ্চ, যেখানে ‘ফেভারিট’-এর তকমা নেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে। বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে ক্যানারি-হলুদ অনেক বিবর্ণ। অনেক বেশি দিশেহারা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও মরক্কোর বিরুদ্ধেও চেনা দাপট দেখা যায়নি ব্রাজিলের খেলায়। ব্যতিক্রম শুধু ভিনিসিয়াস। দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে জয়ে আশার আলো দেখছেন বিশ্বব্যাপী ব্রাজিলের সমর্থকরা। দেখাচ্ছেন ভিনিসিয়াস। মরক্কোর বিরুদ্ধে গোল করে দলের মানরক্ষা করেছিলেন। হাইতির বিপক্ষেও গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন। পাশে নেমার নেই। তবু আপফ্রন্টে লড়ে যাচ্ছেন ভিনি, ‘একা কুম্ভ’ হয়ে। তাঁকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ‘জোগা বোনিতো’র ভক্তকুল। বিশ্বকাপ ফাইনাল এখনও ‘বহুত দূর’। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরলেই নটআউটে অপেক্ষা করছে অনেক গুপ্তঘাতক। কার্লোর স্ট্র্যাটেজি আর ভিনিসিয়াস– বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত সেলেকাওদের প্রাপ্তি বলতে এটুকুই। এই যৎসামান্য রসদে প্রত্যাশার পাহাড় জয় আদৌ কি সম্ভব?

সম্ভব ভিনিসিয়াস জ্বলে উঠলে। তিনি জ্বলে উঠলে ব্রাজিলের ভাগ্যাকাশে উজ্জ্বল হবে ষষ্ঠ তারা। কোপাকাবানার বিচে তখন হয়তো কান পাতলে শোনা যাবে আবরান্তেসের সেই অমোঘবাণী– ‘ভিনিসিয়াস জুনিয়র? আ ট্রু ড্রিবলার, আ রিয়াল জেম।’