


ফেভারিট-আন্ডারডগের পাথর সরাতেই ফুটবল মাঝে মাঝে নিয়ে আসে সিসিফাসদের। সেই পাহাড়চূড়োয় পৌঁছতে পারার আগেই পাথর গড়িয়ে যায়। ফের সে ফিরে আসে। আবার ঠেলে দেয় পাথর। এ যেন এক বৃত্ত। সময়ের পানা জমা পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে কেউ জানান দেয়– জলের অস্তিত্ব। জেগে ওঠে খেলার বুকে ধুকপুক করতে থাকা প্রাণবায়ু। এহেন সিসিফাস কখনও হয়ে যান পাপা বওবা দিওপ, আবার কখনও হয়ে যান ক্যামেরুনের ফ্র্যাঙ্কোইস ওমাম বিইক।
খেলার মাঠ। স্কোরলাইন ০-০। যে মুহূর্ত, বিশ্বের সমস্ত আবহমান বৈষম্যের বিপ্রতীপে থেকে যায় এক পতাকার মতো, সেই মাঠের ভিতর চোখ রাখা দর্শক আশ্চর্য স্বাভাবিকতায় মেনে নেয় এই বৈষম্যকেই। তাঁর মনোলোকে থেকে যায় ছোট দল-বড় দল, নামী-অনামী, আন্ডারডগ-ফেভারিটের মতো অস্বস্তিকর শব্দবন্ধ।
মনে পড়ে যায় দু’দশক আগের কথা। ২০০২ সাল। দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানে বিশ্বকাপ। সেবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে এল সেনেগাল। আফ্রিকার সবুজে ঘেরা দেশ সেনেগাল প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামল যে দলের বিরুদ্ধে, তারা ঠিক আগের বিশ্বকাপেই বিশ্বজয় করে এসেছে। ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স। থিয়েরি অঁরির ফ্রান্স। ডেভিড ত্রেজেগুয়ের ফ্রান্স। প্যাট্রিক ভিয়েরার ফ্রান্স।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আগমন ছিল রাজকীয়। জিদানের চোট সত্ত্বেও ফ্রান্স সেবারে টুর্নামেন্ট জয়ের দাবিদার। বেটিং বাজারে ক্লডিও ম্যাকালেলে-ইমানুয়েল পেতিতের ফ্রান্সের ওপর বাজি ধরা হচ্ছে চড়া দামে। এহেন ফ্রান্সের সঙ্গে বিশ্বকাপে হামাগুড়ি দেওয়া সেনেগালের খেলা। আস্ত একটা পৃথিবীর প্রায় কোনও মানুষই ভাবতে পারেনি এ আসলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এ আসলে বিশ্বকাপের লড়াই! প্রায় সকলেই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল ফ্রান্স সেনেগালকে কার্যত ধূলিস্যাৎ করে দেবে প্রথম ম্যাচেই। কিন্তু একেক মুহূর্ত আসে, বিপ্লবের মতো, যেখানে খেলা তার শিকড়ের টানে ফিরে যায় নিজস্ব বিশ্বাসে, খেলা আসলে সাম্যবাদের নিশান, এ-কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ফিরে আসেন হাদজি দিউফ। বাঁ-দিক থেকে একটা বিধ্বংসী দৌড়। বার্লিন ওয়ালের মতো ভেঙে যায় বিশ্বজয়ীদের ডিফেন্স লাইন। মাটি ঘেঁষা ক্রস থেকে গোল করে চলে যান পাপা বওবা দিওপ।

বাকি সময়টা অসম লড়াই। তবু, শেষাবধি জিতে যায় সেনেগাল। জিতে যায় ফুটবল।
আসলে ‘অঘটন’ শব্দটির মধ্যে যেমন আগ্রহ মিশে থাকে, তেমনই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের ঔদ্ধত্যও। যেন ছোট দলের জেতার কোনও অধিকারই ছিল না। অথচ খেলাধূলার মূল দর্শনই তো প্রতিযোগিতা– যেখানে নাম নয়, দিনের পারফরম্যান্সই শেষ কথা। মাঠে জার্সির ইতিহাস গোল করে না, খেলোয়াড়রাই করেন। অথচ আমাদের অজান্তেই যে গড়ে ওঠা বৈষম্য, যা সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে দড়, যা সম্ভাবনার বিচারে অধিক সম্ভাব্য, তাকেই বিধান মেনে নিয়ে একজনকে ‘ফেভারিট’ এবং অন্যজনকে ‘আন্ডারডগ’ বলে দেওয়ার যে চল– তা কালে কালে স্থানু পাথরের মতো চেপে বসে।
সেই পাথর সরাতেই ফুটবল মাঝে মাঝে নিয়ে আসে সিসিফাসদের। সেই পাহাড়চূড়োয় পৌঁছতে পারার আগেই পাথর গড়িয়ে যায়। ফের সে ফিরে আসে। আবার ঠেলে দেয় পাথর। এ যেন এক বৃত্ত। সময়ের পানা জমা পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে কেউ জানান দেয়– জলের অস্তিত্ব। জেগে ওঠে খেলার বুকে ধুকপুক করতে থাকা প্রাণবায়ু। এহেন সিসিফাস কখনও হয়ে যান পাপা বওবা দিওপ, আবার কখনও হয়ে যান ক্যামেরুনের ফ্র্যাঙ্কোইস ওমাম বিইক।

’৯০। ইতালিয়া। রজার মিল্লা তখন কেরিয়ার সায়াহ্নে। বিশ্বকাপে নামছে ক্যামেরুন। দলে সে অর্থে কোনও ফর্মে থাকা তারকা নেই। বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ফরাসি লিগের নিচের দিকের দলগুলিতে খেলে। প্রথম ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে ’৮৬-র বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার। মারাদোনা-যুগ মধ্যগগনে। ইতালিতে মারাদোনা যখন খেলতে নামছেন, ইতালি দুইভাগে ভেঙে যাচ্ছে। নিজের দেশকে সমর্থনের বদলে নেপলসের ঈশ্বর মারাদোনার জন্য আর্জেন্টিনার পতাকা তুলে নিচ্ছে সান সিরোর আজুরি সমর্থকরা। বিশ্ব জুড়ে মারাদোনা তখন বিস্ময়।
মারাদোনাকে দেখার জন্য ইতালিতে এমন ভিড় হল বিশ্বকাপে যে, পুলিশ নামাতে হচ্ছে স্টেডিয়ামের বাইরে! এহেন মারাদোনার রথের চাকা বসে গেল ক্যামেরুনের সামনে। শুধু কি মারাদোনা? বুরুচাগা-বাতিস্তা-রুগেরির মতো তারকাখচিত কার্লোস বিলার্দোর দলটা প্রথম ম্যাচেই হেরে গেল ক্যামেরুনের কাছে! গোলকিপার নেরি পুম্পিদোর সামনে দিয়ে গোল করে গেলেন ক্যামেরুনের ফ্র্যাঙ্কোইস ওমাম বিইক। ক্যামেরুন প্রথমবার আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেল সেবার। অথচ, এই ম্যাচ শুরুর আগেও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের দূরকল্পনাতেও ছিল না এমন কোনও ফলাফল।

বিশ্বকাপের ইতিহাস খুললেই তাই দেখা যাবে, তথাকথিত অঘটনই তার প্রাণ। ক্যামেরুন, সেনেগাল, দক্ষিণ কোরিয়া– প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময়ে ফুটবল-শক্তিধরদের ভুল প্রমাণ করেছে। সেই মুহূর্তগুলোই বিশ্বকাপকে শুধু ট্রফির লড়াই নয়, সম্ভাবনার উৎসব করে তোলে।
অঘটনের ইতিহাস লিখতে গেলে চলে আসে আরও অসংখ্য ম্যাচ। কিন্তু সেসব ইতিহাসের বালুচর থেকেও যে সারসত্যটি ঝিনুকের মতো উঠে আসে, তা চিনতে পারা জরুরি। এই যে ‘অঘটন’, আমাদের চলতি কথায় বারেবারে ফিরে আসে যে শব্দখানা– সেই অঘটনের নেপথ্যে আমাদের যে সামাজিক নির্মাণতত্ত্ব দায়ী, তাকে একেবারে মুছে ফেলাও কি সম্ভব?
ব্যক্তির আবেগ থেকে যখন কোনও তারকা বা দল সমষ্টির স্নায়ু ছুঁয়ে যায়, সেই মুহূর্ত থেকে তাকে ঘিরে থাকা ভালোবাসার পানসিই তো গড়ে তোলে এই বৈষম্য। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যখন আফ্রিকার দেশ মরক্কো মাঠে নামে কেউ কি ভেবেছিল, তারা হারিয়ে দেবে প্রবল পরাক্রমী পর্তুগালকে? পৌঁছে যাবে সেমিফাইনালে? অথচ তারা পেরেছিল এবং তাদের দলের এক ঝাঁক খেলোয়াড়ই পরবর্তীতে তারকা হয়ে ওঠে।

এবারের বিশ্বকাপে তারাই আবার হয়ে উঠেছে ফেভারিট। ব্রাজিলের মতো দলকে ‘আটকে দেওয়া’-র বদলে লেখা হচ্ছে ‘ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ড্র করল মরক্কো’। অর্থাৎ, মরক্কো নিজেই নিজেদের তুলে এনেছে এক স্তর থেকে অন্যস্তরে। মানুষ মরক্কোর জন্য গলা ফাটাচ্ছে। যেভাবে নিজেদের তুলে এনেছে ক্রোয়েশিয়া কিংবা বেলজিয়াম। আজ তাঁদেরও সমর্থকের সংখ্যা বেড়েছে পাল্লা দিয়ে।
ফুটবলে ‘অঘটন’ শব্দখানা বহুমাত্রিক। তাঁর দু’পাশে প্রতিপক্ষেরা বদলে যায়। কারও ক্ষমতায়ন হয়, আবার কারও বা ক্ষয় হয় সেই ক্ষমতাই। জয়-পরাজয়ের কিংবা চোখ ধাঁধানো ফুটবলের সূচকে এই ক্ষমতা আসলে একটু একটু করে জমা হওয়া মানুষের ভালোবাসামাত্র। তাই বড় দল ছোট দলের কাছে হারলে তাকে অঘটন না বলে অন্য কিছু বলা যায় কি? বলা যায়– ফুটবল! কারণ, এই খেলার সবচেয়ে বড় সত্যই হল, এখানে কোনও ফল আগে থেকে লেখা থাকে না। আর সেই কারণেই কোটি কোটি মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন, ৯০ মিনিটে অসম্ভবও সম্ভব।
ফুটবলে তাই অঘটন নয়, বরং অনিশ্চয়তাই নিয়ম; নিশ্চিত ফলটাই ব্যতিক্রম।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved