


বিভিন্ন সত্তার উপস্থিতির মধ্যে থেকেও আডা নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে। আডার শরীর হয়ে উঠেছে এক স্রোতস্বিনী নদী। নিরন্তর বয়ে চলা স্বাদু জলধারা। অন্য জগৎ থেকে বিভিন্ন সত্তারা স্রোতের মতো প্রবেশ করেছে আডার মনুষ্যসত্তায়। সে সেইসব আত্মাদের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করে গেলেও কাউকেই ফিরিয়ে দেয়নি। সে যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছে, নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, রূপান্তরিত হয়েছে, কিন্তু নিজের ভিতর ধারণ করেছে আমিত্ব অতিক্রম করা বহুত্বকে। তাই আডা ‘Freshwater’। এক প্রবহমান জলধারা।
‘Je est un autre’ (I is another)
ফরাসি কবি Arthur Rimbaud তাঁর একটি চিঠিতে একথা লিখেছিলেন। এই কথার অর্থ হল, কোনও মানুষই তার চেতনার একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়। মানুষের অবচেতনের বহুমুখী প্রবাহ অনেক ক্ষেত্রেই এক স্থির ‘আমি’ বা আমিত্ববোধের ধারণাকে অতিক্রম করে যায়। ‘আমি’ কী? ‘আমি’ কে? আমার ভিতরঘরের আমি কেন এত আলাদা, বাইরের ‘আমি’-র থেকে? লোকসমক্ষে যে ‘আমি’ হাঁটি-চলি, কথা বলি, এবং এই যে একলা ‘আমি’, তার মাঝখানেও যে নানা সত্তার জাগরণ টের পাই সময়-পরিস্থিতির ফেরে, এরা কারা? সত্যিই তো! লালনও প্রশ্ন করেছেন, ‘আমার ঘরে বসত করে কয়জনা?’ সাদা রং যেমন তার ভিতরে ধারণ করে থাকে বেণীআসহকলা, এবং সঠিক সময় এলে আকাশে মেলে ধরে তার রঙিন পেখম, তেমনই হয়তো বিশেষ পরিস্থিতি বা অবস্থায় মানুষও টের পায় যে, তার শরীর একটি হলেও, সেই শরীর ধারণ করে রয়েছে বহু সত্তা। রোম্যান্টিক কবি Samuel Taylor Coleridge দিয়েছিলেন ‘Infinite I am’-এর ধারণা। তাঁর কথায় ‘আমি’-র ভিতর নিহিত রয়েছে এক অসীম, ঐশ্বরিক ও সর্বব্যাপী সত্তা এবং প্রতিটি মানুষের চেতনা আসলে এক বৃহত্তর মহাজাগতিক চেতনার অংশ। এতসব চিন্তা মাথায় গিজগিজ করতে শুরু করেছিল প্রথম যে বইটি পড়ে, তা হল নাইজেরিয়ান সাহিত্যিক Ben Okri-র লেখা ‘The Famished Road’। এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র একটি শিশু, যে আসলে একটি ‘Spirit child’, অর্থাৎ সে যে-কোনও সময় বাস্তব জগতের সীমানা অতিক্রম করে চলে যেতে পারে এক অতিপ্রাকৃতিক জগতে। সে নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা সম্প্রদায়ের একজন ‘Abiku’। ইয়োরুবাদের বিশ্বাস আবিকুদের শিশু অবস্থাতেই মৃত্যু হয় এবং তারা বারবার জন্ম নিতে থাকে। কিন্তু এই উপন্যাসে আজারো, সেই স্পিরিট চাইল্ড, আটকে পড়ে জীবিত এবং মৃতদের জগতের মাঝখানে। আজারো বড় হতে হতে নিজের মধ্যে টের পায় টের পায় বিভিন্ন সত্তার উপস্থিতি।

উপন্যাসটি পড়ে এমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি, যে শুরু হয় এই ধারার অন্যান্য উপন্যাসের বেপরোয়া খোঁজ। পেয়েও যাই বেশ কিছু– যাকে বলে, ‘হিডেন জেমস’! যেমন ধরা যাক, Amos Tutuola লিখিত ‘The Palm-Wine Drinkard’ কিংবা Helen Oyeyemi-র উপন্যাস ‘The Icarus Girl’। তবে যে বইটির নাম না করলে অন্যায় হবে, সেটি হল মেক্সিকান লেখক Juan Rulfo-র লেখা ‘Pedro Paramo’। কিন্তু এইসব বই খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎই সন্ধান পেলাম এক এমন বইয়ের যা আমার চিন্তাস্রোতকে দিল এক পাগলপারা গতি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অশান্ত ঢেউয়ের মতন আছড়ে পড়তে লাগল আমার চেতনার শান্ত সৈকতে। মনে আছে এক বর্ষাদুপুরে পড়তে শুরু করি নাইজেরিয়ান লেখিকা Akwaeke Emezi লিখিত এই নতুন খুঁজে পাওয়া উপন্যাস ‘Freshwater’। বই খুলেই উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লেখা–
‘For those of us
With one foot
On the other side’
বুঝতে বাকি রইল না যা আমি পড়তে চাইছিলাম, হাতে এসে পড়েছে ঠিক সেরকমই এক সম্পদ। এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র নাইজেরিয়ার ইগবো উপজাতির আডা নামের একটি মেয়ে। শৈশব থেকেই সে নিজের অস্তিত্বের মধ্যে অনুভব করতে শুরু করে একাধিক আত্মার উপস্থিতি। ইগবোরা বিশ্বাস করেন যে কিছু মানুষের শরীরে বসবাস করতে পারে Ogbanje আত্মারা। এই আত্মারা হল এমন শিশুদের আত্মা যারা মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়ার পর, শিশু অবস্থাতেই তাদের মৃত্যু হয়। এরপর এই শিশুরা আবার একই মায়ের গর্ভে ফিরে আসে। ‘The Famished Road’-এর মুখ্য চরিত্র আজারো যেমন ছিল Abiku-দের মধ্যে ব্যতিক্রম। সেরকমই Freshwater উপন্যাসে আডা মুখ্য এবং ব্যতিক্রমী চরিত্র, কারণ অন্যান্য Ogbanje শিশুদের মতন শৈশবে তার মৃত্যু হয় না। আডা জন্মগ্রহণ করার পর Ogbanje আত্মারা নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দেয়। তারা বলে–
‘We are the ones who came before.’

পাঠক বুঝতে পারে আডা চরিত্রটির মধ্যে উপস্থিত রয়েছে তার জন্মের পূর্ববর্তী আত্মাদের অস্তিত্ব। এই আত্মারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আডাকে চালনা করে। মেয়েটি আত্মপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আডার মনে হতে থাকে যে, তার ভিতরে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর যেন সর্বক্ষণ একসঙ্গে কথা বলে চলেছে। একই শরীরে এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্ব ধারণ করার ফলে তার সবসময় মনে হতে থাকে, এই শরীর তার নিজের নয়। প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সর্বক্ষণ এই একইরকম যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়– তারা যা চিন্তা করে বা তাদের স্বাভাবিক ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা, মানসিক আকর্ষণ, যৌন প্রবৃত্তি সমস্ত কিছু আটকা পড়ে যায় এক ভুল শরীরে। যেমন ধরা যাক, একজন পুরুষ, অর্থাৎ শরীর-বিচারে পুরুষ হলেও মননে সে নারী– তার চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি সবই একজন নারীর মতো। সেক্ষেত্রে এমনটা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, এক নারী বন্দি হয়ে রয়েছে একজন পুরুষের শরীরে। এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। এমন দৃষ্টান্তও দেখা যেতে পারে যে, শরীর-বিচারে নারী, এমন এক ব্যক্তির ভিতর সময় ও পরিস্থিতির হেরফেরে কখনও জেগে উঠছে পুরুষ সত্তা, আবার কখনও সক্রিয় হচ্ছে নারী সত্তা। এখানে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক Gilles Deleuze এবং Felix Guattari-এর Rhizomatic Identity-র ধারণা। তাঁদের মতে, যে কোনও মানুষের পরিচয়েরই কোনও একক কেন্দ্র থাকে না। প্রত্যেক মানুষের পরিচয় তৈরি হয় বহু বিন্দুর সংযোগে, যেন একটা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। আডার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম। আডার কোনও একক পরিচয় নেই। তার শরীরের মধ্যে উপস্থিত সব আত্মাদের পরিচয়সূত্র যুক্ত হয়েছে তার আত্মপরিচয়ের সঙ্গে।
একসময় আডা কলেজে পড়ার জন্য আমেরিকায় পাড়ি দেয়। বিদেশে গিয়ে সে আরও একাকিত্বে ভুগতে শুরু করে। একজন আফ্রিকান অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় সে সকলের থেকে একরকম বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। একইসঙ্গে তাকে লড়াই করতে হয় নিজের ভিতরে জাগ্রত সত্তাগুলির সঙ্গে। তার জীবনে প্রেম আসে, যৌন অভিজ্ঞতা হয়। কিন্তু সমস্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেই সে পরিচিত হতে থাকে একজন একক আত্মপরিচয়সম্পন্ন তরুণী হিসেবে নয়, বরং বহু সত্তা ধারণকারী এক ব্যক্তি হিসেবে। কলেজে পড়াকালীন একসময় আডা শিকার হয় যৌন হেনস্থার। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে আডা নিজের চেতনা এবং অবচেতনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে তার ভিতরে বসবাসকারী আত্মারা হয়ে ওঠে অধিক শক্তিশালী। বিশেষ করে আডাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে নির্দয়, আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক এক অস্তিত্ব– Asughara। এই আত্মা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আডার শরীর এবং সম্পর্ক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। উপন্যাসটির মোট ২২টি অধ্যায়ের মধ্যে সাতটি অধ্যায়ের গল্প বলা হয়েছে Asughara-র বয়ানে। উপন্যাসের সপ্তম অধ্যায়ে এই আত্মা বলছে–
‘I was a child of trauma; my birth was on top of a scream and I was baptized in blood. By the time Ada brought me to Georgia I was ready to consume everything I touched.’

আডা যৌন অত্যাচারের শিকার হওয়ার পর Asughara তার শরীর এবং মনের ওপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় এই আত্মা আসলে আডাকে নিরাপত্তা দিতে চায়। Asughara-র বিশ্বাস সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে আডা তাকে নিজের শরীরে আহ্বান করেছে এবং আডাকে রক্ষা করা তার কর্তব্য। এই অনুভূতির সত্যতা থেকে সে আডা সম্পর্কে বলে–
“She was so gullible: she went and threw herself right into the arms of people who broke her; she would see danger and instead of avoiding it like a person with sense, she would walk behind its teeth. As if she would be safe. As if her childhood shouldn’t have taught her better.”
আডা সর্বদা বিভ্রান্ত হয়ে রয়েছে, সে নিজের কোনও একক সত্তা সম্পর্কে অবগত নয়, এবং তাকে অভিনব উপায়ে রক্ষা করে চলেছে এক আত্মা। Asughara ভিন্ন পৃথিবীর অস্তিত্ব। মনুষ্য-পৃথিবীর রীতি-রেওয়াজ বা নিয়মকানুন তার কাছে দুর্বোধ্য। তাই অনেক সময় আডাকে রক্ষা করতে গিয়ে Asughara আডার শরীরকে বানিয়ে তুলেছে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। তবুও একথা অস্বীকার করা ভুল হবে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপযুক্ত নিরাপত্তা পরিকাঠামোর অভাবে প্রান্তিক যৌনতার মানুষরা প্রতিনিয়ত যৌন লাঞ্ছনা, এমনকী ধর্ষণের শিকার হয়। এইরকম অসহায় সময়ে এই সমস্ত মানুষদের নিজেদেরকেই হয়ে উঠতে হয় নিজের রক্ষাকবচ। নিজের ভেতরেই জন্ম দিতে হয় এক সাহসী, বেপরোয়া, আক্রমণাত্মক সত্তাকে। Asughara সেই সত্তারই প্রতিফলন।
এরপরে দেখা যায় আডার শরীরে Saint Vincent নামক আরও এক সত্তার তীব্র উপস্থিতি। বিশেষত এই সত্তাটির মাধ্যমে এই উপন্যাসে জেন্ডার ফ্লুইডিটি একটি স্বতন্ত্র পথ খুঁজে পায়। এই উপন্যাসে Saint Vincent সত্তাটি প্রকৃতপক্ষে নন বাইনারি বা ট্রান্সজেন্ডার চেতনার প্রতীক। এই আত্মা আডার শরীর, লিঙ্গ পরিচয় এবং যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নিজের ইচ্ছেমতো রূপান্তরিত করতে সক্ষম। আডার শরীরকে সে ব্যবহার করে নিজের শরীর ভেবে।
‘He molded her into a new body there, a dreambody with reorganised flesh and a penis complete with functioning nerves and expanding blood vessels, tautening easily into an erection.’
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে Salvador Dali-র আঁকা ‘Metamorphosis of Narcissus’ ছবিটির কথা। দালি, গ্রিক দেবতা নার্সিসাসের একটি ফুলে (ড্যাফোডিল) রূপান্তরিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন ছবিটিতে। এখানেও একটি সত্তা রূপান্তরিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সত্তায়, যা আবার সামনে আনছে Hermann Hesse-র একটি চিন্তাসূত্র–
‘The belief that there is only one self is an illusion.’

এই উপন্যাসের ১৫-তম অধ্যায়টি আমরা পাই আডার বয়ানে, কবিতার আকারে। উপন্যাসের ২২টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র চারটি অধ্যায়ে আমরা আডার একটি স্বতন্ত্র একক পরিচয় পাই। গল্পের এই অংশে এসে আমরা এই বহু সত্তা ধারণকারী নারী চরিত্রের নিজস্ব স্বর শুনতে পাই৷ সেই কণ্ঠস্বর অসহায়ত্বের, ভীতির, স্বীকারোক্তি এবং সত্যকথনের। গোটা উপন্যাসে আমরা বিভিন্ন সত্তার কণ্ঠস্বর শুনি, এবং সেই অংশগুলো লেখা হয়েছে গদ্যের ভাষায়। বইয়ের অধিকাংশ অধ্যায় শোনা যায় একটি সমষ্টিবদ্ধ কণ্ঠস্বর অথবা Asughara-র বয়ানে। ব্যতিক্রম এই ১৫-তম অধ্যায়, যেটি লেখা হয়েছে কবিতার ভাষায়। কবিতা স্বতঃস্ফূর্ত, অবচেতনের অতল থেকে উঠে আসা ধারাভাষ্য। কবিতা একপ্রকার সত্য মন্ত্রোচ্চারণ। তাই আডা কবিতার মধ্যে দিয়েই নিজের দুর্বলতা, ভীতি এবং আঘাত পাওয়ার যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারে। সে বলে–
“I went mad too young, you see,
they couldn’t wait to ride me.
I only scream on my better days,
crippled in meat and hot skin.
They couldn’t wait to ride me,
to drink from my terrible depths.
Crippled in meat and hot skin,
I tried to die from this body.”
এই কবিতায় উঠে এসেছে আডার নিজস্ব কণ্ঠস্বর খুঁজে না-পাওয়ার এবং প্রতিনিয়ত ভিন্ন ভিন্ন সত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার যন্ত্রণা। এই নিরন্তর অন্তর্দ্বন্দ্ব বিভিন্ন সময়ে তাকে পৌঁছে দিয়েছে চূড়ান্ত একাকিত্ব, আত্মগ্লানি এবং অসহায়ত্বের অন্ধকার পৃথিবীতে। আডার নিজের শরীর হয়ে উঠেছে তার স্বতন্ত্র সত্তার কারাগার। কিন্তু উপন্যাসের শেষে দেখা যায় আডা তার ভিতরে বসবাসকারী আত্মাদের উপস্থিতিকে মেনে নেয়। তার অস্তিত্ব আসলে অনেকগুলি সত্তার সমষ্টিগত অস্তিত্ব– এই সত্যকে সে অবশেষে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। ফলস্বরূপ দেখা যায় সে আর তার শরীরে অন্তর্লীন আত্মাদের সঙ্গে কোনওরকম সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে না। আডা বুঝতে পারে তার নিজস্ব সত্তা প্রকৃতপক্ষে একটি বৃহত্তর অলৌকিক জগতের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। তার শরীর আসলে বাস্তব এবং অতিপ্রাকৃতিক জগতের মাঝখানে থাকা একটি দরজা। ভারতীয় কবি ও দার্শনিক কবীর লিখেছিলেন–
‘চেতন এবং অবচেতনের মাঝখানে মন হল একটি টাঙিয়ে রাখা দোলনা।’

অর্থাৎ মানুষ চেতনা এবং অবচেতনের মধ্যবর্তী সীমারেখা সময় এবং পরিস্থিতির ফেরে যে কোনও সময় অতিক্রম করতে পারে। নন-বাইনারি বা ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের লিঙ্গ-তরলতার অর্থাৎ জেন্ডার ফ্লুইডিটির ধারণাও একইরকম। প্রাইড মান্থ আমরা উদ্যাপন করি সবরকম লিঙ্গ পরিচয়ের এবং প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সমাজের মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। এই উপন্যাসে আডা চরিত্রটি যেন হয়ে উঠেছে এই বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিকরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক। বিভিন্ন সত্তার উপস্থিতির মধ্যে থেকেও আডা নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে। আডার শরীর হয়ে উঠেছে এক স্রোতস্বিনী নদী। নিরন্তর বয়ে চলা স্বাদু জলধারা। অন্য জগৎ থেকে বিভিন্ন সত্তারা স্রোতের মতো প্রবেশ করেছে আডার মনুষ্যসত্তায়। সে সেইসব আত্মাদের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করে গেলেও কাউকেই ফিরিয়ে দেয়নি। সে যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছে, নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, রূপান্তরিত হয়েছে, কিন্তু নিজের ভিতর ধারণ করেছে আমিত্ব অতিক্রম করা বহুত্বকে। তাই আডা ‘Freshwater’। এক প্রবহমান জলধারা।
এই উপন্যাস শেষ হচ্ছে আডার নির্ভীক আত্মকথনের মধ্য দিয়ে–
‘I am the brothersister who remained. I am a village full of faces and a compound full of bones, translucent thousands. Why should I be afraid? I am the source of the spring.
All freshwater comes out of my mouth.’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved