


নকুড়বাবুকে তাড়া করে আসছে চার-পাঁচটি দল। এই দলগুলির নানা পরিচয়। সেই পরিচয় তাদের মনুষ্য পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। একদলের ঝান্ডায় ত্রিশূল। আরেক দলের ঝান্ডায় চাঁদ। একদলের ঝান্ডায় এক ফুল তো আরেক দলের ঝান্ডায় আরেক ফুল। একদলের ঝান্ডা লাল, তো আরেক দলের ঝান্ডা কমলা। তাদের রাজনৈতিক দলত্ব, ধর্মীয় দলত্ব নানারকম। তবে একটা উদ্দেশ্য এক। তারা নকুড়বাবুর দৃষ্টি চায়, মুন্ডু চায়, মন চায়। কেন?
১২.
নকুড়বাবু ছুটছেন।
কোন নকুড়বাবু? সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট আশ্চর্য বিজ্ঞানী প্রোফেসর শঙ্কুকে যিনি ‘তিলুবাবু’ বলে ডাকতেন, সেই নকুড়বাবু। যিনি বর্ষার দিনে গোলা তেঁতুলের আচার খাচ্ছিলেন আর একটা জ্যোতির্ময় ফুটবল তাঁকে অজ্ঞান করে দিয়ে গেল– সেই নকুড়বাবু। যিনি আপনার চোখের সামনে নয়কে হয় এবং হয়কে নয় করে দিতে পারেন সেই নকুড়বাবু। সামনে তাজমহল, অথচ নকুড়বাবু চাইলে আপনাকে দেখাবেন তাজমহল তৈরি হচ্ছে। সামনে কিছু নেই, অথচ নকুড়বাবু চাইলে আপনাকে দেখাবেন সামনে সোনার শহর। সেই নকুড়বাবু।
ছুটছেন। প্রচণ্ড গতিতে। লোকজনকে কাটিয়ে, তড়িৎগতিতে! কেন? কারণ তাঁকে তাড়া করে আসছে চার-পাঁচটি দল। এই দলগুলির নানা পরিচয়। সেই পরিচয় তাদের মনুষ্য পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। একদলের ঝান্ডায় ত্রিশূল। আরেক দলের ঝান্ডায় চাঁদ। একদলের ঝান্ডায় এক ফুল তো আরেক দলের ঝান্ডায় আরেক ফুল। একদলের ঝান্ডা লাল, তো আরেক দলের ঝান্ডা কমলা। তাদের রাজনৈতিক দলত্ব, ধর্মীয় দলত্ব নানারকম। তবে একটা উদ্দেশ্য এক। তারা নকুড়বাবুর দৃষ্টি চায়, মুন্ডু চায়, মন চায়। কেন? কারণ তারা জনসাধারণকে নকুড়বাবুর চোখ, মুন্ডু, মন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। নকুড়বাবু ধরা দেবেন না। ছুটছেন। একটা দুর্দান্ত চেজ-সিন।

এমন একটা দৃশ্যের কথা ভাবছিলেন হবু-চলচ্চিত্র পরিচালক কুমার রতন। তার নাম কুমার রতন নয়, কিন্তু নাম নিয়েছেন কুমার রতন। তিনি সত্যজিৎকে ট্রিবিউট দিতে চান। তাই এই পরিকল্পনা। স্ক্রিপ্ট রেডি কিন্তু প্রযোজক পাওয়া যাচ্ছে না। এটা কুমার রতনের প্রথম ছবি। তাই প্রযোজক পাওয়া কঠিন। তাছাড়া কুমার রতনের চেহারা অন্তরায়। এ জাতীয় ছবি করার জন্য যে-রকম চেহারা হতে হয়, সে-রকম চেহারা তাঁর নয়। মাথা ভর্তি টাক। বেঁটে মানুষ। বুড়ো হলে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মানিয়ে যেত। কিন্তু কুমার রতন বুড়ো নন। একালে ২৫ বছরের যুবক, টাক মাথা, গোলগাল– তাকে কে আর ইন্টালেকচুয়াল ভাববে! সত্যজিৎ একটা ব্যাপার!
অগত্যা কুমার রতন চোখ বন্ধ করে তাঁর না-হওয়া সিনেমার দৃশ্যগুলি দেখতে লাগলেন। এটা একটা ভালো উপায়। সিনেমা না-বানিয়েও সিনেমা দেখা যায়। চোখ বন্ধ করে নিজের না-করা সিনেমার দৃশ্যগুলিকে চোখের সামনে কল্পনা করা যায়। সেই কল্পনার কাজ কুমার রতন করে যাচ্ছেন। এজন্য নকুড়বাবু তাঁর প্রিয়। নকুড়বাবু অবশ্য আরও শক্তিশালী। কেবল দেখেন না, দেখাতেও পারেন। এইসব ভাবতে ভাবতে কুমার রতন তাঁর সিনেমার পরবর্তী দৃশ্যে চোখ বন্ধ করে প্রবেশ করলেন।

পরপর অনেক ক’টা বন্ধ ঘর। প্রতিটি ঘরের ভিতর গোপন বৈঠক চলছে। একটু পুরনো কায়দায় দৃশ্যটি ভেবেছেন রতন কুমার। বাজেট কম। তাই এমন ভাবনা। ঘরের ভেতর বৈঠক দেখাতে গেলে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী লাগবে। তাই ভেতরে কী কথা হচ্ছে, তার সারমর্ম দরজার উপরে ভেসে উঠবে। যেমন পিপিটি প্রেজেন্ট করার সময় বক্তা করেন। তেমনই।
গোপন বৈঠক এক, দরজায় লেখা: নকুড়বাবুর চোখ দিয়ে আমরা দেখাতে চাই যেখানে আজানের শব্দ সেখানে সেখানে আগে ছিল মন্দিরের ঘণ্টা। এটা যদি দেখানো ও শোনানো যায় তাহলে…
গোপন বৈঠক দুই, দরজায় লেখা: পালেরা বিদায় নিল। সেনেরা এল। বৌদ্ধ বিহারগুলো ব্রাহ্মণ্যবাদীরা দখল করছে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে লড়াই। তখন কোথায় মুসলমান। নকুড়বাবুকে সেইসব বই দিতে হবে।
গোপন বৈঠক তিন, দরজায় লেখা: কাফেরদের কীভাবে হারিয়ে দখল করা হয়েছিল সব তা দেখিয়ে জেহাদি বানাতে হবে।
গোপন বৈঠক চার, দরজায় লেখা: বিবেকানন্দ, সুভাষ আকবরের প্রশংসা করছেন দেখাতে হবে।

কুমার রতন আবার চোখ খুললেন। মনে হল দৃশ্যটা জমল না। কালারফুল হওয়া চাই। বিগ বাজেট ফিল্ম যদি হত! তিনি সত্যজিৎ নন। সত্যজিতের যে উদ্ভাবনী কল্পনা, তা কুমার রতনের কোথায়। গুপী গাইন বাঘা বাইনে ভূতের নাচের দৃশ্য। আহা! ভূত মানে কী ভূত? ভারতের সামাজিক আর রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়ে দিলেন। ভূত মানে অতীত। এখন সত্যজিৎ থাকলে কি নকুড়বাবুকে নিয়ে একটা উত্তরসত্য মার্কা কিছু বানাতেন না! খুবই বানাতেন। সেই সত্য যা দেখাইবে তুমি। নকুড়বাবু তো তাই পারেন। তখন কোথায় ‘এআই’ কোথায় কী? শুধু সত্যজিতের নকুড়বাবু। পাড়ার লাইব্রেরিতে বইতে যে বিবরণ পড়ছেন, তা দিয়ে মনের ছবি তৈরি করছেন, সেই ছবি দেখাচ্ছেন। সিধু জ্যাঠা যদি গুগল হন তাহলে নকুড়বাবু এআই। মানে পূর্বরূপ। তবে পার্থক্য আছে। নকুড়বাবুকে লোভী অবিবেকী মানুষ চাইলেই ব্যবহার করতে পারেন না। তেঁতুলখেকো এই সাধারণ মানুষটি নির্লোভ। নিজের মনের দখল নিজে রাখতে পারেন।
এইসব ভাবতে ভাবতে কুমার রতন আবার চোখ বন্ধ করলেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁর মন ক্লান্ত। তাই এবার এই চোখ-বন্ধ করে নিজের না-হওয়া সিনেমার দৃশ্যের পর দৃশ্য তিনি আর দেখতে পেলেন না। ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তাঁকে নকুড়বাবু স্বপ্নে দেখা দিলেন। বললেন, ভাই কুমার রতন। দুঃখ করো না। আমাদের মাকড়দায় তুমি কখনও আসোনি। আসতেও পারবে না। এই জায়গাটা হারিয়ে গিয়েছে। যারা আমাকে ধরার জন্য ছুটছে তারা আমাকে ধরতে পারবে না। আমি মাকড়দায় ঢুকে পড়ব। চিন্তাহরণ ঘোষাল মশাইয়ের কথা কি তুমি জানো? আমার বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথ। চিন্তাহরণবাবুর গেঁটে বাত সারিয়ে দিয়েছিলেন। তাই ঘোষালবাবু খুশি হয়ে ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। সাত হাজার বই। আমি পড়ি। ভাবি। দেখি। দেখাই। এই তো সেদিন দেখলাম। বিরাট মাঠ। একজন আরেকজনের বুক বিদীর্ণ করে রক্ত খাচ্ছে। বীভৎস দৃশ্য। মহাভারত, কুরুক্ষেত্র। রক্ত হাতে ভীম দাঁড়িয়ে। তার বীভৎস কাণ্ড দেখে কুরুক্ষেত্রের মাঠ থেকে সবাই পালাচ্ছে। আরেকদিন দেখলাম একজন দাড়িওয়ালা জোব্বা পরা লোক বসে আছে, তার গায়ে অনেক গয়নাগাটি, তার সামনে এনে রাখা হল একটা থালা। থালার ওপর একটা নকশা করা কাপড়ের ছাউনি, সেটা তুলে দেখানো হল, তাতে রাখা আছে একটা মানুষের মুন্ডু– এই সবেমাত্র কোপ মেরে ধড় থেকে আলগা করা হয়েছে সেটিকে। আওরঙ্গজেব আর দারা শিকো। বুঝলে ভাই কুমার রতন, দেখা আর দেখানো এই দুয়ের জগতে থাকতে থাকতে আজকাল মনে হয় মানুষের নয়, এই গ্রহের ইতিহাস পড়ব। অনেক তো মানুষ হল, এবার অন্য ইতিহাস। সেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে আর মানুষ থাকবে না। সব তুচ্ছ! আওরঙ্গজেব তুচ্ছ, দুঃশাসন তুচ্ছ, আকবর তুচ্ছ, হরিপদ কেরানি তুচ্ছ। আমাকে ধরতে আসা লোকেরা হঠাৎ থমকে যাবে। তাদের চোখের সামনে জেগে উঠবে প্রাচীন অরণ্য। সেই অরণ্যে তখনও মানুষের সৃষ্টি হয়নি। অনন্ত বরফ। সেই বরফ যুগের সামনে এসে তাদের সমস্ত মতলব ঢাকা পড়ে যাবে।

কুমার রতন ঘুমের মধ্যে দেখতে পেলেন তাঁর শরীর ঢেকে যাচ্ছে ঝরে পড়া বরফের তলায়। তবু ঘুমের মধ্যে খুব শান্তি হল তাঁর।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved