


ফিরেই বা কী হবে বারবার? সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ছবি তুলে ব্যক্তিগত গরিমা বাড়িয়ে সাধারণ লোক যেমন তাদের ছিবড়ের মতো ফেলে দেয়, তাদের কি খারাপ লাগে না? বা, হলই না-হয় ক্যামে সাবান, হাতে করে ১৪ হাজার কিলোমিটার যে নিয়ে এলাম হারামজাদা, সেটা এই মুখ বাঁকানো দেখতে? সেরকমই, আত্মাদের সঙ্গেও মানুষেরও এই স্বার্থের সম্পর্কে বিদেহীরা ক্রমাগত ফেরার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে হয়ে যান। বারবার ধাক্কা খেয়ে ভাবেন, এবার যখন ফিরব, তখন এমন ব্যোমকে দেব, বুঝবি!
আজকাল ভূতেদের দেখা পাওয়া যেমন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের এই ফিরতে না চাওয়াটা শুধুমাত্র আধুনিক যুগের প্রভাবে না, এতে আমাদের রীতিমতো দোষ আছে। তাছাড়া আমাদের ছোটবেলাতেও ইহলোক আর পরলোকের যোগাযোগ স্থাপন বেশ দুরূহ ব্যাপারই ছিল। তবে সমস্যাটা খানিক বেড়েছে আগের চেয়ে, সেটাও ঠিক। আজকাল সর্বত্র এত যে আলো, সেটা একটা জানা অসুবিধে। যাঁরা ওপারে পৌঁছে গেছেন, তাঁরা অন্ধকার ছাড়া প্রকট হন না। তাঁদের শরীর সূক্ষ্ম, দিনের তীব্র আলোয় এমনিতেই তাঁদের স্বচ্ছ অবয়ব ভালো করে ঠাহর হয় না, তার ওপর তাঁরাও চান না ওই বায়বীয় কায়া অকারণ ঝুঁকি নিতে গিয়ে উবে যাক। ভূতেদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রকৃষ্ট সময়টা ফলে ছিল সন্ধে-পরবর্তী। অনেকটা মার্কিন দেশে থাকা আত্মীয়দের মতো, ওরা ঘুমলে আমরা জাগি, আমরা জাগলে ওরা ঘুময়। আজকাল সন্ধের পরেও আলো কমে না, আনাচকানাচ বলে কিছু নেই যে সেখান থেকে অকস্মাৎ বেরিয়ে এসে সবাইকে তাজ্জব করে দেওয়া যাবে। ভূতেদেরও তো ফেরার জন্য একটা অনুপ্রেরণা দরকার?

এটা বলছি না যে, আমাদের ছোটবেলায় আলো কম থাকলেই হরদম এই যোগাযোগ সম্ভব হত, সেটা বাড়াবাড়ি হবে। তবে তাঁদের অনেকেই যে দেখা না দিলেও কাছাকাছিই রয়েছেন, সেই ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ধারণা আমাদের ছিল। সেই যুগের শিক্ষা পেয়েছি বলেই আজও আমি সন্ধের আগে পর্যন্ত সম্পূর্ণ নাস্তিক হলেও, রাত বাড়লে ঘোর সাবধানী, কারণ ভূতেদের সঙ্গে ইয়ার্কি নয়।
বিদেশে থাকা আত্মীয়দেরও তো দেখতে পেতাম না এখনকার মতো প্রতি মুহূর্তে মজা করতে, কিন্তু তাই বলে কি তাঁরা নেই বলে কখনও সন্দেহ করেছি? সবাই মেনে নিয়েছে তাও নয়। হয়তো ওপাড়ার রামুকাকু বা হারুবাবু এসে সন্দেহ প্রকাশ করলেন, যে জ্যাঠামশাইয়ের ছেলে সত্যিই সান ফ্রান্সিসকোতে ইঞ্জিনিয়ার, কারা যেন বলছিল আদতে রৌরকেলার কাছে কয়লাখনিতে ওভারসিয়ার? আর যদি বা এইসব সত্যিও হয়, তারা যখন মাঝেমধ্যে দেশে ফেরে, তখন আমাদের কথা আদৌ মনে রাখে-টাখে তো? হারুবাবুকে তখন কোনওমতে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই সেখানে জ্বলজ্বল করছে প্রমাণ। ওই তো, বাথরুমের তাকের থেকে এখনও তিন বছর আগেকার ক্যামে সাবানের র্যাপারে আলো ঠিকরোচ্ছে, এর থেকে অকাট্য প্রমাণ আর কীই বা চাই মানুষের?
আধুনিক যুগে জন্ম যে পাঠকদের, তাঁরা মাথা চুলকে ভাববেন, এটা আবার কোন সাবান। তাঁদের জ্ঞাতার্থে, নয়ের দশক পর্যন্ত বিদেশে থাকা আত্মীয়রা দেশে ফেরার সময় দেশি আত্মীয়দের জন্য ওদেশের ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে গাদা গাদা সেইসব জিনিস কিনে আনতেন, যেগুলো সস্তা, কিন্তু দেখে বেশ অনেকটা মনে হয়। এর মধ্যে অন্যতম উপাদান ছিল এই ক্যামে সাবান। তারপরেও অনেকে আনতেন, কিন্তু ততদিনে এখানকার লোকজনও কোক-পেপসি খেয়ে বুঝে গেছে ওসব গিফটের মানে নেই।

তো, এই আত্মীয়দের সঙ্গে সেযুগে যোগাযোগ তো ওই কালেভদ্রেই হতো। কিন্তু যোগাযোগ ছিন্নও করা যায় না, পাছে ওরকম জরুরি লোকজন আমাদেরই উদ্যোগের অভাবে আমাদের ভুলে যায়? তাই মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক ট্রাঙ্ক কল বুক করে বসে থাকা হত। কখন লাইন পাওয়া যাবে তার কোনও ঠিক নেই, ফোনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিয়ম করে কেউ না কেউ পাহারা দিচ্ছে, রিং হলেই খপ করে ধরে ফেলতে হবে। মিস করা চলবে না। এখানেও বিদেশ এবং পরলোকের আরেকটা মিল। তা হল, যখন বিলেত বা আমেরিকার লাইন অবশেষে পাওয়া গেল, অন্যদিক থেকে যে ক্ষীণ বিদেহী গলা ভেসে আসত, তা এতই মৃদু আর অস্পষ্ট যে, আওয়াজটা যে ইহজগতেরই তা হলফ করে বলা অসম্ভব।
যাই হোক, ভৌগোলিক এবং জাগতিক বিচ্ছেদের ধাঁচ কিছুটা একরকমের লাগলেও, সেগুলো অতিক্রম করার উপায়গুলো তো আর এক নয়। মানে, পরলোকের জন্য তো টেলিফোন চলে না। ওপারে যোগাযোগের আন্তর্জাগতিক সামাজিক মাধ্যম বলতে চিরকালই প্ল্যানচেট। আজকাল অবশ্য কমে এসেছে এসব। কারণ লোকে এতই মোবাইলে ব্যস্ত, পরকাল নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আর কে খোঁজখবর নেবে? এখন ট্রেনে-বাসে সবাই উঠেই মোবাইল। সামনের সিটে ঠেসাঠেসি করে চারটে ব্রহ্মদৈত্য আর মামদো বসে থাকলেও চোখে পড়বে না। এই বেইজ্জতি ফিরে এসে কেই বা নিতে চায়?

আমাদের ছোটবেলায় যেহেতু এসব ছিল না, তখনও প্ল্যানচেটের বেশ একটা বাজার ছিল। আর মানুষও আসল দূরত্বগুলো জানত ভালো করে। যেমন, ধরা যাক, বিদেশের থেকে আদতে পরলোক বেশি কাছে। তবে ইহলোক থেকে লোকান্তরিত না হয়ে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একটা ছোট সুড়ঙ্গ দরকার। সেখানে বিদেশ যেমন যে দূর, সেই দূরেই, চাইলেও পৌঁছনো কঠিন। তাছাড়া ভূতেদের জগৎ কাছেই, আজ বাদে কাল সবাই পৌঁছবই, এটা আমরা মোটামুটি জানতাম।
তুলা রাশি হওয়ার জন্য আমার বাবার না কি ভূত আকর্ষণী ক্ষমতা বিশেষভাবে বেশি ছিল। ভালো অ্যান্টেনার মতো, যে রেডিওতে দূরের স্টেশনগুলোও ধরা পড়ে। বাবা ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত প্ল্যানচেট করত। ঠাকুমার সেটা মোটেই পছন্দ ছিল না, এসব জিনিস গৃহস্থ বাড়িতে করাটা অকল্যাণ। তাছাড়া আত্মাদেরও তো কষ্ট হয়?
যেহেতু ব্যারাকপুরে বহু সাহেব থাকত এককালে, মাঝেমধ্যেই না কি বাবার প্ল্যানচেটের আসরে সাহেবসুবোরা ঢুকে পড়ে হম্বিতম্বি করে যেত। ডাকা হচ্ছে হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, এসে পৌঁছলেন লর্ড ক্যানিং, সেরকম। মায়ের কাছে শুনেছি, কোনও এক গ্রান্ট না কী নামের এক সাহেব না কি রেগুলার এসে পড়তেন বাবার প্ল্যানচেটে। ‘মঙ্গল পান্ডের কাছে কোথায় যেন ওঁর সমাধিও আছে।’

খারাপই লাগে, জীবিত অবস্থায় নিশ্চয়ই খুব সামাজিক ছিলেন।
তবে সব ভূতই যে সামাজিক হবে তারও মানে নেই। রাগী ভূতও রয়েছে অনেক, যাদের ডাকলেই রেগে যায়। ভূতেরা যেহেতু মানুষেরই মাদার টিঙ্কচার, মানুষের বিভিন্ন গুণাবলির নির্যাসটুকুও যে তাদের মধ্যে থেকে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এটাও ঠিক যে লোকে অকারণেও বিরক্ত করে খুব। ওই সোশাল মিডিয়ায় পিং করার মতোই। বেশিরভাগ লোকেরই আদতে জরুরি কোনও কথা নেই।
হয়তো বহু আড়ম্বর করে ডাকা হল কোনও বিদেহী আত্মাকে। তিনি তখন কচি ঘাসফুলে ঢাকা স্বর্গের প্রান্তরে বসে সমমনস্কদের সঙ্গে জীবনের অর্থ নিয়ে দার্শনিক খুনসুটি করছেন, তা না– ‘ওগো শুনছ, তুমি কি রয়েছ? একটু আসতে পারবে?’ ‘মেসোমশাই, আছেন?’ ‘বাবা, বাবা?’ ফিরে না গিয়েও মুশকিল, এতদিনের পরিচয়। সেদিন পর্যন্ত শুশ্রূষা করেছে, ফেলে এসে সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেলে নেমকহারাম বলবে না লোকে? তাছাড়া ওই ডাকাডাকির চোঙ ধরে অন্য কোনও পাজি আত্মা নেমে ফষ্টিনষ্টি করে এলে নাম খারাপ হবে নিজের, সেটাও মেনে নেওয়া যায় না। তো উচ্চমার্গের আলোচনা ছেড়ে নিচে নেমে গিয়ে প্রশ্নটা কী? ‘সিন্দুকের চাবিটা কোথায় রেখে গেছ, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!’, বা ‘টেঁপি অসবর্ণ প্রেম করছে, কী করি?’

ফলে ভূতেরা অসামাজিক সেই কারণেও। ফিরেই বা কী হবে বারবার? সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ছবি তুলে ব্যক্তিগত গরিমা বাড়িয়ে সাধারণ লোক যেমন তাদের ছিবড়ের মতো ফেলে দেয়, তাদের কি খারাপ লাগে না? বা, হলই না-হয় ক্যামে সাবান, হাতে করে ১৪ হাজার কিলোমিটার যে নিয়ে এলাম হারামজাদা, সেটা এই মুখ বাঁকানো দেখতে? সেরকমই, আত্মাদের সঙ্গেও মানুষেরও এই স্বার্থের সম্পর্কে বিদেহীরা ক্রমাগত ফেরার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে হয়ে যান। বারবার ধাক্কা খেয়ে ভাবেন, এবার যখন ফিরব, তখন এমন ব্যোমকে দেব, বুঝবি!
বাবার শেষবারের প্ল্যানচেটে মা-ও সঙ্গে ছিল। মা, বাবা, কালীদাসকাকু, মেসো আর বনগাঁর আমাদের কিছু জমিতে চাষ করত সেই মামু– এই চারজন। মামুকে ছোটবেলায় আমিও দেখেছি। বাগানের কাঁঠাল আনত। তো, বড় ফুলস্কেপ পাতা রাখা হয়েছে বোর্ডে টানটান করে, তার ওপর পেনসিল সোজা করে দাঁড় করিয়ে সবাই সেটাকে দুই আঙুলের ফাঁকে ধরেছে, ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার, সঙ্গে শুধু একটা টর্চ, উত্তর দেখার জন্য। সবাইকে বলা হল, তারা যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা চিন্তা করে। কিছুক্ষণ ঘরে নড়াচড়া নেই, পিন পড়লেও শব্দ হয়, তারপর হঠাৎ না কি পেন্সিল ঘুরতে শুরু করল বনবন করে। থামলে আলো জ্বেলে দেখা গেল কী সব ঘিচিমিচি লিখে গেছে কে। বাবা বলল, যদি অন্য কেউ এসে থাকেন, দয়া করে চলে যান। তার কিছু পরে না কি আবার ঘুরল পেনসিল। এবার কিন্তু লেখা হল ‘বিভূতি’।

মাকে জিজ্ঞেস করলাম, তা কী কী প্রশ্ন করলে তোমরা? স্বভাবতই, মহাপুরুষ নেমেছেন প্ল্যানচেটের ক্ষেত্রে, জীবনের মানে-টানেগুলো জেনে নেওয়ার সমূহ সুযোগ।
মা বলল, আমরা ওই জিজ্ঞেস করলাম, ঘাটশিলার বাড়িটা একজন নিয়ে কীসব বানাবে বলছে, তা কি দেওয়া হবে? উত্তর এল– না, না, না। তারপর ভেবেছিলাম আমি পরীক্ষায় পাশ করব কি না ওটাও জেনে নিই, কিন্তু লজ্জায় আর বলতে পারলাম না।
আত্মারা কি সাধে সচরাচর দেখা দেন না? এই যে ক্ষণিকের আশ্চর্য যোগাযোগ স্থাপন করা গেল, প্রশ্নগুলো কিন্তু কেমন সাধারণ মার্কা। তাছাড়া এই যে আমাদের ধারণা আত্মা মানেই সর্বজ্ঞ হতে হবে। বিভূতিভূষণ কী করে মায়ের ইউনিভার্সিটির পরীক্ষার রেজাল্ট জানবেন? তাও না কি যথাসাধ্য কীসব পারিবারিক ইস্যুর উত্তর দিয়েছিলেন উপরোধে পড়ে। তারপর বাবা বলায় যে, আপনার যদি এখানে থাকতে কষ্ট হয়, আপনি দয়া করে চলে যান, দ্রুত লেখা হয়েছিল, ‘তথাস্তু’।

বাবার বড়মামা আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন। আমরা ডাকতাম বড়দা। ওঁরা নিঃসন্তান হওয়ায় আমরা বিভিন্ন বাচ্চারা বড়দার ঘরে বসে আড্ডা দিতাম দিনরাত। আমি তখন খুবই ছোট। আহ্লাদী আর টুকটুকি এসেছে, আর পম্পালীদি। বড়দা বলল, চল, আমরা প্ল্যানচেট করি। সবাই শুনে উত্তেজিত। কাগজ-টাগজ সেট করা হল, তারপর ঘর অন্ধকার করে সবাই পেনসিল ধরল আঙুলের ফাঁকে আলতো করে। সবই ঠিকঠাক যাচ্ছিল, এমন সময় পরিষ্কার টের পেলাম বড়দা প্রাণপণে পেনসিলটাকে টেনে কীসব লেখার চেষ্টা করছে!
তো যেটা বলছিলাম। প্ল্যানচেটের মতো ইহ এবং পরলোকের সামাজিকতা যদি স্থাপন করতেই হয়, এটা বিলেতের আত্মীয়দের দেশে ফিরতে বলার মতো খানিকটা। ওদেশের হাওয়াবাতাস ভালো, সবকিছু নিয়মমাফিক চলে। এখানে এসে সেরকমই আত্মাদেরও ভালো লাগে না। বৈষয়িক প্রশ্নও করবেন না, এদিকের অল্প যা বিষয়-আশয়, তাতেও ওঁদের আর সেভাবে মন নেই। মনে রাখবেন, এমন কিছু করবেন না যেটা আপনি যখন ওদিকে পৌঁছবেন, আপনার সঙ্গে এদিক থেকে কেউ করলে নিজেকে ব্যবহৃত লাগত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved