Robbar

ম্যানিফেস্টোর ভিড়ে অচেনা মার্কস

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 22, 2026 7:38 pm
  • Updated:June 22, 2026 8:41 pm  

কার্ল মার্কস স্থির-দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তাঁর পাতার পর পাতা লিখেও শেষ না-হওয়া নাটক ‘উলানেম’-এর দিকে। যতটা তিনি লিখেছেন, সবটাই কি নয় গোয়েটের রোম্যান্টিক লেখা প্রমিথিউসের কাছে ঋণী? কার্ল মার্কস তখনও জানেন না, ১৮৩৯-এ আরও একবার তিনি ফিরে আসবেন এই নাটকে। তখনও শেষ হবে না এই অশেষ নাটক। এবং কার্ল মার্কসের ম্যাগনাম ওপাস– ‘দাস ক্যাপিটাল’, তাও তো থেকে গেল, তিন খণ্ডের অসমাপ্ত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো!

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

৯৯.

১৮৩৭ সাল। কার্ল মার্কস, তিনি ১৯, তিনি নিজের প্রতিভায় মোহিত হয়ে, তিনটে মহৎ কাজ করে চলেছেন।

এক, তিনি ক্রমাগত রোম্যান্টিক প্রেমের কবিতা লিখে চলেছেন। দুই, তিনি প্রেম করছেন জেনির সঙ্গে, যে জেনি তাঁর থেকে কয়েক বছরের বড়। তিন, কবিতার পাশাপাশি তিনি একটি উপন্যাসে হাত দিয়েছেন। এবং তরতর করে এগচ্ছে সেই উপন্যাস। অবাক হওয়ার কারণ নেই, তিনিই আমাদের এক ও আদি কার্ল মার্কস, ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর চিন্তক এবং লেখক।

কার্ল মার্কস

কাঠখোদাই-এর শেষ দুটি লেখায় আমি আপনাদের যথেষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছি, এই রকম কিছু এটা ঘটতে চলেছে। কেননা, আমার এতদিনের লেখার টেবিল আমাকে ক্রমাগত উসকে দিচ্ছে খাপছাড়া ভাবনার দিকে। গত লেখায় নিয়ে গেল বিশ্বকাপে। এবার দুম করে কার্ল মার্কসে। তাও আবার আমাদের চেনা রাজনৈতিক অর্থনীতির মার্কসে নয়। অন্য, অচেনা মার্কসে।

আমার লেখার টেবিল এখন একই সঙ্গে আমার সামনে ও ঘাড়ে। আমার ঘাড়ে ক’টা মাথা যে, তার কথা শুনব না?

১৯ বছরের কার্ল মার্কস বেশ বুদ্ধিমান। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র। বাবা জার্মান। মা ডাচ। বাবা হেনরিক। মা হেনরিয়েট। তাঁদের ১১টি সন্তান। বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন ইহুদি। মার্কসের জন্মের আগেই তাঁরা ক্রিশ্চান হয়েছেন। সুতরাং, কার্ল মার্কস অবশ্যই ক্রিশ্চান। এখন অন্তত তিনি নিজেকে তাই ভাবেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি জেনির সঙ্গে এনগেজড হবেন।

কার্ল মার্কস, সঙ্গে স্ত্রী জেনি

কার্লের বাবা হেনরিখ অ্যাটর্নি। উচ্চ-মধ্যবিত্ত। মা হেনরিয়েট বৈষয়িক। বাণিজ্যে মন। তিনি কয়েক বছর পরে ফিলিপস ইলেকট্রনিক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা হবেন। তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও কার্ল দর্শন আর ইতিহাসের ছাত্র। তার ওপর আবার মেম্বার হয়েছে একটা ট্যাভার্ন ক্লাবের। মাতাল কার্ল অসহ্য। মদ খেলে কার্ল রাগ সামলাতে পারেন না। মুখে যা আসে, তাই বলেন। রাস্তাঘাটে ঝগড়া করেন। ভদ্রতার ধার ধারেন না। ক’দিন আগেই তো পুলিশে ধরেছিল! ড্রাঙ্ক হয়ে ট্যাভার্নে মারামারি করে দু’-রাত হাজতে কাটিয়েছেন। তারপর বাড়ি ফিরে ভগবান আর ধর্মের আদ্যশ্রাদ্ধ করে চিৎকার করে বলেছেন: Religion is the sigh of the oppressed creatures, the heart of a heartless world, the soul of the soulless conditions. It is the opium of the people.

এখন তো শুধু নেশাগ্রস্ত হয়ে বলছেন। পরে না কি কার্ল এইসব কথা লিখে বুর্জোয়া বিশ্বাসের বিরুদ্ধে জগৎজোড়া বিপ্লব নিয়ে আসবেন!

কার্ল মার্কসের বাবা-মা দু’জনেই চান না, তাঁদের ছেলের সঙ্গে জেনির বিয়ে হোক। জেনি বুদ্ধিমতি। সুন্দরী এবং ধনী পরিবারের মেয়ে। কী কারণে জেনি কার্লের সঙ্গে ফেঁসে গিয়েছে! তাঁদের মাথায় ঢোকে না! কার্ল ইজ বিলিয়ান্ট! কিন্তু নির্ভরযোগ্য কি? ওর সঙ্গে সংসার করা যায়? কার্ল মাতাল হলে ঈশ্বরহীন দানব। আর যখন ও সোবার, তখনও তর্কের নেশায় ও বুঁদ। মুখের ভাষা কী বিটার, কী ফিয়ার্স, কী ডেস্ট্রাকটিভ! স্ত্রী হয়ে এইরকম একটা চণ্ডালের সঙ্গে ঘর করতে পারবে জেনি? তারপর বাচ্চাকাচ্চা হলে কোথা থেকে আসবে সংসারের টাকা? যে শ্রমিকদের জন্য ও লড়াই করবে, তারা কি ওর ভরণপোষণের ভার নেবে? সেই ভার তো বহন করতে পারে কারখানার মালিকরা? আর সেই মালিকদের ও দিচ্ছে গালাগালি! কে দেবে ওকে চাকরি?

কার্ল মার্কসের সঙ্গে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, সঙ্গে মার্কসের কন্যারা

যাক গে! এই প্রশ্ন থেকে এখন কেটে পড়ে চলে যাচ্ছি কার্ল মার্কসের টেবিলে। তিনি নিমগ্ন তাঁর উপন্যাসে। উপন্যাসের নাম ‘স্করপিয়ন অ্যান্ড ফেলিক্স’। বেশ অনেকটাই লেখা হয়ে গিয়েছে। তিনটে মূল চরিত্র। দর্জি মার্টেন। দর্জির ছেলে স্করপিয়ন। তারই নামেই উপন্যাসের নাম। সেই চরিত্রই ক্রমশ হয়ে উঠছে মধ্যমণি। তার মেজাজটা অনেকটাই কার্লের মতো। আর দোকানে দর্জিগিরি শিখতে এসেছে একজন। তার নাম ফেলিক্স।

উপন্যাসের কেন্দ্রে ক্রমশ ঢুকছে অনেক তর্ক-বিতর্ক। বেসিক্যালি, দোকানের মালিক এবং শ্রমিক, বুর্জোয়া এবং প্রলিতারিয়াত, দুটো ক্লাস এদের মধ্যে, এই তিনটে চরিত্রের মাধ্যমে কার্ল গড়ে তুলতে চাইছেন একটা অ্যাবসার্ড, অ্যাবস্ট্রাক্ট, ফিলোসফিকাল ডিবেট। কিন্তু কাজটা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। সাহিত্য না-হয়ে দর্শনের কচকচানি হয়ে উঠছে ক্রমশ। কী করা যায়?

লরেন অ্যান্ড হার্ডির আদলে মার্কসের বইয়ের প্রচ্ছদ

কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে ফেলেন কার্ল! চুপ করে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। ব্র্যান্ডিতে একটা গভীর চুমুক দেন। সিগার ধরান। তারপর লরেন্স স্টার্ন-এর ক্লাসিক উপন্যাস, প্রতিটি শিক্ষিত মানুষকে পড়তেই হয়, সেই বিপুল গ্রন্থ, ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড ওপিনিওন অফ ট্রিস্ট্রাম শ্যান্ডি, জেন্টলম্যান’-এর পাতা ওল্টাতে থাকেন। এই উপন্যাস কার্লের মডেল ও প্রেরণা। এই উপন্যাসের ভাবনাচিন্তার কিছু মালমশলা নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে একটা বিতর্কের বিশ্বাস্য অবয়ব তৈরি করতে হবে: যাঁদের দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে চাই, মানে যাঁদের মতামত থাকবে আমার তিন চরিত্রের তর্কাতর্কির মধ্যে, তাঁরা হলেন ইমানুয়েল কান্ট, জোহান গটলিব, জন লক। কিন্তু কী উপায়ে বুনে দিতে হবে এঁদের দর্শন সাহিত্যগুণ বজায় রেখে? সেই পথ দেখাবেন লরেন্স স্টার্ন।

‘ট্রিসস্ট্রাম শ্যান্ডি’র পাতা আবার ওল্টাতে থাকেন কার্ল মার্কস। তারপর মেজাজ হারান! নিজের ওপর দানবীয় রাগে চিৎকার করে ওঠেন: Who says, anger is an irrational flaw? I shall utilize anger as an analytical tool and as a revolutionary catalyst! আরও খানিকটা ব্র্যান্ডি গলায় ঢেলে কার্ল টান দেন টেবিলের ড্রয়ারে। বেরিয়ে আসে আরও একটা অসমাপ্ত অসহায় পাণ্ডুলিপি। একটা কাব্যনাট্য। নাম ‘উলানেম’ (Oulanem)।

ঘটনা ঘটছে ইতালির এক পাহাড় ঘেরা রহস্যপুরীতে। সেখান এসেছে উলানেম নামের এক জার্মান পর্যটক। সঙ্গে তার ইতালীয় বন্ধু লুচিন্দো। আরও এক চরিত্র ওই পাহাড়ি শহরেই থাকে, তার নাম পারতিনি। আরও তিনটি চরিত্র আছে এই কাব্যনাট্যে: আলওয়ানডের, তার সৎ মেয়ে উইরিন আর ধর্মযাজক পেত্র। নাটক শুরু এই তীব্র স্বগতোক্তিতে: All lost! The hour is now expired. And time stands still. This pigmy universe collapses.

কার্ল মার্কস স্থির-দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন পাতার পর পাতা লিখেও শেষ না-হওয়া নাটকটির দিকে। যতটা তিনি লিখেছেন, সবটাই কি নয় গোয়েটের রোম্যান্টিক লেখা প্রমিথিউসের কাছে ঋণী? কার্ল মার্কস তখনও জানেন না, ১৮৩৯-এ আরও একবার তিনি ফিরে আসবেন এই নাটকে। তখনও শেষ হবে না এই অশেষ নাটক। এবং কার্ল মার্কসের ম্যাগনাম ওপাস– ‘দাস ক্যাপিটাল’, তাও তো থেকে গেল, তিন খণ্ডের অসমাপ্ত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো!

কার্ল মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর নোটস

তা হোক, কিছু কিছু অসমাপ্তি যুগে যুগে হয়ে থাকে ইতিহাসের পরম প্রাপ্তি। শেষ না-হওয়ার হতাশা ও বিশ্বাস নিয়েও। কার্ল মার্কস দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা চিঠি লিখতে শুরু করেন:

প্রিয়তমা জেনি, তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হোক, তোমার আমার পরিবারের কেউ চান না। আমাকে নিয়ে তুমি সুখী হবে না, এই বিষয়ে তারা নিশ্চিত। তবু আমি তোমাকে বিয়ে করব। এবং বিয়ে করব প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চে গিয়ে ক্রিশ্চান বিয়ের সাবেকি স্টাইলে। যদিও আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বর নেই, এই মহাবিশ্ব ঈশ্বরহীন। আমার ধারণা আমাকে কিছুদিনের মধ্যেই দেশ থেকে নির্বাসিত হতে হবে, আমার বৈপ্লবিক প্রত্যয় ও প্রচারের জন্য। কোনও দেশ, কোনও শহরে হয়তো জুটবে আমার মাথা গোঁজার জায়গা। কিন্তু কোনও রাষ্ট্র আমাকে স্বীকৃতি দিয়ে গ্রহণ করার মতো আহাম্মক হবে না। আমাকে আমৃত্যু স্টেটলেস থাকতেই হবে!
তবুও কি তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
তোমার কার্ল মার্কস।

………… রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব ………….