


ঘাসেরা তো অত সহজে মরে না। মৌমাছিরাও না। এতকিছুর পরেও ওই ভাঙা ঘরের ছাদ থেকে মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে উপকূলরেখা ও সেইসব সীমানা যেখানে ফুটে উঠেছে বুনো ফুল। যুদ্ধের পোড়া গন্ধমাখা মাটি থেকে মাথা উঁচু করে। সেখানে তাদের সঙ্গে মৌমাছিদের দেখা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে। মৌমাছিরা সীমান্ত বোঝে না। গাছেরাও না। তারা শুধু জানে ভালোবাসা সম্পর্ক দায়িত্ব কর্তব্য ও জীবন। মৌমাছিরা ফুল থেকে নিয়ে আসছে পরাগ ও মকরন্দ আর ফলসম্ভব করে আসছে শত সহস্র গাছকে। এরপর ঘাসেদের দল দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেবে বীজ। বৃক্ষেরা ফলভারে নত হবে। তাদের বীজ ছড়িয়ে দেবে সীমান্ত পেরিয়ে অজস্র পাখি বাদুড়ের দল। দিকে দিকে আবার ঘাস, আবার নতুন চারা এবং আবার ফুল। আবার চক্রাকারে আদি অকৃত্রিম প্রাণ এগিয়ে যাবে। থেকে যাবে ইব্রাহিমদের মতো মানুষের জানকবুল লড়াইয়ের গল্প।
চারিদিক ভাঙাচোরা ইট কাঠ পাথরের প্রাণহীন স্তূপ। মানুষের ক্রোধ, অন্ধত্ব, অহংকার, জিঘাংসা, রিপু, ঘৃণার অন্ধকার প্রমাণ। দীর্ঘ যুদ্ধ। দগদগে! হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। জেনোসাইড। সারা পৃথিবী একযোগে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। অহরহ মিছিল, চিৎকৃত স্লোগানের বিপুল ঢেউ এসে লাগছে গাজার তীরে। তারই মাঝে থেকে থেকে শেল বুলেট বোমার বিকট শব্দ, ঝলসানো আগুন, দরদালান ভেঙে পড়ার শব্দ, মানুষের কান্না, হইহই। তবু গাজার মৌমাছিরা এখনও উড়ছে।
মৌমাছি উড়ছে মানে কিছু ফুল এখনও অবশিষ্ট আছে। ফুলেরা একবার মৌমাছিকে অথবা মৌমাছিরা ফুলকে একবার খুঁজে পেলে বানচাল হয়ে যাবে তামাম এই যুদ্ধের দলিল। মাটি ফাটিয়ে সমস্ত সীমানা ঘুচিয়ে তারা আবার ফিরিয়ে আনবে সবুজ। আবার প্রাণ। আবার সেই এক জীবনীশক্তি, যার অধীনে ক্ষুদ্র মানুষের জন্ম।
তারা একটা গল্প কয়েক কোটি বছর ধরে বলে যাচ্ছে। গল্পটা মানুষ, মানুষের সভ্যতা, তার অভিধানে লেখা মানবিকতা অমানবিকতা যুদ্ধ শান্তি ইত্যাদির চেয়ে অনেক বড়।

ইব্রাহিম আল ডাব্বা নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে একটা ভাঙা ঘরের ছাদে উঠছেন। ঘরে কেউ নেই। যারা থাকত, তারা আদৌ বেঁচে আছে কি না তাও জানা নেই। আপাতত এই ভাঙা ঘরের ছাদে ইব্রাহিমের মৌমাছিদের আস্তানা। এমন ভাঙা ঘরের ছাদ মৌমাছির বাক্স রাখার আদর্শ জায়গা নয় মোটেই। এই আকালে কেউ বাক্সগুলোকে জ্বালানি হিসেবে নিয়ে চলে যেতে পারে। কাঠের বাক্স ভেঙে কিছু আসবাব বানানোর কাজেও লাগিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু আপাতত আর কোনও নিরাপদ জায়গা ইব্রাহিমের কাছে নেই– এই ছাদ ছাড়া। উঁচু ঘরের ছাদ থেকে যতদূর চোখ যায় প্রায় জনমনুষ্যহীন শহর ভেঙে পড়া ইট বালি পাথর লোহার ভার নিয়ে মুখ থুবড়ে শুয়ে আছে। তার মধ্যেই ইব্রাহিমের ছেলে বছর আঠেরোর মুসা নীল আকাশের দিকে মৌমাছির একটা ফ্রেম তুলে ধরে। তারা সকলে মন দিয়ে যে যার কাজ করে যাচ্ছে। ছাদ থেকে উড়ে উড়ে ঠিক খুঁজে আনছে এখনও-বেঁচে-থাকা ফুলেদের খবর। মৌমাছিদের মহল্লায় মানুষের জেনোসাইডের খবর, শেল বোমা বুলেট বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর কেমনভাবে পরিবেশিত হয়, তা এখনও আমার জানা নেই, তবে তারা পরিস্থিতিটা নিশ্চয়ই তাদের মতো করে বুঝছে।
গাজার মৌমাছিদের দেখে ইব্রাহিমের মনে হয় গাজার মানুষদের কথা। গাজার মানুষের অনিঃশেষ জীবনীশক্তির মতো অজস্র বাধা অতিক্রম করে তারা ঠিক খুঁজে বার করছে ফুলের ঠিকানা। ঠিক ফিরে আসছে চাকে।

যুদ্ধের আগে ৪০০টা মৌ-বাক্স ছিল ইব্রাহিমের। এখন যুদ্ধের পরে সংখ্যাটা ৩৫-এ নেমে এসেছে। জীবনে প্রাণভরে তিনি এই কাজটাই শুধু শিখেছেন। মৌ-পালন। আর কিছুই পারেন না। এই তার ধ্যানজ্ঞান, সাধনা, যাপন, রুটিরুজি। সাত সন্তানের জনক ইব্রাহিমকে তাই এতবড় জেনোসাইড দিয়েও তার মৌমাছিদের থেকে আলাদা করা যায়নি। যুদ্ধে কবেই তার ঘর ভেঙেছে। বারবার বাসা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। তার গোটা মৌ-পালনক্ষেত্র, নানা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে– যার বাজারমূল্য সাড়ে তিন লক্ষ ডলার। যেটুকু যা টাকা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন– তা দিয়ে অগ্নিমূল্য বাজার থেকে মাত্র তিনটে মৌ-বাক্স তাকে কিনতে হয়েছিল তিন হাজারেরও বেশি ডলার দিয়ে। যে মোমপাতাকে ফাউন্ডেশন শিট হিসেবে একটা মৌ-বাক্সের প্রতিটি ফ্রেমে মৌমাছিদের ঘর বাঁধবার জন্য ব্যবহার করা হয়, সেই শিটের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তবুও গাজার মৌ-পালকরা হার মানেননি। ২০২০ সালে FAO-এর হিসাব বলছে– ৮৬,০০০ মৌ-বাক্স ছিল গাজায়। অপূর্ব স্বাদ-গন্ধের বিশ্বমানের মধু উৎপাদন করেছে প্যালেস্তাইন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চল। বছরে চার থেকে পাঁচশো মেট্রিক টন মধু সরবরাহ করেছে তারা বিশ্বকে। সেই মৌ-বাক্সের সংখ্যা আড়াই বছর আগে নেমে এসেছিল ৩০,০০০-এ। এখন তো অনেক কম। মধুর উৎপাদন আগে যা হত, এখন তার এক তৃতীয়াংশ। ইব্রাহিম ভেবেছিলেন সিজফায়ারের পর পরিস্থিতি ক্রমে স্বাভাবিক হবে, কিন্তু সিজফায়ারের পরে ইয়েলো লাইন টেনে তাদের যাতায়াত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চাইলেও নিজেদের কৃষি বা মৌ-পালনক্ষেত্রে তাঁরা যেতে পারছেন না। বাক্স নেই, মৌমাছি নেই, ফ্রেম নেই, ফাউন্ডেশন শিট নেই, ফুল নেই– তাই অনেক জায়গাতেই মৌমাছিরা যেটুকু আছে তাদেরকে চিনির জল খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ যে মৌমাছির কাছে ফিরবে তার প্রায় সব পথ বন্ধ।

তবু মানুষ তো মানুষ। ধ্বংসের চেয়ে তার সৃষ্টির ইতিহাস বড় বা তার চেয়েও বেশি, বিস্ময়কর! বিশেষ করে গাজায় মৌ-পালন বিষয়টা মানুষের রক্তে। কয়েক হাজার বছর ধরে তাঁরা বংশানুক্রমিকভাবে মৌ-পালন করেছেন ভালোবেসে। মৌমাছির জীবনদর্শনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে। মধুর ব্যবসা, ইব্রাহিমের কথায়, এই সেদিনের। কিন্তু মৌমাছির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক? শত-সহস্র বছরের। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ৩২ বছরের তরুণ মৌ-পালক ফাহাদ আল দাহদু তাঁর ধ্বংস হয়ে যাওয়া পুরনো মৌ-পালনক্ষেত্র থেকে তুলে আনছেন ভাঙা বাক্স, কাঠকুটো। দিনের পর দিন তাই মেরামত করে বানিয়ে চলেছেন নতুন বাক্স। ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্রেরা যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই তিনটে মাত্র বাক্স থেকে এখন তৈরি করেছেন আরও ৩২টা বাক্স। অর্থাৎ, মোট ৩৫টা বাক্স। মানুষ এগচ্ছে, মৌমাছিরা এগচ্ছে।
এই মৌমাছি নিয়ে মৌ-পালকরা পরিযান করতেন। নানা কৃষিক্ষেত্র, চারণভূমি, অরণ্যের কাছে যেতেন। উপকূলেও যেতেন। ইজরায়েলের সীমানায় গিয়ে বাক্স রাখতেন। মৌমাছি তো মানুষের ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন বোঝে না। সীমান্তও বোঝে না। তাদের কেউ ইজরায়েলি মৌমাছি নয়, কেউ প্যালেস্তিনীয় নয়। তারা সীমানা পার করে উড়ে যেত ইজরায়েলের বাগানে। মানুষের দাগে আঁকা প্যালেস্তাইনের মৌমাছি হন্তারক ইজরায়েলের বাগানে ফুলে ফুলে সারাদিন ঘুরে তাদের ফলসম্ভব করে আসত। সে ফল আর বীজ তো পেত ইজরায়েলই। এখন অনেকদিন হল প্যালেস্তাইনের মৌমাছিদের সীমান্তে আর যেতে দেওয়া হয় না। তাদেরও আর ইজরায়েলের ফলবাগানে যাওয়ার অধিকার নেই। চাষবাস তো ব্যাহত। চারণভূমিও ঝলসে গিয়েছে। তাই মৌমাছিদের খাবারের খুব অভাব। নিজেদের খাবারে টান পড়লেও মানুষ তবু চেষ্টা করে যাচ্ছে মৌমাছিদের জন্য কীভাবে একটু খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। মধু কতটা পাওয়া যাবে বড় কথা না। এই মৃতের শহরে মৌমাছিদের জীবনপ্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখাই এখন মৌ-পালকদের দিনরাতের ব্রত।

হাজার বছর ধরে মৌ-পালন করতে করতে প্যালেস্তাইনের মৌ-পালকরা যখন অন্যতম প্রধান পেশা হিসেবে মৌ-পালনকে গ্রহণ করলেন, তখন তারা দ্রুত বিশ্বের বাজারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধু সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছিলেন। মধুকে তারা বলেন ‘হলুদ সোনা’। পরিসংখ্যান তো আগেই দিয়েছি। ইব্রাহিমের মতো মৌ-পালকরা ছাড়াও ভিন্ন পেশার মানুষ মৌ-পালনে এসেছেন। ছোট্ট গাজা শহরেই মৌ-পালক আছেন ৯০৫ জন। রতেব সামুর একজন ইঞ্জিনিয়ার। তাঁরা ৩৬ জন তরুণ ও ১৪ জন তরুণী মিলে ‘আল হান্নুন’ নামে এক মৌ-পালক সমবায় গড়ে তোলেন। সেখানে কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পুষ্টিবিজ্ঞানী, কেউ শিল্পী, কেউ শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মী। জেরিকো শহরের আইসা-র মতো মৌ-পালক রয়েছেন। তাঁর মেয়ের লেখাপড়ার খরচ তিনি চালাতেন মৌ-পালন করেই। মৌমাছির শরীর নিঃসৃত মোমই প্রকৃত মোম। সেই মোম যাতে এতটুকুও নষ্ট না হয়, তার জন্য FAO থেকে একটি বিশেষ মেশিন প্যালেস্তাইনে প্রথম স্থাপন করা হয় আল হান্নুন সমবায়ের মাধ্যমে। সেই মেশিনে সমস্ত মোম গলিয়ে আবার তাকে ঠান্ডা করে বাক্সের নানা কাজে, ফাউন্ডেশন শিট বানানোর কাজে, সুদৃশ মোমবাতি বা মোমের ভাস্কর্য তৈরির কাজে ব্যবহৃত হত। এক বছরের মধ্যে এই মেশিনের সাহায্যে ২৮% খরচ সাশ্রয় করেন আল হান্নুনের তরুণ মৌ-পালকেরা। ৬০ টন উৎকৃষ্ট মৌ-মোম তাঁরা আমদানি করেন বিশ্ববাজারে। যুদ্ধ এসব কেড়ে নিয়েছে। তবু একটু একটু করে আবার তাঁরা ফিরছেন রোজ পরিশ্রম করে।
‘মৌপালন তো শুধু আমাদের জীবিকা নয়। আমাদের জীবনও। মৌমাছিরা হারিয়ে গেলে আমরাই বা বাঁচব কী করে? তাই জানের পরোয়া করি না। মৌমাছিরা তো শুধু মধু দেয় না। পরাগমিলন করে। মৌমাছিরা না থাকলে আমাদের গাছপালারাই বা একা একা থাকবে কী করে? আর কোনও কাজও আমি জানি না। আমি আশৈশব শিখেছি কীভাবে মৌমাছিদের যত্ন করতে হয়, রানি মৌমাছি বানাতে হয়, কীভাবে আমাদের অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীল মৌমাছির স্ট্রেন উদ্ভাবন করতে হয়। তাই যতক্ষণ এ শরীরে প্রাণ আছে আমরা মৌমাছিদের জন্যই কাজ করে যাব।’

জেরিকো শহরের আইসা বলেন, ‘এরকম গরম একটা শহরে মৌমাছিরা থাকে ভাবতে অবাক লাগে না? কিন্তু গরম আরও বেড়ে যাওয়ায় মৌমাছিদের এখন কষ্ট হচ্ছে। অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। তখন বসন্ত। তখন বাইরে ফুলেদের দল। অথচ মৌমাছিরা প্রবল বর্ষায় বেরতে পারছে না। শুধু ইজরায়েলি ব্লকেড বা যুদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তন, পেস্টিসাইডের প্রয়োগ আমাদের ঐতিহ্যবাহী পেশাকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। তবু আমরা হারিনি। আমাদের মৌমাছিরাও লড়ে যাচ্ছে।’
প্যালেস্তাইন নিয়ে সারা বিশ্ব-জুড়ে সওয়াল চলেছে। আজ মনে হল তারা কেমন আছে? মৌমাছিরা? যারা দেশ কাল সীমানা নির্বিশেষে পৃথিবীর তৃণভূমি থেকে শুরু করে সবরকমের বাস্তুতন্ত্র জুড়ে জীবনের প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রেখেছে মানুষের থেকে একটিও পয়সা না নিয়ে? কেমন আছে সেই মৌমাছিরা যারা থাকে একা মাটির নিচে? যারা মানুষের চেয়ে বয়সে ঢের বড়। খুঁজতে খুঁজতে দেখা হল তাদের সঙ্গে। ইব্রাহিম, আইসা, রতেবের মতো নারীপুরুষদের সঙ্গে যাঁরা জীবনকে শ্রদ্ধা করেছেন। যাঁরা মৌমাছিদের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। এই পাহাড়প্রমাণ যন্ত্রণা, মৃত্যুমিছিল, খাবারের অভাব, টাকার অভাব পেরিয়ে, ভয়ে ভয়ে বেঁচে না থেকে নিজেদের শেষ সম্বল উজাড় করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে ভাঙা বাক্স কাঠকুটো থেকে আবার গড়ে তুলেছেন মৌমাছির বাক্স। ইট কাঠ পাথরের স্তূপ, শেল বোমা বুলেট থেকে বুক দিয়ে আগলে নিশ্চিত করেছেন মৌমাছিদের জীবনপ্রবাহ ও বংশবিস্তার। এর চেয়ে বড় জীবনগাথা আর কী হতে পারে?

গাজার ধ্বংসস্তূপে কান পাতলে গুনগুন গুঞ্জন শোনা যায়। গাজার মৌমাছিরা এখনও উড়ছে। এখনও গাজায় ফুল ফুটছে। মৌমাছিরা বারুদের গন্ধের ভিতর ঠিক তার ঘ্রাণ খুঁজে নিচ্ছে। শেল বোমায় ভারী হয়ে থাকা আকাশ পাড়ি দিয়ে ঠিক ফিরে আসছে চাকে। গাজার এই মৌমাছিদের দেখে ইব্রাহিমের মনে হয় গাজার মানুষদের কথা। বারবার যারা ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে জীবনের দিকে। খেদ বলব না কি সময়ের কবিতা? ইব্রাহিম বলছেন–
‘যে মৌমাছিদের বড় হওয়ার কথা দুরন্ত সবুজের মাঝে
তারা জন্মাচ্ছে এই পাথরের স্তূপের ভিতরে!’
যুদ্ধের কারণে একদিন বাংলায় বিরাট মন্বন্তর হয়েছিল। ঘরে ঘরে চাষিরা সপরিবারে না খেয়ে মরে গেলেও অজস্র দেশি বীজধান বাঁচিয়ে গিয়েছিলেন সুদিনের স্বপ্নে। এই ভেবে যে, মন্বন্তর শেষে সুদিন এলে আবার এইসব বীজধানে বাংলার মাঠ ভরে যাবে। ইব্রাহিম, রতেব, আইসাদের চোখেও সেই স্বপ্ন। আবার ফুলে ফলে গাছে ভরে যাবে তাদের গ্রাম মফস্সল শহর। বাংলার কৃষকদের সামনে সেদিন একদিকে জীবন, একদিকে যুদ্ধ মন্বন্তর মৃত্যু আর হাতভরা বীজ। আর ইব্রাহিমদের হাতে তাদের দেশে বেঁচে থাকা আর কিছু মৌমাছি।
একটা ছবি দেখছি। ঘাসেরা তো অত সহজে মরে না। মৌমাছিরাও না। এতকিছুর পরেও ওই ভাঙা ঘরের ছাদ থেকে মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে উপকূলরেখা ও সেইসব সীমানা যেখানে ফুটে উঠেছে বুনো ফুল। যুদ্ধের পোড়া গন্ধমাখা মাটি থেকে মাথা উঁচু করে। সেখানে তাদের সঙ্গে মৌমাছিদের দেখা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে। মৌমাছিরা সীমান্ত বোঝে না। গাছেরাও না। তারা শুধু জানে ভালোবাসা সম্পর্ক দায়িত্ব কর্তব্য ও জীবন। মৌমাছিরা ফুল থেকে নিয়ে আসছে পরাগ ও মকরন্দ আর ফলসম্ভব করে আসছে শত সহস্র গাছকে। এরপর ঘাসেদের দল দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেবে বীজ। বৃক্ষেরা ফলভারে নত হবে। তাদের বীজ ছড়িয়ে দেবে সীমান্ত পেরিয়ে অজস্র পাখি বাদুড়ের দল। দিকে দিকে আবার ঘাস, আবার নতুন চারা এবং আবার ফুল। আবার চক্রাকারে আদি অকৃত্রিম প্রাণ এগিয়ে যাবে। থেকে যাবে ইব্রাহিমদের মতো মানুষের জানকবুল লড়াইয়ের গল্প। তারা একবেলা খেয়েছিল নিজেরা আর একবেলা খাইয়েছিল মৌমাছিদের। যেদিন ফুল ছিল না, ছিল শুধু আপাদমস্তক Rubble। মানুষ এসেছিল ভালোবাসার আর এক ধারক হয়ে। তাদের ওপর ঝরে পড়বে মৌচাকের মধু, সীমান্ত পেরনো বৃক্ষের কুসুম।

আড়াল থেকে কেউ চিরতরে থেমে যাওয়া কামান, মেশিনগান, জংধরা রাইফেলের ভিড়ে শান্তির গান গেয়ে বলবে–
‘ভালোবাসা সেদিনও ছিল
মানুষ ছিল না, আছে এবং থাকবে না যেদিন’
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন মিশ্র-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved